ঢাকা শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬

হলি আর্টিসান, জঙ্গিবাদ ও বাংলাদেশ

হলি আর্টিসান, জঙ্গিবাদ ও বাংলাদেশ
×

ড. জিয়া রহমান

প্রকাশ: ২৭ নভেম্বর ২০১৯ | ১৩:৩৩

হলি আর্টিসানে হামলার তিন বছর চার মাস পর বুধবার যুগান্তকারী রায় দিয়েছেন আদালত। এতে জড়িতদের মধ্যে ১৩ জন ঘটনার দিন ও পরবর্তীকালে বিভিন্ন অভিযানে নিহত হয়েছে। রায়ে মৃত্যুদণ্ড পেয়েছে আটক সাতজন। এই রায়ে গোটা জাতির প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটেছে। জঙ্গিবাদ উপড়ে ফেলতে জনগণের যে প্রত্যাশা এই রায়ের মাধ্যমে তার একধাপ অগ্রগতি ঘটল। এই রায় আসতে কিছুটা বিলম্ব হলেও মনে রাখতে হবে, যেনতেন একটি রায় ন্যায়বিচারকে নানাভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে। সে হিসাবে এই রায় আগামী দিনে জঙ্গিবাদ দমনে একটি বড় ভূমিকা পালন করতে পারে।


বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ উত্থানের মূলে দুটি কারণ চিহ্নিত করা যায়। একটি হচ্ছে, বিশ্বরাজনীতি ও জাতীয় রাজনীতি। এ দুটির মধ্যেই জঙ্গিবাদের উত্থান নিহিত রয়েছে। একাডেমিক জায়গা থেকে বিশ্ব জঙ্গিবাদের উত্থানের পেছনে নানা কারণের বর্ণনা থাকলেও সর্বশেষ আমরা দেখি, নাইন-ইলেভেনকে কেন্দ্র করে পরবর্তীকালে সারা পৃথিবীতে এ ধরনের ঘৃণ্য অপরাধ ছড়িয়ে গেছে। নাইন-ইলেভেনের পরবর্তী সময় মুসলমানদের ওপর বিভিন্নভাবে নানা ধরনের লাঞ্ছনা, অপমান বা গ্লানি এসেছে। সেগুলো মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠীকে তাদের জিহাদি রাজনীতি করার সুযোগ করে দিয়েছে। বাংলাদেশে ১৯৭৫ সালের পরবর্তী সময়ে ইসলামীকরণের কথা বলে রাষ্ট্রের মূলনীতি উপড়ে ফেলে জঙ্গিবাদকে প্রসারিত করার প্রয়াস আমরা লক্ষ্য করে থাকি। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত যে দেশের চেতনা ছিল ধর্মনিরপেক্ষ, তা সম্পূর্ণ ভেঙে দিয়ে এখানে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি সূচনার মধ্য দিয়ে জঙ্গিবাদের ক্ষেত্র তৈরি করা হয়েছিল। পরবর্তীকালে বিশ্বরাজনীতি ও জাতীয় রাজনীতি একাকার হয়ে এখানে জঙ্গিবাদের উত্থান সম্ভব হয়েছে। ১৯৭৫ সালের বিয়োগান্ত ঘটনার মধ্য দিয়ে যে অপশক্তির উত্থান ঘটেছিল, তাদের ফুলেফেঁপে ওঠার সুযোগ করে দিয়েছিল বিশ্বরাজনীতির ধারক-বাহকরা। যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাইরে থেকে ক্ষমতায় টিকে থাকার চেষ্টা করেছে, শুধু তারা জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটিয়েছে- এমনটি বললে অসম্পন্ন থেকে যাবে। বরং বলতে হবে, বিশ্বরাজনীতির ধারক-বাহক ও বাংলাদেশের '৭৫-পরবর্তী অবৈধ শক্তি- এই দুইয়ে মিলে জঙ্গিবাদকে এই পর্যায়ে নিয়ে এসেছে।

হলি আর্টিসান হামলা আমাদের সামনে নতুন করে যে বিষয়টি নিয়ে এসেছে তা হলো, আশির দশক শেষে বা নব্বই দশকের শুরুতে আমরা দেখেছি, জঙ্গিবাদ উত্থানের সঙ্গে দারিদ্র্যের একটা সম্পর্ক ছিল। সে সময় আমরা দেখেছি, যারা জঙ্গিবাদে সম্পৃক্ত হতো, তারা আর্থসামাজিক বাস্তবতায় নিচের দিকে ছিল। তাদের নানাভাবে অর্থনৈতিক সুবিধা দিয়ে এ ধরনের সহিংস কর্মকাণ্ডে উদ্বুদ্ধ করা হতো। এরপর আফগান-ফেরত মুজাহিদদের তৎপরতার মধ্য দিয়ে হুজি, জেএমবিসহ বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের উত্থান দেখেছি। আমরা দেখেছি, তারা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার মধ্য দিয়েই টিকে ছিল। হলি আর্টিসান ঘটনায় একটি নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। হলি আর্টিসান ঘটনায় যারা জড়িত, তাদের অধিকাংশেরই বয়স ২০ বছরের কোঠায়। তারা আর্থসামাজিকভাবে উচ্চ-মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান। তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা দেখলেও দেখা যায় যে, তারা সমাজের 'প্রিভিলেজ' ক্লাসের অন্তর্ভুক্ত।

হলি আর্টিসান যে নতুন বাস্তবতা, এটি গোটা পৃথিবীরই। উন্নত বিশ্ব আমেরিকা, কানাডা, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সে শিক্ষিত ও উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানদের জঙ্গিবাদে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। তাদের কোনো না কোনোভাবে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক বাস্তবতায় এ ধরনের কার্যকলাপ খুবই ক্রিয়াশীল। আমরা বলি, বর্তমান তরুণ প্রজন্ম খুবই ঝুঁকিপ্রবণ। এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে নানাভাবে তাদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।

ঝুঁকিপ্রবণ বলছি এই কারণে যে, একসময় তরুণ সমাজের নানা ধরনের সামাজিক কাজ ও দেশের ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার ক্ষেত্র প্রসারিত ছিল। কিন্তু বর্তমানে বিশ্বায়ন ও প্রযুক্তি বিকাশের ফলে তাদের সামাজিকীকরণ, নৈতিক মূল্যবোধ, শরীরচর্চা, মননশীলতা, সৃজনশীলতা ও সাংস্কৃতিক চর্চার ক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে এসেছে। ফলে নানাভাবে তারা প্রযুক্তিতে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে। কারণ তাদের মানসিক বিকাশ ও সাংস্কৃতিক উৎকর্ষে বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি হচ্ছে। এই প্রজন্ম কোনো না কোনোভাবে তাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সম্বন্ধে খুব বেশি অবহিত নয়। ঠিক একইভাবে তাদের ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার প্রক্রিয়াও নেই। ফলে তারা ঝুঁকিপূর্ণ। একই সঙ্গে এটাও মনে রাখতে হবে, তাদের এই বয়সটি হলো প্রতিবাদ করার বয়স। তারা সমাজে নানা রকম অসমতা, ন্যায়বিচার, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব দেখে আসছে। কিন্তু নানা কারণে তাদের প্রতিবাদ করার সুযোগ কমে গেছে। ফলে এ থেকে তাদের ক্ষোভ সুপ্ত থাকছে। আর মগজধোলাইয়ের মাধ্যমে তাদের সেই সুপ্ত ক্ষোভ কাজে লাগাচ্ছে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা জঙ্গি নেটওয়ার্কগুলো। ইন্টারনেটে ধর্মের বিকৃত ব্যাখ্যাসহ নানা ধরনের বিষয় উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে তাদের উগ্রবাদে জড়ানো হচ্ছে। এরপরও জাতির কাছে এটা খুবই অপ্রত্যাশিত যে, এই বয়সের ছেলেমেয়েরা এ ধরনের জঘন্য কাজ সংগঠিত করবে।

সমাজতান্ত্রিকভাবে মনে করি, আমাদের বড় রাজনৈতিক দলগুলোর এখানে বড় দায় আছে। তারা কখনও তাদের রাজনৈতিক কার্যসূচিতে এই প্রজন্মকে যুক্ত করেনি। এর ফলে আমরা দেখেছি, অরাজনৈতিক ছদ্মাবরণে বিভিন্ন প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি ও ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল-কলেজে থাকা জঙ্গি সংগঠনগুলো নানাভাবে এই সন্তানদের সংগঠিত করতে পেরেছে। আমাদের মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো কোনোভাবে যদি যুব সমাজকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করে, তাহলে এই বিভ্রান্তি অনেকটাই কেটে যেত। বড় রাজনৈতিক দলগুলো যে খুব বেশি চিন্তাভাবনা করেছে, তা মনে হয় না। অতি সম্প্রতি অবশ্য যুবলীগ সম্মেলনে শেখ ফজলে শামস পরশের মতো একজন শিক্ষিত, ভদ্র ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে সভাপতি বানানো হয়েছে। পরশ তার প্রথম বক্তব্যে বলেছেন, 'আমার মূল কাজ হবে যারা শিক্ষিত ও ভদ্র তাদের যুবলীগে যুক্ত করা। অতীতে এটা না করাই ছিল সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। যে কারণে তামিম চৌধুরীর মতো মানুষজন যারা বিদেশে পড়াশোনা করেছেন, যাদের ইংরেজি বলার সামর্থ্য রয়েছে এবং প্রযুক্তি ব্যবহারে পারঙ্গম, আমাদের তরুণ তাদের ইংরেজি বলার দক্ষতা ও প্রযুক্তি জ্ঞানের প্রতি সহজেই আকৃষ্ট হয়। এর বিপরীত কোনো সংগঠন ছিল না, যারা যুব সমাজকে সংগঠিত করবে। এ কারণেই আমাদের যুব সমাজ এদিকে ধাবিত হওয়ার প্রয়াস পেয়েছে। আমরা জঙ্গিবাদকে একেবারে নির্মূল করে ফেলব- বিশ্ব বাস্তবতা আমাদের সেটা বলে না। কিন্তু পৃথিবীতে এটি নিয়ন্ত্রণের জন্য নানা ধরনের পলিসি গ্রহণ করা হয়েছে। এর সঙ্গে সমন্বয় করে আমাদের যুব সমাজকে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উদ্বুদ্ধকরণই মূল লক্ষ্য বা কাজ হওয়া উচিত।

বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ নানারকম সক্ষমতা না থাকা সত্তেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে, তা বিশ্বে রোল মডেল স্থাপন করেছে। এমনকি ইন্টারপোলপ্রধান বাংলাদেশে একটি সম্মেলনে এসে এ দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে রোল মডেল হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। তবে জঙ্গিবাদের মতো একটি বিষয়কে নিয়ন্ত্রণে রাখতে শুধু কঠোর পদক্ষেপ নিলেই হবে না। কিছু কোমল পদক্ষেপও নিতে হবে। বরং যারা এসব কাজে যুক্ত হচ্ছে, তাদের সেখান থেকে ফিরিয়ে এনে একটি পরিবেশ সৃষ্টি করার ওপর জোর দিতে হবে। হলি আর্টিসান ঘটনার পর এ ধরনের একটি পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল। জঙ্গিবাদ ঠেকাতে গোটা জাতি উদ্বুদ্ধ হয়েছিল। আমরা নানা সুপারিশ দিয়েছিলাম। কিন্তু দুর্ভাজনক হলেও সত্য যে, এই কাজটি হয়নি বললেই চলে। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে তরুণদের দেশ গঠনের কাজে সম্পৃক্ত করতে হবে।

হলি আর্টিসান রায়ে আমরা আশাবাদী। কারণ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আন্তঃসম্পর্ক ও আন্তঃযোগাযোগের মধ্য দিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের মাধ্যমে স্বচ্ছ আইনি প্রক্রিয়ায় এ রায় এসেছে। ভুলে গেলে চলবে না, এই দেশ এমন একটি দেশ, যে দেশে তার প্রতিষ্ঠাতাকে পুরো পরিবারসহ হত্যা করা হয়েছিল। সেই রায় পেতে আমাদের ২১ বছরের বেশি অপেক্ষা করতে হয়েছিল। এছাড়া আরও কিছু হত্যার বিচার এখন পর্যন্ত হয়নি। হলি আর্টিসান মামলার রায় উচ্চ আদালতে যাবে, সেই প্রক্রিয়া যেন স্বচ্ছ ও দ্রুত নিষ্পত্তি হয়। এই রায়ের পর আলোচনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যারা পর্দার আড়ালে থেকে এসব ঘৃণ্য কাজের নেতৃত্ব দেন, তারা কতটা চিহ্নিত হয়েছেন। তাদের চিহ্নিত করা না গেলে এ ধরনের অপরাধ রুখে দেওয়া সম্ভব হবে না।

সমাজবিজ্ঞানী; অধ্যাপক, অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়



আরও পড়ুন

×