ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬

রাজনীতি

অমসৃণ পথ এলোমেলো চিত্র

অমসৃণ পথ এলোমেলো চিত্র
×

এম হাফিজউদ্দিন খান

প্রকাশ: ১৫ মার্চ ২০২০ | ১৫:০৫ | আপডেট: ১৫ মার্চ ২০২০ | ১৫:০৬

করোনা এখন বৈশ্বিক মহামারি- এই ঘোষণা দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। ১১৭টি দেশ ও অঞ্চল এই ভাইরাসে আক্রান্ত। এক লাখ ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়ে এখন চিকিৎসাধীন। সংবাদমাধ্যমগুলোতে প্রকাশ, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মৃতের সংখ্যা ইতোমধ্যে পাঁচ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। এখন আমরাও উদ্বিগ্ন। আমাদের দেশে কয়েকজন আক্রান্ত হওয়ার খবর এসেছে সংবাদমাধ্যমে। বেশ কিছু সংখ্যক আক্রান্ত মানুষ রয়েছেন কোয়ারেন্টাইনে। সমকালসহ কয়েকটি পত্রিকায় দেখলাম, বিদেশফেরত বড় অংশ নেই পর্যবেক্ষণে। সচেতনতা ও সতর্কতা এই বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার বড় উপায়। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো যেখানে এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে আমাদের ব্যবস্থাপনা ও সামর্থ্য কতটা প্রয়োজনানুগ- এর ব্যাখ্যা-বিশ্নেষণ নিষ্প্রয়োজন। এ মুহূর্তে প্রয়োজন সম্মিলিত প্রয়াসে পরিস্থিতি মোকাবিলায় যথাযথ কর্মপন্থা নির্ধারণ করা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এই বিপজ্জনক পরিস্থিতিতেও রাজনীতি টেনে আনা হচ্ছে। পরস্পরবিরোধী কথাবার্তা এমন প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে- আমরা কি সবকিছুতে রাজনীতি জড়িয়ে চর্চা করতে ক্রমেই অধিক অভ্যস্ত হয়ে পড়ছি? দেশের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতেও ঐকমত্যের কোনো তাগিদ নেই!

দাবি করি, আমরা গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক পরিবেশ-আবহ সৃষ্টি করতে পেরেছি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের বিদ্যমান বাস্তবতা কি এই সাক্ষ্য বহন করে? আমরা জানি, গণতন্ত্রের অন্যতম শর্ত পরমতসহিষ্ণুতা ও সমানাধিকার নিশ্চিতকরণ। দুঃখজনক হলেও অসত্য নয়, এই দুই-ই বৃত্তবন্দি। আর এই বৃত্তবন্দিতার কারণেই আমাদের রাজনীতি ক্রমান্বয়ে শ্রীহীন হচ্ছে। যদি এই ধারাটাই অব্যাহত থাকে, তাহলে শ্রীহীনতার চিত্র আরও প্রকট হবে এবং দেশ-জনগণের জন্য তা এক পর্যায়ে ভয়াবহ হয়ে দাঁড়াবে। যে কোনো গণতান্ত্রিক দেশের কিছু বিষয়-বৈশিষ্ট্য থাকে এবং এর নিরিখেই নির্ণীত হয়, সেই দেশটা প্রকৃতই কতটা গণতান্ত্রিক। আইনের শাসন, ন্যায়বিচার, মানুষের মুক্তভাবে কথা বলা কিংবা মতপ্রকাশের অধিকার, সামাজিক নিরাপত্তা ইত্যাদিও গণতান্ত্রিক রাজনীতি কিংবা রাষ্ট্রব্যবস্থার সবিশেষ অনুষঙ্গ। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের কিছু সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ছিল। স্বাধীনতার পর আমাদের এ পর্যন্ত অর্জনের খতিয়ান কম দীর্ঘ না হলেও অদ্যাবধি আরও অনেক লক্ষ্যই রয়ে গেছে অনার্জিত। রাজনীতির নামে অপরাজনীতির চর্চা কিংবা নিজ স্বার্থ বড় করে দেখে অন্যদের স্বার্থ উপেক্ষা-অবজ্ঞার কারণ এর জন্য বহুলাংশে দায়ী। বাংলাদেশে নিবন্ধিত ৭০টিরও বেশি রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব থাকলেও বেশিরভাগ দলের কার্যক্রমই দৃষ্টিগ্রাহ্য নয়। তাদের লক্ষ্যও অনেক ক্ষেত্রে অস্পষ্ট। সরকারের বাইরে বেশিরভাগ দলেরই কার্যক্রম বৃত্তবন্দি। এমন পরিস্থিতি শুধু অনাকাঙ্ক্ষিতই নয়; গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কিংবা সমাজ ব্যবস্থার জন্য অশুভ বার্তাবহ।

সরকারের বাইরে বিরোধী দলের রাজনীতির ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক সংজ্ঞাসূত্র মতে, রাজনীতির মাঠ মসৃণ নয়। বিরোধী দল বলতে প্রথমে তো বিএনপিকেই ধরতে হবে। তৃণমূল পর্যায়ে আওয়ামী লীগের বাইরে এখনও তাদেরই বিস্তারটা বেশি। কিন্তু তারা রাজনৈতিকভাবে ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে- এই সত্য এড়ানোর পথ নেই। বিগত কয়েক বছরের চিত্র পর্যালোচনা করলে স্পষ্টতই দেখা যায়, কোনো ইস্যুতেই তারা শক্ত অবস্থান নিতে পারেনি। নির্মোহভাবে বলতে গেলে বলতে হয়, তারা নানাভাবে কোণঠাসা। নিজেরা উঠে দাঁড়াতে পারছে না। দলের অগ্রজ-অনুজদের মধ্যে নেতৃত্বের ক্ষেত্রে রয়েছে সমন্বয়হীনতা। একই সঙ্গে নেতৃত্ব নিয়ে জটিলতাও রয়েছে। বিগত ঢাকা সিটির জোড়া নির্বাচনের আগে-পরে অনেকেই আশা করেছিলেন, দলের মধ্যে একটা চাঙ্গা ভাব আসবে। কিন্তু না, এখনও তারা এলোমেলোই। শুধু তাদের দলীয় রাজনীতিই নয়, গোটা রাজনীতিই এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছে। দেশের জরুরি বিষয়েও ঐকমত্যের কোনো চিন্তা সরকারের নীতিনির্ধারকদের মাথায় আসে না। তাহলে কীসের রাজনীতি; কার জন্য রাজনীতি? বিরোধী দল বলতে আমরা যা বুঝি; আমাদের জাতীয় সংসদের দিকে তাকালে এ ব্যাপারে খেই হারিয়ে ফেলতে হয়। সরকারি দলের সঙ্গে জোটবদ্ধ থেকে কীভাবে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন সম্ভব? অথচ গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে শক্তিশালী বিরোধী দল অত্যন্ত জরুরি। শুধু রাজনীতির জন্যই নয়; দেশ-জাতির নানা প্রয়োজনেও তা জরুরি।

মামলার ভারে বিএনপির নেতৃত্ব ন্যুব্জ। ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে গত জাতীয় নির্বাচনের আগে যে জোট গঠিত হয়েছিল, তাও এখন বলতে গেলে ছন্নছাড়া। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে জোটবদ্ধ হওয়ার চিত্র আমরা অনেক দেশেই দেখতে পাই। কিন্তু আমাদের দেশে জোটবদ্ধ রাজনীতির শর্ত কিংবা অনুষঙ্গ নিয়ে প্রশ্ন আছে। ড. কামালের দল গণফোরামের অবস্থা এখন টালমাটাল। গণফোরাম নানা সমস্যায় জর্জরিত। আমাদের বাম রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থাও প্রায় একই। কোনো কোনো বাম দল ঠাঁই নিয়েছে ডানের ছায়াতলে। এর বাইরে সরকারের সিদ্ধান্তের সমালোচনা যে কয়টি বাম দলের নেতারা করেন, তাও খুব উচ্চকণ্ঠে নয়। তাদের সাংগঠনিক অবস্থানের কারণেই এমতাবস্থা দৃশ্যমান। জাতীয় পার্টির কথা আলাদা করে ব্যাখ্যা-বিশ্নেষণের প্রয়োজন নেই। আগেই বলেছি, তারা সরকারি জোটে থেকে জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করছে কীভাবে, তা বোধগম্য নয়! এর সমীকরণ মেলানো দুস্কর। জাতীয় পার্টিতেও রয়েছে নেতৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব-কোন্দল। দেখা যাচ্ছে, কেন্দ্রীয় পর্যায়ে আওয়ামী লীগ বাদে প্রায় সবক'টি রাজনৈতিক দলে নেতৃত্ব নিয়ে কোন্দল ক্রমেই মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। এসব ক্ষেত্রে কারও কারও রাজনৈতিক কূটকৌশল রয়েছে বলে অভিযোগ শোনা যায়। মেরুকরণের রাজনীতি অনেক সমীকরণই পাল্টে দিয়েছে। এই যে বহুবিধ নেতিবাচক চিত্র, তা আমাদের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ধারাকে পুষ্ট করার পরিবর্তে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছে, তাতে দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কোন পথে- তা নির্ণয় করা খুব কঠিন হয়ে পড়েছে। গণতন্ত্র গণতন্ত্র বলে চিৎকার করলেই তো আর গণতান্ত্রিক আবহে আমরা চলেছি, তা বলা যাবে না।
আসে জামায়াত প্রসঙ্গ। জামায়াত বেশ কিছুদিন ধরেই সরাসরি কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেই বললেই চলে। গোপনে তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম চলছে কিনা, জানি না। তবে গণতন্ত্রে গোপন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অবকাশ নেই। অন্যান্য ইসলামিক দল বরং জামায়াত থেকে এখন ভালো অবস্থানে আছে। ক্ষীণ আঙ্গিকে হলেও তারা তাদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে। জামায়াত দীর্ঘদিন ধরে আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনে তাদের উপস্থিতি নানাভাবে জানান দিয়ে এলেও বর্তমান পরিস্থিতি-প্রেক্ষাপট ভিন্ন। তারা কখনও একা, কখনও বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে রাজনীতি করলেও তাদের প্রতি মানুষের অনাস্থার চিত্রটাই পুষ্ট। জামায়াত বাংলাদেশকে ভালোবাসে- এর প্রমাণ এখনও দিতে পারেনি। মনে-প্রাণে বাঙালিত্বের পরিচয়ও দিতে পারেনি। ১৯৭১ সালে তাদের যে ভূমিকা ছিল, এর জন্যও কোনো অনুতাপবোধ এখনও করছে না। এসব কারণে সাধারণ মানুষের কাছে তারা পৌঁছতে পারছে না। ভবিষ্যতে তারা রাজনীতিতে কোন অবস্থানে থাকবে, তা বলা মুশকিল। জামায়াতকে নিয়ে বিএনপির ক্ষতি হয়েছে- এমন কথা আমরা ইতোমধ্যে কম শুনিনি। বিএনপির ভেতরেই জামায়াত নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে। সামগ্রিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সরকারপক্ষ তাদের মতো করে চলার পথটা খুঁজে পেয়েছে। তাদের কোনো কাজ কিংবা নীতির বিরোধিতা বিএনপি কিংবা অন্য কোনো দল-জোট থেকে কখনও কখনও হলেও তা তারা তাদের অবস্থানগত কারণেই আমলে নেওয়ার প্রয়োজন মনে করে না। গণতন্ত্রের জন্য, গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য এর কোনো কিছুই শুভ নয়। দেশে প্রকৃতই গণতন্ত্র কতটা বিদ্যমান- এ নিয়ে তর্ক চলতেই পারে। দেশে গণতন্ত্রের কথা উচ্চারিত হচ্ছে বটে, কিন্তু এর চর্চা নিয়ে প্রশ্ন আছে ব্যাপক। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া আদালতের রায়ে দণ্ডিত হয়ে দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে আছেন। তার শারীরিক অবস্থাও ভালো নয় বলে বিএনপি নেতারা বারবার বলছেন। কিন্তু বিএনপি নেতৃবৃন্দ এ ক্ষেত্রে তাদের রাজনৈতিক ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন।

দেশের জন্য, মানুষের জন্য গণতান্ত্রিক রাজনীতির পথটা মসৃণ করা দরকার। অমসৃণ কিংবা অসমতল পথ-ভূমিতে গণতান্ত্রিক রাজনীতির বিকাশ সম্ভব নয়। গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য সমতল ভূমি নিশ্চিত করতেই হবে। গঠনমূলক সমালোচনা সরকারকে আমলে নিতে হবে। কোনো সরকারেরই আত্মতুষ্টিতে ভোগার অবকাশ নেই। কারণ মানুষের অধিকারের ক্ষেত্রটা অনেক বিস্তৃত। কোনো সরকারের পক্ষেই মানুষের অধিকারের শতভাগ পরিপূর্ণতা এনে দেওয়া সহজ নয়। রাজনীতির পথ যতটা মসৃণ হবে, উন্নয়ন-অগ্রগতি ততই টেকসই হবে। রাজনীতিতে সহনশীলতার চর্চা হোক, পরমতের প্রতি শ্রদ্ধা বাড়ূক- এটাই প্রত্যাশা। এর সুফল পাবে দেশ-জাতি। সুস্থ ধারায় ফিরুক রাজনীতি। পথ হোক মসৃণ। এলোমেলো চিত্র মুছে যাক।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা; সভাপতি সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন

আরও পড়ুন

×