ঢাকা বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬

সংক্রমণ বাড়ার শঙ্কা

নিয়ন্ত্রণের সুযোগ হাতছাড়া নয়

নিয়ন্ত্রণের সুযোগ হাতছাড়া নয়
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ০৩ মে ২০২০ | ১২:০০

দেশে করোনা সংক্রমণের দুই মাস পূর্ণ হওয়ার আগমুহূর্তে পরিস্থিতি উন্নতির লক্ষণ আমরা সামান্যই দেখছি। রোববার একদিনে দেশে সর্বোচ্চ ৬৬৫ জনের শরীরে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার খবর এবং একই দিনে সমকালে প্রকাশিত 'মে মাসেই লক্ষাধিক আক্রান্তের আশঙ্কা' শীর্ষক প্রতিবেদন- উভয়টি সে ইঙ্গিতই দিচ্ছে। তবে সার্বিক দিক বিবেচনায় আমরা মনে করি, দেরি হলেও পরিস্থিতি এখনও নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি। বস্তুত সমকালের প্রতিবেদনটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরেরই জনস্বাস্থ্যবিদদের পর্যালোচনার ফল। তারা সংক্রমণের চলমান ধারা অব্যাহত থাকা ও অবনতি হলে কেমন হবে উভয় অবস্থার পূর্বাভাস দিয়েছেন। বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে চলতি মে মাসে ৪৮ থেকে ৫০ হাজার মানুষ আক্রান্ত হওয়া কিংবা পরিস্থিতি মারাত্মক হলে এক লাখ আক্রান্ত হওয়ার পরিসংখ্যান যুক্তিগ্রাহ্য বলেই আমাদের মনে হয়। অবস্থা বাস্তবে একেবারে না মিললেও পূর্বাভাসের সত্যতা রয়েছে। বিশেষ করে আমরা গত কয়েক দিনে লকডাউনের ঢিলেঢালা চিত্রই দেখেছি। যদিও দেশের অর্থনীতি বিবেচনায় পোশাক শিল্প কারখানা খুলে দেওয়ার বিষয়টি আমরা ইতিবাচক বলে মনে করি। তবে করোনা থেকে সুরক্ষায় স্বাস্থ্য সচেতনতা ও সতর্কতার ওপর জোর দেওয়ায় কোনো ছাড় নয়।
আমরা জানি, সংক্রমণ ব্যাধি হিসেবে করোনাভাইরাস প্রতিরোধের মূল বিষয়ই হলো সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা। লকডাউন শিথিল হওয়ার কারণে সঙ্গনিরোধ ব্যবস্থা পুরোপুরি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনকি আমরা দেখেছি শহরের কাঁচাবাজারগুলোতে ক্রেতা-বিক্রেতা কেউই সেভাবে দূরত্ব বজায় রাখছেন না। ব্যাংকগুলোতেও মানুষের ভিড় লক্ষণীয়। আবার শহরে মানুষ যতটা সতর্ক হয়ে চলাফেরা করছেন, গ্রামে তা দেখা যাচ্ছে না। অনেকে হয়তো ঘরে থেকে হাঁপিয়ে উঠছেন; প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে ঘরের বাইরে যাচ্ছেন। এমন ঢিলেঢালা ভাব চলতে থাকলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা আরও কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।
বৈশ্বিক মহামারি করোনা নিয়ন্ত্রণে যেসব দেশ সফল হয়েছে, তারা সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার পাশাপাশি অধিক পরিমাণে পরীক্ষা নিশ্চিত করেছে। এ পরীক্ষার দিক থেকে আমরা পিছিয়ে আছি। যদিও এটা সত্য যে, প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগে পরীক্ষার পরিধি বাড়ছে। সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ত্রিশের অধিক ল্যাবের মাধ্যমে এখন গড়ে পাঁচ হাজার করোনাভাইরাস পরীক্ষা হচ্ছে। তারপরও এটি যথেষ্ট নয়। এ পরীক্ষার পরিমাণ ও পরিধি আরও কীভাবে বাড়ানো যায় তা নিয়ে ভাবার অবকাশ রয়েছে।
এটি অনস্বীকার্য যে, লকডাউন দীর্ঘতর হওয়ার কারণে তার প্রভাব পড়ছে নিন্মমধ্যবিত্ত ও নিন্মবিত্তের ওপর। কাজের অভাবে অনেকেই নিত্যদিনের খাবার বন্দোবস্তে হিমশিম খাচ্ছে, এ অবস্থায় তাদের জন্য ত্রাণের ব্যবস্থা কিংবা তাদের কাজের সুযোগ করে দেওয়া প্রয়োজন। উভয় অবস্থায়ই সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা কঠিন হলেও বাঁচার তাগিদেই সতর্কতার সঙ্গে তা নিশ্চিত করতে হবে। সরকার ১৬ মে পর্যন্ত সাধারণ ছুটি বাড়িয়েছে। আমরা মনে করি, অবস্থার আলোকেই লকডাউন ও ছুটি দীর্ঘতর হচ্ছে। ফলে ইতোমধ্যে যে লকডাউনে শিথিলতা দেখা গেছে তা আর বাড়তে দেওয়া যাবে না। অন্তত সাধারণ ছুটি পর্যন্ত কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতেই হবে। নচেৎ সামাজিক বাঙালিকে ঘরে ধরে রাখা সম্ভব হবে না। আর তাতে সম্ভব হবে না পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখাও। করোনাভাইরাসের ওষুধ আবিস্কার হয়নি বলে এখন সতর্কতা ও সঙ্গনিরোধ ব্যবস্থার বিকল্পও নেই। এক্ষেত্রে কেবল প্রশাসন কিংবা সেনাবাহিনী-পুলিশের ভয়ে নয় বরং আমরা চাই, সাধারণ মানুষ নিজেদের সুরক্ষার স্বার্থেই প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি ও সতর্কতা বজায় রাখুক।
ইতোমধ্যে যারা করোনায় আক্রান্ত হয়েছে তাদের যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করাও এ সময়ের জরুরি কর্তব্য। আক্রান্ত রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক আইসোলেশন শয্যা, ভেন্টিলেটর এবং আইসিইউ বেড প্রস্তুত রাখা প্রয়োজন হলেও সে প্রস্তুতি সন্তোষজনক নয় বলেই বিশেষজ্ঞদের মত। চিকিৎসকদের সুরক্ষার জন্য মানসম্পন্ন ও মাস্ক নিয়েও রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। করোনা পরীক্ষার জন্য কিট সংকটের বিষয়টিও সংবাদমাধ্যমে এসেছে। আমরা মনে করি এসব দিকে নজর বাড়াতেই হবে। সবকিছু রাজধানীতে কেন্দ্রীভূত না করে প্রত্যেকটি জেলা হাসপাতালে আইসিইউ ও ভেন্টিলেটর বসানোসহ টেস্ট করা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা প্রস্তুত রাখা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞরা যেহেতু পূর্বাভাস দিয়েছেন চলতি মাসেই সর্বোচ্চ সংক্রমণ হবে তাই এ মাসের বাকি সময়টায় প্রশাসনকে সর্বোচ্চ সতর্কতা বজায় রাখতেই হবে। লকডাউনে কঠোর হওয়াসহ মানুষকে ঘরে রাখার ব্যবস্থা নেওয়া চাই। জুনের মাঝামাঝি সংক্রমণ কিছুটা কমে আসার ইঙ্গিত রয়েছে বলে আমরা চাই, এ শেষ সময়টায় আর কোনো ছাড় নয়। অন্যথায় নিয়ন্ত্রণের সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে।

আরও পড়ুন

×