করোনা
মানবিক বিশ্বের খোঁজে বিষাক্ত ভাইরাস!
রাশেদা রওনক খান
প্রকাশ: ০৫ এপ্রিল ২০২০ | ১২:৫১ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০
বিশ্বের সর্বত্র রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে যারা আছেন, তাদের থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত সবাই যেন এক মরীচিকার পেছনে ছুটছে! এই অবিরত ছুটে চলায় নেই কোনো যতি চিহ্ন, নেই কোথাও ভাবনার অবসর। ভাবনাহীন, অবিরত এই পথচলায় নেই কোনো মানবিকতার ছোঁয়া। পৃথিবী উষ্ণ থেকে উষ্ণতর হচ্ছে, প্রকৃতি তার সব আভা হারিয়ে ফেলছে, মানুষের পাশে মানুষ না খেয়ে মারা যাচ্ছে, পরিবারের ভেতরে কিছু মানুষ অবহেলায় আত্মহত্যা করছে; তবুও মানুষ সেই মরীচিকার পেছনে পথচলা থামাচ্ছিল না! সেই মরীচিকা আসলে অর্থ উপার্জন আর ক্ষমতা লাভের। এই মরীচিকার পেছনে ছুটছে মানুষ, ছুটছে সমাজ ও রাষ্ট্র। আলোচনাটা শুরু করি যুক্তরাষ্ট্র দিয়েই।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাজনীতিবিদ নন, ধনকুবেরের ঘরে জন্ম নেওয়া ধনকুবের! তিনি জানেন, টাকা দিয়ে কীভাবে সব সমস্যার সমাধান করা যায়, তার বিভিন্ন সময়ের বক্তৃতায় এসব গল্প পাওয়া যাবে। নেট দুনিয়ার বদৌলতে আমরা দেখেছি, কীভাবে তার বাড়ি স্বর্ণমণ্ডিত করে সাজিয়ে রেখেছেন! মার্কিনিদের ধারণা, তিনি আসলে সমাজে শ্রেণিবৈষম্য তৈরির চূড়ান্ত উদাহরণ। সেই মানুষটি যখন পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী দেশের সরকারপ্রধান, সেখানে করোনা মোকাবিলা রোধে ব্যর্থতার এ ধরনের ভয়াবহতা দেখা স্বাভাবিক না অস্বাভাবিক, তা কেবল মার্কিনিরা বলতে পারবেন। অন্য সব সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বিষয়গুলো যে প্রক্রিয়ায় অগভীরভাবে পরিচালনা করতেন, সেভাবেই করোনা মোকাবিলা করতে গিয়ে এখন যুক্তরাষ্ট্র কী ধরনের হুমকির মধ্যে পড়েছে, তা স্পষ্ট। কী পরিমাণ জীবনের বিনিময়ে এই অবহেলার দাম চোকাতে হবে, তা এখনও বোঝা যাচ্ছে না। দু'দিন আগেও তার ভাবনা ছিল, ইস্টার উৎসবকে মাথায় রেখে বাজার উন্মুক্ত করে দেওয়া। যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিদিন মানুষ মারা যাচ্ছে, সেখানে পুঁজিবাজার উন্মুক্তের পক্ষে সেই দেশের রাষ্ট্রপ্রধান! এই আমাদের বর্তমান বিশ্ব।
ডিসেম্বর বাদই দিলাম। যদি জানুয়ারি মাস থেকেও আমেরিকা করোনার প্রকোপকে কেবল 'চায়নিজ সমস্যা' না ভাবত, তাহলে আজকে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো এতটা ভোগান্তির শিকার হতো না। ট্রাম্প তো কয়েকদিন আগেও এটিকে 'চায়নিজ ভাইরাস' বলে তামাশা করেছেন। এখন আমেরিকানদের কঠোর সমালোচনার মুখে পড়েছেন। তিনি দেশকে করোনার প্রকোপ থেকে রক্ষার জন্য কোনো ভালো উদ্যোগ নিতে পারেননি বলে প্রতিদিন ইন্টারনেটে ভাইরাল হচ্ছে তার সব বক্তব্য। কেবল বিরোধী দল ডেমোক্র্যাটদের সমালোচনার মুখে পড়েছেন তা নয়, এমনকি নিজ দলের সমালোচনাও শুনতে হচ্ছে তাকে। যদিও তাতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের খুব একটা আসে যায় বলে মনে হয় না। ট্রাম্পের প্রস্তুতি ও বক্তব্য নিয়ে রিপাবলিকানরা ব্যক্তিগত সমালোচনায় মেতে উঠলেও দলীয় পরিসরে তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু সন্দেহ থেকেই যায়,৩ নভেম্বর ভোটের দিন ট্রাম্প জয়ী হতে পারবে কিনা! প্রশ্ন উঠেছে, ধনী শ্বেতাঙ্গরাও কি মুখ ফিরিয়ে নেবে ট্রাম্প থেকে, যাদের ভোটে নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি? কারণ করোনা তো ধনী-দরিদ্র, সিটিজেন-ইমিগ্র্যান্ট কোনো বিভেদ করছে না! টাকার দম্ভে আর যাই হোক, মৃত্যুকে এড়ানো যাবে না, এই চির সত্য মানতে বোকা মানুষদের দ্বিধা কেন?
করোনাভাইরাস দেখতে ছোট হলেও বৃহৎ অনেক কিছু উন্মুক্ত করে দিয়েছে। সামরিকীকরণ, যুদ্ধ ও প্রতিটি দেশের রাজনৈতিক-অর্থনীতির ওপর যাদের এত নজরদারি সেই যুক্তরাষ্ট্রে এখন হাসপাতালে চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাবে মানুষ মরছে। উত্তরটা খুব সহজ, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা খাতে অবহেলা, উন্নাসিক আচরণ, বিপরীতে চরম পুঁজিবাদের হাতছানিতে করপোরেট কোম্পানির স্বার্থ আর যুদ্ধ অর্থনীতির প্রতি গভীর মমত্ববোধ। একই চিত্র ইংল্যান্ডেও। এমনকি পিছিয়ে নেই ইউরোপের বিভিন্ন দেশও। ইংল্যান্ডের নাগরিকরাও তুমুল সমালোচনা করছে তাদের সরকারকে। করোনায় যেদিন ব্রিটিশ স্বাস্থ্যমন্ত্রী আক্রান্ত হয়েছেন প্রায় মাস দেড়েক আগে, সেদিন থেকেও যদি কঠোর লকডাউনে যেত, হয়তো অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে থাকত। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার 'হার্ড ইমিউনিটি' তত্ত্বে বিশ্বাসী হয়ে ধীরে ধীরে এগোচ্ছিল। স্বাস্থ্য ব্যবস্থা কোণঠাসা হয়ে গেছে অন্যান্য পুঁজিবাদী উন্নয়ন খাতের ভিড়ে। এই পুঁজির ওপর ভিত্তি করে দেশের জিডিপি বাড়ছে, ধনীরা আরও ধনী হচ্ছে, ধনীদের হাতে সম্পদ পুঞ্জীভূত হচ্ছে, করপোরেট জৌলুস বাড়ছে আর সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যবস্থা, বাসস্থান, খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়গুলো রাষ্ট্রের দায়িত্ব থেকে যেন উধাও হয়ে যাচ্ছে! কীভাবে কর্ম পুঁজিবাদ আমাদের মানবিকতাবোধকে ধ্বংস করে দিচ্ছে, আজ বুঝি করোনাভাইরাস তাই জানান দিয়ে গেল।
বাংলাদেশও কিন্তু এই চিত্র থেকে খুব দূরে নয়! রাষ্ট্র, সরকার, সমাজ, পরিবার এমনকি ব্যক্তি মানুষ সবাই মুনাফার পেছনে উন্মাদ হয়ে ছুটছিল। যেন কেউ কারও দিকে তাকানোর সময়টুকু নেই। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র করোনাভাইরাস এই মরীচিকার পেছনে দৌড়ানো থেকে কিছু মুহূর্তের জন্য হলেও আমাদের থামিয়েছে। আপাত মনে হতে পারে, উন্নত বিশ্ব আর আমরা উন্নয়নশীল দেশ খুব বেশি ভিন্ন। না, এই করোনা আমাদের জানান দিয়ে দিল যে, বিশ্ব একটি অখণ্ড ব্যবস্থা। এই অখণ্ড ব্যবস্থায় আমরা যেমন চরম পুঁজিবাদী উন্নয়নকে প্রাধান্য দিচ্ছিলাম, তেমনই তাদের এই উন্নয়নের ফাঁপা জায়গাগুলো আজ উন্মুক্ত হলো, সেগুলো থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে।
জানি, আমাদের জনসংখ্যার তুলনায় লোকবল ও সম্পদ দুটিই খুব কম। কিন্তু সেটা আমরা চেষ্টা করলেই কাটিয়ে উঠতে পারি। আমাদের সেই চেষ্টাটা ফিরে আসুক, যেমন এসেছিল মুক্তিযুদ্ধের সময়। কীভাবে পশ্চিম পাকিস্তানের গুঁড়িয়ে দেওয়া একটি ভগ্নদশা নতুন রাষ্ট্রকে গড়ে তুলেছেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু, সেই চেষ্টা আজ আবারও করতে হবে দেশের অর্থনৈতিক চিত্র বদলের মধ্য দিয়ে।
শেষ কথা একটাই, আমেরিকা-ইংল্যান্ডের বর্তমান করুণ পরিস্থিতি থেকে আমাদের শিক্ষা নিতেই হবে! উন্নত দেশগুলো পুঁজিবাদের স্বার্থে করপোরেট কোম্পানি আর যুদ্ধ অর্থনীতির প্রতি গভীর মনোযোগের কারণে এই ভাইরাস প্রতিরোধে মনোযোগ দিতে ব্যর্থ হয়েছে। আমরা যেন ব্যর্থ না হই। আমাদের সম্বল এই সাধারণ মানুষদের জীবন। আমরা 'উন্নত' দেশগুলোর চোখে 'অনুন্নত' হতে পারি; কিন্তু তাদের তুলনায় আমাদের সাধারণ মানুষের প্রতি মমত্ব ও দায়িত্ববোধ অনেক- আজ প্রমাণের সময় এসেছে। সামাজিক-অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রের সব ধরনের সতর্কতাই এই মুহূর্তে আমাদের রক্ষা করতে পারে। ভালো থাকুক প্রিয় স্বদেশ, নিরাপদে থাকুক বাংলার সব মানুষ!
শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
