করোনায় হ-য-ব-র-ল
×
সাইফুল ইসলাম
প্রকাশ: ০৩ মে ২০২০ | ১২:০০
কথায় বলে, যেখানে বাঘের ভয়, সেখানে রাত হয়। বাংলাদেশের বর্তমান করোনা পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গেলে এই প্রবাদটি সামনে আসবে। বাংলাদেশে যে সময় ক্রমেই বাড়ছে করোনা সংক্রমিত রোগীর সংখ্যা- ঠিক সেই সময় রাস্তায় বাড়ছে জনসমাগম। ধীরে ধীরে খুলছে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। লকডাউনের বাংলাদেশি ভার্সনের এ পর্বে রাজধানী ঢাকায় কেবল বন্ধ রয়েছে পাবলিক বাস ও শপিংমলগুলো। একদিকে বলা হচ্ছে ঘরে থাকুন, আরেকদিকে ঘর থেকে বের হওয়ার সমস্ত রাস্তা খুলে দেওয়া হচ্ছে খুবই সচেতনতার সঙ্গে। বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের ভয়াবহ মহামারি প্রত্যক্ষ করলেও আমাদের মধ্যে কোনো উপলব্ধি হয়তো কাজ করছে না।
চীনে করোনাভাইরাস শনাক্ত হওয়ার পর তা দ্রুত বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়তে থাকে। এর সঙ্গে ভেঙে পড়ে বিশ্ব যোগাযোগ ব্যবস্থা। আমরা প্রস্তুতির জন্য দুই মাসেরও বেশি সময় পেয়েছি। বাংলাদেশে গত ৮ মার্চ করোনাভাইরাস শনাক্ত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত আমাদের সুরক্ষা ব্যবস্থা (মুখে মুখে) অত্যন্ত মজবুত ছিল। করোনা শনাক্ত হওয়ার পর পরই সেই সুরক্ষা ব্যবস্থাগুলো যেন হাওয়ায় মিশে গেল। সেই ৮ মার্চ থেকে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। লকডাউন করা হয়েছে। লকডাউন বাস্তবায়নে সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে। করোনাভাইরাস শনাক্তকরণ ল্যাবের সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি বিশেষায়িত হাসপাতাল চালু করা হয়েছে।
তবে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সামগ্রিক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলার লেশমাত্র নেই। চলতি বছরের শুরুর দিকে বিদেশি ও বিদেশফেরত বাংলাদেশিদের বিমানবন্দরে স্বাস্থ্য পরীক্ষার নির্দেশনা দেওয়া হয়। আমরা সংবাদমাধ্যম থেকে এই নির্দেশনার বিপরীতে সরকারি কর্মচারীদের নৈরাজ্য দেখেছি। স্বাস্থ্য পরীক্ষা না করেই টাকার বিনিময়ে অনেককে বিমানবন্দর থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। গলদ শুরু বিমানবন্দর থেকে। এরপর বিদেশফেরতদের অবদানে ধীরে করোনার বিস্তার ঘটলে শুরু হয় শনাক্তকরণ পরীক্ষা। ১৭ কোটি মানুষের দেশে শুরুর দিকে প্রতিদিন করোনো টেস্ট করা হতো শ'খানেক মানুষের। জনরোষে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় করোনা পরীক্ষাকেন্দ্রের সংখ্যা বৃদ্ধি করলেও প্রয়োজনের তুলনায় নমুনা সংগ্রহ হচ্ছে না। গত শনিবার পর্যন্ত দেশে প্রায় ৯ হাজার মানুষের মধ্যে করোনা শনাক্ত হলেও দৈনিক নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা মাত্র ৪-৫ হাজারের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। অথচ বিশ্বব্যাপী করোনা পরীক্ষার ওপর অধিক জোর দেওয়া হয়েছে।
করোনার প্রতিষেধক এখনও আবিস্কার হয়নি। কবে আবিস্কার হবে তাও নিশ্চিত করে বলা যায় না। করোনা মোকাবিলায় যে ক'টি দেশ সফল হয়েছে, তাদের প্রধান প্রতিষেধক ছিল লকডাউন। বাংলাদেশেও লকডাউন হয়েছে। তবে সফল হওয়া দেশগুলোর লকডাউন ও বাংলাদেশের লকডাউনের মধ্যে পার্থক্য বেশ স্পষ্ট। আমার মতে, এটা লকডাউনের বাংলাদেশি ভার্সন। এই লকডাউন মানুষের চলাফেরা সীমিত করতে পারলেও থামাতে পারেনি। লকডাউনের মধ্যে অফিস কিংবা কারখানার বাইরে তালা লাগিয়ে ভেতরে কাজ পরিচালনার খবরও নেহায়েত কম নয়। সবচেয়ে হতাশার বিষয় হলো- এই সময়ে যে প্রতিষ্ঠানগুলো খোলা থাকা জরুরি, সেই হাসপাতালগুলো বিশেষ করে বেসরকারি হাসপাতালগুলো লকডাউন মেনে চলেছে কার্যকরভাবে। অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, মানুষকে খাবার দিলেই লকডাউন বাস্তবায়ন হয়ে যাবে। ঘরে খাবার না থাকলে মানুষ লকডাউন মানবে না। বাস্তবে হয়েছেও তাই। লকডাইনে নিম্ন আয়ের মানষের ওপর দুর্যোগ নেমে এসেছে। এর মধ্যেই চলেছে ত্রাণের ত্রাস। একদিকে ত্রাণের অপর্যাপ্ততা, অন্যদিকে অব্যবস্থাপনার ফলে ভুগছে নিম্ন আয়ের মানুষজন। করোনার দুর্যোগ মোকাবিলায় সেনা মোতায়েন করা হয়েছে, এই দুর্যোগে এখন পর্যন্ত পুলিশের ভূমিকাও অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে প্রশংসনীয়। সঙ্গত কারণেই দাবি উঠেছিল, পুলিশ-সেনাবাহিনীর মাধ্যমে ত্রাণ বিতরণ করার। যে কোনো কারণেই হোক সেই জন আকাক্ষা বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে লকডাইনেও বন্ধ থাকেনি ত্রাণ চুরি। এখনও অধিকাংশ ডাক্তার-নার্স সুরক্ষা সামগ্রী পাননি। অনেকেই ব্যক্তিগত উদ্যোগে পিপিইসহ অন্যান্য সুরক্ষা সামগ্রী সংগ্রহ করেছেন। সাধারণ মাস্ককে এন-৯৫ হিসাবে সরবরাহ করার প্রচেষ্টা চালিয়েছে বিবেকবিবর্জিত শ্রেণি।
আশঙ্কা করা হচ্ছে, করোনার ভয়াবহতা বাড়তে পারে। এমতাবস্থায় লকডাউন শিথিল করা হয়েছে। পরিস্থিতির দাবিতে আরও কিছুদিন লকডাউন কার্যকর করার ব্যাপারে সরকার পুনর্বিবেচনা করতে পারে। মনে রাখা দরকার, মানুষ বাঁচলেই অর্থনীতি বাঁচবে। মানুষ বিপর্যস্ত হলে অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়বে।
সাংবাদিক
চীনে করোনাভাইরাস শনাক্ত হওয়ার পর তা দ্রুত বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়তে থাকে। এর সঙ্গে ভেঙে পড়ে বিশ্ব যোগাযোগ ব্যবস্থা। আমরা প্রস্তুতির জন্য দুই মাসেরও বেশি সময় পেয়েছি। বাংলাদেশে গত ৮ মার্চ করোনাভাইরাস শনাক্ত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত আমাদের সুরক্ষা ব্যবস্থা (মুখে মুখে) অত্যন্ত মজবুত ছিল। করোনা শনাক্ত হওয়ার পর পরই সেই সুরক্ষা ব্যবস্থাগুলো যেন হাওয়ায় মিশে গেল। সেই ৮ মার্চ থেকে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। লকডাউন করা হয়েছে। লকডাউন বাস্তবায়নে সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে। করোনাভাইরাস শনাক্তকরণ ল্যাবের সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি বিশেষায়িত হাসপাতাল চালু করা হয়েছে।
তবে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সামগ্রিক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলার লেশমাত্র নেই। চলতি বছরের শুরুর দিকে বিদেশি ও বিদেশফেরত বাংলাদেশিদের বিমানবন্দরে স্বাস্থ্য পরীক্ষার নির্দেশনা দেওয়া হয়। আমরা সংবাদমাধ্যম থেকে এই নির্দেশনার বিপরীতে সরকারি কর্মচারীদের নৈরাজ্য দেখেছি। স্বাস্থ্য পরীক্ষা না করেই টাকার বিনিময়ে অনেককে বিমানবন্দর থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। গলদ শুরু বিমানবন্দর থেকে। এরপর বিদেশফেরতদের অবদানে ধীরে করোনার বিস্তার ঘটলে শুরু হয় শনাক্তকরণ পরীক্ষা। ১৭ কোটি মানুষের দেশে শুরুর দিকে প্রতিদিন করোনো টেস্ট করা হতো শ'খানেক মানুষের। জনরোষে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় করোনা পরীক্ষাকেন্দ্রের সংখ্যা বৃদ্ধি করলেও প্রয়োজনের তুলনায় নমুনা সংগ্রহ হচ্ছে না। গত শনিবার পর্যন্ত দেশে প্রায় ৯ হাজার মানুষের মধ্যে করোনা শনাক্ত হলেও দৈনিক নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা মাত্র ৪-৫ হাজারের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। অথচ বিশ্বব্যাপী করোনা পরীক্ষার ওপর অধিক জোর দেওয়া হয়েছে।
করোনার প্রতিষেধক এখনও আবিস্কার হয়নি। কবে আবিস্কার হবে তাও নিশ্চিত করে বলা যায় না। করোনা মোকাবিলায় যে ক'টি দেশ সফল হয়েছে, তাদের প্রধান প্রতিষেধক ছিল লকডাউন। বাংলাদেশেও লকডাউন হয়েছে। তবে সফল হওয়া দেশগুলোর লকডাউন ও বাংলাদেশের লকডাউনের মধ্যে পার্থক্য বেশ স্পষ্ট। আমার মতে, এটা লকডাউনের বাংলাদেশি ভার্সন। এই লকডাউন মানুষের চলাফেরা সীমিত করতে পারলেও থামাতে পারেনি। লকডাউনের মধ্যে অফিস কিংবা কারখানার বাইরে তালা লাগিয়ে ভেতরে কাজ পরিচালনার খবরও নেহায়েত কম নয়। সবচেয়ে হতাশার বিষয় হলো- এই সময়ে যে প্রতিষ্ঠানগুলো খোলা থাকা জরুরি, সেই হাসপাতালগুলো বিশেষ করে বেসরকারি হাসপাতালগুলো লকডাউন মেনে চলেছে কার্যকরভাবে। অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, মানুষকে খাবার দিলেই লকডাউন বাস্তবায়ন হয়ে যাবে। ঘরে খাবার না থাকলে মানুষ লকডাউন মানবে না। বাস্তবে হয়েছেও তাই। লকডাইনে নিম্ন আয়ের মানষের ওপর দুর্যোগ নেমে এসেছে। এর মধ্যেই চলেছে ত্রাণের ত্রাস। একদিকে ত্রাণের অপর্যাপ্ততা, অন্যদিকে অব্যবস্থাপনার ফলে ভুগছে নিম্ন আয়ের মানুষজন। করোনার দুর্যোগ মোকাবিলায় সেনা মোতায়েন করা হয়েছে, এই দুর্যোগে এখন পর্যন্ত পুলিশের ভূমিকাও অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে প্রশংসনীয়। সঙ্গত কারণেই দাবি উঠেছিল, পুলিশ-সেনাবাহিনীর মাধ্যমে ত্রাণ বিতরণ করার। যে কোনো কারণেই হোক সেই জন আকাক্ষা বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে লকডাইনেও বন্ধ থাকেনি ত্রাণ চুরি। এখনও অধিকাংশ ডাক্তার-নার্স সুরক্ষা সামগ্রী পাননি। অনেকেই ব্যক্তিগত উদ্যোগে পিপিইসহ অন্যান্য সুরক্ষা সামগ্রী সংগ্রহ করেছেন। সাধারণ মাস্ককে এন-৯৫ হিসাবে সরবরাহ করার প্রচেষ্টা চালিয়েছে বিবেকবিবর্জিত শ্রেণি।
আশঙ্কা করা হচ্ছে, করোনার ভয়াবহতা বাড়তে পারে। এমতাবস্থায় লকডাউন শিথিল করা হয়েছে। পরিস্থিতির দাবিতে আরও কিছুদিন লকডাউন কার্যকর করার ব্যাপারে সরকার পুনর্বিবেচনা করতে পারে। মনে রাখা দরকার, মানুষ বাঁচলেই অর্থনীতি বাঁচবে। মানুষ বিপর্যস্ত হলে অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়বে।
সাংবাদিক
- বিষয় :
- করোনা