ঢাকা বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬

হুর কাছে যেসব প্রশ্নের উত্তর নেই

হুর কাছে যেসব প্রশ্নের উত্তর নেই
×

রাশেদ মেহেদী

প্রকাশ: ০৩ মে ২০২০ | ১২:০০

বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো হাস্যকর চরিত্র আর কেউ আসেননি। তিনি সর্বসম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (হু) কড়া সমালোচনা করেছেন। এমনকি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের অনুদান বন্ধেরও হুমকি দিয়েছেন। আমি অনুদান বন্ধের পক্ষে নই। কিন্তু ট্রাম্পের সমালোচনাকে যুক্তিযুক্ত বলেই মনে হয়। প্রশ্ন ওঠে, ৩১ ডিসেম্বর যখন উহানে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ে তখন সত্যিই কি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যথাযথ গুরুত্ব দিয়েছিল? আজকের দুনিয়ায় অত্যাধুনিক উড়োজাহাজ যোগাযোগ ব্যবস্থা যেখানে বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যোগাযোগটাকে ঘণ্টার হিসাবের মধ্যে বেঁধে ফেলেছে, তখন একটা অতিমাত্রায় সংক্রামক ভাইরাসের একটি শহরে উত্থানকে কতটা গুরুত্ব দিয়েছিল হু?
চীনের উহানে ১০ হাজার ব্যক্তির মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পর ৩১ জানুয়ারি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বিশ্বব্যাপী জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে। যে ঘোষণায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান বলেন- চীনে এটার বিস্তার বাড়ছে সেদিকে খেয়াল রেখে নয়, বরং বিশ্বের দুর্বল অর্থনীতির দেশগুলোর যেখানে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাও দুর্বল সেসব দেশের জন্যই এই জরুরি অবস্থা জারি করা। কারণ যথেষ্ট শক্তিশালী স্বাস্থ্থ্য ব্যবস্থা নেই সেখানে, তাই করোনা ভাইরাস মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এ ঘোষণা থেকেই বোঝা যায়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জরুরি অবস্থা ঘোষণার সময়ই বুঝতে পারেনি যে, এই ভাইরাস শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ ইতালি, ফ্রান্স, স্পেন এমনকি বর্তমান পুঁজিবাদী বিশ্বায়নের মোড়ল যুক্তরাষ্ট্রেও এটি মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এমনকি চীনে যখন করোনাভাইরাস ২১৩ জনের প্রাণ নিয়েছে, তখনও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উপযুক্ত কোনো প্রতিনিধি দল চীনে যায়নি। এমনকি ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম দুই সপ্তাহেও কভিড-১৯ সংক্রমণ বিস্তার রোধ এবং উপসর্গজনিত অবস্থা সম্পর্কে একটা স্বাস্থ্য নির্দেশিকাও চূড়ান্ত করতে পারেনি। যুক্তিসঙ্গতভাবেই বলা যায়, সঠিক সময়ে এই অতি সংক্রামক ভাইরাসের শক্তি সম্পর্কে উপযুক্ত ধারণা দিতে ব্যর্থ হয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
এর আগে আফ্রিকায় ইবোলা ভাইরাস, দক্ষিণ ভারতে নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণজনিত পরিস্থিতিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যেভাবে আগাম বার্তা দিয়ে, স্বাস্থ্য সংক্রান্ত নির্দেশিকা দিয়ে বিশ্বকে এর বিরুদ্ধে সচেতন এবং সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে সক্ষম হয়েছিল, কভিড-১৯-এর ক্ষেত্রে সেটা কেন পারল না? করোনার প্রথম প্রজন্ম ২০০৩ সালে সার্স, ২০১২ সালে দ্বিতীয় প্রজন্ম মার্শ এবং ২০১৯-এর শেষ দিনে কভিড-১৯-এর উত্থান একটা শহর থেকেই। যার নাম উহান। আর এই উহানেই বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ইনস্টিটিউট অব ভাইরোলজি! আমরা এই প্রতিষ্ঠানকে প্রশ্নবিদ্ধ করি না, কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানের ছায়ার নিচে থাকা শহর থেকেই কেন বারবার ভাইরাস ছড়ায়?
চীন সরকারের তথ্য-প্রবাহেও পুরো বিষয়টি কুয়াশাচ্ছন্ন। আজও বিশ্ববাসী জানে না উহানে এটি কীভাবে ছড়িয়েছিল। ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর চীন সরকার প্রথম উহানে করোনাভাইরাসের উপস্থিতির কথা জানায়। কিন্তু কত আগে থেকে তৃতীয় প্রজন্মের করোনাভাইরাস বিস্তৃত হতে শুরু করেছিল, সে সম্পর্কে কিছু জানায়নি। একেবারেই বিশ্বাস করতে চাই না, করোনাভাইরাস ভয়ংকর কোনো জীবাণু অস্ত্রবিষয়ক কোনো গবেষণার একটা দুর্ঘটনার ফল। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতনামা সাংবাদিক সাদ ওলসানের আলোচিত অনুসন্ধানী রিপোর্টকেও আমরা আমলে নিতে চাই না। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে, উহান থেকে পাঁচশ' কিলোমিটার দূরে বেইজিং শহরে কভিড-১৯ তাণ্ডব চালাতে ব্যর্থ হলো, অথচ প্রায় ছয় হাজার কিলোমিটার দূরে ইতালি, স্পেনে তাণ্ডব চালাল, এগারো হাজার কিলোমিটার দূরে নিউইয়র্কে তাণ্ডব চালাল কীভাবে? এরপর যখন বিশ্বের প্রায় দুই শতাশিক দেশে ছড়াল, তখন চীন নিজের ভূখণ্ডের ভেতরে ভাইরাস সংক্রমণ নিয়ে এমন 'রিলাক্সড' আচরণ কীভাবে করছে সে প্রশ্নটিও কিন্তু বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে। এখন যদি প্রশ্ন ওঠে, আগাম প্রস্তুতি
থাকার কারণে গোপনে চীন এই ভাইরাস প্রতিরোধী ভ্যাকসিনও তৈরি করেছে এবং সে দেশে গণহারে প্রয়োগ করেছে, সেটাও কি হেসে উড়িয়ে দেওয়া যায়?
কভিড-১৯ চীনের অর্থনীতিতে খুব বড় একটা প্রভাব ফেলেনি। কারণ উহানের বাইরে চীনের আর কোনো বড় বাণিজ্যিক শহরে কভিড-১৯-এর তাণ্ডবের নজির নেই। অথচ চীনের বানিজ্যিক প্রতিদ্বন্দ্বী ইউরোপের শক্তিশালী অর্থনীতির কয়েকটি দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্র কি ভয়ংকর বিপর্যয়ে পড়েছে! আমাদের দেশের মতো উঠতি অর্থনীতির দেশগুলোর সামনে বিপর্যয়ের আশঙ্কা আরও বড় হয়ে সামনে এসেছে। এখন যে অবস্থা, বিশ্ব অর্থনীতিতে চীনের বিকল্প বিশ্বায়নই এখন বড় বাস্তবতা হিসেবে সামনে চলে এসেছে। আমাদের দেশের মতো দেশগুলো শুধু নয়, এশিয়া এবং ইউরোপের শক্তিশালী অর্থনীতির দেশগুলোকেও বড় মন্দা ঠেকাতে চীনের প্রতিই নির্ভরতা বাড়াতে হবে, এর বিকল্প নেই। তাহলে কভিড-১৯ বিপর্যয় থেকে সুদে-আসলে লাভটা কার বেশি হলো? অবশ্যই চীনের।
এখন কভিড-১৯-এর উৎপত্তি সম্পর্কে আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি উঠেছে। সেই দাবি শুরুতেই একবাক্যে প্রত্যাখ্যান করেছে চীন। কভিড-১৯-এ সারাবিশ্ব বিপর্যস্ত হয়েছে, মানুষকে জীবন দিতে হয়েছে উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিম সর্বত্র। অতএব বিশ্বেরও জানার অধিকার আছে কেন, কীভাবে, কোত্থেকে এর উৎপত্তি। চীন শক্তিধর স্বাধীন রাষ্ট্র হলেও বিশ্ব সমাজের বাইরে নয়। তারা জাতিসংঘের সদস্য। অতএব তাদের একক সিদ্ধান্তে এ তদন্ত বন্ধ হতে পারে না। প্রয়োজনে পুরো বিশ্বকে এক হয়ে চাপ দিয়ে হলেও চীনকে তদন্তে সহায়তার জন্য রাজি করাতেই হবে। আর এর দায়িত্ব বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকেই নিতে হবে। ভবিষ্যতে আক্রমণ আরও ভয়াবহ হলে এ ধরনের একটা ভাইরাসই যে মানব সভ্যতাকে প্রাগৈতিহসিক রূপ দিতে পারে কয়েক দিনেই,কভিড-১৯-এর পরও কি সেই শিক্ষা বিশ্ব নেবে না?
সাংবাদিক

আরও পড়ুন

×