সমাজ
নাগরিকের মর্যাদা কতদূর...
নাহিদ হাসান
প্রকাশ: ০৫ এপ্রিল ২০২০ | ১২:৫০ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০
'আপনি চাকরি করেন, আপনার মাইনে দেন ওই গরিব কৃষক, আপনার মাইনে দেন ওই গরিব শ্রমিক। আপনার সংসার চলে ওই টাকায়, আমরা গাড়ি চড়ি ওই টাকায়। ওদের সম্মান করে কথা বলুন, ইজ্জত করে কথা বলুন। ওরাই মালিক, ওদের দ্বারা আপনার সংসার চলে।'- আমলাদের উদ্দেশে এই কথাগুলো বলেছিলেন বঙ্গবন্ধু, জনগণের 'শ্যাখ সাব'।
অথচ যশোরের মনিরামপুর, কক্সবাজার, কুড়িগ্রামে সর্বত্র জনগণকে অপমান করা হচ্ছে। অফিসারে মারে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও পেটায়। কারণ মাস্ক না থাকার মতো তুচ্ছ কারণে। যদিও মাস্ক কোনো কাজেই আসছে না।
কয়েক দিন আগে একজন সিভিল সার্জন মেয়ের বিয়ে সেরেছেন। খাইয়েছেন কয়েকশ' আত্মীয়কে। মেয়ররা দল বেঁধে কেউ হাত ধুচ্ছেন, কেউ ওষুধ স্প্রে করছেন। অন্যদিকে আকিজ গ্রুপের করোনা হাসপাতালের কাজ আটকে দিয়েছেন স্থানীয় নেতা। এখানে কেউ আসবেন না।
এ দেশের লাখ লাখ মানুষ রাস্তার ভরসায় চলেন। গৃহভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থা ধ্বংস করেছি বিদেশি পরামর্শে। প্লাস্টিক উৎপাদকরাই ক্ষমতায়, কুমোর-তাঁতিরা কাজহারা হয়েছেন সেই কবে। ফলে গ্রাম এখন কাঁচামালের জোগানদার মাত্র। কুটির শিল্প শেষ। যারা গার্মেন্টস থেকে, জুটমিল থেকে গ্রামে ফিরলেন তারা কী খাবেন? জেলাপ্রতি বরাদ্দ হয়েছে ১০০ টন চাল (৭১ ভাগ গরিবের জেলা কুড়িগ্রামে ইউনিয়নপ্রতি সোয়া টন)। এই মানুষদের সঙ্গে আমলা-সেপাইদের আচরণ কেমন হওয়া উচিত তাহলে? ভাত নেই, পেটানি আছে! স্বীকার করতে হবে, কিছু আমলা বা পুলিশ ব্যতিক্রম।
আমলা-সেনাদের নিয়ে ফেসবুকে পক্ষে-বিপক্ষে নানা মন্তব্য আসছে। কেউ বলছেন, 'এত বিশাল পরিমাণ শিক্ষিত সম্প্রদায় হলো কিন্তু মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হলো না কেন?' কেউ বলছেন, এদের নিয়োগের আগে অন্তত ছয় আন্তর্জাতিক সংস্থার অধীনে ম্যানার ও মূল্যবোধ শেখানোর ট্রেনিং দেওয়া উচিত।
২.
ইউরোপে নবজাগরণের পর আইনের শাসন তিনটি কথার ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়। এক. যে আইন সর্বজনীন কল্যাণ আনে, তাই উত্তম আইন; দুই. রাজা কোনো মানুষের অধীন নন, তবুও তিনি আইন ও সৃষ্টিকর্তার অধীন। কেননা রাজার ক্ষমতার উৎস আইন। মানে আইনের চোখে সবাই সমান। এমনকি রাজাও আইনের অধীন; তিন. রাজা এক প্রজার স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করে আরেক প্রজাকে অনুগ্রহ করতে পারেন না।
কিন্তু এই আইনের শাসন কেবল ইউরোপীয়দের বেলায় প্রযোজ্য বলে মনে করা হতো। রবার্ট ক্লাইভ থেকে সাহিত্যিক প্রধানমন্ত্রী চার্চিল পর্যন্ত তাই মনে করতেন। ক্লাইভ ব্রিটেনে গ্র্যাজুয়েটদের এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, আমি একজন ইংরেজ। আর একজন ইংরেজের সেই অধিকার আছে অসভ্য ভারতীয়দের শাসন করার। আর চার্চিল তো মনেই করতেন, ভারতীয়রা পশুর ধর্ম নিয়ে পশুসদৃশ জাতি।
বিখ্যাত দার্শনিক জেমস মিল। তিনি ১৮১০ সালে এডিনবার্গ রিভিউতে লেখেন, 'ইউরোপীয় সভ্যতা এত উচ্চ যে, বঙ্গে ব্রিটিশরা ক্ষমতার চূড়ান্ত অপব্যবহার করলেও প্রাচ্য স্বৈরতন্ত্রের শ্রেষ্ঠতম সদ্ব্যবহারের চেয়েও তা উত্তম।' কেউ কেউ তো এমনটাই বলেছেন, শাসিত হওয়ার অমর্যাদাবোধ আসলে একটি ইউরোপীয় অনুভূতি। এই ছিল ভারতে ব্রিটিশ শাসন ও আইনের ভিত্তি, যা ভারতীয়দের অমানুষ ও পশু কল্পনা করত। ফলে একজন ব্রিটিশ নাগরিকের সঙ্গে তার প্রধানমন্ত্রীর অধিকারবোধের ভেদ না থাকলেও দখলকৃত ভারতে 'নেটিভ' শব্দটি গালি ছিল। একজন চৌকিদারও প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হওয়ার ফলে জনগণকে মানুষ মনে করত না। এই যে থানায় পিটিয়ে বা ক্রসফায়ারে নাগরিককে হত্যা করা যায়, এটাই ভারতবাসীর জন্য ব্রিটিশ আইন। যে আইন ভারতবাসীকে শৃঙ্খলিত ও বন্দি করার জন্য নির্মিত। সেই আইন দিয়ে মুক্তির আশা কাঁঠালের আমসত্ত্বের মতোই।
রাজা রামমোহন রায় ১৮৫৮ সালের পরে ইংল্যান্ডে গিয়ে নিজেকে ব্রিটিশ প্রজা যে দাবি করেছিলেন, এটাই ছিল সেই মাজেজা। ১৮৫৮ সালের পরে কোম্পানি শাসনের অবসান ও অঙ্গরাজ্যের মর্যাদাপ্রাপ্তি ঘটলেও ব্রিটিশ নাগরিক অধিকার জোটেনি। বিশাল ভারত শাসিত হয়েছে একজন 'ভারত সচিব'-এর নিচের পদ 'ভাইসরয়' দ্বারা। যার আরেক নাম বড়লাট। এই বড়লাটই ছিলেন ভারত ভাগ্যবিধাতা।
যে আইন ভারতবাসীকে অমানুষ ও পশু কল্পনা করেছে, সেই আইনই আমরা সংবিধানে ১৫২(১) অনুচ্ছেদে 'ব্যাখ্যা' অংশে 'প্রচলিত আইন' নামে হালাল করে নিয়েছি। কলোনির নাগরিক অধিকার দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশে 'মানবিক মর্যাদা' প্রতিষ্ঠা চেয়েছি। ফলে ঔপনিবেশিক আইনে জন্ম নেওয়া আমলারা জনগণকে মারবেন-কাটবেন, এ আর আশ্চর্য কী! যতই জনগণের শেখ সাব আমলাদের হুঁশিয়ারি দেন- এটা ব্রিটিশ কলোনি না, পাকিস্তানি কলোনি না। বঙ্গবন্ধু, আপনার জনগণকে কেউ মানুষই মনে করে না আর।
রেল-নৌ, যোগাযোগ ও পরিবেশ উন্নয়ন গণকমিটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সভাপতি
[email protected]
