সমাজ
কাঙালের হকে রাক্ষসের থাবা
দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু
প্রকাশ: ১৭ এপ্রিল ২০২০ | ১৩:৩৯ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০
করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে বড় একটি অংশ মানুষের আয়-রোজগারের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। এক শ্রেণির মানুষের খাদ্য সংকটও প্রকট হয়ে উঠেছে। বিদ্যমান বাস্তবতায় সরকার হতদরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য নানা রকম কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। ওএমএসে ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রি, নগদ আর্থিক সহায়তার মতো জনকল্যাণমুখী কর্মসূচি সরকার হাতে নিলেও এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় কোথাও কোথাও ভেসে উঠেছে লুটপাট কিংবা আত্মসাতের চিত্র। ওএমএসের চাল বেরুচ্ছে সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীল অসাধুদের ঘরের মেঝে ফুঁড়ে; গোপন আস্তানার বেষ্টনী ভেঙে। বলবানদের পকেটস্থ হচ্ছে অর্থ। এরই মধ্যে কয়েকশ' বস্তা চাল দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে উদ্ধার করেছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। অর্থ আত্মসাতের দায়ে জনপ্রতিনিধি (চেয়ারম্যান-মেম্বার) কাউকে কাউকে বরখাস্ত ও আটকের খবরও সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। কাঙালের ধন চুরির এমন অপকাণ্ডের উপাখ্যান আমাদের সমাজে নতুন কিছু নয়। বরং কখনও কখনও এই চিত্র এতটাই উৎকট হয়ে উঠেছে, তাতে সেই প্রচলিত প্রবাদটিই সামনে এসেছে- 'চোর না শোনে ধর্মের কাহিনী।'
সরকারিভাবে বরাদ্দ চাল আত্মসাতের সচিত্র প্রতিবেদন এই করোনা সংকটকালে বলতে গেলে নিত্যই সংবাদমাধ্যমের অনেকাংশ জুড়ে থাকছে। লকডাউন চলাকালে ক্ষুধার্তদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ ও স্বল্পমূল্যে চাল বিক্রির সরকারি কর্মসূচি বাস্তবায়নে দায়িত্বশীল অসাধু-দুর্বৃত্তদের কারণে কীভাবে মূল লক্ষ্য ভেস্তে যাচ্ছে, এরই খণ্ড খণ্ড নজির অহরহ মিলছে। বলা যায়, এই খণ্ড খণ্ড চিত্রটাই যেন সামগ্রিকভাবে অখণ্ড। খোদ রাজধানীতেও থেমে নেই এই অপকর্ম। পত্রিকান্তরে প্রকাশ, ঢাকায় হতদরিদ্ররা কাঙ্ক্ষিত ত্রাণ পাচ্ছেন না। আবার ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম চালাতে গিয়ে অনেক কাউন্সিলর টাকা আত্মসাৎ করে ফেলছেন। বিস্ময়কর হলো, করোনা দুর্যোগেও চাল চুরি, অর্থ আত্মসাৎ বন্ধ হচ্ছে না! এটা তো অসত্য নয় যে, শুধু আমাদের দেশেই নয়, বিশ্বের সিংহভাগ মানুষ এখন প্রাণ বাঁচানোর শঙ্কায় অধিকতর শঙ্কিত। অনেক মানুষের মনে মৃত্যুভয় দেখা দিয়েছে। এমতাবস্থায়ও কাঙালের ধনে রাক্ষসরা থাবা বসাচ্ছে। ওরা ক্ষমতাবান কিংবা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় আশ্রিত দুর্বৃত্ত। কোনো কোনো সংসদ সদস্য নাকি প্রকাশ্যেই তাদের পক্ষাবলম্বন করেছেন! টিসিবির ভোজ্যতেলের শতাধিক বোতল মিলেছে ব্যবসায়ীর বক্সখাটের ভেতরে! তাদের নীতিজ্ঞান বা রুচিজ্ঞান ইত্যাদি নিয়ে না হয় প্রশ্ন না-ই তুললাম। কিন্তু এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর বারবার উচ্চারিত হুঁশিয়ারিও এদের টনক নড়াতে পারছে না- এটিই বিস্ময়ের। তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায়, এদের শিকড়-বাকড় কতটা ছড়ানো কিংবা কতটা গভীরে প্রোথিত? তাদের শক্তি-সাহসের উৎসটাই বা কী?
সাধুবেশে পাকা চোরের দল এ দেশে স্তরে স্তরে রয়েছে। এই চোর চক্র অর্থাৎ 'চাটার দল' সম্পর্কে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের খেদোক্তি সচেতন সবারই জানা। 'চাটার দল' সব সময়ই ছিল, এখনও আছে। বরং বলা যায়, এরা এখন অভিনব কৌশল অবলম্বন করে আরও শাখা-প্রশাখা ছড়িয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সেই কবে তার কবিতায় লিখে গেছেন- 'এ জগতে, হায়, সেই বেশি চায় আছে যার ভূরি ভূরি-/ রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি।' এই কাব্য পঙ্ক্তির চিরন্তনতা যে সর্বকালীন বিদ্যমান বাস্তবতা- ফের তাই প্রমাণ করে। আমাদের অভিজ্ঞতায় আছে, সরকারের অথবা জনসম্পত্তি বা সম্পদ লুটপাট কিংবা আত্মসাৎ তারাই করেছে, যারা বটবৃক্ষের ছায়াতলে থাকে। এই বটবৃক্ষ হচ্ছে রাজনীতির নামে অপরাজনীতির ধারক-বাহকরা। অপরাজনীতির ক্ষমতাবানরা (এরা আবার সব সময়ই হয়ে থাকে ক্ষমতাসীন মহলের অংশীজন) নিজের হীনস্বার্থ চরিতার্থ করতে দুর্বৃত্তদের আশকারা দেয়, লালন-পালন করে। আমাদের অভিজ্ঞতায় এও আছে, এই দুর্বৃত্তরাই ক্ষমতাসীনদের শত্রু হয়ে দাঁড়ায় শেষ পর্যন্ত এবং এও আমরা অনেকে জানি, এই দুর্বৃত্তরা মোটেও অচেনা নয়। বহিস্কার আর নামমাত্র সাজায় এদের কিচ্ছু হয় না। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে এরাও রং পাল্টায়। আরও একটি বিষয় উল্লেখ্য, এই দুর্যোগ-দুর্বিপাকে সরকার-প্রশাসন, সামাজিক শক্তির প্রতিনিধিরা মাঠে নেমে মানুষের কল্যাণে কাজ করছেন। ব্যবসায়ীরাও বাড়িয়েছেন সহায়তার হাত। ত্রাণ দিচ্ছেন, নানা রকম মানবিক সহায়তা করছেন। কিন্তু রাজনৈতিক দলের ক'জন নেতাকে মাঠে দেখা যাচ্ছে? অধিকাংশ সংসদ সদস্যের ভূমিকাই বা কী এই দুর্যোগে? সুরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে কি এ সময়ে তাদের মাঠে নামা কিংবা জনগণের পাশে দাঁড়ানো উচিত ছিল না?
প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং শেষ পর্যন্ত ত্রাণ চুরি ও ওএমএসে কারচুপির উৎকটতা পর্যবেক্ষণ করে প্রশাসনের দায়িত্বশীল ও অন্য সংশ্নিষ্টদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে বলেছেন, 'ত্রাণ চুরি করলে মোবাইল কোর্টে বিচার'। প্রধানমন্ত্রীর এমন ঘোষণার পরও কিন্তু অপকাণ্ড ঘটেছে। এসব অপকাণ্ডের হোতারা সংক্রামক ব্যাধির মতো। এদের বিনাশ এত সহজে হয় না। যখন এদের পালা শেষ হয় তখন আবার এদেরই অনুসরণ করে উত্তরসূরিরা। এই খেলা আজকের নতুন নয়; যুগের পর যুগ ধরে চলে আসা ভুক্তভোগীদের নিয়ে জীবন বৈরিতার এ এক নিষ্ঠুর খেলা। ত্রাণ বিতরণে সমন্বয়হীনতা, ত্রাণদানের নামে অনেকেরই ফটোসেশন, শ্রমজীবী কিংবা দিন আনা দিন খাওয়া মানুষদের নিয়ে নানা রকম অপ্রীতিকর কর্মকাণ্ডের প্রতিচিত্রও আমাদের সামনে কম নয়। বিদ্যুৎকেন্দ্রে বালিশ কেনার নামে, কোনো কোনো অফিসে আপ্যায়নের নামে এক হাজার টাকার নাশতার বিল এক লাখ টাকা করা, অফিসের পর্দা কেনার নামে কোটি কোটি টাকা তছরুপ ইত্যাদি ঘটনা সরকারের ঊর্ধ্বতন দায়িত্বশীলদের মাধ্যমে সংঘটিত হওয়ার নজির আমাদের সামনে কম না থাকলেও দৃষ্টান্তযোগ্য প্রতিকারচিত্র কতটা পুষ্ট- এমন প্রশ্নের উত্তর প্রীতিকর নয়। বড়রা যেখানে এমন দুস্কর্ম করে পার পেয়ে যান কিংবা বছরের পর বছর চলে গেলেও তাদের বিচার শেষ হয় না; সেখানে চুনোপুঁটিরা তো উৎসাহিত হবেই।
আমরা জানি, অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের 'শূন্য সহিষ্ণুতা'র অঙ্গীকার রয়েছে। চাল চোর, দুর্যোগকালীন সহায়তার টাকা আত্মসাৎকারী কিংবা অসাধু-নীতিহীন-ভ্রষ্ট সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এরা সবাই এক কাতারে বসবাসকারী। এদের শিকড়-বাকড় উপড়ে ফেলতে হলে চালাতে হবে সাঁড়াশি অভিযান। কালক্ষেপণ না করে নিতে হবে যথাযথ দৃষ্টান্তযোগ্য আইনানুগ ব্যবস্থা। ব্যবস্থা উত্তম করতে না পারলে অবস্থা ভালোর আশা দুরাশারই নামান্তর। তাই হাত দিতে হবে উৎসে। নির্মোহ অবস্থান নিয়ে গোড়ায় দৃষ্টি না দিলে বহিস্কার কিংবা খণ্ডকালীন সাজার মতো টোটকা দাওয়াই দিয়ে সুফল মিলবে না। ব্যাধি বা অসুখটা গুরুতর, তাই চিকিৎসাও হতে হবে সে রকমই। রাঘব-বোয়ালদের ধরুন, চুনোপুঁটিরা এমনিতেই জালে আটকা পড়বে। রাক্ষস-খোক্ষসদের এ দেশের জনসমাজে সদম্ভ বিচরণ তো নতুন কিছু নয়। রাজনীতির ছত্রছায়ায় থেকে যেসব বলবান পরগাছার জন্ম হচ্ছে, সেই বৃক্ষের শিকড় উপড়ে ফেলতে না পারলে কীটদষ্টরা জন্মাবেই। অতএব, অনিয়ম-দুর্নীতি যদি নিয়ন্ত্রণ করতে হয়; ওইসব ব্যক্তিকে স্পর্শ করতে হবে, যারা নিজেদের আইনের ঊর্ধ্বে বলে ভাবছেন। মনে রাখা দরকার, জাল ফেলে বড় মাছ ধরতে চাইলে তার সঙ্গে চুনোপুঁটিও জালে উঠে আসে। রুই-কাতলার দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে রাখলে বা রাখতে বাধ্য করা হলে কাঙ্ক্ষিত ফল লাভ সুদূর পরাহতই থেকে যাবে।
লেখক ও সাংবাদিক
[email protected]
