ঢাকা শুক্রবার, ০৩ জুলাই ২০২৬

করোনাভাইরাস

সম্ভাব্য অনিশ্চয়তা ও করণীয় কল্পচিত্র

সম্ভাব্য অনিশ্চয়তা ও করণীয় কল্পচিত্র
×

আবুল বারকাত

প্রকাশ: ৩১ মার্চ ২০২০ | ১১:২১

(গতকালের পর)
করোনাভাইরাস প্রতিরোধে কোনোরকম কালক্ষেপণ না করে ১৭ কোটি মানুষের আমাদের দেশে যা দরকার তা হলো :পিসিআর বা পলিমারেজ চেইন রিঅ্যাকশন মেশিনে মলিকুলার ডায়াগনসিসের জন্য যথেষ্ট পরিমাণ রি-এজেন্ট যেন প্রতিদিন কমপক্ষে ১০ হাজার টেস্ট করা সম্ভব হয় (এ মুহূর্তে আমাদের দেশের তুলনায় অর্ধেক জনসংখ্যার দেশ জার্মানিতে প্রতিদিন টেস্ট হচ্ছে ৭০ হাজার); দ্রুত বা র‌্যাপিড টেস্টের জন্য কমপক্ষে দুই লাখ রোগ নির্ণয় কিট- যে কিটের কার্যকারিতা ইতোমধ্যে শতভাগ প্রমাণিত (অর্থাৎ পরীক্ষামূলক কোনো কিট নয়); সংশ্নিষ্ট ল্যাবরেটরি প্রতিষ্ঠা, ল্যাব-বিজ্ঞানী ও জ্ঞানসমৃদ্ধ প্রশিক্ষিত টেকনিশিয়ান-কর্মী বাহিনী নিয়োগ; নির্ণীত রোগীর চিকিৎসা ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় ভেন্টিলেটর, অক্সিজেন ও গুরুতর রোগীর জন্য ডেডিকেটেড ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট বা আইসিইউ ব্যবস্থা; প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে রোগীর লালা-রক্ত ইত্যাদি বহনের জন্য নির্দিষ্ট তাপমাত্রার কোল্ড চেইন ব্যবস্থা; দেশের ভেতরেই সংশ্নিষ্ট যেসব উপাদান-উপকরণ আছে, তার পূর্ণ ইনভেনটরি; রোগতত্ত্বীয় ও সংশ্নিষ্ট সব বিষয়ের ডাটা বেইজ প্রতিষ্ঠা ও তা সংরক্ষণের ত্রুটিহীন নিশ্ছিদ্র ব্যবস্থা; হাসপাতাল-চিকিৎসাকেন্দ্রে রোগীদের ঢোকা এবং বেরোনোর জন্য রোগের ধরন অনুযায়ী (যাকে বলা হচ্ছে ওয়ান ওয়ে ইন অ্যান্ড আউট)- সংক্রমিত রোগী, সংক্রমণ-সম্ভাব্য রোগী, অসংক্রমিত রোগীর ঢোকার জন্য তিনটি ভিন্ন পথ আর বেরোনোর সময় সংক্রমিত রোগী ও অসংক্রমিত রোগীর জন্য দুটি ভিন্ন পথ; মানব স্বাস্থ্য, জীবজন্তু ও পরিবেশ স্বাস্থ্যের ডাটা ইন্টিগ্রেশনের ব্যবস্থা; জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে জননিরাপত্তা ব্যবস্থার সংযোগ স্থাপন; চিকিৎসক-স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের জন্য পরীক্ষিত নিরাপত্তা পরিধেয় এবং প্রণোদনাব্যবস্থা; কার্যকর সঙ্গরোধ ব্যবস্থা; স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতা বিধি যে কোনো মূল্যে কঠোরভাবে পালনের সংস্কৃতি গড়ে তোলা; সামাজিক মেলামেশা রোধ; ভাইরাস প্রতিরোধী সামাজিক আন্দোলন জোরদার করা; বিদেশ থেকে রোগ নির্ণয় ও প্রতিরোধ বিশেষজ্ঞ-ডাক্তার-নার্স আনা; অসংক্রমিত রোগ যেমন ক্যান্সার, কিডনি, হার্ট, ডায়াবেটিস- যেসব রোগের চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে দেশে প্রতিবছর ৫০ লাখ অদরিদ্র মানুষ দরিদ্রদের কাতারে যুক্ত হচ্ছেন- এসব রোগের চিকিৎসা চালু রাখা; চালু রাখা গর্ভবতী মা ও নবজাতকের চিকিৎসাসেবা; গুরুত্বের সঙ্গে খেয়াল রাখা যে করোনাভাইরাস আক্রান্ত মানুষের কো-মর্বিডিটি অর্থাৎ অন্য রোগে আক্রান্ত মানুষ যদি করোনাভাইরাসের কবলে পড়েন, সেক্ষেত্রে তার মৃত্যু-সম্ভাবনা অথবা গুরুতর অসুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায় এবং সে অনুযায়ী চিকিৎসা ব্যবস্থা সাজানো। এককথায় দরকার হলো সমগ্র স্বাস্থ্য সেক্টর ও জনস্বাস্থ্য সেক্টরকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়া ও সংশ্নিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা গড়ে তোলা।
করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে যেসব কর্মকাণ্ডের কথা এর আগে বললাম, তা বাস্তবায়নে সম্পদ ব্যয় করতে হবে। অর্থ লাগবে। সম্ভাব্য কী পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ (ব্যয় নয়) করতে হবে এবং ওই অর্থ আহরণের উৎস কী হতে পারে? আগেই বলেছি, হিসাবটি খণ্ডচিত্রভিত্তিক নয়, সমগ্র চিত্র বিবেচনায় রেখেই করতে হবে। এ ধরনের কল্পচিত্র অনুযায়ী আমার হিসাবে প্রয়োজন হবে কমপক্ষে এক লাখ কোটি টাকা। সম্পূর্ণ অর্থ একই সঙ্গে এখনই প্রয়োজন হবে না। কারণ বেশ কিছু জিনিসপত্তর, যেমন রি-এজেন্ট, বেতন-ভাতা, পরিবহন ব্যয়- এসব সামনে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে লাগবে। আনুমানিক এক লাখ কোটি টাকার এ বিনিয়োগ কোথা থেকে আসতে পারে? আমার জানামতে, বৈশ্বিকভাবে ইতোমধ্যে ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের কভিড-১৯ প্রতিরোধ তহবিল গঠন করা হয়েছে, যা আক্রান্ত দেশগুলো ব্যবহার করবে আর পাশাপাশি এ বাবদ প্রায় ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ অর্থ দিচ্ছে পৃথিবীর বিভিন্ন ফাউন্ডেশন, ট্রাস্ট ও চ্যারিটি সংস্থা। অর্থাৎ এ মুহূর্তে করোনা প্রতিরোধে বৈশ্বিক তহবিলে আছে কমপক্ষে ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (এ অঙ্ক বাড়বে)। যৌক্তিক কারণেই বৈশ্বিক জনসংখ্যা অনুপাতে আমাদের ন্যায্য হিস্যা হওয়া উচিত ওই ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের কমপক্ষে ৩ শতাংশ। অর্থাৎ কমপক্ষে ১২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা। এ হিস্যা পেতে হলে প্রয়োজন হবে শক্তিশালী অতি জরুরি ফলপ্রদ কূটনৈতিক কর্মকাণ্ড। এ ক্ষেত্রেও ভ্যানগার্ড হতে পারেন বিশ্বসমাজে আদৃত আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বৈশ্বিক তহবিল থেকে ওই অর্থ পাওয়া গেলে ঘাটতি থাকবে ৮৭ হাজার ২৫০ কোটি টাকা। ঘাটতি এ অর্থ পূরণের উৎস হতে পারে জরুরি অবস্থায় সম্পদশালীদের ওপর কর অর্থাৎ ওয়েলথ ট্যাক্স আরোপ (৩০ হাজার কোটি টাকা), পাচারকৃত অর্থ ও কালো টাকা উদ্ধার (৬০ হাজার কোটি টাকা)। এখানে অর্থনীতি শাস্ত্রের কয়েকটি প্রমাণিত-পরীক্ষিত সত্য কথা উল্লেখ জরুরি :ওয়েলথ ট্যাক্স বৈষম্য হ্রাস করে; অর্থ পাচার ও কালো টাকা বৈষম্য বাড়ায়; সম্পদশালীদের ওপর ট্যাক্স কমালে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ে না; সমাজের নিচতলার ৯০ শতাংশ মানুষের ওপর ট্যাক্স কমালে তাদের কর্মসংস্থান ও আয় বাড়ে।
করোনাভাইরাস প্রতিরোধে এই এক লাখ কোটি টাকার বিনিয়োগ ফল হবে বহুমুখী পজিটিভ-স্বল্প ও দীর্ঘ উভয় মেয়াদেই। স্বল্পমেয়াদে আক্রান্ত মানুষ বাঁচবে, সংক্রমণ হার কমবে, সংক্রমণ বিস্তার রোধ হবে, কমিউনিটিতে ছড়িয়ে যাওয়া কমবে, মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত হবে, মানুষের মানসিক দুশ্চিন্তা উদ্ভূত দুর্দশা কমবে, কো-মর্বিডিটি (সহ-অসুস্থতা) কমবে, একই সঙ্গে কমবে সংশ্নিষ্ট মৃত্যুহার। আর দীর্ঘমেয়াদে লাভ হবে অনেক সুদূরপ্রসারী :ভাইরাস প্রতিরোধ সংশ্নিষ্ট সুরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী হবে। সমগ্র স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেবে, বিষয়টি ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক লাখ কোটি টাকার প্রস্তাবিত বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদে আমাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে উন্নততর করবে, যার অভিঘাত হবে কল্পনাতীত পজিটিভ এবং বংশপরম্পরা। নিজস্ব জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রযুক্তিবলয় দৃঢ়তর হওয়ার মাধ্যমে ভবিষ্যতের জনস্বাস্থ্যসহ অর্থনৈতিক-সামাজিক বলয় সুসংহত হবে; দৃঢ়তর হবে সব প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, যা সুশাসনের পূর্বশর্ত; দুর্বল প্রতিষ্ঠান সবল প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হবে, যা টেকসই প্রবৃদ্ধি ও প্রগতি নিশ্চিত করার পূর্বশর্ত; ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্যের জন্য এ বিনিয়োগ হবে উপরি পাওনা অর্থাৎ তখন তাদের এ বিনিয়োগ করা প্রয়োজন পড়বে না; শুধু রক্ষণাবেক্ষণসহ প্রাতিষ্ঠানিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে হবে। এ বিনিয়োগ সুস্থ মানবসমাজ বিনির্মাণের ভিত্তি সুপ্রশস্ত করবে, যা ভবিষ্যতে জনসমৃদ্ধি ও মানব কুশলতা নিশ্চিত করবে। এককথায় এ হলো সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য বর্তমানের আবশ্যিক বিনিয়োগ।
আসা যাক আমার দ্বিতীয়পর্বের বক্তব্যে, যেখানে আমি বলেছি- 'ক্ষতি-সম্ভাবনা হয়তোবা অপরিমেয়; কিন্তু ক্ষতি হ্রাস করতে হবে এবং সেটাও সম্ভব।' সম্ভাব্য অপরিমেয় ক্ষতিটা হতে পারে কীভাবে? মানুষের অকালমৃত্যু ও বিভিন্ন মেয়াদি বিভিন্ন ধরনের অসুস্থতার কথা তো আগেই বলেছি- এসব হলো প্রথম ক্যাটাগরির ক্ষতি। দ্বিতীয় ক্যাটাগরির ক্ষতিটা হবে একই সঙ্গে পাশাপাশি; তবে ক্ষতির রূপটা হবে ভিন্ন এবং সম্ভবত ক্ষতির গভীরতা হতে পারে কল্পনাতীত ও অপরিমেয়। বিষয়টার উদ্ভব হবে স্বাভাবিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ হয়ে যাওয়া অথবা গতি স্লথ হয়ে যাওয়ার কারণে। ইতোমধ্যেই আমরা এসব লক্ষ্য করছি বিভিন্নভাবে বিভিন্ন মাত্রায়: শিল্প কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে (বিশেষত বস্ত্র, গার্মেন্টস, লেদার ইত্যাদি); বন্ধ হচ্ছে সব ধরনের ট্রান্সপোর্ট; বন্ধ হয়ে যাচ্ছে অনানুষ্ঠানিক খাত- রিকশা, ভ্যানসহ শহর-উপশহর-গ্রামের বিভিন্ন অর্থনৈতিক বা জীবিকা নির্বাহী কর্মকাণ্ড; বেকারত্ব বাড়ছে এবং বাড়বে সর্বত্র; কৃষক কৃষিজ ফসল বিক্রির জন্য হাটবাজারে যেতে পারছে না। কারণ করোনার কারণে হাট বসতে দেওয়া হচ্ছে না; বৈদেশিক বাণিজ্য, আমদানি ও রপ্তানি উভয়ই কমছে; ইতোমধ্যে বস্ত্র ও গার্মেন্টসের প্রায় তিন বিলিয়ন ডলারের ক্রয়াদেশ বাতিল হয়েছে; ব্যাংকের এলসি প্রায় স্থবির; প্রবাসীদের প্রেরিত অর্থের পরিমাণ কমে আসছে- এসবই বড় ধরনের অনিশ্চয়তা এবং এ অনিশ্চয়তা কতদিন চলবে, তা কেউই জানে না। আমার মতে, এসব কারণে সবচেয়ে মারাত্মক যে বিষয়টা সমাগত- এপ্রিল-মে মাসের মধ্যেই সম্ভবত, তা হলো হয়তোবা খাদ্যের পরিমাণে ঘাটতি থাকবে না; কিন্তু গ্রাম-শহর নির্বিশেষে দরিদ্র-বিত্তহীন-নিম্নবিত্ত মানুষের ঘরে খাবার থাকবে না, তারা সন্তান-সন্ততিসহ অভুক্ত-অর্ধভুক্ত থাকতে বাধ্য হবেন।
এ এক সম্ভাব্য দুর্ভিক্ষাবস্থা। পরিত্রাণের একমাত্র উপায় হলো ক্ষুধার্ত-অভুক্ত-অর্ধভুক্ত দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের হাতে অর্থ থাকুক বা না থাকুক, তাদের চুলায় নিম্নতম প্রয়োজনমতো খাবার থাকতেই হবে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এসব মানুষের সংখ্যা ১৭ কোটি মানুষের মধ্যে কমপক্ষে তিন কোটি ৪০ লাখ অর্থাৎ দেশের মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশ। কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে যখন 'দিন আনে দিন খায়' মানুষের কাজ থাকবে না, তখন এসব মানুষের সংখ্যাটা দাঁড়াবে আনুমানিক ছয় কোটি। অর্থাৎ এরা হলেন দেশের মোট খানার আনুমানিক ৩৭ শতাংশ। এই ছয় কোটি মানুষ বাস করেন আনুমানিক এক কোটি ৫০ লাখ খানায়; যার মধ্যে গ্রামে এক কোটি খানা আর শহরে ৫০ লাখ খানা।
(তৃতীয় অংশ আগামীকাল)
[email protected]
অধ্যাপক, অর্থনীতি ও জাপানিজ স্টাডিজ বিভাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সভাপতি, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি

আরও পড়ুন

×