ট্রাম্পের ব্যর্থতার দায় হু`র ঘাড়ে!
মার্টিন ম্যাককি
প্রকাশ: ১৭ এপ্রিল ২০২০ | ১৩:৪০ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০
বিশ্বব্যাপী একুশ লক্ষাধিক মানুষের মধ্যে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে দেড় লাখ মানুষ মৃত্যুবরণ করেছেন। করোনা মহামারির এই পরিস্থিতিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে (হু) আর্থিক সহায়তা বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তির প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন ট্রাম্পের জন্য নতুন কিছু নয়। ২০১৭ সালে তিনি ইউনেস্কো ও প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেন। পরের বছর তিনি ইরান পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে আসেন। ট্রাম্পের এ ধরনের সিদ্ধান্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বাইরে নিয়ে যাচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে বেশ কিছু আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুমোদনকারী দেশগুলোর তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। এত কিছুর পরও বিশ্বনেতারা লোক দেখানো সমালোচনা করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রেখেছেন। নিজেদের স্বার্থসংশ্নিষ্ট থাকলেই কেবল নেতারা ট্রাম্পের বিষয়ে মুখ খুলতে চান। তবে মহামারির এ সময় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় ট্রাম্পের আর্থিক সহায়তা বন্ধের ঘোষণার সমালোচনা করেছেন আয়ারল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিমন কভেনি। বিশ্বব্যাপী মহামারি চলাকালে এ সিদ্ধান্তকে 'অরক্ষণীয় সিদ্ধান্ত' বলেছেন তিনি। তার মতে, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক দুর্বল জনগোষ্ঠী বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ওপর নির্ভর করে। আর এ সময়ে আর্থিক সহায়তা কমিয়ে দেওয়া সত্যিই দুঃখজনক। জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাইকো মাআস এ বিষয়ে টুইট করেছেন। তিনি বলেছেন, 'দোষারোপ করে কোনো লাভ নেই। ভাইরাস কোনো সীমানা মানছে না।'
বিশ্বব্যাপী মহামারি মোকাবিলায় যে সংগঠনটি সামনে থেকে কাজ করছে, কেন তার ক্ষতিসাধনের চেষ্টা করেছেন? মহামারিতে ৩০ হাজারেরও বেশি আমেরিকানের মৃত্যু হয়েছে- এমন যুক্তিতে ট্রাম্প বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে দোষারোপ করছেন, যা অযৌক্তিক। তাহলে দোষারোপের আর কি কোনো কারণ আছে? উত্তর খুবই সহজ। অভিযোগ উঠেছে, করোনা মোকাবিলায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থ হয়েছেন ট্রাম্প। নির্বাচনের আগে এই অভিযোগ থেকে মুক্তি পেতে ট্রাম্প দোষারোপ করার জন্য কাউকে খুঁজছিলেন। আর শেষ পর্যন্ত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে বলির পাঁঠা বানালেন। হোয়াইট হাউস তার নিয়মিত ব্রিফিংয়ে লকডাউন পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে আমেরিকান জনগণের ত্রাণকর্তা বলে প্রচারণা চালাচ্ছে। হোয়াইট হাউস নিজেদের ব্যর্থতার দোষ অন্যের ওপর চাপাচ্ছে। ট্রাম্প প্রথমে মেক্সিকো, পরে চীন এবং সবশেষ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ওপর দায় চাপাল। কোনো ধরনের তথ্য-উপাত্ত যাচাই না করেই ট্রাম্প তার সিদ্ধান্তকে ন্যায্য দাবি করেছেন। তিনি দাবি করেছেন- মহামারির প্রাথমিক পর্যায়ে হু'র মারাত্মক অব্যবস্থাপনা ছিল। তার কারণেই যুক্তরাষ্ট্র যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণে বিলম্ব করে। অবশ্য ২৩ জানুয়ারি হু ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বিষয়ে সতর্ক করেছিল। এর ছয় দিন পর কয়েক হাজার আমেরিকানের মৃত্যুর আশঙ্কার কথা জানিয়ে ট্রাম্পকে সতর্ক করেছিলেন তার অর্থনৈতিক উপদেষ্টা। অবশ্য ট্রাম্প তখন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও তার অর্থনৈতিক উপদেষ্টার সতর্কবাণীকে উপেক্ষা করেছিলেন।
আর্থিক সহায়তা বন্ধের সিদ্ধান্তটি নিশ্চিতভাবেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশ হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সংস্থাটির মূল বাজেটের ৪০ শতাংশে ভূমিকা রাখে। যদিও এটি মোট ব্যয়ের ২০ শতাংশ মাত্র। স্বেচ্ছাসেবী ৮০ শতাংশেরও বেশি অবদান রাখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সংস্থাটির বাজেটে যুক্তরাষ্ট্রের এই সহায়তা কংগ্রেস কর্তৃক অনুমোদিত। এগুলো ট্রাম্প আইনিভাবে আটকাতে পারবেন কিনা, তা অনিশ্চিত। তবে তিনি ফেডারেল এজেন্সিগুলোর দ্বারা প্রদত্ত অর্থ প্রদান বন্ধ করতে পারেন। কভিড-১৯ মহামারি বিশ্বনেতা ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর দুর্বলতা স্পষ্ট করেছে। এর আগে আমরা দেখেছি, জাইর বলসোনারো অ্যামাজনকে জ্বালিয়ে বিশ্বকে হুমকির মুখে ফেলেছিল। ডোনাল্ড ট্রাম্প করোনা মহামারির প্রতিক্রিয়ায় যে সিদ্ধান্ত নিলেন, তাতে বিশ্ববাসী হতাশ। এ পরিস্থিতিতে এমন সিদ্ধান্তের কোনো প্রয়োজন ছিল না।
অধ্যাপক, লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিন ও উপদেষ্টা, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা
গার্ডিয়ান থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর , মো. সাইফুল ইসলাম
