ঢাকা বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬

নবরূপে গৌর গোপাল মন্দির

নবরূপে গৌর গোপাল মন্দির
×

পি. কে সরকার

প্রকাশ: ২৩ মার্চ ২০২০ | ১২:০৫

গোপাল মা যশোদার বড় সোহাগের নাম। দ্বাপরযুগে ভগবান শ্রীবিষুষ্ণর অবতার শ্রীকৃষ্ণের শৈশবের নাম গোপাল। গত ৪ মার্চ নান্দনিক সৌন্দর্য ও বৈশিষ্ট্যময় নতুন মন্দিরে নন্দলাল গোপালের অভিষেক অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়েছে মহাসমারোহে। ফরিদপুর জেলা সদরের শ্রীশ্রী গৌর গোপাল বিগ্রহ মন্দিরে এই প্রতীককে ধারণ ও স্থিতি দেওয়ার জন্য অতীতে একদিন শীলান্যাস করেছিলেন স্বর্গীয় সুধন্য কুমার মিত্র ১৩৩০ বঙ্গাব্দ, ১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দে। শ্রীশ্রী গৌর গোপাল অঙ্গনে আধুনিক নান্দিকতা আর সৌকর্যমণ্ডিত মন্দিরে প্রায় শতবর্ষের যুগসন্ধিক্ষণকে সুবর্ণরেখায় যুক্ত করেছে। ফরিদপুর সদর শ্রীশ্রী গৌর গোপাল বিগ্রহ এস্টেটের পরিচালনা পর্ষদের মননশীলতার সুস্থিত কামনার প্রতিফলন ঘটেছে এই মন্দিরের শৈল্পিক বিকাশে। আমরা অতি প্রাচীন ও প্রাচীন মন্দির বলতে প্রচ্ছন্নভাবে দেবতার প্রাচীনত্বের বিষয়টি কল্পনায় লালন করি। কিন্তু নিত্য সনাতন ভগবানের স্থিতির সঙ্গে পুরোনো মন্দিরের দেবতার প্রাচীনত্ব ভাবনা সমীচীন নয়। তিনি একক সত্তায় অধিষ্ঠিত। আমরা তাঁকে তাঁর রূপান্তরের ঐশ্বর্য মাঝে নিবেদনের অর্ঘ্য-নৈবেদ্য সাজাব, এই তো পরিষদের আকিঞ্চন।
চতুস্কোণভিত, ত্রিতল উচ্চতাসম্পন্ন শ্রীমন্দির। মন্দিরগাত্রে ইলোরা-অজন্তার উপমায় অনুপম কারুকার্য। ছাদে রয়েছে টেরাকোটা স্টাইলে মনোহর পুষ্পচক্র। গীতা মাধুর্যের বিশেষ ক্ষণগুলোকে স্থিতি দেওয়া হয়েছে বিভক্তভাবে সিমেন্ট ও টাইলসের শৈল্পিক উপস্থাপনায়। দক্ষিণমুখী মন্দিরের ডানে কংসবধ, শ্রীকৃষ্ণের শিবদর্শন, কংসের কারাগারে শ্রীকৃষ্ণ ও মহামায়া, শ্রীকৃষ্ণের গিরি গোবর্ধনলীলা, পুৎনাবধ, রাখাল বালকসনে শ্রীকৃষ্ণের গোচারণ, অর্জুনের বিশ্বরূপ দর্শন, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের সূচনাপর্বে শ্রীগীতার উদ্ভবক্ষণ- এসবই সিমেন্ট শৈল্পিক সম্ভারে মূর্ত করেছেন ভাস্কর শ্যামল পাল।
টাইলস বিন্যাসে সুবিন্যস্ত প্রভায় ভাস্বর হয়েছে কুরুক্ষেত্রের মহারণভূমি, শ্রীকৃষ্ণের কালীয় দমন, কংসের কারাগারে শ্রীকৃষ্ণের অবতার, এই অপূর্ব কারুকাজ সম্পন্ন করেছেন ঢাকা আর্ট কলেজের নিপুণ শিল্পীরা। এককথায় সব মন্দির কৃষ্ণময় গীতাময়তার এক অপূর্ব ব্যঞ্জনায় প্রতিভাত। মন্দিরের প্রবেশদ্বারের ঊর্ধ্বে ডানে শ্রীশ্রী রামকানাই, মাঝে দুই ফুট বিশিষ্ট টাইলসের বিভাজন। বামে গোপালের ননিচোরা রূপটি পরিগ্রহ করা হয়েছে। দ্বারের ঊর্ধ্বভাগে কাষ্ঠের লতাগুল্ম শোভামাঝে ময়ূর খচিত রয়েছে।
মন্দিরচূড়ার শীর্ষদেশে দ্বাপরে শ্রীকৃষ্ণ অবতারের মূল চিত্রটি ভাস্কর্যে ধারণ করা হয়েছে। নাগমাতা বাসুকির আচ্ছাদনে শ্রীকৃষ্ণ বাসুদেবের যমুনা অতিক্রমণের চিত্রটি অলঙ্কৃত হয়েছে কালজয়ী ইতিহাসের ঐতিহ্য মহিমায়।
দুই বেদিতে দুই বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। বামটিতে মোহনীয় ভঙ্গিমায় যশোদাজীবন গোপাল নারু হাতে। নিয়ন আলো-আঁধারির নীলাভবন্যায় গোপালের এই বিধৃত রূপটি অতি তাৎপর্যপূর্ণ। ডানে বেদিতে রাম-কানাইয়ের বিগ্রহ স্থাপিত হয়েছে। যে বিগ্রহ পূর্বের মূল মন্দিরের স্থাপনাকে স্বভক্তি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করে ও শিকড়ের সন্ধানকে অর্থবহ করে তোলে। পূর্বের মন্দিরের ভক্তসমাগম স্থলের ঊর্ধ্বভাগে রয়েছে শ্রীচৈতন্যচরিতামৃতের অমিয় স্তোত্রবাণী। তারই ধারাবাহিকতায় নবনির্মিত মন্দিরগাত্রে প্রতিটি পার্শ্বে রয়েছে- শ্রীকৃষ্ণ মুখনিঃসৃত শ্রীগীতার অমৃতলিপিকা। এক সুশৃঙ্খল সমন্বয় মাধুর্যে বৈদিক চেতনাকে ধারণ করার প্রচেষ্টা করা হয়েছে মন্দির সৌকর্য বিকাশে। সম্পূর্ণ
মার্কানা মারবেল পাথরে তৈরি গোপাল-বিগ্রহ।
২০২০ খ্রিষ্টাব্দ চলমান। আর তিনটি বছর পর শতবর্ষের মহিমায় গৌর-গোপাল আঙিনায় রচিত হবে এক গৌরবময় অধ্যায়। ভবিষ্যতে অনাগতকালের ললাটে ৪ মার্চ, ২০২০ গৌর-গোপাল বিগ্রহ ট্রাস্টির রাজমুকুটে একটি স্বর্ণপালক সংযোজনের দিন হিসেবে পরিগণিত হবে। মহান একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের পাশবিকতার স্মৃতিবাহী, বহু প্রতিকূলতার সীমানা পেরিয়ে নিজস্ব অর্থায়নে গৌর-গোপাল বিগ্রহ এস্টেটের জয়যাত্রা 'শুভ হোক।'
মুক্তিযোদ্ধা

আরও পড়ুন

×