হেই সামালো ধান হো
শেখ রোকন
প্রকাশ: ০৩ মে ২০২০ | ১২:০০
অবিভক্ত বাংলায় তেভাগার আন্দোলন উজ্জীবিত করতে সলিল চৌধুরী যখন 'হেই সামালো ধান হো' গণসঙ্গীত রচনা করেন, তখন ধানের ক্ষেতের দাবিদার ছিল মাত্র দুই পক্ষ। একদিকে জোতদার বা জমিদার, অন্যদিকে কৃষক বা চাষি। হিসাব ছিল পরিস্কার, লেনিনের ভাষায় শত্রু-মিত্র সটান চিহ্নিত। দেশভাগের পর সেই পঞ্চাশের দশকেই জমিদারি ও জোতদারি বিলুপ্ত হয়েছে, ভূমির ওপর সাধারণ চাষির অধিকারের স্বীকৃতি দিয়ে প্রজাস্বত্ব আইন হয়েছে; কিন্তু চাষির জন্য শত্রু-মিত্রের ভেদরেখা যেন আরও ঝাপসা হয়ে গেছে। কৃষকের কল্যাণ নিয়ে এত কার্যক্রম ও কর্মসূচি; কিন্তু যত দিন যাচ্ছে প্রান্তিক চাষি আরও প্রান্তিক হচ্ছে, সংকটের পর সংকট বাড়ছে। করোনাভাইরাস এসেছে কৃষকের বোঝার ওপর শাকের আঁটি হয়ে।
ভরা মৌসুমে লকডাউনের কারণে পর্যাপ্ত কৃষি শ্রমিক পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল। প্রধানমন্ত্রী দলীয় নেতাকর্মীদের কৃষকের পাশে দাঁড়ানোর নির্দেশনা দিয়েছিলেন। সেই নির্দেশনা পালন করতে গিয়ে যে 'ফটোসেশন' চলেছে, তাতে কোথাও কোথাও লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি হয়েছে। কোনো এক টিভি চ্যানেলে একজন কৃষক বলছিলেন, এক ছাত্র সংগঠনের কর্মীরা যদিও আন্তরিকতার সঙ্গেই ধান কেটে দিয়েছে; অপটুতার কারণে ঠিকমতো আঁটি বাঁধতে পারেনি। ফলে ধানের একটি অংশ, তার ভাষায় মূলটা, মাটিতে পড়ে গেছে।
দেশে মোট উৎপাদিত ধানের ৬০ শতাংশই আসে বোরো মৌসুম থেকে। ধানের তিন প্রধান মৌসুমের মধ্যে বোরো দীর্ঘতরও। বীজতলা তৈরি থেকে ধানকাটা পর্যন্ত, অগ্রহায়ণ থেকে বৈশাখ, বছরের প্রায় ছয় মাস এর সঙ্গে নিবিড়িভাবে জড়িত থাকে চাষি। কেবল চাষি নয়- বিদ্যমান কৃষি ব্যবস্থায় বীজ, সার, কীটনাশক, সেচযন্ত্র, ডিজেল খাতও এই মৌসুমের জন্য বছরভর অপেক্ষা করে। অপেক্ষায় থাকে ফড়িয়া, ব্যাপারী, আড়তদার, চাতাল মালিক, চালের ব্যবসায়ী। সরকারি ধান ও চাল ক্রয় উপলক্ষে খাদ্য গুদামের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ক্ষমতাসীন দলের কিছু স্থানীয় নেতাকর্মীর মধ্যে গড়ে ওঠা চক্রও চাতকের মতো তাকিয়ে থাকে বোরো মৌসুমের দিকে।
আউশ ধান যদিও সবচেয়ে কম সময়ে ঘরে তোলা যায়, বৈশাখ থেকে শ্রাবণ, বর্ষা ও বন্যায় খেয়ে যাওয়ার অনিশ্চয়তায় এই মৌসুম থেকে ক্রমেই সরে এসেছে চাষিরা। আমন যদিও সবদিক থেকে সুবিধাজনক- কৃত্রিম সেচ ও সার লাগে না বললেই চলে। এমনকি বোনা বা ছিটানো আমনের ক্ষেত্রে বীজতলা তৈরি ও জমি চাষেরও প্রয়োজন হয় না। কিন্তু এই মৌসুমের স্বল্প ফলন দিয়ে ১৭ কোটি মানুষের দেশে ভাতের চাহিদা মেটানো কঠিন। বিপুল উৎপাদন খরচ দিয়ে বেশি ফলনে আদৌ কোনো লাভ হয় কিনা, সেটা অবশ্য ভিন্ন প্রসঙ্গ।
বোরো মৌসুমে কৃষক যদি সুষ্ঠুভাবে ধান ঘরে তুলতে পারে, যদি উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য পায়, তাহলে দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি এবং গ্রাম-শহর নির্বিশেষে খাদ্য নিরাপত্তা সুরক্ষিত থাকে। আর যদি খোদা নাখাস্তা একটি বোরো মৌসুম ভেস্তে যায়, তাহলে সারাদেশের জন্য গোটা বছর খাদ্য মজুদ নাজুক হয়ে পড়ে। বাংলাদেশ গত এক দশকে খাদ্যশস্যে যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে, তা ফসকে যাওয়ার উপক্রম হয়। দুর্ভাগ্যবশত প্রায় প্রতিবছরই দেশের কোথাও না কোথাও বোরো ফসল নষ্ট হয়। বিশেষত হাওরাঞ্চলে দু-এক বছর পরপরই বোরো ফসল খেয়ে যায় আগাম বন্যা। বোরো ধানের কমবেশি ২০ শতাংশের জোগান আসে সেখান থেকে। নদীর গুরুত্ব অস্বীকার করায় ডুবো বাঁধ দিয়ে হাওরাঞ্চলের ফসল রক্ষাকারী লোকায়ত ব্যবস্থা সাম্প্রতিক সময়ে কীভাবে ঘন ঘন ব্যর্থ প্রমাণ হচ্ছে, তা নিয়ে আরেকটি নিবন্ধ লেখা যেতে পারে।
অনেকের জন্য স্বস্তির বিষয় হতে পারে- এবার হাওরাঞ্চলের ফসল ঘরে তোলা নিয়ে আশঙ্কা আর নেই। এবারও আগাম বন্যায় হাওরের বোরো ধান মার খেতে পারে বলে সংবাদমাধ্যমে যে শঙ্কা প্রকাশ হয়েছিল, তা ইতোমধ্যে কেটে গেছে। শুক্রবার কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, হাওরাঞ্চলের সাত জেলার ৭৭ শতাংশ ধানই কাটা শেষ। ১৩ শতাংশ এখনও পাকেনি। বাকি ১০ শতাংশ পাকা ধান কাটাও হয়তো গত তিন দিনে কমবেশি সম্পন্ন হয়েছে। ওদিকে আগাম বন্যার আশঙ্কাও এবার নেই। শনিবারই বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের ইন্টারেকটিভ ম্যাপ দেখছিলাম। সারাদেশের বিভিন্ন নদীতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের যে ৮৬টি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র রয়েছে, সবই সবুজ দেখাচ্ছে। আশা করা যায়, এগুলো হলুদ, কমলা বা লাল হতে হতে হাওরাঞ্চলের সব ধানই ঘরে উঠে আসবে।
তাহলে তো সবই ঠিকই আছে!
সব ঠিক আছে এখনও বলা যাবে না অন্তত দুটি কারণে। প্রথমত, এই ব্যাখ্যা খুব কম সময়ই দেওয়া হয়ে থাকে যে, হাওরাঞ্চলে বন্যা যেমন আগাম, বোরো ধানও তেমনই আগাম। সেখানকার ধান যদিও বৈশাখের মাঝামাঝিতে সব পেকে যায়, দেশের বাকি অংশে তেমন নয়। বৈশাখের পর গোটা জ্যৈষ্ঠ কাটিয়ে আষাঢ়ের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্তও বোরো ধান কাটা চলতে থাকে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের আলোচ্য সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতেই বলা হয়েছে, দেশের অন্যান্য এলাকায় শুক্রবার পর্যন্ত মাত্র ১৬ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। তার মানে, দেশে বোরো উৎপাদনের ৮০ ভাগ এলাকার ৮০ ভাগের বেশি ধান এখনও কাটা বাকি। বাকি মানে, এখনও কাটার উপযোগী হয়নি। এই ধান ঘরে ওঠার আগে যদি ঝড়, বর্ষণ, বৃষ্টি দেখা দেয়, তাহলে বোরো মৌসুমের ৮০ ভাগ আক্ষরিক অর্থেই মাঠে মারা যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয় বৈকি। এই ঝুঁকি সামলানোর ব্যাপারে আমরা কতটা সতর্ক ও প্রস্তুত?
আমার ক্ষুদ্র পর্যবেক্ষণ- হাওরাঞ্চলের ধান নিয়ে সরকার ও সংবাদমাধ্যমের মনোযোগ যতটা বেশি ছিল, বাকি অংশের ধান নিয়ে যেন ততটাই উদাসীন। এবার শুধু নয়, প্রতিবছরই কমবেশি এমন ঘটে। কিন্তু করোনা পরিস্থিতিতেও একই ঔদাসীন্য হবে আত্মঘাতের নামান্তর। মনে রাখতে হবে, অর্থনীতির বাকি সব চাকা যখন স্থবির; তখন সুষ্ঠু বোরো মৌসুম নিম্ন ও মধ্যবিত্তের মধ্যে আশা ও আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনবে। এমনকি আগামী কয়েক মাস ত্রাণ কার্যক্রমও সুষ্ঠুভাবে চালাতে হলেও বোরো ধানের চালান মিস করা যাবে না।
দ্বিতীয়ত, এবং প্রধানত, ধানের ন্যায্যমূল্য যে কোনো মূল্যে নিশ্চিত করতে হবে। সরকার এবারও কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনার ঘোষণা দিয়েছে। ২৬ টাকা কেজি দরে আট লাখ টন ধান কেনা হবে। যদিও মোট উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ২ কোটি ৪ লাখ টনের তুলনায় এই পরিমাণ সামান্যই; যদি সত্যিই 'সরাসরি' কেনা যায়, করোনাকালো কৃষকের বড় উপকার হবে। ২৬ টাকা কেজিও দাম মন্দ নয়। অনেক সময় 'ভেজা' আখ্যা দিয়ে কৃষকের ধান ফিরিয়ে দেয় গুদাম কর্মকর্তারা। কৃষকের তো ধান মজুদ রাখার সঙ্গতি নেই, তখন বাধ্য হয়ে আড়তে বা চাতালে বিক্রি করে। আমার কথা, প্রয়োজনে দাম দুই-এক টাকা কম রাখা হোক; প্রয়োজনে কর্তৃপক্ষ নিজেই ধান শুকিয়ে গুদামে তুলুক; তবু কৃষকের কাছ থেকে ভরা মৌসুমেই কেনা হোক। খাদ্য গুদামগুলো সাধারণত উপজেলা পর্যায়ে; প্রতিটি ইউনিয়নে ধান ক্রয়ের ব্যবস্থা করলে কৃষকের পক্ষে সরাসরি ধান বিক্রয় সহজ হবে।
মোট কথা, করোনা পরিস্থিতির অভিঘাত যদি সামলাতে হয়, সরকারকে এবার বোরো ধান সামলাতেই হবে। বোরো ধান সামলানো মানে সরকারের সামান্য সদিচ্ছা ও সক্রিয়তা- কৃষক যাতে তার ধান ন্যায্যমূল্যে বিক্রি করতে পারে, সরাসরি খাদ্য গুদামে দিতে পারে, বর্ষা ও বন্যার আগে মাঠের ধান ঘরে তুলতে পারে।
করোনাকালে আমরা বিমান, নৌ, স্থলবন্দর সামাল দিতে ব্যর্থ হয়েছি। লকডাউন ঘোষণা করেও কার্যকর করতে ব্যর্থ হয়েছি। পর্যাপ্ত পরীক্ষা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে ব্যর্থ হয়েছি। বোরো ধান সামলাতেও যদি ব্যর্থ হই, তাহলে করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সাফল্যের জন্য হাতে থাকবে কেবল পেন্সিল।
[email protected]
লেখক ও গবেষক
- বিষয় :
- কৃষি