সমকালীন প্রসঙ্গ
করোনার যুগে স্ববিরোধিতার ভাইরাস
জুলফিকার আলি মাণিক
প্রকাশ: ১২ মার্চ ২০২০ | ১২:৫৭
মনে করুন, আপনার এলাকায় বহুদিন ধরে সড়কগুলো ভাঙা। চারপাশ ময়লা, বিবর্ণ, মলিন কিংবা এলাকার নানা জায়গায় ড্রেন, তরল বর্জ্য অপসারণের নালা, খাল এবং জলাশয় পরিণত হয়েছে ভাগাড়ে। ভয়াবহ দূষণের ধারাবাহিক দীর্ঘ গল্প ছড়িয়ে আছে চারদিকে। সড়কের ধারে, এমনকি ওপরেও ময়লা, আবর্জনা স্তূপ হয়ে থাকে নিয়মিত; দুর্গন্ধ, মশা, পোকা-মাকড়ের উপদ্রব ভয়াবহ। ছড়াচ্ছে অজানা সব জীবাণু। গণশৌচাগারের অভাবে কিংবা শৌচাগারের শোচনীয় দশার কারণে খোলা আকাশের নিচে অজস্র টয়লেট গড়ে উঠেছে। মানববর্জ্য আর দুর্গন্ধের ছড়াছড়ি, বছরের পর বছর সাধারণ মানুষের অসহনীয় অসহায় বসবাস। কিন্তু কোনো প্রতিকার নেই। কখনও এমন বাস্তবতায় ব্যক্তিগতভাবে কেউ মন খারাপের কথা বললে আমি বলি- চেষ্টা করুন ওসব সড়ক দিয়ে রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে যেতে। তাহলে দেখবেন, জাদুর ছোঁয়ার মতো করে সব সমস্যা রাতারাতি দূর হবে সাময়িকভাবে।
২০১২ সালের এক ঘটনা। কক্সবাজারের রামুতে বৌদ্ধদের ওপর নজিরবিহীন সন্ত্রাসী হামলা হয়। খবর সংগ্রহের কাজে রামু যাই। দেখি ছোট্ট উপজেলা শহর রামুর সড়কগুলো ভয়াবহভাবে ভাঙা। ভীষণ যন্ত্রণাদায়ক চলাচলের পথ সব। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে বুঝলাম, রামু শহরের সড়কগুলো শেষ কবে ভালো ছিল সেটা তাদের স্মৃতিতেই নেই। কেউ বলেছিলেন, দশ বছর ধরে রাস্তাগুলো ভাঙা; কেউবা বলেছিলেন তারও বেশি সময় হবে। রামুর বহু মানুষকে আমি খুব অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম, দশ বছরে এসব ভাঙা সড়ক একবারও ঠিক করা হয়নি! তারা বলেছিলেন, না। তার চেয়েও অবাক কাণ্ড ঘটেছিল তখন, যখন দেখি স্থানীয়দের সঙ্গে আমার এসব আলোচনার দু'তিন দিন পর রামুর ভাঙা প্রধান সড়কের ওপর একদল শ্রমিক ঝাড়ূ দিচ্ছে দিনরাত। ভাঙা জায়গাগুলোয় ব্রাশ দিয়ে ঘষছে। ভীষণ কৌতূহলে জিজ্ঞেস করেছিলাম, হঠাৎ কেন তারা সেসব করছে? অবিশ্বাস্য উত্তর মেলে ; তারা বলেছিল, রাস্তা ঠিক করা হবে। আমি ভাবছিলাম, ভাঙা রাস্তা প্রসঙ্গে শুধু স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলার জন্যই কেউ ঠিক করার উদ্যোগ নিয়ে নিল, এত ভালো সব! পরে দেখি- না, ব্যাপারটা মোটেই তা নয়। বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীকে সহানুভূতি জানাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রামু যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। হেলিকপ্টারে ঢাকা থেকে উড়ে রামু নামার পর যেসব সড়ক দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর গাড়ি যাবে, শুধু সেসব সড়ক দ্রুততম সময়ে মেরামত ও মসৃণ করতে যা করা দরকার, রাতদিন ধরে তা-ই করা হয়েছিল। যেন প্রধানমন্ত্রী বোঝেন, কত মসৃণভাবে চলছে দেশ ও সাধারণ মানুষের জীবন। দেশের মানুষের জীবনের পথচলা কত আরামের করেছেন মন্ত্রী, এমপি, নেতা ও প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা। এমন ঘটনা যুগে যুগে অসংখ্য পাওয়া যাবে। ভিভিআইপি ও ভিআইপিদের জন্য সব সুন্দর, ঝকঝকে করা হয়। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী হলে তো কথাই নেই। নিদেনপক্ষে একজন মন্ত্রী হলেও কিছু ঘষামাজা করার প্রতিযোগিতা লেগে যায়। আর সাধারণ মানুষের জন্য ভোগান্তির জরাজীর্ণ জীবন। যেন 'যেমন রেখেছি সে-ই তো ঢের বেশি'- এমন এক মনোভাব। ভাঙা রাস্তা, ডাস্টবিন, নর্দমা, দুর্গন্ধ, মশা ও রোগশোক আর বহুরূপী হয়রানির সঙ্গে বসবাসই যেন আমাদের সাতজনমের ভাগ্য পাওয়ার মতো।
অথচ রাজনীতিবিদ, রাজনৈতিক দল, সরকার আর তাদের হুকুম তামিলকারীরা কথায় কথায় বলেন, তাদের সব কাজ জনগণের কথা ভেবে, সাধারণ মানুষের স্বার্থে ও সেবায়। তাদের কথা ও কাজে স্ববিরোধিতার শেষ নেই। এখন যেমন করোনাভাইরাস নিয়ে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসেবায় তারা 'মহাচিন্তিত', 'মহাব্যস্ত', 'মহাউদ্যোগী' এমন ভাব দেখাচ্ছে। জনগণের স্বার্থে নাকি মুজিববর্ষে জনসমাগমের সব কর্মসূচি বাতিল বা স্থগিত করা হয়েছে। ৮ মার্চ প্রথম দেশে তিনজন করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগী শনাক্তের ঘোষণা দেয় সরকার। সঙ্গে সঙ্গে ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর দিনসহ মুজিববর্ষের এবং ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের জনসমাগমের পরিকল্পিত, ব্যয়বহুল সব অনুষ্ঠান বাতিলের ঘোষণা দেয় সরকার। বিদেশি অতিথিদের আনার পরিকল্পনাও বাতিল করে। ১৭ মার্চ আসার কথা ছিল ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির। আর ২৬ মার্চ ক্ষমতাসীন বিজেপির প্রধান প্রতিপক্ষ কংগ্রেস নেতা সোনিয়া গান্ধীর আসার কথা ছিল।
দিলিল্গতে সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক সহিংসতার পর আমাদের দেশে কঠিন সমালোচনা ও প্রতিবাদের মুখে পড়েন ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি ও তার দল বিজেপি। দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর মধ্যে ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় পাওয়া ভারতবিরোধী মনোভাব আবারও বেশ সক্রিয় ও প্রকাশ্য হয়ে ওঠে। মুজিববর্ষে মোদির আগমন বাতিলের দাবি তোলে অনেকে। এমন এক প্রেক্ষাপটে ৮ মার্চ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্তের খবর দেশের মানুষকে নিঃসন্দেহে উদ্বিগ্ন করেছে। তবে বিদেশি অতিথিদের নিয়ে মুজিববর্ষ ও স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠান শেষ মুহূর্তে বাতিলের জুতসই কারণও দিয়েছে; যার ফলে আরও অনেক চলমান ও সম্ভাব্য সমস্যারও রাতারাতি সমাধান হয়েছে। সরকার বাহবাও কুড়োতে পারছে এই বলে যে, তারা সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। তাই মুজিববর্ষ ও স্বাধীনতা দিবসকে ঘিরে সব জনসমাগমের অনুষ্ঠান বাতিল করছে। 
এ ক্ষেত্রেও স্ববিরোধী কথা ও কাজ স্পষ্ট। করোনাভাইরাসের রোগী শনাক্তের আগেই সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট মানুষকে 'সম্ভব হলে গণপরিবহন ব্যবহার না করার' বা 'গণপরিবহন এড়িয়ে চলার' পরামর্শ দেয়। এটা ১৭ কোটি মানুষের দেশে সম্ভাব্য বিপদ এড়ানোর জন্য একদিনের কোনো অনুষ্ঠান বাতিল বা বর্জনের মতো সাধারণ পরামর্শ নয়। মানুষের অপরিহার্য প্রাত্যহিক জীবনকে অনির্দিষ্টকালের জন্য পাল্টে ফেলার পরামর্শ; যা পালন আমাদের দেশের বাস্তবতায় সত্যিই অসম্ভব। ব্যক্তিগত পরিবহন আছে এমন মানুষ জনসংখ্যার তুলনায় নগণ্য। অন্যদিকে, অপ্রতুল ও বিশৃঙ্খল গণপরিবহনের কারণে সংখ্যাগরিষ্ঠের জীবনে এমনিতেই বিপত্তি আর হয়রানির অন্ত নেই। গণপরিবহন এড়িয়ে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ হেঁটে পথ চলবে, কাজ করবে, জীবন চালাবে কিংবা ঘরে বসে থাকবে- এসব অসম্ভব চিন্তা। হাঁটার কোনো জায়গা ও পরিবেশ নেই কোনো শহরে। গণপরিবহন এড়ালে এ খাতকেন্দ্রিক জীবিকা নির্বাহকারীদের জীবনও বিপদগ্রস্ত হবে। এসব বিতর্কের পরও যদি মেনে নিতে হয়, এই পরামর্শ সাধারণ মানুষেরই স্বার্থে এবং যারা পারবে তারা পালন করবে, তাহলে প্রশ্ন ওঠে- গণপরিবহনের ব্যবহার এড়ানোর মতো গুরুতর পরামর্শের পর এবং মুজিববর্ষের জনসমাগম বাতিলের আগের দিন ৭ মার্চ আর্মি স্টেডিয়ামে সংগীত অনুষ্ঠান বা কনসার্টের আয়োজন কেন? এই জনসমাগম ঘটানো কোন জনগণের স্বার্থে ছিল? কেন তা বাতিল করা হয়নি? এই কনসার্ট অনুষ্ঠান সরকার ও ক্ষমতাসীনদের কথা ও কাজের মধ্যে বৈপরীত্য প্রকাশ করে।
অভিজ্ঞতা বলে, তরুণ শিক্ষার্থীরা এসব কনসার্টের প্রধান দর্শক হয়। এই কনসার্ট জনসমাগম ঘটায়, তরুণদের যোগ দিতে প্রলুব্ধ করেছে। অথচ করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে সরকার শিক্ষার্থীদের জনসমাগম এড়াতে বলেছে। সরকারের শিক্ষা বিভাগ এই পরামর্শসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে খোলা আকাশের নিচে প্রতিদিনের অ্যাসেমব্লি বা সমাবেশ বাদ দিয়ে তা শ্রেণিকক্ষে করার নির্দেশ দিয়েছে। খোলা আকাশের নিচেই হোক আর শ্রেণিকক্ষেই হোক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোই তো শত শত শিক্ষার্থীর সমাগম ঘটানোর জায়গা। যাদের সিংহভাগ গণপরিবহনে যায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। সেসবের ফটকে আরও কয়েকশ' অভিভাবকের ভিড় জমে। একদিকে শিক্ষার্থীদের জনসমাগম এড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে ১১ মার্চ মিরপুর স্টেডিয়ামে জিম্বাবুয়ের সঙ্গে টি২০ সিরিজের শেষ খেলা ঠিকই আয়োজন করা হয়েছে। এসব খেলার হাজারো দর্শকের মধ্যে বড় অংশ তরুণ ও শিক্ষার্থী। করোনাভাইরাসের কারণে সব পরিকল্পিত জনসমাগম যখন বাতিল হচ্ছে ও এড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, তখন স্টেডিয়ামে জিম্বাবুয়ের সঙ্গে ক্রিকেট খেলা কোন যুক্তিতে অনুষ্ঠিত হলো, তাও দুর্বোধ্য। ফলে শিক্ষার্থীসহ সবাইকে জনসমাগম এড়ানোর পরামর্শ আর নানা কাজ সরকারের স্ববিরোধী কথা ও কাজ ছাড়া কিছুই নয়।
মার্চের শুরুতে দক্ষিণ ঢাকা সিটি করপোরেশন মুজিববর্ষ উপলক্ষে নাগরিকদের বাড়িঘর রং করতে বলে। এ জন্য গণবিজ্ঞপ্তি দেয়। সেই সঙ্গে সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, 'যারা বাড়িঘর রং করাবেন না তারা জাতির জনকের জন্মশতবার্ষিকী পালন করতে চান না বলে মনে করব (প্রথম আলো, ৪ মার্চ ২০২০)। ঢাকা শহরে অগণিত নোংরা, বিবর্ণ, সরকারি স্থাপনা সবার পরিচিত। যেগুলো তেমনই আছে মুজিববর্ষ শুরুর ক'দিন আগেও। তাহলে কি আমরা সরকারের দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বিজ্ঞপ্তি অনুসারে ধরে নেব, সরকারি স্থাপনাগুলো রং না করলে সরকার স্বয়ং জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী পালন করতে চায় না?
সরকার ও রাজনীতিকদের নানা বাজে কথা ও দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজ নিয়ে আরও বহু কথা উঠতে পারে। যেমন, ঢাকা-১০ আসনে জাতীয় সংসদের উপনির্বাচনে 'দায়িত্বশীল দলগুলোর' প্রার্থীরা জনসমাগম করে প্রচারে ব্যস্ত। করোনাভাইরাসের বিস্তার প্রতিরোধে করমর্দন, কোলাকুলি না করার পরামর্শ সত্ত্বেও প্রার্থীরা অবলীলায় হাত মেলাচ্ছেন ভোটারদের সঙ্গে, অনেককে জড়িয়ে ধরছেন।
মুজিববর্ষ ও করোনাভাইরাস নিয়ে সরকারের নানা পরামর্শ, নির্দেশ আর কাজের মধ্যে স্ববিরোধী, পরস্পরবিরোধী কথা মানুষের মনে কেবল হাস্যরস, নানা প্রশ্ন আর সন্দেহেরই উদ্রেক ঘটাবে। বরং কাণ্ডজ্ঞানহীন কথা ও কাজ নয়, সাধারণ মানুষকে সত্যিকারের সচেতন ও সাবধান করতে দরকার সন্দেহাতীত সুশৃঙ্খল তথ্য, পরামর্শ ও ধারাবাহিক সঠিক কাজ।
ঢাকা, ১২ মার্চ
সাংবাদিক
- বিষয় :
- করোনা
