ঢাকা মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

আফগান শান্তিচুক্তি ও তার ভবিষ্যৎ

আফগান শান্তিচুক্তি ও তার ভবিষ্যৎ
×

ইশফাক ইলাহী চৌধুরী

প্রকাশ: ০৫ মার্চ ২০২০ | ১৩:১৭

কাতারের রাজধানী দোহায় গত ২৯ ফেব্রুয়ারি তালেবান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের মধ্যে স্বাক্ষরিত শান্তিচুক্তিটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হলেও এর ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। আমরা দেখেছি, ওই চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও এবং তালেবান নেতারা ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন কাতার, তুরস্ক, ভারত, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, উজবেকিস্তান ও তাজিকিস্তানের প্রতিনিধিরা। মার্কিন-তালেবান দুই পক্ষই চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা আফগান যুদ্ধের একটি শান্তিপূর্ণ পরিসমাপ্তি টানা ছাড়াও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র শক্তিগুলোর সেনাসদস্যদের সম্মানজনকভাবে আফগানিস্তান থেকে সরে আসারও একটি প্রচেষ্টা এই চুক্তি।
যদিও আমরা দেখেছি, তালেবানের সঙ্গে মার্কিন বাহিনীর এই সংঘর্ষ ২০০১ সাল থেকে চলে আসছিল; কিন্তু আফগান জনগণের ভাগ্যে গত চার দশকে যুদ্ধ ছাড়া আর কিছু ছিল না। ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তানে লক্ষাধিক সোভিয়েত সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে দেশজুড়ে গেরিলা যুদ্ধ সংঘটিত হয়। সোভিয়েত ইউনিয়নকে আফগানিস্তান থেকে হটানোর জন্য মার্কিনিদের সহায়তায় আফগান-পাকিস্তান সীমান্তে মুজাহিদিন বাহিনী গড়ে তোলা হয়েছিল। এক যুগ ধরে চলা এই যুদ্ধে প্রায় ১৫ হাজার সোভিয়েত সেনা, প্রায় ৯০ হাজার মুজাহিদিন ও ১৮ হাজার আফগান সৈন্য নিহত হয়। লক্ষাধিক আফগান বেসামরিক জনগণ হতাহত হওয়া ছাড়াও প্রায় ২০ লাখ আফগান নাগরিক পাকিস্তান ও ইরানের উদ্বাস্তু শরিকগুলোয় আশ্রয় নেয়। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর মদদপুষ্ট মুজাহিদিনরা সোভিয়েত সৈন্য চলে যাওয়া পর কাবুলে তাদের সরকার গঠন করে; কিন্তু শিগগিরই নিজেদের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্বের ফলে আফগানিস্তানজুড়ে আবারও গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। ফলে কাবুলসহ আফগানিস্তানের বড় শহরগুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। এই গৃহযুদ্ধের সুযোগে পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী গোয়েন্দা (আইএসআই) তত্ত্বাবধানে সীমান্ত প্রদেশের মাদ্রাসার ছাত্রদের নিয়ে তালেবান বাহিনী গড়ে তোলে, যারা ১৯৯৬ সালে মুজাহিদদের হটিয়ে কাবুলে তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে।
তালেবানরা তাদের দৃষ্টিতে, ইসলামী শাসনব্যবস্থা কায়েমের নামে সব আধুনিক স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল ইত্যাদি বন্ধ করে দেয়। মেয়েদের জন্য অত্যন্ত কঠিন পর্দাপ্রথা চালু করে। সে সময় ওসামা বিন লাদেনসহ আল কায়দার নেতৃবৃন্দ আফগানিস্তানে সন্ত্রাসী ঘাঁটি গড়ে তোলে। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ারে হামলার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ওসামা বিন লাদেনকে হস্তান্তরের জন্য তালেবান সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। তালেবানপ্রধান মোল্লা ওমর এতে রাজি না হওয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ ন্যাটো সদস্যরা আফগানিস্তানে হামলা করে। ফলে অচিরেই তালেবান সরকারের পতন ঘটে এবং আফগানিস্তানে নতুন সরকার গঠিত হয়। তালেবানরা তখন পাক-আফগান সীমান্তে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। সেই থেকেই গত প্রায় দুই দশক ধরে আফগানিস্তানজুড়ে তালেবানের সঙ্গে আফগান সরকারি বাহিনী ও যুক্তরাষ্ট্রসহ তাদের মিত্র শক্তিদের মধ্যে সংঘর্ষ চলে আসছে।
যদিও ইতোমধ্যে আফগান জনগণ প্রথমবারের মতো একটি গণতান্ত্রিক শাসনতন্ত্র রচনা এবং সেই শাসনতন্ত্রের অধীনে নির্বাচিত সংসদ ও রাষ্ট্রপ্রধান পেয়েছে; কিন্তু দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল, বিশেষ করে পাক-আফগান সীমান্ত অঞ্চলে তালেবানের প্রভাব রয়ে গেছে। এ পর্যন্ত এ যুদ্ধে প্রায় আড়াই হাজার মার্কিন ও ন্যাটো সেনা নিহত হয় এবং আহত হয়েছে প্রায় ২০ হাজার। তাছাড়া প্রায় ৬০ হাজার আফগান সেনা এবং লক্ষাধিক বেসামরিক নাগরিক এ যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছে। যদিও শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ সামাজিক উন্নয়ন, বিশেষ করে নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে আফগানিস্তান অনেকদূর এগিয়েছে; কিন্তু দুর্নীতি ও জাতিগত বিভাজনের কারণে কাবুল সরকার তালেবানের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি। এ ছাড়া পাকিস্তান, ভারত, ইরানসহ বিভিন্ন শক্তি তাদের নিজেদের স্বার্থে আফগানিস্তানকে ব্যবহার করছে। বিশেষ করে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা তালেবানকে গোপনে আশ্রয়, প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র সরবরাহ অক্ষুণ্ণ রেখেছে।
লক্ষ্যহীনভাবে পরিচালিত এই যুদ্ধের আশু পরিসমাপ্তি তাই সব পক্ষেরই কাম্য। কিন্তু আদৌ এ চুক্তি আফগানিস্তানে শান্তি ফিরিয়ে আনবে কিনা- এ নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী কথা ছিল ১০ মার্চের মধ্যে আফগান সরকার পাঁচ হাজার তালেবান বন্দিকে মুক্তি দেবে, আর তালেবানের কাছে আটক এক হাজার আফগান বাহিনীর সদস্যকে তারা মুক্ত করবে। কিন্তু আফগান প্রেসিডেন্ট ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন, যেহেতু তার সরকারের সঙ্গে এ ব্যাপারে আলোচনা হয়নি, সেহেতু এই বন্দি বিনিময়ে তিনি আগ্রহী নন। এদিকে তালেবানের একাংশ যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি করছে, সেই সঙ্গে তালেবানের অপরাংশ আইএস ও আল কায়দার আনুগত্য স্বীকার করেছে। তারা সপ্তাহ না পেরোতেই আফগানিস্তানের বিভিন্ন স্থানে বোমা হামলা চালিয়ে তাদের অবস্থান পরিস্কার করেছে। অর্থাৎ চুক্তি অনুযায়ী অস্ত্রবিরতির যে কথা বলা হয়েছিল, তা কার্যকর হতে এখনও অনেক বাকি।  

চুক্তিতে বলা আছে, তালেবান নেতৃত্ব আফগান সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসবে এবং তারা ঘোষণা দেবে, আফগান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি হুমকি হয়ে দাঁড়ায় এমন কোনো গোষ্ঠীকে আফগানিস্তানে ঘাঁটি গাড়তে দেবে না। এ চুক্তিতে আরও বলা আছে, তালেবান গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করলে আগামী ১৪ মাসের মধ্যে ধীরে ধীরে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহার করা হবে। আফগানিস্তানে ন্যাটোভুক্ত দেশের প্রায় ১৭ হাজার সেনা রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় আট হাজার মার্কিন সেনা। তালেবান আদৌ তাদের ঘোষিত আদর্শের বাইরে এসে সরকারের সঙ্গে একযোগে নির্বাচনে অংশ নেবে কিনা, তাতে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। তালেবান যদি মনে করে যে, সরকার বাহিনী যথেষ্ট দুর্বল, তখন মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের পরে তারা কাবুল আক্রমণ করে নিজেদের দখলে নিতে পারে। তখন হয়তো আমরা দেখব, দোহায় সম্পাদিত এই শান্তিচুক্তি অর্থহীন কাগজে চুক্তিতে পরিণত হয়েছে; ঠিক যেমনটা হয়েছিল ১৯৭৩ সালে সম্পাদিত ভিয়েতনাম শান্তিচুক্তির বেলায়।
শান্তিচুক্তি-উত্তর আফগানিস্তানে বিভিন্ন শক্তি তাদের প্রভাববলয় সংহত করার চেষ্টা করবে। পাকিস্তান চাইবে তাদের মদদপুষ্ট তালেবান সরকার যেন কাবুলে প্রতিষ্ঠিত হয়। অন্যদিকে ভারত চাইবে পাকিস্তানি প্রভাবমুক্ত একটি আফগানিস্তান। সে জন্য গত দুই দশক ধরে ভারত আফগানিস্তানের সরকারকে বিভিন্নভাবে সহায়তা ও সমর্থন দিয়ে এসেছে। আফগানিস্তানে তালেবান নিয়ন্ত্রিত গোঁড়া ইসলামী সরকার প্রতিষ্ঠা হোক, এটা ভারতের কাম্য নয়। একই সঙ্গে ইরানও চায় না কট্টর তালেবানের প্রত্যাবর্তন। কারণ আফগানিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ইরান-আফগান সীমান্তে শিয়া অধ্যুষিত প্রদেশগুলোতে তালেবানবিরোধী ইরান সমর্থিত বিভিন্ন সংগঠন সক্রিয় রয়েছে। একইভাবে আফগানিস্তানের উত্তরাঞ্চলের প্রদেশগুলোতে যেখানে তাজিক, হাজারা ও উজবেক জনগণের বসবাস রয়েছে, তারা পশতুন জনগোষ্ঠী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত তালেবান বাহিনীকে সহজে গ্রহণ করবে না। রাশিয়া ও চীনও চাইবে না তাদের নিজেদের স্বার্থে ইসলামী আমিরাত তথা তালেবান আবার ক্ষমতায় আসুক। তাই দীর্ঘমেয়াদি অশান্তির আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
গত দুই দশকে আফগানিস্তানে আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন যতটুকু হয়েছিল, তার সবটুকুই এখন থমকে যাওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে। যে দেশে কোনোদিন নির্বাচন হয়নি, সেখানে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর সংসদীয় নির্বাচন হয়েছে। তালেবান যদিও বলেছিল, যারা ভোটকেন্দ্রে যাবে তাদের আঙুল কেটে ফেলা হবে এবং অনেকের আঙুল কাটাও হয়েছে। তা সত্ত্বেও কোটি কোটি আফগান নারী-পুরুষ ভোট দিয়েছে। যে নারীদের ঘর থেকে বেরোতে দেওয়া হতো না, এখন তারা সেনাবাহিনী, পুলিশ ও প্রশাসনের বিভিন্ন উচ্চ পদে কাজ করে যাচ্ছে। সংসদে সরাসরি নির্বাচনে পুরুষ প্রার্থীকে হারিয়ে নারীরা নির্বাচিত হয়েছেন। ধ্বংসপ্রাপ্ত স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, হাসপাতাল পুনর্নির্মাণ হয়েছে, একই সঙ্গে অনেক নতুন স্কুল-কলেজ নির্মাণ হয়েছে। যে আফগানিস্তানে ফুটবল-ক্রিকেট নিষিদ্ধ ছিল, সেখানে এখন আন্তর্জাতিক মানের ক্রিকেট ও ফুটবল দল গড়ে উঠেছে। গত দুই দশকে প্রতিটি অলিম্পিকে আফগানিস্তান স্বর্ণসহ বিভিন্ন পদক বিজয়ী হয়েছে।
তালেবান যদি তার আগের রূপে ক্ষমতায় ফিরে আসে, তাহলে আফগানিস্তান আবার অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে। তালেবান সমর্থিত আল কায়দা ও আইএস ইতোমধ্যে সেখানে ঘাঁটি গেড়েছে। আফগানিস্তানে ধর্মীয় উগ্রবাদ ফিরে আসা সমগ্র বিশ্ব, বিশেষ করে আমাদের উপমহাদেশের জন্য একটি বড় রকমের হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। উপমহাদেশসহ এ অঞ্চলের অন্যান্য জঙ্গি সংগঠনও তালেবানের উত্থানে নতুন করে উৎসাহিত হবে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সব থেকে বড় ক্ষতি হবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মিত্র হিসেবে সে নিজেকে আবারও অবিশ্বস্ত প্রমাণ করল। 'যতক্ষণ নিজ স্বার্থে প্রয়োজন ব্যবহার করে, প্রয়োজন ফুরালে আবর্জনার মতো ছুড়ে ফেলা'- এটাই যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীতি হয়, তাহলে বন্ধু হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রকে মেনে নিতে যে কোনো দেশ দ্বিতীয়বার ভাববে বলেই আমার মনে হয়।
নিরাপত্তা বিশ্নেষক, অবসরপ্রাপ্ত এয়ার কমডোর ট্রেজারার, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক

আরও পড়ুন

×