এই ব্রাজিলকে রুখে এমন সাধ্য কার!
ছবি : সংগৃহীত
ফাতিউস ফাহমিদ সৌরভ
প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬ | ০২:৩৯
ফুটবল কখনো কখনো নদীর মতো। কোথাও শান্ত, কোথাও ঘূর্ণি। কোথাও আবার হঠাৎ ভাঙন। যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টনে এমনই এক ফুটবল নাটকের সাক্ষী হলো বিশ্ব। রাতটা শুরু হয়েছিল জাপানের নিখুঁত শৃঙ্খলার ঝলকে, আর শেষ হলো ব্রাজিলের হলুদ ঝড়ে।
প্রথমার্ধে জাপান যেন বাঁশের বেড়া তুলে দাঁড়িয়েছিল ব্রাজিলের সামনে। নিখুঁত, নম্র অথচ পাথরের মতো কঠিন। ব্রাজিল বলের দখল রেখেছিল, ফাঁক খুঁজছিল; কিন্তু গোলের দরজায় তখনো তালা। আর সেই তালার ফাঁক গলিয়েই ২৯ মিনিটে কাইশু সানো যেন বজ্রাঘাত করলেন। এগিয়ে গেল জাপান। হিউস্টনের হলুদ শিবিরে নেমে এলো মুহূর্তের নিস্তব্ধতা।
কিন্তু ইতিহাস বলে, ব্রাজিলের নীরবতা কখনো পরাজয়ের ভাষা নয়। সেটি অনেক সময় ঝড়ের আগের সমুদ্রের মতো।
কার্লো আনচেলত্তির এই ব্রাজিল শুধু সাম্বার দল নয়। এটি ধৈর্যের দল, হিসেবি দল। প্রতিপক্ষের ভুলের অপেক্ষা করতে জানে। এই দলের খেলায় যেমন পুরোনো ব্রাজিলের কবিতা আছে, তেমনি রয়েছে ইউরোপীয় বাস্তবতার কঠোর ব্যাকরণও।
বল দখলে প্রায় ৬৯ শতাংশ আধিপত্য, পুরো ম্যাচে ১৯টি শট এবং ৬৭৬টি পাস—পরিসংখ্যান বলছে, ম্যাচের স্রোত শেষ পর্যন্ত ব্রাজিলের দিকেই বয়ে গেছে। কিন্তু ফুটবলে সংখ্যাই সব নয়। প্রথমার্ধে সেই আধিপত্যে শেষ আঘাতের ধার ছিল না।
জাপানের পাঁচজনের রক্ষণভাগ বারবার ব্রাজিলকে বাইরে ঠেলে দিয়েছে। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র বল পেলেই দুই-তিনজন খেলোয়াড় ছায়ার মতো ঘিরে ধরেছেন। রায়ান, মাতেউস কুনিয়া ও লুকাস পাকেতারা চেষ্টা করেছেন ঠিকই, কিন্তু জাপানের নীল দেয়ালের সামনে ব্রাজিলের আক্রমণ তখন অনেকটা আলো-ছায়ার খেলা। দেখতে সুন্দর, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কার্যকর নয়। জাপান যেন বারবার জানিয়ে দিচ্ছিল—তারা এখানে শুধু অংশ নিতে নয়, অনেক দূর যেতে এসেছে।
দ্বিতীয়ার্ধে তাই দরকার ছিল ভিন্ন কিছু। মাঠে নামার আগে টানেলে নেইমার যেন সতীর্থদের সেই বার্তাই দিয়ে গেলেন। বিরতির পর বদলে গেল ব্রাজিল। শুধু আক্রমণে নয়, বদলে গেল দলের মানসিকতাও।
আনচেলত্তি এন্ড্রিককে নামালেন। পরিবর্তনটি দারুণ ফল দিল। এন্ড্রিক বারবার বক্সে ঢুকে জাপানের রক্ষণে অস্থিরতা তৈরি করতে থাকলেন। ব্রাজিল তখন আর শুধু বল ঘোরাচ্ছে না, একের পর এক আঘাতও হানছে।
সেই ঝড় আর সামলাতে পারল না জাপান। ৫৫ মিনিটে কাসেমিরো সমতা ফেরালেন। গোলটি ছিল অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বের প্রতীক। যাকে অনেকেই ধীরগতির বলে সমালোচনা করছিলেন, সেই কাসেমিরো যেন মনে করিয়ে দিলেন—বড় ম্যাচে অভিজ্ঞতার মূল্য কতটা।
এই গোল শুধু স্কোরলাইন বদলায়নি, বদলে দিয়েছে ম্যাচের গতিপথও। জাপানের রক্ষণ তখনো অটুট, কিন্তু ভেতরে ভেতরে তাতে ফাটল ধরেছে। ব্রুনো গিমারায়েস মাঝমাঠে ছন্দ তুলছিলেন, ভিনিসিয়ুস টেনে নিচ্ছিলেন প্রতিপক্ষের নজর, আর বক্সের ভেতর বাড়ছিল হলুদ জার্সিধারীদের চাপ।
তারপরও জাপান শেষ পর্যন্ত লড়েছে। তাদের পাঁচটি শট সংখ্যায় কম হলেও প্রতিটি মুহূর্তে ছিল শৃঙ্খলা ও আত্মবিশ্বাসের ছাপ। কিন্তু প্রতিপক্ষের নাম যখন ব্রাজিল, তখন একবার থামানো যায়, বারবার নয়। শুধু রক্ষণ দিয়ে এই দলকে আটকে রাখা কঠিন।
ম্যাচ যখন অতিরিক্ত সময়ের দিকে এগোচ্ছে, তখনই গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি লিখলেন শেষ অধ্যায়। ৯৬ মিনিটে তাঁর গোলটি ছিল শুধু জয়সূচক নয়, এক ঘোষণাও। যেন বলে দিলেন—শেষ বাঁশি বাজার আগে ব্রাজিল কখনো হার মানে না। ফুটবল দেবতাও যেন ফিসফিস করে বললেন, ইতিহাস শেষ পর্যন্ত লড়ে যাওয়া দলগুলোর জন্যই দরজা খুলে দেয়।
না, এটি নিখুঁত জয় ছিল না। এটি ছিল ঘামে ভেজা জয়, ধৈর্যে গড়া জয়, বিপদের ভেতর থেকে উঠে আসা জয়। আর এখানেই এই জয়ের সৌন্দর্য।
প্রথমার্ধে জাপানের শৃঙ্খলার সামনে আটকে গিয়েছিল ব্রাজিল। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে তারা দেখিয়েছে বড় মঞ্চে কীভাবে ঘুরে দাঁড়াতে হয়। সময় সবসময় শুরু থেকেই পাশে থাকে না; কখনো কখনো শেষ অধ্যায় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় নিজের গল্প লেখার জন্য।
এই ব্রাজিল আর আগের মতো শুধু জাদুর দল নয়, আবার পুরোপুরি যান্ত্রিকও নয়। এটি শিল্প ও বাস্তবতার এক অনন্য মিশেল। ভিনিসিয়ুসের পায়ের জাদু, কাসেমিরোর দৃঢ়তা, মার্তিনেল্লির শেষ মুহূর্তের বিষ আর আনচেলত্তির ঠান্ডা মাথার পরিকল্পনা—সব মিলিয়ে গড়ে উঠেছে নতুন এক ব্রাজিল।
সামনে পথ আরও কঠিন। রাউন্ড অব সিক্সটিন, কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল—এখনো অনেক পথ বাকি। প্রতিটি ধাপে প্রতিপক্ষ হবে আরও হিসেবি, আরও নির্মম। তাই ব্রাজিলকে শুধু ঝলক দেখালেই চলবে না; দেখাতে হবে ধারাবাহিকতাও। মাঝমাঠ হতে হবে আরও স্থির, আক্রমণ আরও শাণিত, আর রক্ষণ আরও অটুট।
তবে হিউস্টনের এই রাত সমর্থকদের একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়ে গেল—এই দল অপেক্ষা করতে জানে, আঘাত করতে জানে, জয় ছিনিয়ে আনতেও জানে।
জাপান দেয়াল তুলে ব্রাজিলকে রুখতে চেয়েছিল। কিছু সময় সফলও হয়েছিল। কিন্তু ব্রাজিলকে থামাতে শুধু দেয়াল যথেষ্ট নয়, দরকার সময়কেও থামিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা। সেটি পারেনি তারা।
ভিনিসিয়ুস, এন্ড্রিক, মার্তিনেল্লিরা তাই যেন পুরো বিশ্বকে বলে দিলেন— এই ব্রাজিলকে রুখে এমন সাধ্য কার!
- বিষয় :
- ব্রাজিল
- জাপান
- কার্লো আনচেলত্তি
