সাক্ষাৎকার : অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান
আতঙ্ক নয়, করোনা-সচেতনতা চাই
সাক্ষাৎকার গ্রহণ : সাইফুল ইসলাম
প্রকাশ: ০৪ এপ্রিল ২০২০ | ১৩:৫৭ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০
সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। বর্তমানে তিনি ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি অব ক্রিমিনোলজির (আইএসসি) সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষকতা করেছেন। একই বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন এবং কানাডার ক্যালগেরি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসে সৃষ্ট মহামারি বিষয়েও গবেষণা শুরু করেছেন। এ প্রসঙ্গে সমকালের সঙ্গে কথা বলেছেন-
সমকাল : করোনাভাইরাস মাত্র তিন মাসের মধ্যে বিশ্বব্যাপী মহামারির আকার ধারণ করেছে। এমন বিপর্যয়ের কারণ কী? একজন সমাজবিজ্ঞানী হিসেবে বিষয়টি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?
জিয়া রহমান : আমরা বিশ্বায়নের ধারণা জানি। নিঃসন্দেহে বিশ্বায়ন আমাদের অনেক সমৃদ্ধ করেছে। এর ফলে আমরা আমাদের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও সম্পদ ভাগাভাগির মাধ্যমে নানাভাবে উপকৃত হয়েছি। তবে বিশ্বায়নের কিছু নেতিবাচক দিকও রয়েছে। আমরা দেখতে পাচ্ছি, মানুষের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় বিচরণের কারণে করোনাভাইরাস সহজেই এক দেশ থেকে অন্য দেশে ছড়িয়ে যাচ্ছে। জার্মানির বিখ্যাত সমাজতাত্ত্বিক উলরিস বেক অনেক আগে 'রিচ সোসাইটি' নামক একটি তত্ত্ব দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আমরা একটি আধুনিক সমাজ বা রিচ সোসাইটির দিকে চলে যাচ্ছি। এ জন্য আমরা সবকিছু জয় করার জন্য এক ধরনের দুরন্তপনার মধ্য দিয়ে প্রকৃতিকে নানাভাবে আঘাত করছি। কার্ল মার্কস অনেক আগেই বলেছেন, পুঁজিবাদী সমাজে পুঁজিবাদীরা নিজেই তাদের কবর রচনা করছে। পুঁজিবাদী সমাজে মানবিক মূল্যবোধ নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে আমাদের জীবনযাত্রায় অস্থিরতা নেমে এসেছে। এ ছাড়া চাহিদার বেশি প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও ব্যবহারের ফলে প্রাকৃতিক ভারসাম্য পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে একটার পর একটা ভাইরাস সৃষ্টির মাধ্যমে প্রকৃতি আমাদের থেকে প্রতিশোধ নিচ্ছে।
সমকাল : করোনাভাইরাস সংক্রমণে বাংলাদেশের সামগ্রিক পরিবেশ কী ধরনের ভূমিকা রাখছে?
জিয়া রহমান : আমরা ট্র্যাডিশনাল সমাজব্যবস্থা থেকে আধুনিক সমাজে প্রবেশ করেছি। কিন্তু এখনও আমাদের দেশে প্রচুর মানুষ ট্র্যাডিশনাল চিন্তাভাবনা বা অভ্যাসে নিমজ্জিত আছেন। আমাদের দেশে আধুনিকায়ন পরিপূর্ণরূপে না হওয়ায় যারা আধুনিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত তারা নানা রকম প্রতিবন্ধকতার শিকার হচ্ছেন। হার্বাট জে গ্যানস ১৯৬০ সালের দিকে বলেছিলেন 'আরবান ভিলেজারস'-এর কথা। যার অর্থ হলো নগরে বসবাস করে কিন্তু নাগরিক হয়ে ওঠেনি। আমরা দেখছি, মানুষ নগরে বসবাস করছে কিন্তু নাগরিক অভ্যাস গড়ে ওঠেনি। বাংলাদেশের ঢাকাসহ অন্যান্য শহরেও দেখা যায়, মানুষ যত্রতত্র থুতু ফেলছে, ময়লা জমিয়ে রাখছে। রাস্তা পারাপারে অনেকেই ট্রাফিক নিয়ম মানছে না বা ওভারব্রিজ ব্যবহার করছে না। এ ছাড়া পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন না থাকা, পর্যাপ্ত পাবলিক টয়লেট না থাকাসহ অজস্র অসামঞ্জস্যতার মধ্যে আমরা দীর্ঘদিন থেকে বসবাস করে আসছি। বিষয়গুলো আমাদের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।
সমকাল : এখানে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ যতটুকু হয়েছে তার চেয়ে অনেক বেশি আতঙ্ক বিরাজ করছে। এর কারণ কী?
জিয়া রহমান : বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের সংক্রমণ যেভাবে বাড়ছে, তাতে আতঙ্কের বিষয়টি খুবই স্বাভাবিক। ইতোমধ্যে প্রায় ২০০টি দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ হয়েছে। এতে ১০ লক্ষাধিক মানুষ সংক্রমিত হয়েছে এবং প্রাণ হারিয়েছে ৫৬ হাজারের বেশি মানুষ। যদিও সংক্রমিতদের মধ্যে মৃত্যুহার কম, কিন্তু এখন পর্যন্ত এ ভাইরাসের কোনো প্রতিষেধক আবিস্কার হয়নি। এর আগে প্লেগ বা কলেরায় সৃষ্ট মহামারির সময়ও মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছিল। আতঙ্কের বিষয়টি নতুন কিছু নয়। এটা ইতিহাসের ধারাবাহিকতা।
সমকাল : করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ও এর চিকিৎসা নিয়ে বিভিন্ন গুজব রটানো হচ্ছে। গুজব মোকাবিলায় করণীয় কী হতে পারে?
জিয়া রহমান : গুজবের দুটি দিক আমরা দেখতে পাই। প্রথমত, আমাদের মতো দেশগুলোয় শিক্ষার অভাব রয়েছে, সমাজে এখনও কুসংস্কার বিরাজমান। মানুষ এখনও ঝাড়ফুঁকে বিশ্বাস করছে। এ রকম সমাজে সহজেই যে কোনো ধরনের গুজব ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। সমাজের একটা বড় অংশ, বিশেষ করে যারা আর্থসামাজিকভাবে অনেক পিছিয়ে রয়েছে, তারা সহজেই গুজব দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, আমাদের সমাজে দুটি পক্ষ আছে, যারা সবসময় তাদের গায়েবি স্বার্থ হাসিল করতে চায়। তারা পৃথিবীব্যাপী সক্রিয় ছিল। আবার প্রতিটি মহামারির সময় ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলো বারবার এগুলোকে অস্বীকার করেছে, ছোট করে দেখেছে। তারা ধর্মীয় ফতোয়া দিয়ে বিভিন্ন বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। সমাজে আমরা এদের একটি চক্রের অশুভ আঁতাত দেখতে পাই। এ ধরনের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পক্ষগুলো প্রতিটি সংকট মুহূর্তে সরকারকে চাপে ফেলতে চায়।
সমকাল : বিদেশফেরত অধিকাংশ প্রবাসী হোম কোয়ারেন্টাইন মানেননি। এখনও অনেকেই মানছেন না। এর কারণ কী হতে পারে?
জিয়া রহমান : আমরা সুশৃঙ্খল জীবনযাপনে অভ্যস্ত নই। অনেকেই বিশ্বাস করেন তারা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হবেন না। সমাজে অন্যের ভালো থাকা বা সুস্থ থাকার বিষয়ে আমাদের কোনো চিন্তা থাকে না। এ ধরনের মানসিকতার ফলে তারা বিদেশ থেকে এসে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখেননি। এর পাশাপাশি আরেকটি বড় বিষয় হলো, এ দেশে কোনো প্রতিষ্ঠান স্বকীয়তা প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। এখানে পেশাদারিত্ব বা জবাবদিহিও নেই বললেই চলে। প্রথমদিকে যখন মানুষ বিদেশ থেকে আসছিল, তখন সে ধরনের কোনো প্রস্তুতি বা নির্দেশনা ছিল না। ফলে বিদেশফেরতরা নিজেদের মতো করে সর্বত্র ছড়িয়ে গেছে।
সমকাল : যারা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছেন বা যাদের মধ্যে এর উপসর্গ দেখা যাচ্ছে সমাজে তাদের অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এমনটি কেন হচ্ছে?
জিয়া রহমান : বিষয়টি খুবই দুর্ভাগ্যজনক। মূলত আমাদের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ, ব্যক্তির নিজের স্বার্থ চিন্তা করা বা নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকার প্রবণতা থেকে এ প্রবণতা তৈরি হয়েছে। বিশ্বব্যাপী পুঁজিবাদের যে বিষবাষ্প তা আমরা এ ক্ষেত্রে দেখতে পাচ্ছি। আবার হঠাৎ করে একটি বা দুটি জায়গায় কোয়ারেন্টাইন সেন্টার করা হচ্ছে। এগুলো পরিকল্পনামাফিক না হওয়ায় মানুষের মধ্যে আতঙ্কের বিষয়টি চলে আসে। এ ক্ষেত্রে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ও মিডিয়া যদি আরও সচেতনতামূলক প্রচার চালায় তাহলে তা ইতিবাচক হতে পারে।
সমকাল : পরিবার কীভাবে এই দুঃসময়ে করোনা আক্রান্তদের পাশে দাঁড়াতে পারে?
জিয়া রহমান : বর্তমানে সবাই ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে আছেন। আক্রান্তদের পাশে অবস্থান করার সুযোগ নেই। সেই ক্ষেত্রে পরিবারের খুব বেশি কিছু করার নেই। এরপরও আক্রান্তদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এবং তাদের মানসিকভাবে শক্ত রাখার কাজটা পরিবার করতে পারে।
সমকাল : আতঙ্ক বিরাজ করায় অন্য রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরাও হাসপাতালগুলোতে সেবাবঞ্চিত হচ্ছেন, কয়েকজন বিনা চিকিৎসায় মারাও গেছেন। এই আতঙ্ক দূরীকরণে কী করা যেতে পারে?
জিয়া রহমান : আমরা শুনেছি বহু হাসপাতাল রোগীদের সেবা দিচ্ছে না। সম্প্রতি একজন মুক্তিযোদ্ধা কয়েকটি হাসপাতালে ঘুরে ভর্তি হতে না পেরে বিনা চিকিৎসায় মারা গেছেন। বিষয়গুলো অমানবিক। যখন করোনা আক্রান্ত বা সাধারণ রোগীরা কোথাও চিকিৎসা করাতে পারবেন না, তখন পরিবারের অন্য সদস্যসহ প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনও আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়বেন। সাধারণ মানুষের জীবনরক্ষা ও আতঙ্ক দূর করতে হলে আমাদের একটা উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সরকারের উচিত হবে নজরদারি বৃদ্ধি করা। যারা স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছে না তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
সমকাল : জরুরি প্রয়োজনে বাইরে বের হয়ে প্রশাসনের তোপের মুখে পড়ছেন নাগরিকরা। এ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও অন্যান্য প্রশাসনের সদস্যের ভূমিকা কেমন হওয়া দরকার?
জিয়া রহমান : আমাদের মধ্যে ঔপনিবেশিক মনোভাব রয়ে গেছে। আমরা ক্ষমতা পেলে অনেক কিছু ভুলে যাই। তাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, তারা জনগণের অর্থে জনগণের জন্যই চাকরি করেন। সুতরাং জনগণকে উপেক্ষা করে কিছু করা চলে না। বঙ্গবন্ধু বারবার বিষয়টি বলে গেছেন। মানুষকে শোষণ করা বা বশে আনার ঔপনিবেশিক মনোভাব থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। মনে রাখতে হবে, এটি একটি স্বাধীন দেশ। বিশেষ মুহূর্তেও প্রয়োজনে মানুষকে বের হতে হবে। সরকার অবশ্য বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। কেউ বাড়াবাড়ি করলে দ্রুতই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
সমকাল : করোনা মোকাবিলায় সামাজিকভাবে আমরা কী কী প্রস্তুতি নিতে পারি?
জিয়া রহমান : করোনা প্রতিরোধে আমাদের আগাম প্রস্তুতি ছিল না। আমাদের তেমন অভিজ্ঞতা ছিল না। এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ বা প্রশিক্ষিত চিকিৎসক ও নার্স তেমন ছিল না। পিপিই সংকট ছিল। করোনা পরীক্ষার পর্যাপ্ত কিটও ছিল না। একটি মাত্র জায়গায় করোনাভাইরাস পরীক্ষা করা হতো। ধীরে ধীরে সরকার বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখেছে। সরকারি ছুটি ঘোষণা দিয়েছে। মানুষকে ঘরে থাকতে উৎসাহিত করেছে। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে অনেক এলাকায় দরিদ্রদের সহযোগিতা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে অনেক চিকিৎসককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। বেশ কয়েকটি শহরে করোনাভাইরাস পরীক্ষা চলছে। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে সরকার মুজিববর্ষ ও স্বাধীনতা দিবসের আনুষ্ঠানিকতা সংক্ষিপ্ত করেছে। সরকার সব দিক থেকে সাধ্যমতো চেষ্টা করছে। আমাদের উচিত হবে কোয়ারেন্টাইন মেনে চলা, পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা, গুজবে কান না দেওয়া এবং আতঙ্কিত না হওয়া।
সমকাল : করোনাভাইরাসের এই মহামারির মধ্যে আমাদের জন্য কোনো ইতিবাচক দিক আছে কি?
জিয়া রহমান : পরোক্ষভাবে করোনাভাইরাস আমাদের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। এটা আমাদের জন্য বড় সুযোগ করে দিয়েছে। করোনাভাইরাসের মধ্য দিয়ে আমরা দেখলাম, আমাদের স্বাস্থ্যসেবা খাত কতটা ভঙ্গুর। আমরা কখনোই জনগুরুত্বপূর্ণ এ খাতে গুরুত্ব দিইনি। ফলে স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দও হতো অল্প। এই অল্প বাজেটে ছিল দুর্নীতি-অনিয়মের থাবা। আমি প্রত্যাশা করি, বাংলাদেশ দ্রুতই এ সংকট কাটিয়ে উঠবে। এরপর নীতিনির্ধারকরা যদি এ বিষয়গুলোকে পরিকল্পনার মধ্যে নিয়ে আসতে পারেন, তাহলে এ সমাজব্যবস্থা একটি ইতিবাচক অবস্থানে পৌঁছে যাবে। আরেকটি বিষয় হলো, আমরা সচেতন হয়েছি। জীবনের ভয়ে হলেও কিন্তু মানুষ কোয়ারেন্টাইনের মতো বিষয়টি মানতে শুরু করেছে। আমাদের মতো সমাজব্যবস্থায় এটি একটি যথেষ্ট ভালো লক্ষণ। আমি মনে করি, প্রকৃতিগতভাবে একটা সুযোগ এসেছে সচেতন নাগরিক অভ্যাস গড়ে তোলার।
সমকাল : আমাদের সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।
জিয়া রহমান : সমকালের জন্য শুভকামনা।
