ঢাকা শুক্রবার, ০৩ জুলাই ২০২৬

করোনা-দুর্যোগ

রাজনীতির দায় ও দায়িত্ব

রাজনীতির দায় ও দায়িত্ব
×

দেবব্রত চক্রবর্তী বিষুষ্ণ

প্রকাশ: ৩১ মার্চ ২০২০ | ১১:১৯

করোনাভাইরাসের সংক্রমণে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর চিত্র এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি মর্মন্তুদ। পরিস্থিতি বিশ্নেষণে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তুলনামূলকভাবে এই ভাইরাসের বিস্তৃতি এখন পর্যন্ত কম পরিলক্ষিত হলেও একই সঙ্গে কিছু প্রশ্নও সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। আমাদের পরিস্থিতি আমলে নিলে বৈশ্বিক বর্তমান প্রেক্ষাপটে কিছুটা স্বস্তির হলেও এ প্রশ্নটা উপেক্ষণীয় নয়, এই ভাইরাসের লক্ষণ-উপসর্গ আছে এমন কত ভাগকে আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় পরীক্ষাধীনের আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে? করোনা শনাক্তে আমাদের পরীক্ষাকেন্দ্র এখনও একেবারে গণ্ডিবদ্ধ। প্রশ্ন আছে এও- ভাইরোলজিস্টদের পরামর্শ কিংবা প্রস্তাব আমাদের দায়িত্বশীল মহল কতটা আমলে নিচ্ছে? হাসপাতালগুলো কেন এখনও পূর্ণমাত্রায় প্রস্তুত নয়- এটিও জরুরি প্রশ্ন। অনেক ক্ষেত্রেই ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক চিকিৎসাও। রাজধানীর বাসাবোয় স্ট্রোকে আক্রান্ত একজন মুক্তিযোদ্ধাকে তার পরিবার চারটি হাসপাতালে চেষ্টা করেও ভর্তির সুযোগ পায়নি। শেষ পর্যন্ত তিনি একটি হাসপাতালে ভর্তি হতে পারলেও কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রাণ হারান। এর দায় নেবে কে? এটি একটি মাত্র মর্মান্তিক দৃষ্টান্ত।
দৃষ্টি দিই একই প্রসঙ্গে ভিন্ন প্রেক্ষাপটের দিকে। 'এমপিদের পাশে চায় বিপদগ্রস্ত মানুষ' শিরোনামে ২৯ মার্চ সমকালে প্রকাশিত শীর্ষ প্রতিবেদনে যে চিত্র উঠে এসেছে, তাতে দেখা যাচ্ছে, বেশিরভাগ জনপ্রতিনিধি এলাকায় নেই! ভোটের সময় বিনয়ী, প্রতিজ্ঞা কিংবা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ভোটপ্রত্যাশীরা যাদের ভোটে প্রত্যাশা পূরণ করে অধিকতর ক্ষমতার মোহাবিষ্ট হয়ে পড়েন, তাদের কারও কারও সম্পর্কে আমাদের তিক্ত ধারণা-অভিজ্ঞতা আছে। এখন তো ইউপি চেয়ারম্যান পর্যন্ত রাজনৈতিক দলের মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচিত হন। কিন্তু বিদ্যমান দুর্যোগ-দুর্বিপাকে জনকল্যাণে তাদের কতজনের কর্মকাণ্ড দৃষ্টিগ্রাহ্য? ইতোমধ্যে ব্যক্তি কিংবা সামাজিক অনেক সংগঠনের প্রতিনিধিরা মানুষের দিকে সহায়তা-সহযোগিতার হাত প্রসারিত করেছেন। প্রশ্ন হচ্ছে, রাজনীতিকরা কি স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করেও তেমন কিছু করছেন?
এ কথা অনস্বীকার্য, যে কোনো ক্রান্তিকালে যে কোনো দেশে, বিশেষ করে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের মানসিকতা স্পষ্ট হয়। আমাদের যে রাজনীতির এত অর্জন, সেই রাজনীতির ধারক-বাহক অনেকেই স্বাধীন দেশে ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে যে মানসিক দৈন্যের পরিচয় দিয়েছেন, এর ফলে সমাজে নানারকম ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে। করোনা পরিস্থিতি নিয়েও রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ি কম হয়নি। সমাজের প্রায় সর্বত্র হেলাফেলা, বিভাজন, পরস্পর বিদ্বেষাক্রান্ত হয়ে অতিকথনে জড়িয়ে পড়া তামাশা বৈ কী হতে পারে? অনাকাঙ্ক্ষিত হলেও সত্য, রাজনীতি-সংশ্নিষ্ট অনেকেই এ ক্ষেত্রে যতটা পারঙ্গম, অন্যরা ততটা নন। অথচ ক্রান্তিকালে রাজনীতিকরাই হবেন দেশ-জাতির নির্ভরতা- এটাই তো সঙ্গত প্রত্যাশা। কিন্তু আমাদের বাস্তবতা অনেক ক্ষেত্রেই পরিলক্ষিত হয় উল্টো। করোনাভাইরাসের সংক্রমণকালে আমাদের সংসদ সদস্যদের বিপন্ন মানুষের পাশে না থাকার ব্যাপারে জনগণের যে অভিযোগ, তা এ থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। তবে এর ব্যতিক্রমও আছেন সংখ্যায় কম হলেও।
বলা হয়ে থাকে, জনকল্যাণের অপর নাম রাজনীতি। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক-সামাজিক পরিসরে কে কতটা দায়দায়িত্ব পালনে নিষ্ঠ? প্রশ্ন হচ্ছে- বাংলাদেশে নিয়মিত বেতন-মজুরি পেয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন এ রকম মানুষের সংখ্যাচিত্র কতটা স্ম্ফীত? আমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ স্বনিয়োজিত। এ দেশের বড় একটা অংশের জনগোষ্ঠীর বেঁচে থাকার অবলম্বন অর্থনীতির অসংগঠিত খাত। যারা উদয়াস্ত পরিশ্রম করে জীবিকা নির্বাহ করেন, করোনা বিপদের ছায়া ছাড়াই তাদের জীবন বিপর্যস্ত। কিন্তু আমাদের রাজনীতিক-জনপ্রতিনিধিরা তাদের জন্য কতটা দায়বদ্ধ?
আমাদের সীমাবদ্ধতা আছে সত্য, সামর্থ্য ক্ষীণ- তাও সত্য। কিন্তু এর চেয়েও সত্য, আমাদের ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটি স্তরে স্তরে বহুবিধ। আমাদের দায়িত্বশীল অনেকেরই ব্যবস্থা ভালো না করে অবস্থা ভালোর প্রত্যাশা অনেকটা স্ববিরোধিতারই নামান্তর। তাছাড়া বাস্তবতা এড়িয়ে যাওয়া, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তথ্য গোপন করার অপপ্রবণতাও অনেকটা সংক্রামক ব্যাধির মতোই। যথাসময়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে উপলব্ধির ক্ষেত্রে আমাদের সামগ্রিক ব্যর্থতাও কম নয়। সামগ্রিক পরিস্থিতি অঙ্কের হিসাবে চাক্ষুষ যতটা না বিপন্নতার আভাস দিচ্ছে, তার চেয়েও যে কঠিন হবে তা অনেকটা সন্দেহাতীতই। কাজেই এ মুহূর্তে যদি দায়িত্বশীলরা নিজ নিজ দায় নির্দিষ্ট করে দায়িত্ব পালনে এখনও কার্যকর ভূমিকা না রাখেন কিংবা স্বস্বার্থ নিয়েই মগ্ন থাকেন, তাহলে সমাজে তা যে অভিঘাত ফেলবে- এ থেকে উত্তরণ কঠিন হবে। সামাজিক নিরাপত্তা-শৃঙ্খলা, বাজারে মূল্য সন্ত্রাসীদের উন্মত্ততা, জঙ্গিবাদের অপতৎপরতা ইত্যাদি নেতিবাচক কিংবা সমাজবিরোধী এমন অনেক কিছুই মাথাচাড়াও দিতে পারে। এসব কোনো আতঙ্কবার্তা নয়, বরং দায়িত্বশীলদের গুরুত্বের সঙ্গে বিষয়গুলো আমলে রেখে সেভাবেই নির্ধারণ করতে হবে ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা। আমরা যেন ভুলে না যাই, দায় সর্বদাই দায়িত্বের প্রতি ধাবিত হয়। মানুষকে রক্ষার দায় ও দায়িত্ব রাজনীতির অন্যতম শর্ত। আর রাজনীতিকরা হলেন এর পূর্ণতা দেওয়ার মূল শক্তি। কিন্তু আমাদের বাস্তবতা কী বলে?
[email protected]
সাংবাদিক

আরও পড়ুন

×