ঢাকা সোমবার, ২২ জুন ২০২৬

উন্নয়নে চাই 'মাইন্ডসেট' বদল

উন্নয়নে চাই 'মাইন্ডসেট' বদল
×

ড. আতিউর রহমান

প্রকাশ: ০১ জানুয়ারি ২০২০ | ১৩:২২

২০১৯ সালের শুরুটা ছিল ভালোই। নির্বাচন শেষে একই সরকার ফের ক্ষমতাসীন হয়েছিল। সরকারের এই ধারাবাহিকতার ফলে তার নেওয়া মেগা প্রকল্পগুলো ছাড়াও অবকাঠামো খাতের অন্যান্য প্রকল্পের কাজ অব্যাহত রাখতে আর কোনো ঝুঁকি রইল না। ফলে নির্মাণকাজে সক্রিয়তা বজায় থাকারই কথা। বাস্তবেও তাই দেখা গেল। নির্মাণ খাতের প্রবৃদ্ধি আগের বছরের চেয়ে অন্তত ৬ শতাংশের বেশিই রয়ে গেছে বলে সংশ্নিষ্টরা বলছেন। তাই সিমেন্ট ও বড় শিল্পের প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক ধারাতেই থেকেছে। মহাসড়ক, সেতু ও বিল্ডিং নির্মাণে পুরো বছর ধরেই সরকার তৎপর ছিল। মনে হয়, নতুন বছরেও নির্মাণ খাতের চাঙ্গাভাব অব্যাহত থাকবে। তবে নির্মাণ উপকরণের দাম বেশি থাকায় প্রবৃদ্ধির হার শুরুতে যতটা আশা করা গিয়েছিল, ততটা হয়তো হয়নি। হালে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান জোরালো হওয়ার কারণেও রাজনৈতিক বিবেচনায় বেড়ে ওঠা অনেক নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ডের গতি খানিকটা কমেছে। এর নেতিবাচক প্রভাবও এই খাতের প্রবৃদ্ধির ওপর গত বছরের শেষ দিকে পড়েছে বলে মনে হয়। তবে ভালো উদ্যোক্তারা যুক্ত হলে আখেরে এই খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বরং বাড়বে। নির্মাণ খাতের প্রবৃদ্ধির ধারার সঙ্গে একমাত্র সামগ্রিক কৃষির প্রবৃদ্ধি ছিল যথেষ্ট চনমনে। এর সঙ্গে যোগ করা যায় বাড়ন্ত প্রবাসী আয়। এসবের প্রভাবে গত অর্থবছরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৮.১৫ শতাংশ। সারাবিশ্ব ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে দেখলে প্রবৃদ্ধির হার নিঃসন্দেহে খুবই সন্তোষজনক। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে আমাদের অর্থনীতিই ছিল সবচেয়ে গতিময়। কিন্তু শুধু প্রবৃদ্ধির হারকেই জীবনমানের বিচারে যথেষ্ট বলে ধরা হয় না। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার নানা বিষয়ও উন্নয়ন আলাপে এসে পড়ে। তাছাড়া গত বছরের ম্যাক্রো অর্থনীতির সূচকগুলো ছিল মিশ্র।

চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ছিল ঋণাত্মক। মোট অঙ্ক ছিল ১৫.৭ বিলিয়ন ডলার। আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে তা ৭.৫৯ শতাংশ কম। এ বছরের এই সময়ের যে লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছিল তার চেয়ে ১২ শতাংশ কম। অথচ এই সময়টায় চীনের রপ্তানি কমে গেছে। এর বিপরীতে ভিয়েতনামের রপ্তানি কিন্তু বেড়েছে ৭.২ শতাংশ হারে। অবশ্য, ভিয়েতনামের রপ্তানি ঝুড়িতে গার্মেন্ট ছাড়াও উন্নত প্রযুক্তি পণ্যও রয়েছে। আমরা পোশাক শিল্পের উন্নয়নে নিরাপত্তা ও কমপ্লায়েন্সের উন্নয়নের জন্য বড় ধরনের বিনিয়োগ করেছি। তাই আমাদের পক্ষেও চীন থেকে চলে আসা বাজার ধরা সহজ ছিল। কিন্তু বাস্তবে আমরা এই সুযোগের সদ্ব্যবহার ঠিক তেমনটি করে উঠতে পারিনি।

আমাদের আমদানির অবস্থাও সুবিধার ছিল না গত বছর। চলতি অর্থবছরের সেপ্টেম্বর নাগাদ মোট আমদানি কমেছে ২.৫ শতাংশ। তা সত্ত্বেও আমাদের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে। রপ্তানি ও আমদানির এ স্লথগতির প্রভাব রাজস্ব আদায়ের ওপরও পড়েছে। এর সঙ্গে ভ্যাট ও আয়কর সংগ্রহের মন্থরগতি যোগ করে বলতে পারি যে, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায়ে আমরা গত বছর লক্ষ্যমাত্রা থেকে বেশ পেছনেই ছিলাম।

রাজস্ব আদায় কম ছিল বলেই সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণের পরিমাণ বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার হার বেড়েছে ৪৫ শতাংশ। এর নেতিবাচক প্রভাব ব্যক্তি খাতে দেওয়া ব্যাংক ঋণের হারের ওপর নিশ্চয় পড়বে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ মুদ্রানীতির টার্গেট থেকে ব্যক্তি খাতে ঋণ দেওয়ার হারও উল্লেখযোগ্য হারে পিছিয়ে আছে।

দশটি মেগা প্রকল্প অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়িত হচ্ছে। এগুলোর বাস্তবায়নের গতি থামানো যাবে না। তাই এনবিআর আরও সক্রিয় না হলে ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার আগ্রহ কমবে বলে মনে হয় না। তবে বেশি সুদে সঞ্চয়পত্র থেকে অর্থ সংগ্রহের চেয়ে ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণ নেওয়ার ফলে সরকারের খরচ খানিকটা কমেছে। তা সত্ত্বেও এ কথাটি বোধহয় বলা উচিত যে, সরকারের ব্যয় ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা ও স্বচ্ছতা- দুই-ই বাড়ানোর আরও সুযোগ রয়েছে। একে তো প্রকল্প সময়মতো শেষ করা যাচ্ছে না। তার ওপর যদি ব্যয় ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা ও অপচয় বিরাজ করে, তাহলে সরকারের পক্ষে সার্বিক বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে রাখা বেশ মুশকিল হবে। আর এর নেতিবাচক প্রভাব গিয়ে পড়বে ব্যক্তি খাতের ঋণের সরবরাহের ওপর। মূল্যস্টম্ফীতির ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।


পোশাক রপ্তানি শিল্পের মালিকরা চাইছেন তাদের জন্য আলাদা করে টাকার অবমূল্যায়ন। বিশ্ববাজারে নিজেদের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বজায় রাখার জন্য তারা এই দাবি করছেন। ইতোমধ্যে প্রবাসী আয়প্রবাহে ২ শতাংশ প্রণোদনা দেওয়ার ফলে ভালো ফল পেয়েছে সরকার। অনুমান করা হচ্ছে, ২০১৯ বছর শেষে রেমিট্যান্স ১৯ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। ২০১৮ সালে তা ছিল ১৫.৫৫ বিলিয়ন ডলার। এদিকে ২০১৮ সালের জুলাই থেকে অক্টোবর নাগাদ এফডিআই এসেছিল ১৫৬ কোটি ৮০ লাখ ডলার। ২০১৯ সালে ওই সময়ে এফডিআই এসেছে ১৬৫ কোটি ২০ লাখ ডলার। এই ধারা অব্যাহত রাখতে হলে আমাদের অবকাঠামোর ব্যাপক উন্নতি করতে হবে। সরকারের নেওয়া মেগা প্রকল্পগুলো, বিশেষ করে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো তাড়াতাড়ি সম্পন্ন করা গেলে এফডিআইপ্রবাহ আরও দ্রুতগতিতে বাড়বে।

রেমিট্যান্স ও এফডিআইপ্রবাহের ধারা ইতিবাচক থাকলেও মূলত আমদানি ও রপ্তানির মধ্যে পার্থক্য বিরাট হওয়ার কারণে চলতি মূলধনে এখনও ঘাটতি রয়ে গেছে। এর সার্বিক প্রভাব আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর পড়েছে। তা সত্ত্বেও সারাবিশ্বের অর্থনৈতিক অগ্রগতির পাশাপাশি বাংলাদেশের অর্জন খুব একটা হতাশাজনক নয়। তবে আমাদের আত্মতুষ্টির কোনো সুযোগ নেই। বিশেষ করে, গত বছর আর্থিক খাত নিয়ে এমন সব নেতিবাচক আলাপ-আলোচনা গণমাধ্যমে এসেছে, সেসব বিষয়ে নীতিনির্ধারকদের আরও সচেতন হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। ব্যাংকিং খাতের অবস্থা নিয়ে যেসব আলাপ-আলোচনা হয়েছে, তার মূলে ছিল খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি। সেপ্টেম্বর শেষে মোট ঋণের ১২ শতাংশ খেলাপি হয়ে গেছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে।

এসব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও গত বছরের অর্থনীতি অনেক সমমানের দেশের অর্থনীতির চেয়ে যে ভালো 'পারফর্ম' করেছে, সে কথাটি জোর দিয়েই বলা যায়। এই অর্জনের জন্য আমাদের কৃষক, খুদে ও মাঝারি উদ্যোক্তা, প্রবাসকর্মী, রপ্তানি খাতে নিয়োজিত পরিশ্রমী কর্মীর কৃতিত্বের কথা স্বীকার করতেই হবে। অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের যে ধারা বর্তমান সরকার চালু করেছে এবং ডিজিটালি প্রযুক্তির সংযোজন ঘটিয়ে তাকে আরও বেগবান করার চেষ্টা করছে, সেই কৌশলটিই আসলে আমাদের অর্থনীতির এভাবে এগিয়ে চলার বড় শক্তির উৎস। বিগত বছরের অভিজ্ঞতার আলোকে ২০২০ সালের অর্থনীতিকে আরও চাঙ্গা করতে হলে অবশ্য আমাদের  আরও সংস্কারমুখী হতে হবে। কয়েকটি দিকে নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই।

প্রথমত, প্রবৃদ্ধির ধারা যেন সর্বদাই অন্তর্ভুক্তিমূলক থাকে। গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা থাকায় সার্বিকভাবে দারিদ্র্র্য কমছে। ভোগ বাড়ছে। এ ধারাকে আরও বেগবান করতে হলে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির যে পরীক্ষিত ধারা বাংলাদেশ চালু করেছে, তাকে ধরে রাখতে হবে।

দ্বিতীয়ত, ব্যাংকিং খাতের সুশাসন নিশ্চিত করে ঋণ প্রদান, ঋণের ব্যবহারের ওপর অবলোকন আরও জোরদার করার প্রয়োজন রয়েছে। পাশাপাশি কৃষি-খুদে ও মাঝারি খাতে (বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তা, সবুজ উদ্যোক্তা ও ডিজিটাল উদ্যোক্তাদের জন্য) অর্থায়নের গতি বাড়াতে হবে। এ জন্য পূনঃঅর্থায়নের সুযোগগুলো সংকুচিত না করে বরং আরও উদ্ভাবনীমূলক কৌশলে বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

তৃতীয়ত, রপ্তানি খাতে আমাদের গার্মেন্টস ও অন্যান্য খাতের জন্য প্রয়োজনে আরও প্রণোদনা কী করে দেওয়া যায়, সেদিকটা নিয়ে ভাবতে হবে। আমাদের বিশ্বাস, তৈরি পোশাক খাত নিজে নিজেই অনেকটা রূপান্তরিত হচ্ছে। সবুজ হচ্ছে। এই ধারাকে আরও সমর্থন দিয়ে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক চলমান বিশ্বমন্দার এই দুঃসময়ে বাংলাদেশের সফল এই খাতকে আরও চাঙ্গা করতে তৎপর হতে পারে।

চতুর্থত, অটোমেশন জোরদার করে রাজস্ব আয় বাড়ানোর পাশাপাশি রাজস্ব ব্যয়ে যে অপচয় হয়ে থাকে, তা রোধ করার উদ্যোগ নিতে হবে। সরকারি খরচের মান বাড়াতে না পারলে বাজেট ঘাটতি কিন্তু আরও বাড়বে। দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ভেঙে গত অর্থবছরে তা ৫ শতাংশের বেশি (৫.২ শতাংশ) হয়েছে। এই ঘাটতি কমিয়ে আনতে হলে রাজস্ব ব্যয়ে স্বচ্ছতা বাড়াতেই হবে। আশার কথা, সরকার ইতোমধ্যে এদিকটায় নজর দিতে শুরু করেছে।

পঞ্চমত, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর মধ্য থেকে কয়েকটি অগ্রাধিকার দিয়ে আগেভাগে বাস্তবায়ন করার উদ্যোগ নিতে হবে। এ কাজটি করতে পারলে দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তারা এসব অঞ্চলে বিনিয়োগের অভিজ্ঞতা অন্যদের সঙ্গে শেয়ার করবেন। ফলে এফডিআই আগমনের ধারা আরও শক্তিশালী হবে।

ষষ্ঠত, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মান বাড়াতে সরকারি বিনিয়োগের হার বাড়াতে হবে। আমাদের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার মান না বাড়লে উচ্চশিক্ষার মানও বাড়বে না। একই সঙ্গে কারিগরি শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন জনশক্তি ছাড়া ডিজিটাল এই যুগে আমাদের উন্নয়নের বাড়ন্ত ধারা বজায় রাখা মুশকিল হবে। প্রশিক্ষণে সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ আরও বাড়াতে হবে।

সপ্তমত, শতাংশ প্রণোদনা দেওয়ায় প্রবাসী আয় বাড়ছে। রেমিট্যান্স আরও বাড়ানো সম্ভব। সে জন্য দেশে যেমন উপযুক্ত প্রশিক্ষণ বাড়াতে হবে, তেমনি প্রবাসী কর্মীদের বিদেশে পাঠানো, বিদেশে কর্মপরিবেশ এবং তাদের চাওয়া-পাওয়ার দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।

অষ্টমত, ব্যবসা-বাণিজ্যকে আরও উদ্যোক্তা ও ভোক্তাবান্ধব করার জন্য প্রযুক্তির ব্যবহার করে প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় ও তৎপরতা বাড়াতে হবে। এ বিষয়ে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগ যেন সফল হয়, সে জন্য লেগে থাকতে হবে।

এমন আরও অনেক উদ্যোগের কথাই বলা যায়। তবে স্বল্প পরিসরে সে সুযোগ খুব একটা নেই। সবশেষে বলতে চাই, উন্নয়ন শেষ পর্যন্ত 'মাইন্ডসেট' বা মনবদলের বিষয়। এই সমাজে ও প্রশাসনে যেন নৈতিকতা ও উদ্ভাবনের জন্য সচেষ্টতা বাড়ে নতুন বছরে, সে প্রত্যাশাই করছি। আর এই মনবদল ঘটাতে হলে সর্বত্রই স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং ভরসার ক্ষেত্র প্রসারিত করার কোনো বিকল্প নেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর

[email protected]

আরও পড়ুন

×