করোনা সংকট
বাসায় থেকে 'অফিস' এবং বিবেচ্য বিষয়াবলি
মোফাক খায়রুল তৌফিক
প্রকাশ: ২১ মার্চ ২০২০ | ১৩:৪৩
সাম্প্রতিক সময়ে আবির্ভূত করোনাভাইরাস পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত করছে। যেহেতু ভাইরাসটি সংক্রামক, তাই সংক্রমণ কমাতে এবং মহামারি ঠেকাতে আপাত কৌশল হিসেবে মানুষ ঘরে আবদ্ধ থাকাকেই বেছে নিচ্ছে।
বাংলাদেশে ইতোমধ্যে বিভিন্ন স্কুল-কলেজ ও অফিস অনলাইন যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে কার্যক্রম চালাতে শুরু করেছে। নতুন এ পদ্ধতিতে নানা জনের নানা মতামত পাওয়া যাচ্ছে। যাই হোক, পরিস্থিতি যখন অনূকূলে নয় তখন সিদ্ধান্ত সুবিধা-অসুবিধা বা অভ্যাসের ওপর নির্ভর না করে বরং তা বাস্তবতার নিরিখে পরিচালিত হবে। আর এই সময়ের বাস্তবতা হচ্ছে বাসায় বসে সর্বোচ্চ দক্ষতার সঙ্গে কাজ চালিয়ে নেওয়া।
বস্তুত বাসা থেকে কাজ করা নতুন কোনো পদ্ধতি নয়। বাংলাদেশে অসংখ্য মানুষ আউটসোর্সিং, ফ্রিল্যান্সিং ও কনসালট্যান্সি নামে ঘরে বসে দেশের ভেতরে-বাইরের কাজ অনেক দিন ধরে করে আসছেন। অনলাইন বা অফলাইনে বিভিন্ন অফিস ঘুরে কাজ সংগ্রহ করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তা সম্পন্ন করেন এবং কাজের মান দেখে তারা সময়মতো পারিশ্রমিকও পেয়ে থাকেন।
অনলাইনে রিয়েল টাইমে কাজের পরিকল্পনা, দেখাশোনা, নির্দেশনা ও কাজ গ্রহণের জন্য বিভিন্ন সফটওয়্যার বাজারে পাওয়া যায়। সফটওয়্যারের মাধ্যমে জানতে পারবেন আপনার কর্মী কতক্ষণ কম্পিউটারে কোন কাজটি করেছেন, কোন ওয়েবসাইট দেখেছেন, কোন রিপোর্ট পড়েছেন ইত্যাদি। অনেকে চাইলে সেই সফটওয়্যার ব্যবহার করতে পারেন।
মিটিং ও কনফারেন্স এখন অনলাইনে স্কাইপেসহ বিভিন্ন সফটওয়্যারের মাধ্যমে হচ্ছে। সবাই অংশগ্রহণ করছেন, মতামত দিচ্ছেন, আলোচনা করছেন, সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। মিটিংয়ের যা যা আউটকাম থাকার কথা, সবই হচ্ছে; পাশাপাশি সশরীরে ভ্রমণ-সংক্রান্ত সময় ও খরচ সাশ্রয় হচ্ছে। হচ্ছে না শুধু সহকর্মীদের সঙ্গে সশরীরে দেখা, কথা ও অনানুষ্ঠানিক সম্পর্ক উন্নয়ন বিষয়াদি। দুর্যোগ পরিস্থিতিতে এতটুকু ছাড় তো দিতেই হবে।
স্বাভাবিক পরিস্থিতিতেও বাসা থেকে কাজ করার পদ্ধতিটি জনপ্রিয় ছিল। বিশেষ করে উন্নত বিশ্বে। সম্প্রতি এক সার্ভ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৯১ শতাংশ কর্মী বাসা থেকে কাজ করতে চান ব্যক্তিগত এবং কর্মজীবনের ভারসাম্য তৈরি করার জন্য। ৭৯ শতাংশ কর্মী চান কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি ও কাজে বেশি মনোযোগ দেওয়ার জন্য। ৭৮ শতাংশ কর্মী চান শারীরিক ও মানসিক চাপ কমানোর জন্য এবং ৭৮ শতাংশ কর্মী চান অফিস যাতায়াতের সময়, শ্রম ও খরচ বাঁচাতে। তার জন্য তারা বেতনের ৫-১০ শতাংশ কর্তন করতেও প্রস্তুত।
বাসায় বসে কাজ করতে না পারা বা না হওয়া অনেকটা অভ্যাসহীনতা, মনস্তাত্ত্বিক ও নৈতিকতার। বাসায় কাজে মন বসে না, কারণ অভ্যাস নেই। কিছুদিন চেষ্টা করলেই অভ্যাস হয়ে যাবে। মনস্তাত্ত্বিকতার বিষয়ও অনেকটা সে রকম। অনুশীলন করলে অভ্যাসও হবে, মনও বসবে কাজে। আর নৈতিকতাহীনতা সর্বক্ষেত্রেই সুযোগ খুঁজে নেয়, হোক সেটা অফিস অথবা বাসা। যারা কাজে ফাঁকি দেয়, তারা অফিসে বসের সামনে বসেও ফাঁকি দেয়। অনেকে অফিসে বসের সামনে উপস্থিত থাকাকেও কাজ মনে করে। যেহেতু অফিসে আছেন; বসও মনে করেন, নিশ্চয় কিছু না কিছু করছে। কিন্তু কর্মীরা চোখের সামনে না থাকলে বসের মনে প্রশ্ন থাকবে- সারাদিনে তার কর্মীটির আউটকাম কী? তখন কাজ দৃশ্যমান হবে।
মানুষকে স্বাধীন পরিবেশে নিজেকে গড়ে তোলা এবং সঠিক পথে পরিচালিত করার কৌশল আয়ত্ত করতে হবে। বাসা থেকে কাজ করতে চাইলে নিজেই নিজের সুপারভাইজার হতে হবে। একটি দিনে আমার কাজের আউটকাম কী, তা নিজেকে পরিমাপ করতে শিখতে হবে। অফিসের কাজ মানে যে নিজের জন্য কাজ- তা বুঝতে শিখতে হবে। পাশাপাশি নিজের কাজের মান নির্ণয় করতে হবে। নিজের কাজের অক্ষমতা, প্রতিবন্ধকতা ও উন্নয়ন কৌশল নিজেকেই নির্ধারণ করতে হবে।
অফিসের চেয়ে বাসায় কাজে মনোযোগ বেশি দেওয়া সম্ভব। কারণ সেখানে অফিস কলিগ বা অপ্রত্যাশিত কারও আগমন ও সামাজিক কথাবার্তা থাকে না। সমস্যা হবে যদি পরিবারে মানুষ বেশি থাকে। ঢাকা শহরে সাধারণত ছোট ছোট পরিবারের বসবাস। বাসায় একটি নিরিবিলি পরিবেশে জায়গা করতে পারলেই লম্বা সময় ধরে কাজ করা সম্ভব। অল্প কিছুদিন নিরিবিলিতে কাজ করতে দেখলে পরিবারের লোকজনও বুঝতে পারবে এবং ভালো পরিবেশ তৈরি হবে।
অফিসে সহকর্মীদের সঙ্গে বসে কাজ করার অনেক ভালো দিক রয়েছে। যেমন একজন অন্যজনের সঙ্গে কথা বলে, পরামর্শ নিয়ে কোনো সমস্যার বিকল্প সমাধানে পৌঁছানো যায়। একসঙ্গে কাজ করার ফলে মানসিক বোঝাবুঝি তৈরি হয়, যা কাজের জন্য সহায়ক। আবার খারাপ দিকও আছে। যেমন অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা। পাশাপাশি বেশি কথা হওয়ার কারণে অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় ও ক্ষতিকর কথাবার্তা বলে ফেলা, যা বাসা থেকে কাজ করলে অনেকটাই পরিহার করা সম্ভব।
সর্বোপরি যে জিনিসটা বেশি প্রয়োজন তা হলো বিশ্বাস ও আস্থা। যাদের নিয়ে কাজ করব তাদের প্রতি আমার বিশ্বাস রাখতেই হবে। আর আস্থার জন্য উভয় পক্ষকে কাজ করতে হবে। উভয় পক্ষকে বেশি বেশি যোগাযোগে থাকতে হবে। সুপারভাইজার কর্মীর ওপর আস্থা রাখবেন আর দায়িত্ব প্রদান করবেন। আর কর্মীরা তা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন ও আস্থা অর্জন করবেন।
করোনার মতো একটি দুর্যোগকে অতিক্রম করার পাশাপাশি যদি বিকল্প একটি পদ্ধতির সঙ্গে নিজেদের অভ্যস্ত করতে পারি। আর সেই অভ্যাসটা যদি আমাদের পেশাজীবন উন্নয়নে অবদান রাখে, আমাদের নিজেদেরকে নেতৃত্ব দিতে শেখায়, নিজেকে চেনায়। সর্বোপরি একজন আত্মপ্রত্যয়ী, নৈতিক মানুষ হতে শেখায়। সেটা হবে উপরি পাওনা।
উন্নয়ন কর্মী; প্রকল্প ব্যবস্থাপক, সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড জাস্টিস (সিপিজে) ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
- বিষয় :
- করোনা সংকট
- মোফাক খায়রুল তৌফিক
