ঢাকা শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬

সমাজ

ঘরে-বাইরে : রবীন্দ্রনাথ ও করোনাকাল

ঘরে-বাইরে : রবীন্দ্রনাথ ও করোনাকাল
×

রাহমান নাসির উদ্দিন

প্রকাশ: ০৫ এপ্রিল ২০২০ | ১২:৫২ | আপডেট: ০৫ এপ্রিল ২০২০ | ১৪:১৯

বিশ্বায়নের প্রবল আকর্ষণ, ক্রমবর্ধমান পুঁজির তীব্র নেশা, ভোগবাদিতার অদম্য প্রবণতা এবং লাভালাভের অমানবিক হিসাব-নিকাশ মানুষকে ক্রমান্বয়ে ঘরের বাইরে নিয়ে গেছে। এখন বাহিরমুখো সে মানুষকে করোনাভাইরাসের ভয় দেখিয়ে ঘুরমুখো করার ক্লিনিক্যাল আহ্বান মানুষকে আদৌ ঘরের ভেতর আটকে রাখতে পারবে কিনা, সেটা বড় মুশকিল বটে! মিলিটারি দিয়ে সে মুশকিল আসান করাটাও বড় চ্যালেঞ্জ! ঘরমুখো মানুষকে 'ঘরকুনো' মানুষ বলে ভর্ৎসনা করা হয় যে সমাজে, সেখানে মানুষকে ঘরমুখো করার রাষ্ট্রীয় আদেশ বড় কঠিন ব্যাপার!

এটা বোধগম্য যে, করোনাভাইরাস যখন স্বদেশি-বিদেশি, প্রাচ্য-পাশ্চাত্য, ধনী-দরিদ্র, আশরাফ-আতরাফ, জাতপাত, আমির-ফকির আর ধর্মবর্ণের বাইরে নির্বিচারে মানুষের জীবন-ঘাতক হিসেবে পৃথিবীতে নাজিল হয়ে বেশুমার মৃত্যুর কাফেলা তৈরি করেছে, তখন করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ ঘোষণা ছাড়া মানব জাতির গত্যন্তর নেই। আর এ সর্বাত্মক যুদ্ধের অন্যতম যুদ্ধকৌশল হচ্ছে 'ঘরে থাকা', যাতে সামাজিক-শারীরিক সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা যায়। পৃথিবীতে এ পর্যন্ত যত যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে, তার প্রধানত কৌশল হচ্ছে- 'যার যা কিছু আছে, তা নিয়ে প্রস্তুত হওয়া' এবং ঘরের ভেতর বসে না থেকে নিজের সর্বস্ব দিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করা। কিন্তু করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের অন্যতম অস্ত্র হচ্ছে ঘরে থাকা এবং বাইরে বের না হওয়া। এ যেন শতবর্ষ আগে লেখা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'ঘরে-বাইরে' উপন্যাসের একবিংশ শতকীয় সংস্করণ। শতাব্দীকাল পরে এসে আমরা যেন 'ঘরে-বাইরে' উপন্যাসের একটি পুনর্পাঠ করছি। রাষ্ট্রীয় প্রেসক্রিপশনের ক্রিনিক্যাল পাঠ!

রবীন্দ্রনাথ 'ঘরে-বাইরে' উপন্যাস প্রথম গ্রন্থকারে প্রকাশ হয়েছিল ১৯১৬ সালে। উপন্যাসের নায়িক বিমলা 'ঘরে' এবং 'বাইরে' দুই ধরনের সম্পর্কের টানাপোড়েনে ছিলেন। 'ঘরে' স্বামী নিখিলেশের প্রতি বিমলার ছিল গভীর প্রেম আর 'বাইরে' বিপ্লবী সন্দীপের প্রতি ছিল তীব্র আকর্ষণ। এ যেন 'ঘরে' কলসিভরা জলও চায় আবার 'বাইরে' পুকুরে সাঁতারও কাটা চায়! 'ঘর' এবং 'বাইর' তখন কেবলই দুটি শুধু স্থানিক ব্যাপার হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সেটা হয়ে উঠেছে মানব-মানবীর ব্যক্তিগত এবং সমাজগত বিষয়ের যৌথ উপাদান ও উপাত্তের এক সুনিপুণ মেলবন্ধন। 'ঘরে-বাইরে' প্রকাশের এক শতাব্দীকাল পরে এ করোনাকালে এসেও আমরা 'ঘর' ও 'বাইর'কে দুটি মুখোমুখি সত্তা হিসেবে দাঁড়াতে দেখছি এবং উভয়ের মধ্যকার অদৃশ্য এক টানাপোড়েন আমাদের ব্যক্তি-মনস্তত্ত্ব এবং 'সামাজিক দূরত্ব' বজায় রাখার অন্তরালে সমাজ-মনস্তত্ত্বের মধ্যে। এখন আধুনিক মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতাবিরোধী অনুশীলন হিসেবে 'ঘরে থাকা'র কসরত বনাম বহুমাত্রিক জালে বাঁধা 'বাইরে'র তীব্র টান মানুষকে ফেলেছে চরম পরীক্ষায়।

'জীবনের মায়া' বলে একটা অদ্ভুত জিনিস আছে মানুষের চরিত্রে। করোনাভাইরাস সে জিনিসটাকেই পুঁজি করে মানুষকে 'ঘরে' বন্দি করে রাখছে। আবার 'জানমালের হেফাজত করা'র নামে 'জীবন বাঁচানোর তাগিদ' এবং দায়িত্ব বলে একটা রাষ্ট্রীয় বিষয় আছে, যার দোহাই দিয়ে মানুষের 'বাইর'কে রাষ্ট্র নিষিদ্ধ করছে। এ 'ঘরে-বাইরে'র দ্বৈরথে নিখিল বিশ্ব আজ রীতিমতো অচল হয়ে পড়েছে। কেননা এক দেশের সঙ্গে অন্য দেশের সংযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন। দেশের ভেতরও এক অঞ্চলের সঙ্গে অন্য অঞ্চল প্রায় বিচ্ছিন্ন, যাকে বলা হচ্ছে 'লকডাউন'। ব্যক্তি পর্যায়ে এ 'জীবনের মায়া' এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে 'জীবন বাঁচানোর তাগিদ' মানুষকে 'ঘরে' অন্তরীণ রাখতে বাধ্য করছে। কিন্তু 'বাইরে'র টান এত তীব্র যে, মানুষকে 'ঘরে' রাখতে রীতিমতো সশস্ত্র বাহিনীকে মাঠে নামাতে হয়েছে। মানুষকে জোর করে 'ঘরে' থাকতে বাধ্য করতে হচ্ছে। কেননা 'বাইর'-এর ডাক ভীষণ তীব্র, 'বাইর' অন্তহীন আকর্ষণীয় এবং 'বাইর' অতি মধুময়!

এ 'ঘর' ও 'বাইর' আবার ব্যক্তি ও শ্রেণিভেদে ভিন্ন। সমাজের ওপরতলার মানুষ যারা, তাদের কাছে 'বাইর' অনেক আকর্ষণীয়, অনেক লাভজনক এবং ভীষণভাবে ব্যবসা-সফল। 'ঘর' তাদের কাছে 'ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট' বা সাদা-কালো আর 'বাইর' সম্পূর্ণ রঙিন। তাই তারা 'ঘরে' থাকতে চায় না বরঞ্চ 'বাইরে' যেতে চায় এবং সম্পূর্ণ রঙিন জীবনে থাকতে চায়। কিন্তু যারা সমাজের নিচতলার মানুষ এবং যারা দিন এনে দিন খায়, তাদের কাছে ঘর-বাহির দুটিই এক। তাদের কাছে 'ঘর' এবং 'বাইর' দুটিই 'ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট'। কেননা, তাদের কাছে 'বাইর'ই 'ঘর' আর 'বাহির'ই জীবন। ঘরে তাদের আলো নেই; কিন্তু বাইরে আলো আছে; রাস্তার ল্যাম্পপোস্টেও ফ্রি আলো আছে। ঘরে তাদের ফ্যান বা শীতাতপ-নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র নেই; কিন্তু বাইরে ফ্রি দক্ষিণা হাওয়া আছে। ঘরে তাদের অন্ন নেই বা অন্নের সংস্থান নেই; কিন্তু বাহিরে অন্নের সংস্থান আছে। তাই সমাজের বিদ্যমান শ্রেণিভেদে 'ঘর' ও 'বাইর'-এর ভিন্ন ভিন্ন অর্থ আছে।

যেহেতু করোনাভাইরাস চরিত্রগতভাবে 'সাম্যবাদী' অর্থাৎ এটা ধনী-দরিদ্রের মধ্যে কোনো ফারাক করে না, সেহেতু সমাজে বিদ্যমান শ্রেণি-বৈষম্য, সামাজিক-অসমতা এবং অর্থনৈতিক-অসাম্য অনুযায়ী 'ঘর' ও 'বাইর' নির্ধারণ করা জরুরি। যেহেতু ধনীর 'ঘর' আর গরিবের 'ঘর' এক নয়, সেহেতু ধনীর 'বাইর' আর গরিবের 'বাইর'ও এক নয়। তাই ধনী যখন 'ঘরে' বসে (বাধ্য হয়ে থাকলেও!) যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা নিয়ে পিকনিকের আমেজে দিনাতিপাত করে, দরিদ্র তখন অনাহারে-অর্ধাহারে দিন গোজার করে। তাই গরিবকে 'বাইর' হতে হয়। কিন্তু 'বাইর' হওয়ার 'অপরাধে' কানমলা, লাঠির বাড়ি, অকথ্য গালাগাল এবং কান ধরে উঠবস করার মতো অপমান সহ্য করেও তাকে 'বাইরে' যেতে হয়। শখে নয়, পেটের দায়ে। বাইরের হাতে হাত পাততে হয় বেঁচে থাকার জন্য। যে জীবনকে বাঁচানোর জন্য আমরা দরিদ্র মানুষকে ঘরে থাকার সবক দিচ্ছি, ঘরে থাকার কারণে সে জীবন অনাহারে-অর্ধাহারে আদতে আমরা আরও বড় ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিচ্ছি কিনা, সেটা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। তাকে বাঁচানোর নামে প্রকারান্তরে মারার ব্যবস্থা করছি কিনা, সেটাও বিবেচনায় থাকা জরুরি। তাই তো শ্রমজীবী মানুষের অনেককে গণপরিসরে বলতে শুনি, 'করোনা নয়, না খেতে পেয়ে মরে যাব'।

অতএব, হোলসেল 'ঘরে-বাইরে' ওষুধ শ্রেণি-পেশা নির্বিশেষে চাপিয়ে না দিয়ে, সমাজের নিচের তলার মানুষ যেন আরও নিচে না চলে যায়, আমরা যেন সেদিকে সচেতন-খেয়াল রাখি। কারণ বেচারারা এমনিতেই নিচে পড়ে আছে, তাদের 'ঘরে' রাখার নামে যেন আরও নিচে না নামাই। 'বাইরে' না যাওয়ার চাপে তাদেরকে যেন আবার অনাহারে-অর্ধাহারে মৃত্যুর মুখে ঠেলে না দিই।

শতবর্ষ আগে লেখা রবীন্দ্রনাথের 'ঘরে-বাইরে' উপন্যাসে 'ঘর' ও 'বাইর'-এর যে সুনির্দিষ্ট অর্থ ছিল, সেটা ছিল মানবিক সম্পর্কের এবং স্বদেশি আন্দোলনে জাতীয় রাজনীতির দ্বৈরথ; কিন্তু শতবর্ষ পরে এ করোনাকালের 'ঘর' ও 'বাইর' অর্থ হচ্ছে জীবন বাঁচানোর এবং মানুষকে বাঁচানোর তাগিদ ও দায়িত্বশীলতা। বিশেষ করে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত নিচতলার মানুষকে করোনাভাইরাস এবং অনাহার-অর্ধাহার থেকে বাঁচানোর দর্শন দিয়ে আমরা যেন 'ঘরে-বাইরে'কে পাঠ করি। কেননা আমাদের মনে রাখা জরুরি যে, সমাজের নিচতলা আছে বলেই আমরা ওপরতলায় বাস করি।

অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় 

আরও পড়ুন

×