রাজনৈতিক আগাছায় নিড়ানির বিকল্প নেই
হারুন হাবীব
প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০১৯ | ১২:৫৬
বাংলাদেশ এখন পরিচালিত হচ্ছে বাংলাদেশপন্থি বা মুক্তিযুদ্ধপন্থিদের
হাতে। মূলত তাদের হাতেই জাতীয় স্বাধীনতার হূতগৌরব ফিরে এসেছে, প্রভূত
অবকাঠামোগত উন্নয়ন ঘটেছে, সামাজিক ও আর্থিক উন্নয়ন সূচকগুলো ওপরে উঠেছে, যা
বাংলাদেশকে একটি দ্রুত বিকাশমান দেশে পরিণত করেছে। নিঃসন্দেহে এগুলো বড়
অগ্রযাত্রা; কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই অগ্রযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব
লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দুর্নীতি, রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত কিছু ব্যক্তির
দুর্বৃত্তায়নের ভয়ঙ্কর সব উদাহরণ উদ্ঘাটিত হচ্ছে। আদর্শিক রাজনীতি কলঙ্কিত
হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, কিছু অসৎ ব্যক্তির কাছে রাজনীতি হয়ে উঠছে বিত্তবৈভব
অর্জনের হাতিয়ার। রাজনীতির এই সংস্কৃতি কেবল দুর্ভাগ্যজনকই নয়, চরম
অকল্যাণকর। এই দুষ্ট প্রবণতার বিরুদ্ধে সম্প্রতি অভিযান পরিচালিত হয়েছে।
এমনকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে ক্ষমতাসীন দলের সহযোগী সংগঠনের
নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা গ্রহণ চলছে। একে একটি প্রয়োজনীয় শুদ্ধি
অভিযান বলা যেতে পারে। এই অভিযানে সমাজের ব্যাপক সংখ্যক মানুষের সমর্থন
আছে। কারণ তারা জানে, এই দুষ্টধারা সমাজের ও রাষ্ট্রের মঙ্গল আনতে পারে না।
দেশে যে উন্নয়ন হয়েছে বা হচ্ছে, তা উল্লেখযোগ্য। সামরিক ও আধা-সামরিক
সরকারগুলো রাজনীতিকে কলুষিত করেছিল। নতুন প্রজন্মকে নষ্ট রাজনীতির দিকে
ধাবিত করেছিল। সে ধারা আজ নেই, যা প্রার্থিত ছিল তাই ঘটছে আজ বাংলাদেশে।
বাংলাদেশ মাথা তোলে দাঁড়াচ্ছে। এরপরও প্রশ্ন থাকে- উন্নয়নের সঙ্গে সুস্থ
ধারার রাজনীতিচর্চা তাল মিলিয়ে কি চলতে পারছে? যদি পারত তাহলে যাদের
দুর্নীতি-অপকর্মের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালিত হচ্ছে, অবৈধ ক্যাসিনো বা
সীমাহীন টাকা উদ্ধার করা হচ্ছে, তারা সবাই ক্ষমতার রাজনীতির সঙ্গে জড়িত
থাকে কীভাবে? আগেকার দিনে রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করেছেন সমাজের বিত্তশালীরা।
সময়ের স্রোতে সে ধারা বিলীন হয়েছে। অবশ্যই এটা ভালো লক্ষণ যে, রাজনীতি এখন
সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায়, কেবল বিত্তশালী বা প্রতিষ্ঠিত পরিবারের কুক্ষিগত
নয়। কিন্তু যে ধারার রাজনীতি বিকশিত হচ্ছে, তাতেও কি চিন্তিত না হওয়ার কারণ
থাকে না? নিরপেক্ষ চোখে দেখলে বোঝা যাবে- দুর্বৃত্তায়নের থাবা শহর থেকে
গ্রাম পর্যন্ত। আমরা যেন এক নষ্ট সমাজের দিকে ধাবিত হওয়ার প্রতিযোগিতা শুরু
করেছি। এর থেকে পরিত্রাণ দরকার।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র পরিচালিত হয় রাজনীতিবিদদের হাতে। কাজেই এই
দুর্বৃত্তায়ন বন্ধে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন 'পলিটিক্যাল কমিটমেন্ট' বা
রাজনৈতিক সদিচ্ছা। এই সদিচ্ছা ছাড়া দুর্বৃত্তায়ন বন্ধ করা অসম্ভব। হয়তো
কলকারখানা, দালানকোঠা, রাস্তাঘাট, অবকাঠামো তৈরি হবে; কিন্তু সমাজের মৌল
ভিত, মূল্যবোধ বা নৈতিকতার ভিত ধ্বংস হবে। যে মানবিক সমাজ গঠনের প্রত্যাশা
নিয়ে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ গঠিত হয়েছিল, সে প্রত্যাশা ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে।
রাজনীতিবিদরাই রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক। কাজেই সততা, নীতি, আদর্শ নিয়ে তাদের
সংযমের পথে চলতে হবে, নৈতিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে; অন্যথায়
রাষ্ট্রের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের পচন থামানো যাবে না।
গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত ব্যাপক সংখ্যক তরুণ রাজনীতিতে এসেছে, এসেছে
মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত থেকে। তাদের সামনে সৎ ও আত্মত্যাগের দৃষ্টান্ত তুলে
ধরতে হবে, যাতে সবাই বোঝে রাজনীতি মানে অর্থ উপার্জন নয়, রাজনীতি গণমানুষের
কল্যাণে আদর্শের হাতিয়ার। ধানের মধ্যে চিটা থাকবে- এতে বিস্মিত হওয়ার কিছু
নেই। কিন্তু বেশিরভাগ ধান চিটা হয়ে গেলে সব অর্জন অর্থহীন হয়ে পড়ে।
প্রধানমন্ত্রী প্রকাশ্যেই দল ও সহযোগী সংগঠনের দুষ্ট অংশ দমনের চেষ্টা
করছেন। শুদ্ধি অভিযান শুরু করেছেন। এই অভিযান সফল হোক- এটাই প্রত্যাশা।
যে
দল দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকে, তাতে অনুপ্রবেশ ঘটে। হালুয়া-রুটির ভাগ পেতে
অনেকেই ছুটে আসেন ক্ষমতার বলয়ে। বলা হচ্ছে, এই অনুপ্রবেশকারীরাই
দুর্বৃত্তায়ন ঘটিয়ে চলেছে। হয়তো এর গুরুত্ব অস্বীকার করা যাবে না। এই
অনুপ্রবেশকারীরা প্রশ্রয় পাচ্ছে কারও না কারও হাতে। উত্তর খুঁজতে হবে- কেন
এই সুযোগসন্ধানীদের ঠেকানো যায়নি! জবাব পেতে হবে- কেন এতদিন ব্যবস্থা নেওয়া
যায়নি, কে বা কাদের প্রশ্রয়ে ভয়ঙ্কর সব অঘটন ঘটে গেছে? কাজেই সংস্কার
প্রয়োজন। অন্যথায় বিপর্যয় ঠেকানো যাবে না।
বলা বাহুল্য, দেশের অগ্রযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে দুর্বৃত্তায়ন। এই
প্রবণতা রাজনীতিতে অর্থ আর পেশিশক্তির প্রভাব বাড়িয়ে দিয়েছে। রাজনীতি কেবলই
স্লোগানসর্বস্ব হয়ে উঠছে। আদর্শ, জনকল্যাণ, আত্মত্যাগ ও নৈতিকতাবোধ ক্রমেই
দুর্বল হচ্ছে। রাজনীতি হয়ে উঠছে অর্থ-বৈভবের হাতিয়ার। একমাত্র রাজনৈতিক
সততাই পারে সুস্থ রাজনীতি ধারাকে রক্ষা করতে। অতএব প্রধানমন্ত্রী যে
ব্যবস্থা নিয়েছেন, তা প্রশংসনীয়। প্রতিটি দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দল এগিয়ে
এলে, দেশের বৃহত্তর স্বার্থে আন্তরিকভাবে ঝাঁপিয়ে পড়লে এই ধারা অবশ্যই বন্ধ
হবে। মনে রাখতে হবে, এই দুর্বৃত্তরা রাজনৈতিক আগাছা, যা পরিস্কার করা ছাড়া
দ্বিতীয় কোনো পথ নেই। কাজেই শুদ্ধি অভিযানের রশিটা শক্ত করে ধরে রাখতে
হবে। 'জিরো টলারেন্স' নীতি চালু রাখতে হবে। প্রশাসনকে রাজনৈতিক দলমতের
ঊর্ধ্বে থেকে নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে হবে। সরকারি দলসহ যারাই অপরাধ করুক,
তাদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। আইন বিভাগ ও বিচার বিভাগ যেন আলাদাভাবে কাজ
করতে পারে, সে লক্ষ্যে সঠিক উদ্যোগ নিতে হবে। মনে রাখতে হবে- রাজনীতির
সুস্থ ধারা প্রবর্তন করা না গেলে সমাজের শঙ্কা বাড়বে।
রাজনৈতিক দুর্বৃত্তরা কখনও ছিল না- এ কথা বলার সুযোগ নেই। কখনও কম, কখনও
বেশি। সামরিক আমলগুলোতে পরিকল্পিতভাবে রাজনীতিতে অর্থের সমাগম ঘটিয়ে সুস্থ
ধারার রাজনীতিকে কলুষিত করা হয়েছে। নির্বাচনী গণতন্ত্রের আমলে তা নতুন
মাত্রা লাভ করেছে। আদর্শিক কর্মী হওয়ার বদলে মাস্তানরা রাজনৈতিক দল ও
নির্বাচনী রাজনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। ফলে দুর্বৃত্তায়ন বেড়েছে;
তবে রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে এর সমাধান অসম্ভব নয়। কাজেই জাতীয় স্বার্থ ও
জনপ্রত্যাশাকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে স্থান দিতে হবে। দুর্নীতি ও ক্ষমতার
অপব্যবহার, সম্পদ আহরণের প্রবণতা যেন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ না করে, সেদিকে
নজর রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে, রাজনীতির দুর্বৃত্তায়নে হিংসার রাজনীতি
প্রবর্তিত হয়। এ ধারা আত্মসংহারক।
বাংলাদেশের কোথায় কী হচ্ছে, কোথায় কে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে, তার
পুরো খবর রাখা প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে সম্ভব নয়। কাজেই রাষ্ট্রীয় ও
সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর শক্তিশালী ভূমিকা দরকার। ভাবলে স্তম্ভিত হতে
হয়, নতুন কমিটি তৈরি হওয়া মাত্র এক বছরের মাথায় ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতাদের
নিয়ে কী সব ভয়ঙ্কর খবর প্রকাশিত হলো! যে ছাত্রলীগ পাকিস্তানি স্বৈরশাসনের
বিরুদ্ধে বাঙালির জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে চরম ত্যাগ ও তিতিক্ষায় এগিয়ে
নিয়েছে, যারা মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান প্রাণশক্তি হিসেবে আবির্ভূত
হয়েছে, সেই সংগঠনের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের এই অধঃপতন বড় শঙ্কার কারণ। শুধু
ছাত্রদের কথাই বলি কেন- শিক্ষকদেরও একটি অংশ নৈতিকতাবিবর্জিত হয়েছে।
জনপ্রশাসনের একটি অংশেও নষ্ট প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এসব শুভ লক্ষণ নয়।
অতএব নৈতিকতার প্রবর্তন জরুরি, নৈতিকতাসম্পন্ন রাজনীতি ছাড়া রাজনীতি
অর্থহীন।
রাজনীতিবিদরা সমাজ নিয়ন্ত্রণ ও রাষ্ট্র পরিচালনা করেন। কাজেই সৎ, আদর্শবান
রাজনীতিবিদের সংখ্যা কমে এলে দুর্গতির শেষ থাকে না। বরাবরই দেখা গেছে-
দখলবাজি, চাঁদাবাজি, ভেজাল মেশানো, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডসহ যত রকমের অপরাধ
আছে, তার সঙ্গে এমন সব ব্যক্তি জড়িত থাকেন, যারা কোনো না কোনোভাবে
ক্ষমতাসীন দলের ছত্রছায়ায় আছেন। এদের সম্পর্কে সজাগ দৃষ্টি না রাখলে
রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যর্থ হবে। মনে রাখতে হবে, এই দুর্বৃত্তরা লেবাস বদলায়। এরা
আদর্শের কারণে রাজনীতি করে না। অতএব এদের দমন জরুরি। এত কিছুর পরও আমি মনে
করি, সৎ ও আদর্শবান রাজনীতিবিদের সংখ্যা শেষ হয়ে যায়নি। তবে তাদের বিচরণ
স্তিমিত হয়েছে। প্রয়োজন সৎ ও আদর্শের দৃষ্টান্ত স্থাপন করা। প্রয়োজন
নৈতিকতাসম্পন্ন রাজনীতির আকাল দূর করা। কাজেই দেশের স্বার্থে, উন্নয়ন ধরে
রাখার স্বার্থে রাজনীতি থেকে দুর্বৃত্তদের বিদায় করা জরুরি। অন্যথায় যে
নীতি ও আদর্শের শক্তিতে বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, যে রাষ্ট্রের
স্বপ্ন দেখেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, দেখেছিল
মুক্তিযুদ্ধের লাখো শহীদ, সে রাষ্ট্রের অর্জন প্রশ্নবিদ্ধ হবে। আর এই সুযোগ
গ্রহণ করবে সাম্প্রদায়িক ও বাংলাদেশবিরোধী শক্তি।
মুক্তিযোদ্ধা, লেখক ও সাংবাদিক
- বিষয় :
- রাজনীতি
- হারুন হাবীব

