ঢাকা সোমবার, ২২ জুন ২০২৬

শক্তিশালী বিরোধী দলের আবির্ভাব ঘটুক

শক্তিশালী বিরোধী দলের আবির্ভাব ঘটুক
×

আহমদ রফিক

প্রকাশ: ০২ জানুয়ারি ২০২০ | ১৩:৩১

নতুন বছর এসে গেল। জানুয়ারির শীত আর কুয়াশা নিয়ে স্বভাবতই বিগত বছরের ভাবনা, 'কেমন গেল বর্ষ ২০১৯'। গেল বছরটা যেমন ঘটনাবহুল, তেমনি ব্যতিক্রমীও বটে- অস্বাভাবিকভাবে নভেম্বরের শেষ থেকে শীত, ডিসেম্বরে এসে শীত আর কুয়াশা আগামীকে জানান দিয়েছে। বাংলাদেশে এবার প্রকৃতিও ব্যতিক্রমী। কারও কারও মতে, 'বছরটা রাজনীতিবিহীন'।


আমার তা মনে হয় না। বিরোধী দল গণআন্দোলনে মাঠ না কাঁপালেই কি সময়টা রাজনীতিহীন হয়? অনেক ঘটনা তো ঘটে গেল, যা কিছুটা প্রত্যক্ষ, অনেকটা পরোক্ষভাবে, গুণগত বিচারে রাজনীতি-সংশ্নিষ্ট। অন্যদিকে গোটা বিশ্বের প্রধান শক্তি রাজনীতিতে টগবগে। ভাবা যায়, বিতর্কিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাদের শাসনতান্ত্রিক নিম্নকক্ষে অভিশংসিত, রিপাবলিকানরা বিব্রত। উচ্চকক্ষে (সিনেট) তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে এ দফায় ট্রাম্প হয়তো পার পেয়ে যাবেন, তাই তিনি নির্বিকার, যা খুশি বলে যাচ্ছেন।

পরম গণতন্ত্রী নামে পরিচিত ব্রিটিশ জনতা এবার তাদের ব্রিটিশ আভিজাত্যের কৌলীন্য ও শ্রেষ্ঠত্ববোধ দেখিয়ে রক্ষণশীল রাজনীতিকে জিতিয়ে দিল, বুঝিয়ে দিল তারা শ্বেতাঙ্গ অন্য ইউরোপীয় থেকে আলাদা- ব্রেক্সিটে তাই প্রমাণিত। এবার ট্রাম্প-জনসন আঁতাতে ২০২০ সালে কী ঘটবে, কে জানে! আর প্রতিবেশী দেশ ভারত ও মিয়ানমার এমনই রাজনৈতিক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে যে, রাজনীতিমনস্ক বাংলাদেশবাসী মনে মনে ক্ষুব্ধ, কেউ প্রকাশ্যে, লেখালেখিতেও। সারা ভারতের গণতন্ত্রীরা নাগরিকত্ব আইনের দ্বিজাতিতত্ত্বের বিরোধিতায় ক্ষুব্ধ, আন্দোলনরত। রক্তও ঝরছে। হুমকিতে আন্দোলন বন্ধ হচ্ছে না।

বহুকথিত আপ্তবাক্য-বিশ্বায়ন, 'গ্লোবাল ভিলেজ'। বিশ্ব এখন একক ইউনিট। হলে কী হবে, যে যার রাজনৈতিক স্বার্থ নিয়ে মদমত্ত। আর ক্ষুব্ধ রাজনীতির ঢেউ স্পর্শ করে কমবেশি একাধিক দেশকে। তাই প্রতিবেশী মিত্র দেশের সফর স্থগিত করেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। অবিশ্বাস্য বা অভাবিত ঘটনা। আর রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে জাতিসংঘে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী সরব। হেগের আন্তর্জাতিক আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়ানো শান্তির জন্য নোবেল পুরস্কারজয়ী অং সান সু চির দিকে নজর বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের-কী বলেন তিনি আত্মরক্ষায়? আর বিচারকদের মনোভাবই-বা কী?

এগুলো কি রাজনৈতিক উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার বহিঃপ্রকাশ নয়? কিংবা ঘরে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবাসন নিয়ে চিন্তা, রোহিঙ্গা-এনজিও নিয়ে নানা অপ্রীতিকর ঘটনা, রোহিঙ্গা-স্থানীয় দ্বন্দ্ব ইত্যাদি এখানেই শেষ না।

ইতোমধ্যে ঘরে কি কম ঘটনা ঘটেছে, যেগুলো রাজনীতি-সংশ্নিষ্ট, ব্যাপক দুর্নীতি-অনৈতিকতা, যুবলীগের দুর্বৃত্তপনা, ক্যাসিনোকাণ্ডের অবৈধ তৎপরতা, সঙ্গে ছাত্রলীগ- সব মিলিয়ে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভাবমূর্তিতে কালো ছাপ। যে জন্য দলীয়প্রধান ও সরকারপ্রধান শেখ হাসিনাকে প্রকাশ্যে এসবের বিরুদ্ধে ঘোষণা দিতে হয়েছে। যুবলীগ-ছাত্রলীগসহ সংশ্নিষ্টদের রাজনৈতিক অপতৎপরতা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর কথা দেশবাসীকে জানাতে হয়েছে। এমনকি বলতে হয়েছে, প্রয়োজনে নিজ দলে শুদ্ধি অভিযান চালাবেন তিনি।

প্রত্যাশা ছিল মানুষের। এবার সত্যি আগাছা পরিস্কার হবে, নোংরা বিষঝাড় সাফ-সুতরো হবে, নখদন্তহীন দুদক একই ধারায় সামাজিক-রাজনৈতিক দুর্নীতির মূলোচ্ছেদ ঘটাবে; কিন্তু সবাইকে হতাশ করে সেসব অভিযান স্তিমিত হয়ে গেছে। উগ্রপন্থিদের মতে, এমনটাই হওয়ার কথা।

সংসদীয় রাজনীতিতে পশ্চিমা ধারায় সবাই শক্তিশালী বিরোধী দলের উপস্থিতি রাজনীতির জন্যই অপরিহার্য মনে করেন। কাকতালীয়ভাবে ব্রিটেন বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো বাংলাদেশ দ্বিদলীয় রাজনীতিভিত্তিক, সঙ্গে দুর্বল তৃতীয় দল। কিন্তু বাংলাদেশে দ্বিতীয় প্রধান দল বিএনপি অপরাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে এবং বিভ্রান্তিকর বৈনাশিক তৎপরতায় প্রতিপক্ষকে শেষ করার যে অন্যায় গ্রেনেড হামলা চালায়, তারা এখন সেসবের মাশুল গুনছে। দলকে পরিবারকেন্দ্রিক করতে গিয়ে দলীয় নেতৃত্বে ক্ষোভ, অন্তর্দ্বন্দ্ব, ভিন্নমত, পিছুটান ইত্যাদি নিয়ে বিএনপি এখন শক্তিহীন; তদুপরি ক্ষমতাসীন দলের সার্বক্ষণিক তাড়া।

শেষোক্ত ঘটনাটি সংসদীয় গণতন্ত্রসম্মত নয়। তবু তারা গা-ঝাড়া দিচ্ছে; তবে তা জনবান্ধব ইস্যুতে নয়, দলীয়প্রধানের মুক্তির দাবিতে, যিনি দুর্নীতির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত। অন্যদিকে বহুধা বিভক্ত বামপন্থিরাও গুরুত্বপূর্ণ জনদাবি নিয়ে আন্দোলনে দুর্বোধ্য কারণে তৎপর নয়। আবার তাদের কোনো অংশ তৎপর হলেও পুলিশি ঠেঙ্গানিতে রাজপথে নামতে পারে না। এই তো দু'দিন আগে বাম গণতান্ত্রিক মোর্চা বিতর্কিত নির্বাচন ইস্যুতে রাজপথে প্রতিবাদী মিছিল বের করে বেধড়ক পুলিশি মারে বিপর্যস্ত, আহত দুই প্রধান নেতা- সাকি ও সাইফুল হক। এটা কি গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার নজির? শক্তিশালী বিরোধী দলবিহীন রাজনীতি এভাবে গণতন্ত্রকে আহত করে। ফলে একনায়কি শাসনব্যবস্থার জন্য পথ খুলে যায়। সেখানে সুশাসন ও জবাবদিহির অবকাশ থাকে না, যা গণতন্ত্রসম্মত নয়।

এই যে ব্যাপক শক্তিশালী মজুদদারি-কালোবাজারি ও অবিশ্বাস্য মুনাফাবাজি বৃহৎ ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের যে কারণে মধ্যবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত-শ্রমজীবী মানুষের নিদারুণ ভোগান্তি বিশেষ বিশেষ ভোগ্যপণ্য নিয়ে, এর ফলে সারাদেশ নাজেহাল, বিশেষ করে গত বছর (২০১৯) পেঁয়াজ নিয়ে। ভাবা যাক, ৪০ টাকা কেজির পেঁয়াজ ২৫০ টাকা এবং বেশ কয়েক মাস ধরে! স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী তার রান্নাঘরে তাৎক্ষণিক পেঁয়াজের প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছেন। পেঁয়াজ এখনও দুই ধাপ নেমে স্থির। এর পেছনে কি রাজনীতির ঝুট-ঝামেলা নেই? যদিও তা পরোক্ষে।

কিন্তু ছাত্র রাজনীতির যে দুটি ঘটনা সারাদেশে ক্ষুব্ধ চাঞ্চল্য এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ সময় প্রতিবাদে ক্ষুব্ধ করেছে, বিশেষ করে বুয়েটের মর্মস্পর্শী ঘটনায়, তা কি রাজনীতির বাইরে? কিংবা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যের কথিত অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সংখ্যাগরিষ্ঠ ছাত্রছাত্রীদের দীর্ঘকালীন প্রতিবাদী আন্দোলন, মিছিল, সমাবেশ এবং বিভিন্ন কর্মসূচি, যার জের এখনও মেটেনি- এসব তো ক্ষুব্ধ ছাত্র রাজনীতির বহিঃপ্রকাশ।

বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবরারকে রাতভর নির্যাতন করে, সোজা ভাষায় পিটিয়ে হত্যা করা হলো; প্রক্টর টুঁ শব্দটি করলেন না, উপাচার্য নাকি শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে সংলাপে ব্যস্ত ছিলেন, আবরারের মরণ চিৎকার তাদের কানে পৌঁছায়নি। অথচ তারা তখন যথারীতি ক্যাম্পাসে। ছাত্রলীগের স্থানীয় নেতাকর্মীদের হাতে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড এমনই বর্বরতার প্রকাশ ঘটায় যে, তা আন্তর্জাতিক মহল পর্যন্ত পৌঁছায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভাবমূর্তিকে কলঙ্কিত করে।

স্বভাবতই প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা- অপরাধী যে দলেরই হোক, তাদের ছাড় দেওয়া হবে না। এরপর যথারীতি পুলিশ, অপরাধীরা গ্রেপ্তার, দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন পুলিশের বিশেষ টিমের। এরপরও চলেছে বুয়েটসহ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ তাদের দাবি পূরণের জন্য- অপরাধীদের স্থায়ী বহিস্কার, শিক্ষায়তনে রাজনীতি নিষিদ্ধ, উপাচার্যের পদত্যাগ ইত্যাদি। ইতোমধ্যে বুয়েটের প্রক্টর দায় স্বীকার করে পদত্যাগ করেছেন।

এবারও অনেকের প্রত্যাশা, শিক্ষায়তন দূষণমুক্ত হবে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে। ছাত্রলীগ তার সহিংস রাজনীতি থেকে সরে আসবে। অনেকে স্মরণ করেছেন ষাটের দশকে ছাত্রলীগের রাজনীতির গৌরবময় দিনগুলোর কথা, বিশেষ করে ডাকসুর অনুসরণযোগ্য ভূমিকার কথা দলমত নির্বিশেষে।

তিন

আশ্চর্য, এখানেই দেখা গেল বিষবৃক্ষের প্রকাশ। বুয়েট ও অন্যান্য ঘটনার মতো এবারও দৈনিকগুলোতে মোটা হরফে শিরোনাম নানা ভাষ্যে, মূলকথা- ভিন্নমতের কারণে ডাকসুর নির্বাচিত ভিপি নুরুল হক নুরসহ তার সহযোগীদের ওপর মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ ও ছাত্রলীগের দু'দফা হামলায় গুরুতর আহত অবস্থায় তারা হাসপাতালে। প্রতিবাদ শুধু ছাত্র মহল বা রাজধানীর নাগরিক মহলেই নয়, দেশের সর্বত্র শিক্ষিত সমাজে; বিশেষ করে রাজনীতিমনস্কদের মধ্যে।

বিবৃতিতে প্রতিবাদ আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের কারও কারও। তাদের মতে, এ ঘটনা আপত্তিকর, অন্যায়; কারও মতে, পৈশাচিক। ডাকসুর ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক ভাবমূর্তি নষ্ট। তোফায়েল আহমেদ থেকে একাধিক মন্ত্রীর ঘোষণা এমনই। কিন্তু বিস্ময়ের কথা হলো, তাতে পিছু হটেনি কথিত মঞ্চ ও সংশ্নিষ্ট ডাকসুর ছাত্রলীগ নেতৃত্ব। এর জের চলছে।

বুয়েট কিংবা ডাকসু- দুই ক্ষেত্রেই হত্যাকাণ্ড ও হামলার কারণটা রাজনৈতিক। আক্রান্তরা ভারতের নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সোচ্চার ছিল। তাদের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক মতামত আমার জানা নেই; কিন্তু ঘটনার বিবরণ ওই কারণের কথাই বলে। বিদায়ী বছরের চালচিত্র আঁকতে গিয়ে বিশ্ব প্রেক্ষাপটে প্রবীণ সাংবাদিক আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী অনেক অপ্রিয় সত্য উচ্চারণ করেছেন; আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক সম্মেলন নিয়ে কিছু হতাশার কথাও বলেছেন, যেমন সরকারের জবাবদিহির অভাব নিয়ে। তবে ছাত্রলীগের বেপরোয়া অপকর্ম সম্পর্কে কিছু পরামর্শ রাখলে পারতেন। কারণ তিনি আওয়ামী লীগের শুভাকাঙ্ক্ষী।

একই ধারায় আরেক শুভাকাঙ্ক্ষী আবুল মোমেন বাস্তব বিচার-বিশ্নেষণের পর আওয়ামী লীগপ্রধানের দক্ষতা ও বিচক্ষণতার উল্লেখ করেও এমন মন্তব্য করেছেন, 'তার এসব ইতিবাচক চেষ্টার মধ্যে ছাত্রলীগের কিছু নেতাকর্মী ডাকসু ভিপির ওপর বারবার হামলা চালিয়ে এবং তা ঢাকতে নানা মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে পরিস্থিতি তার জন্য প্রতিকূল করার কাজও করে যাচ্ছেন।' নারী শিক্ষা ও নারী ক্ষমতায়নে অগ্রগতি সত্ত্বেও সমাজে নারী নির্যাতনের সংখ্যা ২০১৯-এ সম্ভবত সর্বাধিক। এই সামাজিক অপরাধ রাজনীতি নিরপেক্ষ বলে মনে করার কারণ নেই। ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

এসব কারণে ২০২০-এ মোটা দাগে আমাদের প্রত্যাশা- রাজনৈতিক-সামাজিক ক্ষেত্রে যে অভিযানের শুরু তা লক্ষ্যে পৌঁছাক; মূলত দূষণমুক্ত, অপরাধমুক্ত সমাজ গঠনের অভিপ্রায়ে। দেশের প্রতিটি খাত দুর্নীতিমুক্ত করার চেষ্টা চলুক। বিশ্ববিদ্যালয়সহ শিক্ষায়তনগুলো দূষিত রাজনীতিমুক্ত হোক- এটা সবচেয়ে জরুরি। আর সংসদীয় রাজনীতিতে জামায়াতমুক্ত শক্তিশালী গণতন্ত্রী বিরোধী দলের আবির্ভাব ঘটুক, ক্ষমতাসীন দল তাতে সদর্থক সহায়তা দিলে রাজনীতিতে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সহজ হতে পারে। নতুন বছর কি প্রত্যাশা পূরণে সক্রিয় হবে?

ভাষাসংগ্রামী, কবি, প্রাবন্ধিক, রবীন্দ্র গবেষক

আরও পড়ুন

×