ঢাকা রোববার, ০৫ জুলাই ২০২৬

কালের আয়নায়

পাল্টে যাবে মানবতার চেহারা

পাল্টে যাবে মানবতার চেহারা
×

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী

প্রকাশ: ১৭ এপ্রিল ২০২০ | ১৩:৪১ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০

করোনা করুণা করো- এ ছাড়া এখন আর কী লিখব! মানবতা এখন করোনার বন্দিশালায় বন্দি। সভ্যতা অচল। বাংলাদেশের সবুজ অরণ্যে এখনও কি সবুজ পাতা গজায়? গাছে গাছে পাখি গান গায়? নদীতে জোয়ার আসে? দূর প্রবাসে থাকি। এসব কিছু জানি না। কিন্তু লন্ডনে শীত কেটে গেছে। সারাদিন এত অফুরন্ত সোনালি রোদ আমি কখনও দেখিনি। সকালে ঘুম ভাঙে পাখির গানে। গাছে সবুজ পাতা আবার গজাতে শুরু করেছে।

কিন্তু এই আনন্দ উপভোগ করার কেউ নেই। আগে স্প্রিং এলে সারা লন্ডন শহর আনন্দে উত্তাল হয়ে উঠত। কেউ থাকত না ঘরে। নারীরাও পার্কে শুয়ে থাকত। রৌদ্রস্নান করত। এখন লন্ডনে এই সোনালি সকাল থেকে হলুদ বিকেল সব যেন চোখের ভ্রান্তি। শূন্যতা ও আতঙ্ক ভরা মন দিয়ে মানুষ দেখছে সব। সাড়া দিতে পারছে না।

চীন, আমেরিকা, জাপান, অস্ট্রেলিয়া- সব দেশের বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করছেন এই মৃত্যুদূতের প্রতিষেধক বের করার। এ সময় স্বত্ব-তত্ত্বের বিবাদ ভুলে সব দেশের উচিত এই মৃত্যুদূতকে রোখার কাজে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এগিয়ে আসা। তার বদলে শুনছি সিরিয়ায় আমেরিকার সামরিক তৎপরতা এবং উপমহাদেশে পাকিস্তানি সৈন্যের গোলাবর্ষণে তিনজন ভারতীয় সৈন্যের মৃত্যুর খবর। এই যুদ্ধবাজরা মানবতার অংশ নয়। মৃত্যু-ব্যবসায়ীর সেবাদাস।

আজকের বিশ্বের এই অবস্থার কথা ভেবেই কি রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, 'সকাতরে ওই কাঁদিছে সকলে, শোনো শোনো পিতা।' কিন্তু সকলের ক্রন্দন শুনবে আজ কোন পিতা? পিতা-পুত্র, বধূ-কন্যা সবাই তো আজ গৃহবন্দি। মৃত্যুর নিয়ত করাল আঘাতে সেই গৃহের দেয়াল সতত স্পন্দিত। ভেতরে শঙ্কিত প্রাণের নীরব কান্না। ভারতের একটি খবর পেলেও বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয়নি। স্বামীর করোনা হয়েছে। ৩০ বছরের বিবাহিত জীবনে স্ত্রী কখনও স্বামীকে ছাড়া শোয়নি। তিনি এবার স্বেচ্ছায় স্বামীকে ছেড়ে আইসোলেশনে চলে গেছেন। রুগ্‌ণ স্বামীর সেবাযত্নের জন্য তার সঙ্গে থাকতে রাজি হননি। লন্ডনে এক মা তার সাত মাসের শিশুসন্তানকে হাসপাতালে ফেলে পালিয়ে গেছেন। বাংলাদেশে এক নববধূ তার স্বামীর বাড়িতে যেতে রাজি হননি করোনার ভয়ে। এই খবরগুলো কি সঠিক, না সোশ্যাল মিডিয়ার গালগল্প? যদি সত্য হয় তাহলে বলতে হবে, মানব সভ্যতা এক টার্নিং পয়েন্টে এসে দাঁড়িয়েছে। সমাজ বদলাচ্ছে।

সবকিছুরই শেষ আছে। কভিড-১৯ এরও শেষ আছে। হয়তো এই মৃত্যু-টানেল অতি দীর্ঘ। তাই এই টানেলের একেবারে শেষে কী আছে তা আমরা দেখতেই পাই না। কোন মানবসমাজ ও মানব সভ্যতা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে, তা আমরা জানি না এবং দেখতে পাচ্ছি না। করোনা বর্তমান মানবসমাজের অর্ধাংশও (যা সম্ভব হবে মনে করি না) যদি গ্রাস করে, তাহলেও মানবসমাজ ধ্বংস হবে না। তবে এই সমাজ কী রূপ নেবে, তার সভ্যতা কী চেহারা ধারণ করবে, তা বলা মুশকিল। তবে এই ধ্বংসের মধ্য দিয়ে মানবসমাজ ও মানব সভ্যতা যে এক নতুন রূপ ধারণ করবে- তাতে সন্দেহ নেই।

বদলে যাবে সব দেশের মানবসমাজের চলাফেরা, ধরন-ধারণ। ইংল্যান্ডে শেকহ্যান্ড বা দু'জনের দেখা হলে পরস্পরের হস্তমর্দন প্রাচীনকাল থেকে প্রচলিত প্রথা। এখন অধিকাংশ দেশে এই প্রথা ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু করোনার কী দাপট! এই দাপটে ইংল্যান্ড ও সারা ইউরোপে এমনকি আমেরিকাতেও এই শেকহ্যান্ড নিষিদ্ধ হয়ে গেছে। কারণ, হাতের সংস্পর্শ দ্বারা করোনা সংক্রমিত হতে পারে। বহু প্রাচীনকালে শেকহ্যান্ড প্রথার আবির্ভাব। ইংল্যান্ডের মানুষ তখনও সভ্য হয়নি। রাস্তায় একজন আরেকজনের দেখা পেলেই পরস্পরকে আক্রমণ করত। যে বলশালী, সে দুর্বল জনের সঙ্গে থাকা টাকা-পয়সা সবকিছু লুট করত। তখনকার ইংল্যান্ডের রাজা বাধ্য হয়ে এক আদেশ জারি করলেন। তার দেশের নাগরিকরা পরস্পরের সঙ্গে দেখা হলেই একজন অপরজনের ডান হাত চেপে ধরবে, যাতে কেউ কাউকে আক্রমণ করতে না পারে। পরস্পরের হস্ত ধারণের এই বন্য প্রথাটি পরে সভ্য মানুষের সভ্য আচরণ হয়ে দাঁড়ায়। ইংল্যান্ড থেকে ইউরোপ- তারপর এশিয়া, আফ্রিকা ও আমেরিকায় ইউরোপের সাম্রাজ্য বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রথাটি বিস্তার লাভ করে এবং আধুনিক জগতের সভ্য আচরণ হয়ে দাঁড়ায়।

এই সামাজিক প্রথার উচ্ছেদ ঘটার কোনো কারণই ঘটত না যদি করোনা না আসত। এখন ইংল্যান্ডের মতো সফল দেশে হাতের সংস্পর্শ দ্বারা যাতে করোনায় সংক্রমণ না বাড়ে, সে জন্য শেকহ্যান্ড কার্যত নিষিদ্ধ। এখন লন্ডনে শাদা নাগরিকরাও পরস্পরের দেখা পেলে দূরত্ব বজায় রেখে ভারতীয় নমস্কারের কায়দায় অথবা মুসলমানদের সালাম দেওয়ার কায়দায় প্রীতি জ্ঞাপন করেন। করোনা-পরবর্তী সমাজে যদি এই শেকহ্যান্ডের প্রথাটা একেবারেই উঠে যায় তাহলে বিস্ময়ের কিছু থাকবে কি?

করোনায় চলমান সমাজ গতি হারিয়েছে। এই গতি আবার কী চরিত্রে ফিরে আসবে, কে জানে! দীর্ঘকাল ঘরবন্দি থাকায় সমাজের চেহারা আরও পাল্টাবে। গৃহবন্দি থাকা শুরু হওয়ার সময় অনেক দম্পতি ও প্রেমিক-প্রেমিকা খুশি হয়েছিলেন। এক সমীক্ষায় দেখা যায়, স্বামীকে প্রেমিককে স্ত্রী ও প্রেমিকা বলেছেন, তোমাকে তো কখনও ঘরে পেতাম না। সারাদিন অফিস, ব্যবসা, ক্লাব নিয়ে ব্যস্ত থাকতে। এবার ভালো হয়েছে। তোমাকে কাছে পাব। তুমি ঘরে থাকবে। এই মধুর অবস্থাটা বেশিদিন টেকেনি। দিনের পর দিন ঘরে একসঙ্গে থাকায় নিকটজনের সম্পর্ক বেশিদিন টেকেনি। সামান্য টুকিটাকি বিষয় নিয়েও স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া লাগছে। সমীক্ষা বলছে, করোনার আমলে ডিভোর্সের সংখ্যা বাড়ছে।

সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, পশ্চিমা দেশগুলোতে ম্যারেজ জনপ্রিয়তা ফিরে পেতে যাচ্ছিল। করোনা-পরবর্তী অবস্থায় ম্যারেজের বদলে পার্টনার নিয়ে থাকার প্রবণতা নারী-পুরুষ উভয়ের মধ্যে বাড়বে। তার প্রভাব পড়বে এশিয়ান সমাজেও। ছোট ও মাঝারি দোকানপাট উঠে যাবে। বড় শপিংমল ও বিক্রয়কেন্দ্রেরও সংখ্যা কমবে। মানুষের অনলাইনে ক্রয়-বিক্রয়ের অভ্যাস বাড়ছে। প্রিন্টিং মিডিয়ার জন্য বড় দুঃসময় আসছে। পাঠকরা অনলাইন মিডিয়ার দিকে ঝুঁকবে।

স্কুল-কলেজের সংখ্যা কমবে। মানুষ যেমন ঘরে বসে অনলাইনে অফিসের কাজকর্ম করবে, একইভাবে শিক্ষার্থীরাও ঘরে বসে লেখাপড়া শিখবে। বাণিজ্য ও ব্যবসায়ের ক্ষেত্রেও একই কথা। অনলাইন ব্যাংকিং প্রসারিত হবে। সব ব্যাংক থেকেই কর্মী ছাঁটাই হবে। চালকবিহীন মোটরগাড়ির মতো চালকবিহীন ট্রেন, বাস, এমনকি প্লেন চলাচল করবে। মানুষকে বিভিন্ন সার্ভিস দেওয়া- যেমন হাসপাতালের নার্স, হোটেলের বয়-বেয়ারা ইত্যাদির জন্য রোবট তৈরি এবং তার ব্যবহার করোনা-পরবর্তী মানবসমাজে ব্যাপক হারে বাড়বে। এক কথায়, জনশক্তির ব্যবহার বারোআনা লুপ্ত হয়ে যন্ত্রশক্তির একাধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হবে। পৃথিবীর বিশাল জনশক্তি অব্যবহার্য হয়ে পড়বে। যন্ত্রশক্তি তার স্থান পুরোপুরি দখল করবে।

বিশাল ও বেকার জনশক্তিকে রাষ্ট্রের সোশ্যাল সিকিউরিটির আওতায় আনতে হবে এবং তাদের জন্য প্রণোদনামূলক সামাজিক কাজের ব্যবস্থা করতে হবে। আর তা যদি করতে হয়, আমেরিকার মতো উন্নত ধনবাদী রাষ্ট্রকেও সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির সঙ্গে অনেকটা আপস করতে হবে। যেটা তারা ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক মন্দার সময় করেছিল। আমেরিকা নিজের অর্থনীতি পুনর্গঠনে এত ব্যস্ত থাকবে যে, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর মার্শাল প্ল্যানের সাহায্য দ্বারা ইউরোপের অর্থনীতি আবার চাঙা করে তুলেছিল, এবার তা পারবে না। ফলে ইউরোপে বর্তমান রাজনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তন অনিবার্য।

আমি এই নিবন্ধে করোনা-উত্তর মানবসমাজে ব্যক্তিগত ও সামাজিক আচরণের ব্যাপক পরিবর্তনের কথা বলেছি। কিন্তু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের চেহারা সম্পর্কে সমাজবিজ্ঞানীরা যেখানে কোনো স্পষ্ট ধারণা দিতে পারেননি, সেখানে আমি কী আর দেব? তবে এটা সত্য, গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম ও মার্কেট ইকোনমিকে যদি টিকে থাকতে হয়, তাহলে সমাজতন্ত্রের সঙ্গে তাকে আপস করতেই হবে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য তা আরও প্রযোজ্য।

উদাহরণ হিসেবে বাংলাদেশের কথা বলা যায়। বাংলাদেশ করোনা দমনে আরও সফল হতো যদি সরকারের মন্ত্রীরা দক্ষ ও অভিজ্ঞ হতেন এবং জনসমাজ সম্পূর্ণ শিক্ষিত ও সচেতন হতো। গরিবদের খেটে খেতে হয়, তাতে না হয় তাদের পক্ষে সরকারের নির্দেশ মেনে ঘরে থাকা সম্ভব নয়। কিন্তু যারা দিনমজুর নয়, তারাও কি সরকারের নির্দেশ মেনে চলছে? বুধবার (১৫ এপ্রিল) ঢাকার চ্যানেল আইয়ের খবরে দেখি, রাজধানীর পান্থপথে সামরিক বাহিনীর লোকেরা লোক চলাচল নিয়ন্ত্রণ করছে। প্রত্যেক মানুষ সরকারি নির্দেশে পরস্পরের কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলাচল করছে। কিন্তু যেই সামরিক বাহিনীর লোকেরা সরে যাচ্ছে, অমনি মানুষ সরকারি নির্দেশ অমান্য করে পরস্পরের কাছাকাছি হয়ে চলাফেরা করছে। অথচ এ কথা তারা ভাবছে না যে, এর ফলে তারাই বিপদগ্রস্ত হবে। করোনা দ্রুত সম্প্রসারিত হবে।

উন্নয়নশীল দেশগুলোতে করোনাভাইরাস দমনে সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় বাধা জনসংখ্যার এক বিশাল অংশ অশিক্ষিত, নিজেদের বিপদ বুঝতে অসচেতন এবং সরকারি নির্দেশ মেনে চলে না। করোনার মতো বিশ্ব-মহামারি দমনে অবশ্যই বাংলাদেশের হাতে উন্নত দেশগুলোর মতো সুযোগ-সুবিধা নেই। কিন্তু সীমিত সুযোগ-সুবিধা নিয়েই হাসিনা সরকার সাহস নিয়ে জনগণের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। এই জাতীয় বিপর্যয়ে বিএনপির উচিত অযথা সরকারের সমালোচনা না করে সরকারের পাশে এসে দাঁড়ানো। ইউরোপের দেশগুলোতে বিরোধী দল তাই করছে। বাংলাদেশে বিএনপি যদি তা না করে প্রত্যেক ব্যাপারে সরকারের খুঁত ধরতে থাকে, তা হবে প্রতিবেশীর গুদামে আগুন লাগলে পোড়া আলু খাওয়ার আশায় বসে থাকার মতো। তাতে বিএনপিরই মুখ পুড়বে।

সামনে যে সমাজ পরিবর্তনের বিশাল ধাক্কা আসছে, তা মোকাবিলা করতে হলে পতনশীল বাজার অর্থনীতি মেনে চললে বাংলাদেশ অবশ্যই ভুল করবে। তাকে সমাজতান্ত্রিক ধাঁচের অর্থনীতির সাহায্য অবশ্যই গ্রহণ করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইতোমধ্যে তার ভাষণে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়েছেন এবং করোনা-উত্তর বিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনর্গঠনে তার সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা বলেছেন। তার এই পরিকল্পনা সফল হবে যদি দুর্নীতির ইঁদুর সব লুটে-পুটে না খায়। আমাদের সুশীল সমাজ ও অর্থনীতিবিদদের উচিত, আরও দেশদরদি হওয়া। জাতীয় দুর্যোগের এই মুহূর্তে সরকারের পাশে দাঁড়ানো। সমাজ ও সভ্যতার যে বিরাট পরিবর্তন আসছে, এই মহাবিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে তার উপযোগী অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও সামাজিক প্রণোদনা সৃষ্টির কথা তারা ভাববেন। না হলে এই পরিবর্তনের স্রোতে তারাও ভেসে যাবেন।

লন্ডন, ১৬ এপ্রিল, বৃহস্পতিবার, ২০২০

আরও পড়ুন

×