ঢাকা বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬

রবীন্দ্রনাথের ভিক্ষুকন্যা ও ঝিনাইগাতীর নাজিমুদ্দিন

রবীন্দ্রনাথের ভিক্ষুকন্যা ও ঝিনাইগাতীর নাজিমুদ্দিন
×

রাজীব সরকার

প্রকাশ: ০৩ মে ২০২০ | ১২:০০

'কথা ও কাহিনী'র অন্তর্গত 'নগরলক্ষ্মী' কবিতায় রবীন্দ্রনাথ দুর্ভিক্ষের স্মরণীয় চিত্র এঁকেছেন। দুর্ভিক্ষের কারণে শ্রাবস্তীপুরে যখন চরম হাহাকার, তখন গৌতম বুদ্ধ তার ভক্তদের জিজ্ঞাসা করলেন- এই মহামারিতে মৃতপ্রায় ক্ষুধার্তদের অন্নদানসেবা কে করবে? বিত্তশালী ভক্ত রত্নাকর শেঠ, জয়সেন, ধর্মপাল- প্রত্যেকেই নিজেদের অক্ষমতার কথা জানালেন। ভক্তদের অপারগতায় বুদ্ধ যখন বেদনার্ত তখন ভিক্ষুকন্যা সুপ্রিয়া এগিয়ে এলো। কপর্দকশূন্য এই নারী বুদ্ধকে প্রণাম করে বলল, 'কাঁদে যারা খাদ্যহারা/আমার সন্তান তারা/নগরীরে অন্ন বিলাবার/আমি আজ লইলাম ভার।' সবাই বিস্মিত হয়ে বলল, দীনহীন সুপ্রিয়া কীভাবে ক্ষুধার্তকে অন্ন যোগাবে। সুপ্রিয়া বলে যে সে তার ভিক্ষাপাত্র নিয়ে সবার কাছে যাবে। সবার কাছ থেকে সাহায্য গ্রহণ করে সে তার ভিক্ষাপাত্র পরিপূর্ণ করবে। তার প্রত্যয়, 'ভিক্ষা- অন্নে বাঁচাব বসুধা-/ মিটাইব দুর্ভিক্ষের ক্ষুধা।'
কাকতালীয়ভাবে রবীন্দ্রনাথের এই কবিতার সঙ্গে মিলে গেছে শেরপুর জেলার ঝিনাইগাতী উপজেলার সাম্প্রতিক একটি ঘটনা। করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় উপজেলা নির্বাহী অফিসারের হাতে নিজের সর্বস্ব দশ হাজার টাকা তুলে দিয়েছেন ভিক্ষুক নাজিমুদ্দিন। ভিক্ষুকন্যা সুপ্রিয়া যে আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছিলেন, ভিক্ষুক নাজিমুদ্দিন সেটি বাস্তবায়ন করে দেখালেন। ভিক্ষার মাধ্যমে অর্জিত দশ হাজার টাকা তার একমাত্র সম্বল। এই সঞ্চয়টুকু দিয়ে সাহায্য করলেন করোনায় ক্ষতিগ্রস্তদের। দেশের এক প্রান্তে ঘটে যাওয়া এ ঘটনাটি সারাদেশের নজর কাড়ে। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নাজিমুদ্দিনের মহানুভবতায় মুগ্ধ হন এবং তাকে ঘর নির্মাণের জন্য জমি ও টাকা দেওয়ার জন্য স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশ দেন। শেরপুর জেলা প্রশাসন ইতোমধ্যে এই উদ্যোগ গ্রহণ করেছে এবং তাকে সংবর্ধনা জ্ঞাপন করেছে।
'আমার যেটুকু সাধ্য করিব তা আমি'- এই নীতিতে বলীয়ান হয়ে নিঃস্ব নাজিমুদ্দিন যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর। তার এ সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে যে, দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রধান শর্ত সদিচ্ছা। অতীতে বিভিন্ন দুর্যোগে মানুষের পাশে মানুষ দাঁড়িয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে এটি বাংলাদেশের অন্যতম শক্তি। করোনা অভূতপূর্ব বিপর্যয় তৈরি করেছে। এখন অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় দুর্গত মানুষের পাশে থাকা বেশি জরুরি। দুর্ভাগ্যজনক সত্য হচ্ছে, সামর্থ্য থাকার পরও অনেকেই এগিয়ে আসছেন না। আক্রান্ত ব্যক্তিরা বৈশ্বিক মহামারির শিকার। তারা অপরাধী নন। অতি সচেতনতার কারণে করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে অনেকেই অমানবিক আচরণ করছেন। জঙ্গলে অসুস্থ মাকে রাতের আঁধারে ফেলে রেখে সন্তানদের পালিয়ে যাওয়া, করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে শত্রুর মতো আচরণ করা সভ্য সমাজের লক্ষণ নয়।
সম্মিলিতভাবে এই দুর্যোগ মোকাবিলা যখন জরুরি, তখন বিত্তবান ও শিক্ষিত মানুষের একাংশ নিজেদের বিবেক বিসর্জন দিয়ে করোনা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।
প্রাবন্ধিক ও গবেষক

আরও পড়ুন

×