ক্রান্তিকালে রাজনীতিকদের করণীয়
×
এম হাফিজউদ্দিন খান
প্রকাশ: ০৫ মে ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০
সবচেয়ে বেশি সংক্রমিত দেশগুলোয় করোনার প্রকোপ ধীরে ধীরে কমে এলেও আমাদের দেশে আক্রান্ত ও মৃতের হার দুই-ই বাড়ছে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ, করোনাভাইরাস নিয়ে তথ্য গোপনের অপকৌশল থেমে নেই। নিঃসন্দেহে তা অত্যন্ত বিপজ্জনক। করোনা যেহেতু সংক্রামক ব্যাধি, তাই কেউ যদি এ ক্ষেত্রে প্রকৃত তথ্য আড়াল করেন তাহলে তাতে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বিরূপ প্রভাব পড়তে বাধ্য। তথ্য গোপনের এই তথ্য যদি সঠিকই হয় তাহলে আক্রান্তের সঠিক সংখ্যাচিত্র আমরা পাচ্ছি না তা ধরেই নেওয়া যায়। আমাদের বিদ্যমান বাস্তবতায় উদ্বেগের কারণ আছে আরও। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ইতোমধ্যে সমাজে নানা রকম বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। দেশের অনেকাংশে লকডাউনের কারণে সারাদেশে খাদ্য নিরাপত্তা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। ত্রাণের জন্য হাহাকার বাড়ছে। মানুষ সীমাহীন কষ্টে আছে।
বিদ্যমান সংকট মোকাবিলায় সরকার বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়েছে সত্য, কিন্তু এসব কর্মসূচি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় সমন্বয়হীনতার পাশাপাশি সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীল অনেকের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের খতিয়ান উঠে আসছে সংবাদমাধ্যমে। এমতাবস্থায় রাজনীতিকদের ভূমিকা নিয়েও বিস্তর প্রশ্ন উঠেছে। শুধু তাই নয়, প্রশ্ন উঠেছে সংসদ সদস্যদের ভূমিকা নিয়েও। দোষারোপের বাক্যবান আমাদের দেশের রাজনীতিতে পুরোনো বিষয়। স্বাধীনতা-উত্তর রাজনীতির সংজ্ঞাসূত্র অনেক ক্ষেত্রে পর্যুদস্ত হতে দেখা গেছে। পর্যায়ক্রমে তা প্রকটই হয়েছে এবং সবচেয়ে বিস্ময়কর হলো, দেশের যে কোনো ক্রান্তিকালেও আমাদের রাজনীতির অঙ্গনে অনৈক্য তো বটেই, বহু ক্ষেত্রে রাজনীতিকদের মৌনতাও খুবই বিস্ময়ের। বর্তমান প্রেক্ষাপট যেন ফের এরই প্রতিচিত্র উপস্থাপিত করেছে। যে যুদ্ধ করোনার বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত বিশ্বের প্রায় ২১০টি দেশে চলছে এর শেষ কবে তা এখনও আমরা কেউ জানি না। আমরাও যুদ্ধরত। সরকারের দায়িত্বশীলরা, চিকিৎসক ও চিকিৎসা-সংশ্নিষ্টরা, বেসরকারি পর্যায়ের বিভিন্ন সংস্থা, সামাজিক সংস্থার প্রতিনিধিরা মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন।
রাজনীতিক কিংবা সংসদ সদস্যরা যদি এই ক্রান্তিকালে এককাতারবদ্ধ হয়ে মানুষের কল্যাণে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়ে মাঠে নামতেন, তাহলে ত্রাণ বণ্টনে কিংবা ১০ টাকা কেজি দরে ওএমএসের চাল বিক্রির ক্ষেত্রে দুর্নীতি হয়তো অনেকটাই ঠেকানো যেত। রাজনীতিক কিংবা জনপ্রতিনিধিরা জনগণের সুখ-দুঃখের সঙ্গী হবেন, এটাই তো স্বাভাবিক। সুখের সময় তারা দুধের মাছি হবেন আর দুঃখের সময় আকাশের চাঁদ হয়ে যাবেন, তা তো প্রত্যাশিত নয়। প্রশ্ন উঠতে পারে, সব সংসদ সদস্য কিংবা রাজনীতিকই কি এককাতারে? অবশ্যই না, ব্যতিক্রমও আছেন, তবে এই সংখ্যা যে বেশি নয়, তা বলাই বাহুল্য। জনপ্রতিনিধি কিংবা রাজনীতিকরা মানুষের দুর্দিনে মানুষের পাশে থেকে তাদের প্রয়োজনমতো কাজ করবেন এই চাওয়াটাই সঙ্গত। বিদ্যমান করোনা সংকটে রাজনীতিক ও সংসদ সদস্যদের কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা পালন করতে না দেখায় শুধু যে হতাশা ও বিস্ময়েরই সৃষ্টি করেছে তাই নয়, জন্ম দিয়েছে জিজ্ঞাসারও। এই দুর্যোগ-দুর্বিপাকে যারা জনগণের পাশে থেকে কাজ করছেন তারা অবশ্যই সাধুবাদ পাবেন। কিন্তু যারা তা করছেন না তারা কোন সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত হবেন- এই প্রশ্নটা এড়ানো যাবে না।
আমি মনে করি, এ মুহূর্তে দরকার জাতীয় ঐক্য। বিএনপি ও বাম দলগুলা এর ওপর গুরুত্বারোপ করেছে বটে, কিন্তু জাতীয় ঐক্যের যে উদ্যোগ প্রথমত সরকারেরই নেওয়া প্রয়োজন তা দৃষ্টিগ্রাহ্য হচ্ছে না। উপরন্তু পারস্পরিক সেই পুরোনো কায়দায় দোষারোপের বাক্যবাণই শোনা যাচ্ছে। এমন কর্মকাণ্ড কোনো সংকটেই কাম্য নয়। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা যেমন সরকারের দর্পণ, তেমনি দলমত নির্বিশেষে রাজনীতিকরাও যে কোনো সংকটে জনগণের দর্পণ হয়ে উঠবেন এটাও প্রত্যাশা। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন দল থেকে নির্বাচিত অনেক সংসদ সদস্যকে তাদের নির্বাচনী এলাকায় জনগণ এই সংকটে পাশে পাচ্ছে না- এমন সংবাদ অপ্রীতিকর। আবার কেউ কেউ দায়সারাভাবে লোক দেখানো কিছু কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন- এমন অভিযোগও খুব পুষ্ট। এসব বিষয়ে সাধারণ মানুষের সংঘবদ্ধ বিক্ষোভের ঘটনাও ইতোমধ্যে ঘটেছে। একটা কথা মনে রাখা দরকার, জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে যারা নির্বাচিত হয়েছেন জনগণের প্রতি তাদের দায়টা অনেক বেশি। যারা রাজনীতি করেন, তারা তাদের দায় ভুলে থাকা মানে স্ববিরোধিতারই নামান্তর।
যারা দিন আনেন দিন খান সেসব মানুষকে ঘরে রাখা খুবই কঠিন। অথচ এই সংক্রামক দুর্যোগ ঠেকাতে ঘরে থাকার অর্থাৎ সামাজিক-শারীরিক দূরত্বের বিকল্প নেই। এসব মানুষকে ঘরে রাখতে হবে সামগ্রিক প্রয়োজনের নিরিখেই। আর এজন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন তাদের খাদ্য সহায়তা নিশ্চিত করা। দলমত নির্বিশেষে এই সংকটে রাজনীতিকরা বিপন্ন মানুষের ঘরে ঘরে খাদ্যসামগ্রী পৌঁছানোর ব্যবস্থা করুন। যেসব লোভাতুর ত্রাণসামগ্রী লুটপাট করছে, ওএমএসের ১০ টাকা কেজির চাল আত্মসাৎ করছে, টিসিবির পণ্য কালোবাজারে বিক্রি করে নিজেরা ফুলেফেঁপে উঠছে, তাদের প্রতি কোনো রকম অনুকম্পা কাম্য নয়। রাজনীতিকরা এই দুর্বৃত্তদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেবেন না এটাই প্রত্যাশা। করোনার বিরূপতা আগামীতে আরও ব্যাপকভাবে দেখা দেবে- এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আগামীর সংকট মোকাবিলায়ও প্রস্তুতি নিতে হবে এখনই। আমরা আশা করব, রাজনৈতিক মতাদর্শগত ভেদাভেদ আপাতত ভুলে সব প্রগতিশীল রাজনীতিক এককাতারে দাঁড়াবেন। জনকল্যাণে ব্রতী হবেন।
সরকার একা লড়বে কেন? সরকারকেও এ সংকটে সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে নির্মোহ অবস্থান নিয়ে সহযোগিতার জন্য অন্যদের ডাকতে হবে। সরকারকে বিরোধী পক্ষ চাইলেও সহযোগিতা করতে পারবে না, যদি সরকার সেই ক্ষেত্র তৈরি করে না দেয়। উল্লেখ্য, ত্রাণ চোর, ওএমএসের চাল চোর, টিসিবির পণ্যসামগ্রী চোরদের খবর প্রকাশ করতে গিয়ে সংবাদকর্মীরা হয়রানি-নির্যাতনের শিকার হন। এ রকম ঘটনা ইতোমধ্যে ঘটেছেও। রাজনীতিকরা যদি সংবাদকর্মীদের পাশে থাকেন, তাহলে তারা শক্ত মনোবল নিয়ে অন্যায়-অনিয়মের চিত্র তুলে ধরতে পারবেন। এ ক্ষেত্রেও রাজনীতিকদের দায় রয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এ ক্ষেত্রে কোনো কোনো রাজনীতিকের বৈরী কর্মকাণ্ডের খবর পাওয়া গেছে। তারা কি রাজনৈতিক নেতাকর্মী হিসেবে মূল্যায়িত হতে পারেন? প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলের নীতিনির্ধারকদের উচিত রাজনীতির নামে অপরাজনীতির এসব ধারক-বাহককে পরিত্যাগ করা। তাদের কালো হাত যাতে প্রসারিত হতে না পারে সে রকম ভূমিকা পালন করা।
আমাদের অভিজ্ঞতায় আছে, আগে কেন্দ্রে যে সরকারই থাকুক না কেন স্থানীয় সরকার কাঠামোয় তাদের ছায়া এখনের মতো করে পড়ত না। স্থানীয় শাসন সংস্থাগুলোতে ভারসাম্য থাকত। কেন এখন তা ভেঙে পড়েছে- এ বিষয়টি সচেতন মানুষ মাত্রই জানা। সরকারের মন্ত্রীরা বলছেন, গুদামে যথেষ্ট খাদ্য মজুদ আছে। কিন্তু গুদামে খাদ্যপণ্য মজুদ থাকলেই মানুষের হাহাকার নির্বাপণ করা যাবে না। তাদের কাছে খাদ্যপণ্য পৌঁছাতে হবে। এ কাজটি মূলত স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা করবেন। তারা যাতে স্বচ্ছতার সঙ্গে এই দায়িত্ব পালন করেন, এ ব্যাপারেও সরকার এবং রাজনীতিকদেরই মনোযোগ বাড়াতে হবে। প্রশাসনের যেসব অসাধু ব্যক্তি হীনস্বার্থ চরিতার্থকরণে ব্যস্ত তাদের বিরুদ্ধে সরকারকে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। সাধারণত ক্রান্তিকালে জাতির মানসিকতা খুব ভালোভাবে প্রকাশিত হয়- এই কথা মোটেও অমূলক নয়। করোনাকালে অনেকের মন-মানসিকতার ছাপও প্রতিফলিত হচ্ছে আচার-আচরণে। কিন্তু তারপরও সম্মিলিত প্রয়াসেই সংকট উত্তরণের পথ সুগম করতে হবে।
রাজনীতি যে ক্রমেই রাজনীতিকদের হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে এই সত্য এড়ানো দুরূহ। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন জাগে, এ কারণেই কি আমরা ক্রমাগত বিরূপতার মুখোমুখি হচ্ছি? এ প্রশ্নের উত্তরটা অন্তহীন নয়। জাতীয় স্বার্থের চেয়ে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থ যেসব রাজনীতিকের কাছে বড় তাদের কাছে জনকল্যাণের আশা দুরাশারই নামান্তর। যে কোনো দেশের অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে রাজনীতির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে না। যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকে তবে যে কোনো বাধাই অতিক্রম করা সম্ভব। জনকল্যাণমুখী রাজনীতিই পারে একটি দেশ ও জাতিকে লক্ষ্য অর্জনের পথে নিয়ে যেতে। এর অনেক দৃষ্টান্তই আমাদের সামনে আছে। রাজনীতিকদের গণমানুষের পক্ষেই থাকতে হবে। আদর্শচ্যুত রাজনীতি সমাজ ও রাষ্ট্রকে কি কিছু দিতে পারে?
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও সভাপতি, সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন
বিদ্যমান সংকট মোকাবিলায় সরকার বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়েছে সত্য, কিন্তু এসব কর্মসূচি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় সমন্বয়হীনতার পাশাপাশি সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীল অনেকের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের খতিয়ান উঠে আসছে সংবাদমাধ্যমে। এমতাবস্থায় রাজনীতিকদের ভূমিকা নিয়েও বিস্তর প্রশ্ন উঠেছে। শুধু তাই নয়, প্রশ্ন উঠেছে সংসদ সদস্যদের ভূমিকা নিয়েও। দোষারোপের বাক্যবান আমাদের দেশের রাজনীতিতে পুরোনো বিষয়। স্বাধীনতা-উত্তর রাজনীতির সংজ্ঞাসূত্র অনেক ক্ষেত্রে পর্যুদস্ত হতে দেখা গেছে। পর্যায়ক্রমে তা প্রকটই হয়েছে এবং সবচেয়ে বিস্ময়কর হলো, দেশের যে কোনো ক্রান্তিকালেও আমাদের রাজনীতির অঙ্গনে অনৈক্য তো বটেই, বহু ক্ষেত্রে রাজনীতিকদের মৌনতাও খুবই বিস্ময়ের। বর্তমান প্রেক্ষাপট যেন ফের এরই প্রতিচিত্র উপস্থাপিত করেছে। যে যুদ্ধ করোনার বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত বিশ্বের প্রায় ২১০টি দেশে চলছে এর শেষ কবে তা এখনও আমরা কেউ জানি না। আমরাও যুদ্ধরত। সরকারের দায়িত্বশীলরা, চিকিৎসক ও চিকিৎসা-সংশ্নিষ্টরা, বেসরকারি পর্যায়ের বিভিন্ন সংস্থা, সামাজিক সংস্থার প্রতিনিধিরা মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন।
রাজনীতিক কিংবা সংসদ সদস্যরা যদি এই ক্রান্তিকালে এককাতারবদ্ধ হয়ে মানুষের কল্যাণে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়ে মাঠে নামতেন, তাহলে ত্রাণ বণ্টনে কিংবা ১০ টাকা কেজি দরে ওএমএসের চাল বিক্রির ক্ষেত্রে দুর্নীতি হয়তো অনেকটাই ঠেকানো যেত। রাজনীতিক কিংবা জনপ্রতিনিধিরা জনগণের সুখ-দুঃখের সঙ্গী হবেন, এটাই তো স্বাভাবিক। সুখের সময় তারা দুধের মাছি হবেন আর দুঃখের সময় আকাশের চাঁদ হয়ে যাবেন, তা তো প্রত্যাশিত নয়। প্রশ্ন উঠতে পারে, সব সংসদ সদস্য কিংবা রাজনীতিকই কি এককাতারে? অবশ্যই না, ব্যতিক্রমও আছেন, তবে এই সংখ্যা যে বেশি নয়, তা বলাই বাহুল্য। জনপ্রতিনিধি কিংবা রাজনীতিকরা মানুষের দুর্দিনে মানুষের পাশে থেকে তাদের প্রয়োজনমতো কাজ করবেন এই চাওয়াটাই সঙ্গত। বিদ্যমান করোনা সংকটে রাজনীতিক ও সংসদ সদস্যদের কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা পালন করতে না দেখায় শুধু যে হতাশা ও বিস্ময়েরই সৃষ্টি করেছে তাই নয়, জন্ম দিয়েছে জিজ্ঞাসারও। এই দুর্যোগ-দুর্বিপাকে যারা জনগণের পাশে থেকে কাজ করছেন তারা অবশ্যই সাধুবাদ পাবেন। কিন্তু যারা তা করছেন না তারা কোন সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত হবেন- এই প্রশ্নটা এড়ানো যাবে না।
আমি মনে করি, এ মুহূর্তে দরকার জাতীয় ঐক্য। বিএনপি ও বাম দলগুলা এর ওপর গুরুত্বারোপ করেছে বটে, কিন্তু জাতীয় ঐক্যের যে উদ্যোগ প্রথমত সরকারেরই নেওয়া প্রয়োজন তা দৃষ্টিগ্রাহ্য হচ্ছে না। উপরন্তু পারস্পরিক সেই পুরোনো কায়দায় দোষারোপের বাক্যবাণই শোনা যাচ্ছে। এমন কর্মকাণ্ড কোনো সংকটেই কাম্য নয়। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা যেমন সরকারের দর্পণ, তেমনি দলমত নির্বিশেষে রাজনীতিকরাও যে কোনো সংকটে জনগণের দর্পণ হয়ে উঠবেন এটাও প্রত্যাশা। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন দল থেকে নির্বাচিত অনেক সংসদ সদস্যকে তাদের নির্বাচনী এলাকায় জনগণ এই সংকটে পাশে পাচ্ছে না- এমন সংবাদ অপ্রীতিকর। আবার কেউ কেউ দায়সারাভাবে লোক দেখানো কিছু কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন- এমন অভিযোগও খুব পুষ্ট। এসব বিষয়ে সাধারণ মানুষের সংঘবদ্ধ বিক্ষোভের ঘটনাও ইতোমধ্যে ঘটেছে। একটা কথা মনে রাখা দরকার, জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে যারা নির্বাচিত হয়েছেন জনগণের প্রতি তাদের দায়টা অনেক বেশি। যারা রাজনীতি করেন, তারা তাদের দায় ভুলে থাকা মানে স্ববিরোধিতারই নামান্তর।
যারা দিন আনেন দিন খান সেসব মানুষকে ঘরে রাখা খুবই কঠিন। অথচ এই সংক্রামক দুর্যোগ ঠেকাতে ঘরে থাকার অর্থাৎ সামাজিক-শারীরিক দূরত্বের বিকল্প নেই। এসব মানুষকে ঘরে রাখতে হবে সামগ্রিক প্রয়োজনের নিরিখেই। আর এজন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন তাদের খাদ্য সহায়তা নিশ্চিত করা। দলমত নির্বিশেষে এই সংকটে রাজনীতিকরা বিপন্ন মানুষের ঘরে ঘরে খাদ্যসামগ্রী পৌঁছানোর ব্যবস্থা করুন। যেসব লোভাতুর ত্রাণসামগ্রী লুটপাট করছে, ওএমএসের ১০ টাকা কেজির চাল আত্মসাৎ করছে, টিসিবির পণ্য কালোবাজারে বিক্রি করে নিজেরা ফুলেফেঁপে উঠছে, তাদের প্রতি কোনো রকম অনুকম্পা কাম্য নয়। রাজনীতিকরা এই দুর্বৃত্তদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেবেন না এটাই প্রত্যাশা। করোনার বিরূপতা আগামীতে আরও ব্যাপকভাবে দেখা দেবে- এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আগামীর সংকট মোকাবিলায়ও প্রস্তুতি নিতে হবে এখনই। আমরা আশা করব, রাজনৈতিক মতাদর্শগত ভেদাভেদ আপাতত ভুলে সব প্রগতিশীল রাজনীতিক এককাতারে দাঁড়াবেন। জনকল্যাণে ব্রতী হবেন।
সরকার একা লড়বে কেন? সরকারকেও এ সংকটে সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে নির্মোহ অবস্থান নিয়ে সহযোগিতার জন্য অন্যদের ডাকতে হবে। সরকারকে বিরোধী পক্ষ চাইলেও সহযোগিতা করতে পারবে না, যদি সরকার সেই ক্ষেত্র তৈরি করে না দেয়। উল্লেখ্য, ত্রাণ চোর, ওএমএসের চাল চোর, টিসিবির পণ্যসামগ্রী চোরদের খবর প্রকাশ করতে গিয়ে সংবাদকর্মীরা হয়রানি-নির্যাতনের শিকার হন। এ রকম ঘটনা ইতোমধ্যে ঘটেছেও। রাজনীতিকরা যদি সংবাদকর্মীদের পাশে থাকেন, তাহলে তারা শক্ত মনোবল নিয়ে অন্যায়-অনিয়মের চিত্র তুলে ধরতে পারবেন। এ ক্ষেত্রেও রাজনীতিকদের দায় রয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এ ক্ষেত্রে কোনো কোনো রাজনীতিকের বৈরী কর্মকাণ্ডের খবর পাওয়া গেছে। তারা কি রাজনৈতিক নেতাকর্মী হিসেবে মূল্যায়িত হতে পারেন? প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলের নীতিনির্ধারকদের উচিত রাজনীতির নামে অপরাজনীতির এসব ধারক-বাহককে পরিত্যাগ করা। তাদের কালো হাত যাতে প্রসারিত হতে না পারে সে রকম ভূমিকা পালন করা।
আমাদের অভিজ্ঞতায় আছে, আগে কেন্দ্রে যে সরকারই থাকুক না কেন স্থানীয় সরকার কাঠামোয় তাদের ছায়া এখনের মতো করে পড়ত না। স্থানীয় শাসন সংস্থাগুলোতে ভারসাম্য থাকত। কেন এখন তা ভেঙে পড়েছে- এ বিষয়টি সচেতন মানুষ মাত্রই জানা। সরকারের মন্ত্রীরা বলছেন, গুদামে যথেষ্ট খাদ্য মজুদ আছে। কিন্তু গুদামে খাদ্যপণ্য মজুদ থাকলেই মানুষের হাহাকার নির্বাপণ করা যাবে না। তাদের কাছে খাদ্যপণ্য পৌঁছাতে হবে। এ কাজটি মূলত স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা করবেন। তারা যাতে স্বচ্ছতার সঙ্গে এই দায়িত্ব পালন করেন, এ ব্যাপারেও সরকার এবং রাজনীতিকদেরই মনোযোগ বাড়াতে হবে। প্রশাসনের যেসব অসাধু ব্যক্তি হীনস্বার্থ চরিতার্থকরণে ব্যস্ত তাদের বিরুদ্ধে সরকারকে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। সাধারণত ক্রান্তিকালে জাতির মানসিকতা খুব ভালোভাবে প্রকাশিত হয়- এই কথা মোটেও অমূলক নয়। করোনাকালে অনেকের মন-মানসিকতার ছাপও প্রতিফলিত হচ্ছে আচার-আচরণে। কিন্তু তারপরও সম্মিলিত প্রয়াসেই সংকট উত্তরণের পথ সুগম করতে হবে।
রাজনীতি যে ক্রমেই রাজনীতিকদের হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে এই সত্য এড়ানো দুরূহ। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন জাগে, এ কারণেই কি আমরা ক্রমাগত বিরূপতার মুখোমুখি হচ্ছি? এ প্রশ্নের উত্তরটা অন্তহীন নয়। জাতীয় স্বার্থের চেয়ে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থ যেসব রাজনীতিকের কাছে বড় তাদের কাছে জনকল্যাণের আশা দুরাশারই নামান্তর। যে কোনো দেশের অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে রাজনীতির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে না। যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকে তবে যে কোনো বাধাই অতিক্রম করা সম্ভব। জনকল্যাণমুখী রাজনীতিই পারে একটি দেশ ও জাতিকে লক্ষ্য অর্জনের পথে নিয়ে যেতে। এর অনেক দৃষ্টান্তই আমাদের সামনে আছে। রাজনীতিকদের গণমানুষের পক্ষেই থাকতে হবে। আদর্শচ্যুত রাজনীতি সমাজ ও রাষ্ট্রকে কি কিছু দিতে পারে?
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও সভাপতি, সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন