ঢাকা বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬

র্অথনীতি

এশীয় প্রবৃদ্ধি ও বাংলাদেশ

এশীয় প্রবৃদ্ধি ও বাংলাদেশ
×

ড. মইনুল ইসলাম

প্রকাশ: ২৩ মার্চ ২০২০ | ১২:০৭

সম্প্রতি জোরেশোরে একটি ধারণাকে প্রতিষ্ঠার প্রয়াস শুরু হয়েছে যে, 'অসমতা ছাড়া উন্নয়ন সম্ভব নয়।' প্রথম দিয়েছিলেন মার্কিন অর্থনীতিবিদ সাইমন কুজনেৎস; বিংশ শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে। তাঁর তত্ত্বে বলা হয়েছিল, কোনো দেশের জনগণের মাথাপিছু আয় বাড়তে শুরু করলে একটা পর্যায় পর্যন্ত ওই দেশে আয়বৈষম্যও বাড়তে থাকবে। মাথাপিছু আয় বেড়ে একটা লেভেলে পৌঁছার পর আয়বৈষম্য আর বাড়ে না। এটাকে অর্থনৈতিক উন্নয়নতত্ত্বে 'ইনভার্টেড ইউ হাইপথেসিস' কিংবা 'কুজনেৎস কার্ভ হাইপথেসিস' হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। এই তত্ত্ব যে ভুল- সেটা ষাটের দশক থেকে একের পর এক অর্থনীতিবিদদের গবেষণায় প্রমাণিত হয়ে চলেছে। নোবেল পুরস্কার বিজয়ী বাঙালি অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ ব্যানার্জী এবং ভারতের আরেকজন খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ রবি কানবুরের গবেষণা প্রকাশনায় কুজনেৎস কার্ভ তত্ত্বকে তথ্য-উপাত্ত দিয়ে পুরোপুরি বাতিল করা হয়েছে। সম্প্রতি বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টিকারী ফরাসি অর্থনীতিবিদ টমাস পিকেটির 'ক্যাপিটাল ইন দ্য টোয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি' বইয়ে তথ্য-উপাত্ত দিয়ে প্রমাণ করা হয়েছে, কুজনেৎস বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনার মাধ্যমে তার তত্ত্ব প্রমাণ করার জন্য যে সালগুলো বেছে নিয়েছিলেন সেগুলো ইচ্ছাকৃতভাবেই ভুল বছর বেছে নিয়েছিলেন। কারণ তার তত্ত্ব আসলে ছিল 'আদর্শিকভাবে বিভক্ত বিশ্বে পুঁজিবাদের পক্ষের প্রোপাগান্ডা।' পিকেটি এসব দেশের উন্নয়নের সব পর্যায় বিশ্নেষণ করে প্রমাণ করেছেন, পুঁজিবাদী দেশগুলোতে রাষ্ট্র যদি আয় পুনর্বণ্টনে জোরদার ভূমিকা পালন না করে তাহলে সব দেশেই মাথাপিছু জিডিপির বণ্টনবৈষম্য বাড়তে বাড়তে মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছে যাবেই।
বিংশ শতাব্দীর পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের ব্রাজিলের চমকপ্রদ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সার্টিফিকেট দিতে গিয়ে বিশ্বব্যাংক একটি প্রতিবেদনও রচনা করে ফেলেছিল 'দ্য ব্রাজিলিয়ান মিরাকল' নামে। কিন্তু সত্তর দশক থেকে বিংশ শতাব্দীর বাকি তিন দশকজুড়ে ব্রাজিলকে প্রচণ্ডভাবে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের শিকার হতে হয়েছিল ক্রমবর্ধমান বৈষম্য, ঋণগ্রস্ততা ও দারিদ্র্যের কারণে। তাদের জিডিপিও নেগেটিভ গ্রোথের বিপর্যয়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছিল ওই সময়ে। এই তিন দশককে এখন ব্রাজিলীয়রা অভিহিত করছে 'দ্য লস্ট থ্রি ডিকেডস'। অন্যদিকে, দক্ষিণ কোরিয়া পুঁজিবাদী পথে পঞ্চাশ দশকের শেষ পর্যায়ে অর্থনৈতিক উন্নয়নের দৌড়ে শামিল হয়ে প্রথম থেকেই জনগণের সব অংশকে উন্নয়নের অংশীদার করায় গত ষাট বছরে চমকপ্রদ প্রবৃদ্ধি অর্জনের মাধ্যমে যেমন আজ উন্নত দেশের কাতারে উত্তীর্ণ; তেমনি তাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা পুরোপুরি গণমুখী হয়েও বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যবস্থাগুলোর অন্যতম হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। তাদের আয়বৈষম্য বাড়েনি এই ষাট বছরে। অথচ, দক্ষিণ কোরিয়ার মাথাপিছু জিডিপি এখন ৪০ হাজার ডলার। আরেকটি এশীয় দেশ মালয়েশিয়াও রাষ্ট্রকে আয় পুনর্বণ্টনমূলক ভূমিকা পালনে বাধ্য করার মাধ্যমে এখন উন্নত দেশের স্বীকৃতি পাওয়ার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। মালয়েশিয়ার সংখ্যাগরিষ্ঠ মালয়িরা রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে আজ সে দেশের চৈনিক ও ভারতীয় জনগোষ্ঠীর মতোই উন্নয়নের সুফল ভোগ করছে।
আয়বৈষম্যকে বাড়তে না দিয়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে প্রশংসনীয়ভাবে বাড়ানোয় সফল অতিসাম্প্রতিক 'সাকসেস স্টোরি' ভিয়েতনাম। ভিয়েতনামের জনগণের মাথাপিছু জিডিপি ১৯৭৪ সালে ছিল মাত্র ৬৫ ডলার, ১৯৮৫ সালে ছিল ২৮৫ ডলার। ২০১৭ সালে আইএমএফের প্রাক্কলন মোতাবেক ভিয়েতনামের মাথাপিছু নমিনাল জিডিপি ২৩৫৬ ডলারে পৌঁছে গেছে। ক্রয়ক্ষমতার সমতা ভিত্তিতে ভিয়েতনামের মাথাপিছু জিডিপি ২০১৯ সালে ৮০৫৯ পিপিপি ডলার, যেটাকে 'মিরাকল' আখ্যায়িত করা হচ্ছে। ভিয়েতনামের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার গত দু'দশক ধরে ৬.৫-৭.৫ শতাংশের মধ্যে রয়ে গেছে। ভিয়েতনামের রাষ্ট্রনেতারা এখনও তাদের রাষ্ট্রকে 'সমাজতান্ত্রিক ভিয়েতনাম' হিসেবেই অভিহিত করলেও ১৯৮৬ সালে 'দোই মোই' নামের সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন শুরু হওয়ার ৩৪ বছর পর পাশ্চাত্যের অর্থনৈতিক উন্নয়ন-চিন্তকরা ভিয়েতনামের অর্থনীতিকে 'সোশ্যালিস্ট-ওরিয়েন্টেড মার্কেট ইকোনমি' হিসেবে বর্ণনা করছেন। বিশেষত, প্রাইমারি ও বৃত্তিমূলক (ভোকেশনাল) শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে ভিয়েতনাম ২০০০ সালের মধ্যেই তার পুরো জনসংখ্যাকে শতভাগ শিক্ষিত করে তুলেছে এবং জনগণের বিশাল একটি অংশকে প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জনে সফল করে তুলেছে। একইভাবে উল্লেখযোগ্য, ভিয়েতনাম শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থায় বৈষম্য বাড়তে দেয়নি। আয় ও সম্পদ বণ্টনের ক্ষেত্রেও ভিয়েতনাম সযতনে বৈষম্য বৃদ্ধির প্রবণতাকে প্রতিরোধ করে যাচ্ছে। ভিয়েতনামের জনগণের ৮১ শতাংশ ২০১৭ সালে স্বাস্থ্য বীমার সেবা পেয়ে চলেছে। জনসংখ্যা নীতির ব্যাপারে ভিয়েতনাম কঠোরভাবে 'দুই সন্তান নীতি' অনুসরণ করছে, যে নীতিটা বাংলাদেশের বহু আগেই গ্রহণ করা উচিত ছিল। বাংলাদেশ ধনকুবের প্রবৃদ্ধির হারে ২০১৭ সালে বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপ অর্জন করলেও ভিয়েতনাম সক্রিয়ভাবে ধনাঢ্য ব্যক্তি সৃষ্টিকে নিরুৎসাহিত করে চলেছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুফলকে কয়েকটি নগরে কেন্দ্রীভূত না করে ভিয়েতনাম গ্রামীণ জনগণের মাঝে উন্নয়নকে পৌঁছে দিতে বদ্ধপরিকর। বৈদেশিক বিনিয়োগকে প্রবলভাবে উৎসাহিত করে চলেছে ভিয়েতনাম। এখন ভিয়েতনামে প্রতি বছর বৈদেশিক বিনিয়োগ প্রবাহ দাঁড়াচ্ছে ২০-২৫ বিলিয়ন ডলার, যেখানে বাংলাদেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ এখনও তিন বিলিয়ন ডলারেরও নিচে। ভিয়েতনামের ব্যাংকিং ব্যবস্থা এখনও রাষ্ট্রীয় মালিকানায় রয়ে গেছে, কিন্তু ব্যাংক ঋণে উদ্যোক্তাদের অভিগম্যতা উল্লেখযোগ্যভাবে সহজ ও বহুল বিস্তৃত করা হয়েছে। বিশেষত, গ্রামীণ উৎপাদনকারীদের কম সুদে ঋণ পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এবং ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে সুলভে ও দুর্নীতিমুক্ত প্রক্রিয়ায় ব্যাংক ঋণ পৌঁছে দেওয়ার পারঙ্গমতায় ভিয়েতনাম অনুকরণীয় নজির সৃষ্টি করেছে।
এই ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক গতিশীলতার পেছনের চাবিকাঠি হলো ভিয়েতনামে দুর্নীতির প্রকোপ অনেক কম। ভিয়েতনামের শ্রমশক্তি ও মানব পুঁজি বাংলাদেশের চেয়ে অনেক শিক্ষিত, দক্ষ ও পরিশ্রমী। ভিয়েতনামের ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন চমকপ্রদ, এবং বন্দর, মহাসড়ক ও সুলভ গণপরিবহন দ্রুত আধুনিকায়নে সফল। তৈরি পোশাক রপ্তানিতে ভিয়েতনাম এখন বাংলাদেশকে হটিয়ে গণচীনের পর বিশ্বের দ্বিতীয় অবস্থানটি দখল করে নিয়েছে। ইলেকট্রনিকস পণ্য রপ্তানিতে সিঙ্গাপুরের পর ভিয়েতনাম দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় দ্বিতীয় অবস্থানে। চাল রপ্তানিতে থাইল্যান্ডকে হটিয়ে ভিয়েতনাম ভারতের পর বিশ্বের দ্বিতীয় অবস্থানে; ব্রাজিলের পর কফি রপ্তানিতে ভিয়েতনাম বিশ্বে দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে। সাড়ে ৯ কোটি জনসংখ্যার দেশ ভিয়েতনামের রপ্তানি আয় বাংলাদেশের কয়েক গুণ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গণচীনের চলমান বাণিজ্য যুদ্ধের কারণে গণচীনে উৎপাদনরত অনেক শিল্প-কারখানা এখন ভিয়েতনামে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
ওপরে যে নজিরগুলো উপস্থাপন করা হলো, তার প্রত্যেকটিই 'অসমতা ছাড়া উন্নয়ন সম্ভব না'- এই ভুয়া ফতোয়াকে বাতিল করছে। এই চারটি দেশের 'ন্যায্যতাসহ প্রবৃদ্ধি' অর্জনের মূল উপাদান আসছে নিচের কয়েকটি সফলতা থেকে :১. এসব দেশের শ্রমশক্তি ও মানবপুঁজি বাংলাদেশের চেয়ে অনেক শিক্ষিত, প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন, দক্ষ, পরিশ্রমী, কর্তব্যপরায়ণ ও নির্বিরোধ; ২. এসব দেশের ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন ও আধুনিকায়নে চমকপ্রদ সাফল্য অর্জিত হয়েছে। মহাসড়ক, রেলপথ, বন্দর, বিমানবন্দর, গণপরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়নে এসব দেশ অগ্রাধিকার দিয়ে সফল হয়েছে; ৩. এসব দেশে দুর্নীতির প্রকোপ অনেক কম। দুর্নীতি দমনে এসব দেশে কঠোর ব্যবস্থা চালু রয়েছে; ৪. এসব দেশ শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থায় বৈষম্য বাড়তে দেয়নি; এবং ৫. এসব দেশের মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়া ও মালয়েশিয়া পুঁজিবাদী পদ্ধতি এবং গণচীন ও ভিয়েতনাম সমাজতন্ত্রের অনুসারী হওয়া সত্ত্বেও প্রতিটি দেশে জনপ্রতিনিধিত্বমূলক শক্তিশালী স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা চালু রয়েছে। বাংলাদেশের জন্য এগুলোই প্রধান শিক্ষণীয়।
স্বাধীনতা দিবস সামনে রেখে কলামটি লিখছি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে একটি কথা মনে করিয়ে দিতে :'ক্রোনি ক্যাপিটালিজম' (যাকে বাংলায় স্বজনতোষী পুঁজিবাদ বা মোসাহেবতোষী পুঁজিবাদ বলা যায়) বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক আদর্শের সঙ্গে চরম বিশ্বাসঘাতকতা। বঙ্গবন্ধু একটি কথা বারবার বলতেন, 'পৃথিবীতে দুই দল মানুষ আছে- এক দল শোষক আরেক দল শোষিত। আমি শোষিতের পক্ষে।' মোসাহেবরা নিকৃষ্ট শোষকগোষ্ঠীরই প্রতিভূ। ক্ষমতাসীন দল বা জোটের শীর্ষ নেতৃত্বের দাক্ষিণ্যলোভী এই শোষকদেরই সৌভাগ্যের জোয়ার চলেছে বর্তমান বাংলাদেশে। রাষ্ট্রক্ষমতার পৃষ্ঠপোষকতা লাভে সফল এসব ধুরন্ধর ব্যক্তি এদেশে অতি দ্রুত ধনকুবেরে পরিণত হচ্ছে। যার পরিণামে বাংলাদেশ ধনকুবের সৃষ্টির ক্ষেত্রে বিশ্বে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধির হার অর্জনের লজ্জাজনক স্থানটি দখল করেছে। অথচ, বাংলাদেশ নাকি একটি 'গণপ্রজাতন্ত্র', যার চারটি রাষ্ট্রনীতির মধ্যে ২০১০ সাল থেকে আবার সমাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা 'ওয়েলথ এক্স'-এর প্রতিবেদন ওয়ার্ল্ড আল্‌ট্রা ওয়েলথ রিপোর্ট-২০১৮ মোতাবেক ২০১২ সাল থেকে ২০১৭, এই পাঁচ বছরে অতি ধনী বা ধনকুবেরের সংখ্যা বৃদ্ধির দিক দিয়ে বিশ্বের বড় অর্থনীতির দেশগুলোকে পেছনে ফেলে সারাবিশ্বে ১ নম্বর স্থানটি দখল করেছে বাংলাদেশ। ওই পাঁচ বছরে বাংলাদেশে ধনকুবেরের সংখ্যা বেড়েছে বার্ষিক ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ হারে। এই প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০১৭ সালে বাংলাদেশে ধনকুবেরের সংখ্যা ২৫৫। ধনকুবেরের এই দ্রুততম প্রবৃদ্ধির হার বাংলাদেশের জন্য একটি লজ্জাজনক অর্জন। ক্রোনি ক্যাপিটালিজমের অব্যাহত দৌরাত্ম্যের কারণেই ধনকুবেরদের এই রমরমা প্রবৃদ্ধি ঘটছে এ দেশে। বঙ্গবন্ধু নিশ্চয় এই বাংলাদেশ চাননি।
অর্থনীতিবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×