ঢাকা মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬

কালের আয়নায়

ভারতের পরিস্থিতি এবং মোদির আসন্ন ঢাকা সফর

ভারতের পরিস্থিতি এবং মোদির আসন্ন ঢাকা সফর
×

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী

প্রকাশ: ০৬ মার্চ ২০২০ | ১২:৫৬

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বন্ধু ভারত। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সাহায্য ও সমর্থন অতুলনীয়। ২০ হাজার ভারতীয় সৈন্য প্রাণ দিয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের পুনর্গঠনে প্রথম সাহায্য নিয়ে এগিয়ে এসেছিল ভারত। পাকিস্তানি হানাদাররা পরাজয় নিশ্চিত জেনে চট্টগ্রাম বন্দরে মাইন ভর্তি করে রেখেছিল। তার ফলে সমুদ্রগামী কোনো জাহাজ চট্টগ্রামে নোঙর করতে পারছিল না। তাতে বিদেশ থেকে খাদ্য আসতে না পারায় বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষ অনিবার্য হয়ে উঠেছিল।
এই সময় এ মাইন পরিস্কার করার কাজে আমেরিকা প্রথম দিকে নানা ছলচাতুরী করছিল। তখন ভারত দুটি মাইনবিধ্বংসী ডেস্ট্রয়ার পাঠিয়েছিল চট্টগ্রাম বন্দরে। ভারতের সঙ্গে স্বাধীন বাংলাদেশের অনেক সমস্যাও সৃষ্টি হয়েছিল। তিস্তা ও অন্যান্য নদী নিয়ে বিবাদ ছাড়া বলতে গেলে অধিকাশ বড় সমস্যারই শান্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে মীমাংসা হয়েছে। তিস্তা সংক্রান্ত সমস্যারও এতদিনে সমাধান হতো। ভারতের সাবেক কংগ্রেস সরকার এবং বর্তমানের বিজেপি সরকারও এই সমস্যা সমাধানের জন্য এগিয়ে এসেছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল সরকারের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বারবার বাগড়া দেওয়ায় তিস্তা সমস্যাটির সমাধান এখনও হয়নি। সমস্যাটি ঝুলে আছে। মনে হয়, অদূর ভবিষ্যতে তিস্তাসহ অন্যান্য সমস্যারও সমাধান হয়ে যাবে। এ ব্যাপারে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তার ব্যক্তিগত আগ্রহের কথাও প্রকাশ করেছেন।
সবচেয়ে বড় কথা হলো, হিন্দুত্ববাদী বিজেপি ভারতে ক্ষমতায় বসার পর অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন, বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক আওয়ামী লীগের সঙ্গে একই আদর্শের কংগ্রেস ও কংগ্রেস সরকারের সখ্য ছিল, এখন হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকার হয়তো বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক সরকারের বন্ধু হবে না। বরং এই সরকারের ক্ষতি করার চেষ্টা করবে। এই আশায় বিএনপি-জামায়াত এবং আমাদের সুশীল সমাজের কেউ কেউ অত্যন্ত উল্লসিত হয়েছিলেন।
ভারতে বিজেপির নির্বাচন জয়ে বাংলাদেশে বিএনপি মিষ্টি বিতরণ করেছে এবং লন্ডনে বসে তারেক রহমান ভারতের নতুন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে কাকাবাবু সম্বোধন করে চিঠি লিখেছে। এটা নরেন্দ্র মোদির প্রথম দফা নির্বাচন বিজয়ের সময়ের কথা। কিন্তু মোদি প্রধানমন্ত্রী পদে বসে বাংলাদেশের বিএনপি-জামায়াতের অতি উৎসাহে ঠান্ডা পানি ঢেলে দেন এবং হাসিনা সরকারের সঙ্গে মৈত্রী ও সহযোগিতার সম্পর্ক আরও বাড়িয়ে তোলেন। বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডে তিনি আন্তরিক শোক প্রকাশ করেন এবং বঙ্গবন্ধুকে যে ভাষায় শ্রদ্ধা নিবেদন করেন, তা এক কথায় অনবদ্য।
বাংলাদেশ-ভারত এই সম্পর্ক এখনও অটুট আছে। বাংলাদেশের গত সাধারণ নির্বাচনেও বিএনপি-জামায়াত এবং তাদের তথাকথিত ঐক্যফ্রন্ট নরেন্দ্র মোদির কৃপালাভের কম চেষ্টা করেনি। কিন্তু নরেন্দ্র মোদিকে নড়ানো যায়নি। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ এ জন্য মোদি সরকারের বা মোদির প্রতি কোনো বিরূপ ধারণা পোষণ করে না। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি একটু ভিন্ন। অতীতে অটল বিহারি বাজপেয়ির আমলেও ভারতের কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় বিজেপি ছিল। বাজপেয়িও হিন্দুত্ববাদী ছিলেন। কিন্তু তিনি বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র ভারতের সমদর্শিতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার ঐতিহ্যকে ক্ষুণ্ণ করতে চাননি। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলোর ওপর হিন্দুত্ববাদ চাপাতে চাননি। তার আমলে গো-জবাইকারীদের হত্যা করা হয়নি। গান্ধী-নেহরুকে অবজ্ঞা করা হয়নি। ভারতের ইতিহাস বিকৃত করে তা স্কুলের শিক্ষার্থীদের শেখানো হয়নি।
বর্তমান বিজেপির শাসনে ভারতের গণতন্ত্র, সমদর্শিতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার ঐতিহ্য আজ বিলুপ্তির মুখে। হিংস্র গেরুয়া বাহিনী সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলোর ওপর নির্মম অত্যাচার চালাচ্ছে। উত্তর-পূর্ব দিল্লিতে ভয়াবহ দাঙ্গা বাধানো হয়েছে। তাতে ২৩ জনের মৃত্যুর কথা গণনা করা হয়েছে। আরও মৃত এখনও গণনার বাইরে। সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে অধিকাংশ রাজ্যে চলছে ব্যাপক বিক্ষোভ। এই আইনে ভারতের নাগরিক এবং বৈধভাবে বসবাসকারী বহু বাঙালি ভারত থেকে বিতাড়িত হবে। সবচেয়ে নির্যাতিত হচ্ছে দলিত ও মুসলমান শ্রেণি।

অবস্থা কতটা গুরুতর, তা বোঝা যায় ভারতের সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি সম্পর্কে মার্কিন প্রেসিডেন্টের উদ্বেগ প্রকাশে এবং দিল্লির দাঙ্গা সম্পর্কে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের উৎকণ্ঠা ঘোষণায়। কাশ্মীরের মানুষ এতকাল যেটুকু স্বায়ত্তশাসন ভোগ করছিল, বিজেপি সরকার তাও ছিনিয়ে নিয়েছে। সন্ত্রাস দমনের নামে নিরীহ কাশ্মীরি জনগণের ওপর চলছে মধ্যযুগীয় অত্যাচার। তাতে আমেরিকাসহ কোনো কোনো পশ্চিমা দেশ পর্যন্ত প্রকাশ্যে উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছে। তুরস্ক প্রকাশ্যে ভারতের কাশ্মীর নীতির নিন্দা করেছে। এমনকি ভারতের অসংখ্য বুদ্ধিজীবী কাশ্মীরে ভারতের সেনাবাহিনীর বর্বরতা সম্পর্কে মুখ খুলতে বাধ্য হয়েছেন।
বাংলাদেশের সবচেয়ে নিকটতম বড় প্রতিবেশী ও বড় মিত্র যে ভারত, সে কথা আগেই উল্লেখ করেছি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর মাঝখানে কিছুকাল সামরিক সরকার এবং তাদের সিভিল চেহারার মুখোশ পরা বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় এসে ভারতবিদ্বেষী নীতি অনুসরণ করে দুই দেশের সম্পর্ক বিষিয়ে তুলেছিল। কিন্তু হাসিনা সরকার ক্ষমতায় এসেই সেই সম্পর্ক মেরামত করে ও ভারতের সাবেক কংগ্রেস সরকার এবং বর্তমান বিজেপি সরকার উভয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার দৃঢ় সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে উভয় দেশেরই অশেষ মঙ্গল সাধন করেছে।
হাসিনা সরকার ও মোদি সরকারের মধ্যে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার সম্পর্ক এখনও অটুট আছে এবং সে জন্য বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে অন্যান্য ভারতীয় নেতার সঙ্গে বন্ধুপ্রতিম দেশ ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নরেন্দ্র মোদিকেও হাসিনা সরকার আমন্ত্রণ জানিয়েছে। তিনি এই আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন। তাকে অবশ্যই বাংলাদেশ সরকার স্বাগত জানাবে। সম্মাননা জানাবে। কিন্তু ভারতে যে পরিস্থিতি তাতে বাংলাদেশের সব মানুষ সর্বান্তকরণে তাকে স্বাগত জানাতে পারবে কি? অবশ্য ভারতের পররাষ্ট্র সচিব ইতোমধ্যেই ঢাকায় এসে আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে আশ্বস্ত করে গেছেন যে, ভারতে যা ঘটছে তা তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের ওপর তা প্রভাব বিস্তার করবে না। কিন্তু কারও ঘরে আগুন লাগলে তা পাশের বাড়িতে ছড়াবে না, তার নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারে কি?
বাংলাদেশ সরকার অবশ্য বলেছে, আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ভারত এত সাহায্য করেছে যে, সে দেশের প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানানো আমাদের কর্তব্য। ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানানোকে সমর্থন জানিয়েও সরকারকে সবিনয়ে একটা কথা জানাতে চাই- রাষ্ট্রবিজ্ঞান বলে, দেশ ও সরকার এক নয়। দেশ স্থায়ী, সরকার অস্থায়ী। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সহায়তা জুগিয়েছিল ভারত নামক প্রতিবেশী, তার জনগণ এবং তৎকালীন সরকার- বিশেষ করে সেই সরকারের প্রধান প্রয়াত ইন্দিরা গান্ধী। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের বর্তমান সরকার (তখন ছিল না) তথা এই দলের কোনো সক্রিয় ভূমিকা ছিল না।
বাংলাদেশের কিছু রাজনীতিক ও বুদ্ধিজীবী মুজিববর্ষ শুরুর ১৭ মার্চের অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানানো সম্পর্কে প্রশ্ন তুলেছেন। তারা যদি বাংলাদেশ ও ভারতে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখার প্রয়োজনীয়তায় বিশ্বাসী হন, তাহলে তাদের উচিত হবে- এই আমন্ত্রণ সম্পর্কে প্রশ্ন না তুলে, ভারতে যা ঘটছে, সংখ্যালঘুদের ওপর যে অত্যাচার চালানো হচ্ছে, যে বিভাজনের রাজনীতি ভারতের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎকে অন্ধকার করে ফেলছে, কাশ্মীরে যে ঔপনিবেশিক দমননীতি চালানো হচ্ছে, তার প্রতিকার চেয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদির কাছে একটি স্মারকলিপি প্রদান।
ভারতের সাধারণ মানুষ এবং গণতন্ত্রমনা বুদ্ধিজীবীদের এক বড় অংশ আজ তাদের দেশের অবস্থা সম্পর্কে সচেতন হয়ে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। জওয়াহেরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় ও জামেয়া বিল্লিয়া বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র-শিক্ষকরা রাজপথে নেমেছেন। বাংলাদেশের গণতন্ত্রমনা, অসাম্প্রদায়িক জনগণ ও বুদ্ধিজীবীদের উচিত হবে, ভারতের জনগণের এই আন্দোলনের সঙ্গে সহমর্মিতা ও একাত্মতা প্রকাশ করা। বাংলাদেশে যেন সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা দেখা না দেয়, সেদিকে সতর্ক নজর রাখা।
ভারতে যা ঘটছে, তার সুযোগ নিয়ে বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক শক্তি আবার মাথা তোলার চেষ্টা চালাবে। সরকার ও দেশপ্রেমিক জনগণকে এ সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। প্রসঙ্গক্রমে একটি কথা বলি। ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি বাংলাদেশের একজন বিশেষ বন্ধু। তিনি কংগ্রেসের লোক; কিন্তু বিজেপিরও প্রিয়ভাজন। কারণ, রাষ্ট্রপতি থাকাকালে তিনি নরেন্দ্র মোদিকে নেহরুর সঙ্গে তুলনা করে বক্তৃতা দিয়েছেন এবং রাষ্ট্রপতি পদ ছাড়ার পরে বিজেপির সহযোগী সংগঠন আরএসএসের সভায় যোগ দিয়েছেন। এই সভায় যোগ দিয়ে বিতর্কিত হয়েছেন।
তিনি বিজেপির সঙ্গে সুসম্পর্ক নষ্ট করেননি। আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গেও তার সুসম্পর্ক। প্রণব বাবু যদি ঢাকায় আসেন, তার মাধ্যমেও ভারত সরকারের বর্তমান বিপজ্জনক নীতি সম্পর্কে নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে একটা 'ডায়ালগ' সৃষ্টি করতে পারেন শেখ হাসিনা। আর নরেন্দ্র মোদি যখন ঢাকা আসছেনই, তার সঙ্গে একান্ত বৈঠকে শেখ হাসিনা বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে বিষয়গুলো তুলতে পারেন।
এগুলো আমার উপদেশ নয়, শেখ হাসিনার কাছে তার সরকারের একজন শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে সবিনয় নিবেদন, গণতান্ত্রিক ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা আমাদের একান্ত প্রয়োজন। দু'দেশেই তাই এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে দেওয়া উচিত হবে না, যেখানে দেশ দুটির গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ বিপন্ন হতে পারে। শেখ হাসিনা প্রমাণ করেছেন, তিনি কূটনীতিতেও কুশলী। গোটা উপমহাদেশেই গণতন্ত্র রক্ষা এবং সাম্প্রদায়িকতাকে রোখার ব্যাপারে তিনি একটা দৃঢ় ভূমিকা রাখবেন- এটা সকলেই আশা করে।
লন্ডন, ৬ মার্চ শুক্রবার, ২০২০

আরও পড়ুন

×