ঢাকা শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬

ভুয়া ওয়ারেন্টের রাজনীতি ও মনস্তত্ত্ব

ভুয়া ওয়ারেন্টের রাজনীতি ও মনস্তত্ত্ব
×

ড. জিয়া রহমান

প্রকাশ: ১৮ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১৩:৩১

১৫ ডিসেম্বর দেশের একটি জাতীয় দৈনিকে ভুয়া গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও তার পরিপ্রেক্ষিতে মানুষকে হয়রানি করার যে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে, তা যে কোনো মানুষকে উদ্বিগ্ন না করে পারে না। সম্ভবত এটি একটি দুষ্টচক্র। প্রতারক, পুলিশের মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা অসাধু সদস্য এবং আদালতের ভেতরের অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এ চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত- এটা অনুমান করা যায়। এ ধরনের দুষ্টচক্রের খপ্পরে পড়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানই তার অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে ব্যর্থ হচ্ছে। অনুন্নত বিশ্বে এটি খুবই স্বাভাবিক বিষয়। উন্নত বিশ্বে যে প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নের কথা আমরা বলে থাকি, অনুন্নত বিশ্বে এই প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নের অনুপস্থিতিতে আমাদের কাঙ্ক্ষিত অনেক স্বপ্নই ব্যাহত হচ্ছে। ১৯৫০-এর দশকে গুনার মির্ডাল তাঁর এশিয়ান ড্রামা গ্রন্থে অনুন্নত বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোকে 'সফ্‌ট স্টেট' বলে অভিহিত করেছিলেন। এই সফ্‌ট স্টেটের মূল বিষয় ছিল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর অব্যবস্থাপনা। ১৯৫০ থেকে ২০১৯, প্রায় ৭০ বছর পরও আমরা এই অব্যবস্থাপনা থেকে কতটুকু উত্তরণ ঘটাতে পেরেছি, সে ব্যাপারে প্রশ্ন থেকেই যায়।


অপরাধ একটি স্বাভাবিক বিষয়। সমাজবিজ্ঞানী ডুরখেইমের ভাষায়, প্রাথমিক সমাজ ব্যবস্থা থেকে সমাজের যতই জটিল সমাজ ব্যবস্থার দিকে উত্তরণ ঘটে, মানুষের মধ্যে ততই দ্বন্দ্ব-সংঘাত বৃদ্ধি পায় এবং অপরাধও সমান্তরালে বৃদ্ধি পায়। তার ভাষায়, অপরাধ একটি সামাজিক বাস্তবতা। ডুরখেইমের মতে, এই প্রাথমিক সমাজ থেকে জটিল সমাজে উত্তরণে নগরায়ণ, শিল্পায়ন ও ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদ প্রভৃতির মাধ্যমে অপরাধ প্ররোচিত হয়ে থাকে। বাংলাদেশের মতো অনুন্নত বিশ্বের অনেক দেশই এখন একটি ক্রান্তিকালে অবস্থান করছে। এই ক্রান্তিকালে আমরা নানা ধরনের অপরাধের মুখোমুখি হচ্ছি। আধুনিক বিশ্বে এই অপরাধ নিয়ন্ত্রণের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা হচ্ছে 'ক্রিমিন্যাল জাস্টিস সিস্টেম'। যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে পুলিশ, আদালত ও কারাগার বা সংশোধনাগার কেন্দ্র। উন্নত বিশ্বের দিকে তাকালে আমরা দেখি, সভ্যতা বিকাশ এবং সামাজিক সম্পর্ক জটিল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের ক্রিমিন্যাল জাস্টিস সিস্টেমও উন্নত থেকে উন্নততর হচ্ছে। মূলত ক্রিমিন্যাল জাস্টিস সিস্টেমের প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে অপরাধ নিয়ন্ত্রণও একটি পর্যায়ে চলে আসে।

উন্নত বিশ্বের দিকে তাকালে দেখা যাবে, তাদের পুলিশ বাহিনীর যেমন আধুনিকায়ন হয়েছে, তেমনি তার আদালত ও কারাগার ব্যবস্থাপনাও অত্যন্ত শক্তিশালী এবং উন্নত হয়েছে। এসব দেশে নব নব সংস্কার ও আধুনিকায়ন তথা পুলিশের সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি, পেশাদারি ও নৈতিক দক্ষতা বৃদ্ধি এবং নতুন ধরনের পুলিশি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পুলিশ বাহিনীকে 'পুলিশ অ্যাজ সার্ভিস'-এ রূপান্তর করা হয়েছে। একইভাবে পুলিশ সদস্যদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার মাধ্যমে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি নির্মূল চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। পুলিশ বাহিনীকে বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে উন্নত বিশ্বে পুলিশকে প্রকৃত অর্থেই জনগণের সেবাদান প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হয়েছে। সেখানে কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মাধ্যমে একদিকে যেমন পুলিশকে কমিউনিটির সঙ্গে সম্পৃক্ত করে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে উন্নতমানের সেবাদান নিশ্চিত করা হয়েছে, অন্যদিকে পুলিশ বাহিনীর মধ্যে অসংখ্য শ্রম বিভাজনের মাধ্যমে নতুন নতুন বিশেষায়িত শাখা তৈরি করা হয়েছে। একসময় উন্নত বিশ্বের পুলিশ বাহিনী অপরাধ নিয়ন্ত্রণে তার কার্যক্রমের আওতায় মূলত সমাজে যারা অপরাধ করে তাদের ওপরেই বেশি দৃষ্টি দিত। ভিক্টিমের প্রতি পুলিশের দৃষ্টি ছিল না বললেই চলে। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় ভিক্টিমের অধিকার রক্ষায় পুলিশের বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম চালু হয়েছে। অন্যদিকে স্বাধীন বিচারব্যবস্থার সঙ্গে আধুনিক লিবারেল ডেমোক্রেসির একটি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক পরিলক্ষিত হয়। উন্নত বিশ্বে সভ্যতার অন্যতম মাপকাঠি হলো বিচারব্যবস্থা। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা থেকে শুরু করে বিচারিক আদালতের বিকেন্দ্রীকরণ, রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রসিকিউটর জোগান দেওয়াসহ বিভিন্ন মাধ্যমে বিচারব্যবস্থা উন্নতকরণ করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে অনুন্নত বিশ্বের বিচারহীনতার বিপরীতে মানুষের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হয়েছে। ক্রিমিন্যাল জাস্টিস সিস্টেমের তৃতীয় প্রতিষ্ঠান হলো সংশোধনাগার কেন্দ্র। সনাতনি জেল বা প্রিজনের বিপরীতে সংশোধনাগার প্রবর্তনের মাধ্যমে শাস্তিকালের মধ্যে মানুষকে সংশোধনপূর্বক পুনর্বাসন প্রক্রিয়াটি ত্বরান্বিত হয়েছে। বস্তুত উন্নত বিশ্বের কারাগারগুলো একেকটি রিক্রিয়েশন সেন্টার, যেখানে মানবিক মূল্যবোধ বিকাশের সব মনস্তাত্ত্বিক এবং মোটিভেশনাল প্রোগ্রামের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিগত কয়েক বছর যাবৎ আমি অপরাধ দমনের কৌশল ও প্রক্রিয়া হিসেবে বাংলাদেশের ক্রিমিন্যাল জাস্টিস সিস্টেমকে ঢেলে সাজানোর তাগিদ দিচ্ছি। স্মর্তব্য যে, বাংলাদেশের ক্রিমিন্যাল জাস্টিস সিস্টেমের প্রধান প্রতিষ্ঠানগুলো যথা পুলিশ বাহিনী, আদালত ও কারাগার ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার বহন করে চলেছে। গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে, বাংলাদেশের এই তিনটি প্রতিষ্ঠানই মানুষকে শোষণ এবং তাদের অধিকার দাবিয়ে রাখার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। বৃহত্তর অর্থে এসব প্রতিষ্ঠানের প্রত্যেকটিই রিপ্রোসিভ বা নিবর্তনমূলক প্রতিষ্ঠান। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, এই তিনটি প্রতিষ্ঠানই সময়ের প্রয়োজন মেটাতে তীব্রভাবে ব্যর্থ হয়েছে। বারবার বিভিন্ন পক্ষ থেকে এগুলোর চূড়ান্ত সংস্কারের কথা বলা হলেও এখনও ঔপনিবেশিক আইন দ্বারাই পরিচালিত হচ্ছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও অপরাধের নব নব প্রকরণের বিকাশ ঘটলেও বাস্তবিক কোনো সংস্কার আলোর মুখ দেখেনি। বরং পুরোনো কাঠামো ও আইন বলবৎ থাকায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের মাঝে এ ধরনের দুষ্টচক্র ক্রিয়াশীল।


ভুয়া ওয়ারেন্টের নামে সম্প্রতি পত্রিকায় যে সংবাদ পরিবেশিত হয়েছে, তার কারণ উদঘাটন করতে চাইলে ওপরে বর্ণিত ক্রিমিন্যাল জাস্টিস সিস্টেমের দুর্বলতাকে আমলে নিতে হবে। এ কারণেই উন্নত বিশ্বের পুলিশ অ্যাজ সার্ভিসের পরিবর্তে আমাদের মনোজগতে 'পুলিশ অ্যাজ ফোর্স' গ্রথিত। ঔপনিবেশিক আমলের পুলিশের প্রতি ভীতির সংস্কৃতি এখনও জনমানসে ক্রিয়াশীল। বাংলাদেশের জনগণের মাঝে পুলিশিংভীতির উপস্থিতি প্রাঞ্জল। এ কারণেই ভিক্টিম পুলিশ ও আইন-আদালত থেকে দূরে থাকতে চায়। কোনো ব্যক্তি ভিক্টিম হয়েও থানায় গিয়ে মামলা করতে ভয় পায়। বস্তুত বিগত কয়েক বছরে পুলিশের কিছু উন্নয়ন হলেও (যেমন বিশেষায়িত পুলিশ বাহিনী, নৌ পুলিশ, ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ, ট্যুরিস্ট পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ, কাউন্টার টেররিজম ইউনিট) এর সবই দেশের ওপরের স্তরেই পরিবর্তন এনেছে। অপরাধ দমনের প্রান্তিক জায়গা, বিশেষ করে উপজেলা বা থানা পর্যায়ে মধ্যম ও নিম্ন সারির কর্মকর্তাদের মনস্তাত্ত্বিক কোনো বড় ধরনের সংস্কার হয়েছে বলে মনে হয় না। মূলত এই মধ্যম ও নিম্ন সারির কর্মকর্তাদের সঙ্গেই স্থানীয় পর্যায়ের রাজনীতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক এলিটদের একটি অশুভ আঁতাত তৈরি হয়েছে। এটি এমন ভয়ংকর যে- ক্ষমতা, টাকা ও অন্যান্য সুবিধার সংযোগে সমাজের খুবই ঘৃণিত মানুষেরা বছরের পর বছর নির্দি্বধায় তাদের অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে অধিকারবঞ্চিত হচ্ছেন অপরাধের শিকার ভিক্টিমরা। পত্রিকায় প্রকাশিত ভুয়া ওয়ারেন্ট সংক্রান্ত প্রতিবেদনটি এই অশুভ আঁতাতেরই বাস্তব রূপ। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বা অপ্রকাশিত এহেন হাজারো বিষয়ে প্রতিনিয়ত আমাদের দৃষ্টি আকর্ষিত হয়। অপরাধের সঙ্গে সংশ্নিষ্ট নন কিংবা একেবারেই নিরীহ জনগণও এ ধরনের অশুভ আঁতাতের শিকার প্রতিনিয়ত।

আধুনিক অপরাধবিজ্ঞানের জনক সিজার বেকারিয়া ১৭৬৩ সালে আদালত ও তার সঙ্গে সংশ্নিষ্ট বিষয়গুলোর উন্নয়নের যে সংস্কার প্রস্তাব করেছিলেন, তার লেশমাত্র প্রায় ২৭০ বছর পরও বাংলাদেশের ক্রিমিন্যাল জাস্টিস সিস্টেমে সংস্কার করা হয়নি। মূলত আধুনিক বিশ্বের জনসাধারণের, বিশেষ করে ভিক্টিমের অধিকার নিশ্চিত করার প্রয়োজনে বাংলাদেশে ক্রিমিন্যাল জাস্টিস সিস্টেমের ব্যাপক সংস্কারই নিশ্চিত করতে পারে সাধারণ মানুষের অধিকার।

সমাজবিজ্ঞানী; অধ্যাপক, অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়



আরও পড়ুন

×