ঢাকা মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬

যে ক্ষত আজও শুকায়নি

যে ক্ষত আজও শুকায়নি
×

উদীচীর সম্মেলনে বোমা হামলায় নিহতদের স্মরণে স্মৃতিফলক

সুকান্ত দাস

প্রকাশ: ০৬ মার্চ ২০২০ | ১২:৫৩

১৯৯৯ সালের ৬ মার্চ বাঙালি সাংস্কৃতিক আন্দোলনের বুকে এক গভীর ক্ষতচিহ্ন। যশোরের ঐতিহাসিক টাউন হল ময়দানে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর দ্বাদশ জাতীয় সম্মেলনের শেষ দিন রাত ১টা ১০ ও ১টা ১৭ মিনিটে বাঙালি সংস্কৃতির চেতনাবিরোধী হায়েনাদের পেতে রাখা দুটি শক্তিশালী বোমার বিস্ম্ফোরণে ঝরে যায় গানপাগল ১০টি তাজা প্রাণ। আহত হন আরও দেড় শতাধিক সংস্কৃতিপ্রেমী। যাদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের অঙ্গহানি ঘটে। যশোরবাসী সেই রাতে জেগে উঠেছিল আর্তমানবতার সেবায়। পরদিন সকালে শহরের ফুল ব্যবসায়ীরা এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ জানিয়ে কালো কাপড়ে 'এই শহরে ফুল বিক্রি করতে আমাদের ঘৃণা হয়' লিখে তাদের দোকানের সামনে ঝুলিয়ে দিয়েছিলেন।
মাত্র ২১ বছর। এই ২১ বছরে সেদিনের সেই চেনাজানা প্রিয় যশোরের সবকিছু কেমন যেন আস্তে আস্তে অচেনা হয়ে গেছে। যেসব মানুষের নাম শুনলে শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে যেত, তাদের অনেকেই আজ মুক্তবিহঙ্গ থেকে স্বেচ্ছা খাঁচায় বন্দি পাখি হয়ে গেছেন। নির্দিষ্ট গণ্ডির বাইরে তারা এখন আর যেতে পারেন না। গত ২১ বছরে সারাদেশের মতো যশোরেও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সংখ্যা বেড়েছে বহুগুণ। প্রতিদিনই একাধিক স্থানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন হচ্ছে। যদিও চেতনাহীন, বোধহীন অনুষ্ঠানের সংখ্যাই বেশি। প্রতিনিয়ত যত্রতত্র নতুন নতুন ব্যানারসর্বস্ব সাংস্কৃতিক সংগঠন গজিয়ে উঠছে। কেউ কেউ অঢেল টাকাপয়সা খরচ করে, বড় বড় প্যান্ডেল সাজিয়ে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ভিআইপিদের প্রধান অতিথি, বিশেষ অতিথি হিসেবে অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানিয়ে এবং বিভিন্নভাবে প্রভাব খাটিয়ে প্রকৃত সংস্কৃতিকর্মীদের হটিয়ে অল্পদিনেই সাংস্কৃতিক অঙ্গনের কেউকেটা বনে যাচ্ছেন। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও প্রগতিশীল ব্যানারের মূল নেতৃত্বে নিজেদের জায়গা করে নিচ্ছেন। যার ফলাফল, শত শত সাংস্কৃতিক সংগঠন, হাজার হাজার সংস্কৃতিকর্মী থাকা সত্ত্বেও তুলনামূলক অধিক সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার সহযোগিতা থাকা সত্ত্বেও বর্তমানে সাংস্কৃতিক আন্দোলন ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে পড়ে আছে। এই আন্দোলনও আজ আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কাটিয়ে উঠতে পারছে না।
উদীচী হত্যাকাণ্ডের ২১ বছর পার হলেও এই মামলা আজও আলোর মুখ দেখেনি। বর্তমানে মামলাটি কী অবস্থায় আছে, আদৌ সেটি চালু আছে কিনা, সেটাও অজানা। ২১ বছর ধরে আহত-নিহতদের পরিবার, যশোরসহ সমগ্র দেশবাসীর আবেদনে কোনো সরকারই সাড়া দেয়নি।
১৯৯৯ সালের ৬ মার্চ উদীচী হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে এ দেশের হাজার বছরের সংস্কৃতির ওপর আঘাত হানা হয়। কিন্তু আমরা অর্থাৎ সংস্কতিকর্মীরা হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নিজেদের বন্ধন আরও দৃঢ় করার পরিবর্তে বিপরীত দিকেই ঝুঁকেছি বেশি। ক্ষুদ্র স্বার্থে নিজেদের মধ্যে বিভেদ তৈরি, ছোট ছোট উপদলে বিভক্তি প্রতিপক্ষ ষড়যন্ত্রকারীদের হাতকে আরও শক্তিশালী করেছে। যার প্রতিফলন আমরা দেখেছি বানিয়ারচরের গির্জায়, সাতক্ষীরার গুড় পুকুরিয়ার মেলায়, ময়মনসিংয়ের সিনেমা হলে বোমা হামলায়। পহেলা বৈশাখে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে, সিপিবির সমাবেশে, নেত্রকোনা উদীচীতে, ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলাসহ সারাদেশের ৬৩ জেলায় একযোগে সিরিজ বোমা হামলার মাধ্যমে। যার প্রতিফলন আমরা দেখেছি বেছে বেছে দেশের প্রগতিশীল, মুক্তচিন্তার লেখক, বুদ্ধিজীবী, প্রকাশক, ব্লগারদের হত্যার মাধ্যমে। এত ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের পরও সরকার ২১ বছরে উদীচী হত্যাকাণ্ডের কোনো কূলকিনারা করতে পারল না। বিচারের বাণী আজও নিভৃতেই কেঁদে ফেরে। দীর্ঘ ২১ বছর পর আজও এই টাউন হল ময়দানে একান্তে দাঁড়ালে সেদিনের সেই মধ্যরাতের ভয়াবহতা স্মৃতিতে ভেসে ওঠে। মনে হয়, এখনও এখানে মধ্যরাত; বিচারের দাবিতে এখনও প্রতিনিয়ত এখানকার আকাশ-বাতাস ভারি করে তোলে সেসব খণ্ড-বিখণ্ড মানুষের আর্তনাদ।
সংস্কৃতিকর্মী

আরও পড়ুন

×