নির্বাচন কমিশনে কার স্বার্থে কোন্দল
বদিউল আলম মজুমদার
প্রকাশ: ২৬ নভেম্বর ২০১৯ | ১৩:০৩
আমাদের নির্বাচন কমিশনে কোন্দল নতুন নয়। সাম্প্রতিক অতীতে এটিএম শামসুল
হুদা কমিশন ছাড়া আগে-পরের নির্বাচন কমিশনগুলোর কোনোটি কোন্দল ছাড়া ছিল বলে
মনে পড়ে না। বর্তমান নির্বাচন কমিশন গঠন হওয়ার পর থেকে প্রধান নির্বাচন
কমিশনার কে এম নূরুল হুদা ও একজন কমিশনার মাহবুব তালুকদারের মধ্যে নানা
বিষয়ে মতবিরোধ প্রকাশ্য হয়ে আসছিল। অন্য তিন কমিশনার রফিকুল ইসলাম, কবিতা
খানম ও শাহাদাত হোসেন চৌধুরী অবশ্য সেসব মতবিরোধ বা কোন্দলের ক্ষেত্রে
বরাবরই প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পক্ষ নিয়েছেন। সেদিক থেকে এবারের কোন্দল
খানিকটা ব্যতিক্রম। এবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার বনাম চার নির্বাচন
কমিশনার। সিইসির সঙ্গে যোগ দিয়েছেন নির্বাচন কমিশন সচিব।
এবারের কোন্দলের বিষয় নির্বাচন কমিশনে কর্মচারী নিয়োগ সংক্রান্ত। সম্প্রতি
নির্বাচন কমিশন প্রায় সাড়ে তিনশ' কর্মচারী নিয়োগ দেয়। এই নিয়োগের লিখিত
পরীক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে। জানা যাচ্ছে, নিয়োগ
কার্যক্রম পরিচালনায় সব মিলিয়ে চার কোটি টাকার বেশি খরচ হয়েছে। চার কমিশনার
এই নিয়োগ প্রক্রিয়া, সেখানকার ব্যয় ও বরাদ্দ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
সংবাদমাধ্যমে দেখে যা মনে হচ্ছে, নিয়োগের উপযোগিতা নয়, বরং তারা এখতিয়ার
নিয়ে ক্ষুব্ধ। তারা অভিযোগ করছেন, প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে
নির্বাচন কমিশন সচিব মিলে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন কমিশন
সদস্যদের সঙ্গে কোনোরূপ আলাপ-আলোচনা ছাড়াই। এতে করে ক্ষুব্ধ হয়ে তারা
প্রধান নির্বাচন কমিশনার বরাবর একটি 'ইউনোট' পেশ করেছেন।
আমার মনে আছে, কমিশনের সদস্যদের কোনোরূপ মতামত না নিয়েই
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি করার কারণে ২০১৭ সালে আমরা একটি কোন্দল
দেখেছিলাম। সেই দ্বন্দ্বে একপক্ষে ছিলেন কমিশনার মাহবুব তালুকদার;
অন্যপক্ষে ছিলেন নির্বাচন কমিশনের তৎকালীন সচিব। সেই দ্বন্দ্বে অন্য তিন
কমিশনার নীরব ছিলেন। আর প্রধান নির্বাচন কমিশনার ছিলেন সচিবের পক্ষে। আমার
এও মনে আছে, তখনই প্রধান নির্বাচন কমিশনার অত্যন্ত ক্ষুব্ধভাবেই বলেছিলেন
যে, এসব ব্যাপারে কমিশনারদের কোনো এখতিয়ার নেই। তিনি দৃশ্যত মাহবুব
তালুকদার ছাড়া বাকি কমিশনারদের জানিয়েই ওই বদলি করেছিলেন। এখন দেখা যাচ্ছে,
বাকি তিন কমিশনারও প্রধান নির্বাচন কমিশনারের 'কক্ষচ্যুত' হয়েছেন। 
নির্বাচন কমিশনে কোন্দল বা দ্বন্দ্ব এক অর্থে কাঙ্ক্ষিত। কারণ নীতিগত নানা
মত, দ্বিমত এমনকি বিরোধের মধ্য দিয়ে নীতিগত বিভিন্ন বিষয় স্পষ্ট হয়। কিন্তু
আমাদের নির্বাচন কমিশনে যে দ্বন্দ্ব বা বিরোধ দেখা যাচ্ছে, তা কোনোভাবেই
কাঙ্ক্ষিত হতে পারে না। এই দ্বন্দ্ব মূলত ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। আরও ভেঙে বললে,
ব্যক্তিগত ক্ষমতা চর্চার দ্বন্দ্ব। এতে নীতিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক উৎকর্ষের
স্থান নেই। আমরা দেখব, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে কমিশনে কোনো
দ্বন্দ্ব ছিল না। ওই নির্বাচনে আরপিও বা গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ষষ্ঠ
অনুচ্ছেদের ধারা ৭৩ থেকে ৭৯ ধারায় বর্ণিত প্রায় সব নির্বাচনী অপরাধ সংঘটিত
হলেও নির্বাচন কমিশন নির্লিপ্তই ছিল। এসব নির্বাচনী অপরাধে নির্বাচনী
কর্মকর্তা বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা জড়িত ছিলেন। তাদের
অনিয়মের কারণে জনগণ ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের
তাতে কিছু যায় আসেনি। প্রধান ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার এসব নিয়ে
উচ্চবাচ্য করেননি।
স্বীকার করতে হবে, একমাত্র ব্যতিক্রম ছিলেন মাহবুব তালুকদার। তিনি
মাঝেমধ্যে প্রতিবাদ করেছেন। অন্যান্য কমিশনার মানুষের ভোটাধিকার, জনস্বার্থ
রক্ষায় উদ্যোগী হওয়া দূরে থাক, মৌখিক প্রতিবাদও করেননি। আরও বিস্ময়ের
ব্যাপার, তারা এ ব্যাপারে সাফাইও গেয়েছিলেন। তারা বলেছেন, একাদশ জাতীয় সংসদ
নির্বাচন অত্যন্ত সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এখানেই শেষ নয়। পরবর্তীকালে
যখন কেন্দ্রভিত্তিক তথ্য পর্যালোচনায় ২১৩টি কেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়ার তথ্য
উঠে এসেছিল, তখন তারা প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে সুর মিলিয়ে নানা
হাস্যকর ব্যাখ্যা দিয়েছেন। যেমন নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম বলেছিলেন-
যেহেতু গৃহীত ভোটের মধ্যে বাতিল ভোটও ছিল; তাই এটাকে 'শতভাগ' বলা যায় না!
আমরা দেখেছি, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও পরবর্তীকালে উপজেলা পরিষদ
নির্বাচন উপলক্ষে সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণে বক্তৃতার
নামে প্রধান নির্বাচন কমিশনার, কমিশনাররা ও সচিবসহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা
বিপুল 'সম্মানী' নিয়েছেন। যদিও এভাবে সম্মানী নেওয়া অনেকের কাছে অসম্মানের।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে- তাদের কেউ কেউ প্রশিক্ষণে বক্তৃতা না দিয়েই সম্মানী গ্রহণ করেছেন। তখন এ নিয়ে নির্বাচন কমিশনে আমরা কোনো দ্বিমত বা কোন্দল দেখিনি।
এই কোন্দলের উদ্দেশ্য যাই হোক, কারণ অবশ্য সঙ্গত। নির্বাচন কমিশন সচিব তো
বটেই, প্রধান নির্বাচন কমিশনারই-বা কমিশনের সদস্যদের এড়িয়ে কাজ করবেন কেন?
এমন অবস্থান আইন ও বিধিবিধানের পরিপন্থি। আমাদের সংবিধানের ১১৮/২ অনুচ্ছেদে
বলা হয়েছে- সিইসি কমিশনের সভাপতি। এর মর্মার্থ হচ্ছে, কমিশন সম্মিলিতভাবে
কাজ করবে। কমিশন একটি যৌথ সত্তা। সে ক্ষেত্রে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের
ভূমিকা হবে সমন্বয়কের মতো। কোনোভাবেই তার একক কর্তৃত্ব খাটানো চলবে না।
কমিশনারদের সঙ্গে পরামর্শ করেই তিনি কমিশনকে নেতৃত্ব দেবেন।
হতে পারে, নিয়োগ সংক্রান্ত প্রক্রিয়া নির্বাচন কমিশন সচিবই সম্পন্ন করবেন
প্রধান নির্বাহী হিসেবে। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত আসতে হবে প্রধান নির্বাচন
কমিশনার ও অন্য কমিশনারদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত সভায় উপস্থাপিত মতামতের
ভিত্তিতে। চার কমিশনারকে বাদ দিয়ে যেভাবে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা
হয়েছে, তা কোনো যুক্তিতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এও ভুলে যাওয়া চলবে না,
নিয়োগ প্রক্রিয়া মানে নির্বাচন কমিশনের ব্যয় বৃদ্ধির প্রশ্ন। এই
ব্যয়-সংক্রান্ত
বিষয়ে কমিশনের সদস্যদের মতামত নিতে হবে না?
চার কমিশনারের দেওয়া 'ইউনোট' সম্পর্কে সংবাদমাধ্যমে যে প্রতিবেদন প্রকাশ
হয়েছে, তাতে তারা বলছেন- কমিশন সচিবালয়ের জন্য বাজেটে নির্ধারিত খাতে
বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয় অনুমোদনের ব্যাপারে কমিশনই চূড়ান্ত কর্তৃপক্ষ।
বরাদ্দের অর্থ যেসব খাতে ব্যয় হবে, তা কমিশনের এখতিয়ারভুক্ত এবং কমিশনের
অনুমোদন প্রয়োজন। মাঝেমধ্যে নির্বাচন প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত কোনো কোনো বিষয়
উপস্থাপন করা হলেও অন্য কোনো আর্থিক বিষয়ে কমিশনকে অবগত করা হয় না। এটা
'নির্বাচন কমিশন আইন-২০০৯'-এর ১৬ নম্বর ধারার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
আমিও চার কমিশনারের ইউনোটের এই ভাষ্যের সঙ্গে একমত। কিন্তু তারা যেভাবে
শুধু নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরে নিজেদের এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, সে
ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করি। নির্বাচন কমিশন আইন বা জনপ্রতিনিধিত্ব আদেশে
তাদের যেসব এখতিয়ার দেওয়া হয়েছে, সেগুলো নিয়ে প্রশ্ন তোলেন না কেন?
নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদারের মতো অন্য তিন কমিশনারও যদি একাদশ জাতীয়
সংসদ নির্বাচনে অনিয়ম, কারচুপি, জালিয়াতি নিয়ে সোচ্চার হতেন, তাহলে এতটা
অগ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয়তো জাতিকে হজম করতে হতো না। আর আজকে তাদের এসব
খুঁটিনাটি বিষয়েও গুরুত্বহীন হয়ে বসে থাকতে হতো না।
এই লেখার শিরোনামে প্রশ্ন তুলেছি, নির্বাচন কমিশন কার স্বার্থে কোন্দল বা
কাজ করছে? তাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব হচ্ছে জনস্বার্থে কাজ করা। নাগরিকরা
যাতে তাদের ভোটাধিকার সুষ্ঠুভাবে প্রয়োগ করতে পারে, সে জন্য সর্বোচ্চ
প্রচেষ্টা চালানো। কিন্তু একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আমরা
বুঝতে পেরেছি, তারা সেই দায়িত্ব পালন করছেন না। আবার সর্বশেষ এই কর্তৃত্বের
দ্বন্দ্ব থেকে বোঝা যাচ্ছে, তারা কেবল নিজেদের স্বার্থেই কাজ করেন। নিজের
ক্ষমতা, নিজের আর্থিক সুবিধাই তাদের কাছে সবচেয়ে বড় স্বার্থ। এর চেয়ে
দুর্ভাগ্যজনক আর কী হতে পারে?
সাধারণ সম্পাদক, সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক
- বিষয় :
- সমকালীন প্রসঙ্গ
- বদিউল আলম মজুমদার