ঢাকা সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬

জন্মদিন

শতবর্ষে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়

শতবর্ষে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়
×

গৌতম রায়

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ১৫ জুন ২০২০ | ১৪:৪৬

হেমন্ত মুখোপাধ্যায় একজন খ্যাতিমান বাঙালি কণ্ঠশিল্পী, সংগীত পরিচালক এবং প্রযোজক ছিলেন। তিনি হিন্দি সংগীত জগতে হেমন্ত কুমার নামে প্রসিদ্ধ। তার জন্ম ১৯২০ সালের ১৬ জুন ভারতের বারানসি শহরে। তার পরিবার কলকাতায় আসে বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে?। তিনি ইন্টারমিডিয়েট পাস করে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে যান। কিন্তু তিনি সংগীতের জন্য আপন শিক্ষা ত্যাগ করেন। ১৯৩৭ থেকে তিনি সম্পূর্ণভাবে সংগীত জগতে প্রবেশ করেন।

ছোটবেলার বন্ধু এসকে নন্দন অতি সাধারণ চাকরি করেন কলকাতা পোর্ট ট্রাস্টে। রানার, পাল্ক্কির গানের হেমন্তদা তখন বম্বেতে নাগিন করে সুপার ডুপার হিট। কলকাতায় গাড়ি করে যাচ্ছেন হেমন্তদা। চালকের আসনে সেই চির পরিচিত সনৎবাবু। হঠাৎ হেমন্তদা দেখলেন রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন ছোট বেলাকার বন্ধু নন্দন। সনৎবাবুকে বললেন গাড়ি থামাতে। নন্দন দেখলেন হঠাৎ ব্রেক কষে তার পাশে একটা গাড়ি দাঁড়াল। তিনি একটু সরে দাঁড়ানো মাত্রই দেখেন গাড়ির জানালা খুলে তাকে ডাকছেন ছোট বেলাকার বন্ধু হেমন্ত, আজকের বিখ্যাত শিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। কিছুটা বিস্ময় বিমূঢ় হয়ে পড়েছেন এসকে নন্দন।

কি রে কোথায় যাচ্ছিস? -বন্ধু হেমন্তের আন্তরিকতা এক মুহূর্তে নন্দনের সব সংকোচকে উড়িয়ে দিল।

বন্ধুর গন্তব্য জানার পর তাকে আর একটি কথাও বাড়াতে দিলেন না হেমন্ত। প্রায় জোর করেই বন্ধুকে গাড়িতে তুলে গন্তব্যে পৌঁছে দিলেন।

বাল্যবন্ধু কোনো সেলিব্রেটি নন। সেলিব্রেটি তখন হেমন্তদা। কিন্তু বন্ধুর কাছে তো তিনি শুধুই 'হেমন্ত'। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের মতো স্বনামধন্য বন্ধুর কাছেও তিনি যেমন আবার পোর্ট ট্রাস্টের একজন সাধারণ কর্মীর কাছেও তেমন। মানুষ হেমন্তের এই অনিন্দ্যসুন্দর কান্তি সমসাময়িক শিল্পীদের ভেতরে বড় একটা ছিল না। এই মহৎপ্রাণ মানুষটির বিষয়ে আর একটি কথা বিশেষভাবে বলা জরুরি যে, জানা-অজানা কত মানুষকে যে তিনি আর্থিকভাবে সাহায্য করতেন তা বোধহয় তার বাঁ হাতও জানতে পারত না। এতটাই নীরবে, নিভৃতে ছিল হেমন্তদার মানুষের প্রতি হাত বাড়িয়ে দেওয়ার রীতি-নীতি। বৌদিও জানতেন না কত মানুষের কত বিপদে কীভাবে বুক দিয়ে আগলাতেন হেমন্তদা। জানতেন বুঝি শুধু একজন। সনৎবাবু। এর হাত দিয়েই সাহায্যের খামগুলো সাধারণত তিনি পাঠাতেন।

হেমন্তদা নিশ্চুপ। সামনে দেখলেন একটা ছোট্ট দোকানে আলুর চপ ভাজছে। উৎপলাকে একটা কথা না বলে প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বললেন, চল, ভারি সুন্দর আলুর চপ ভাজছে। ওই দশ টাকার সদ্ব্যবহার করে ব্যাপারটা সেলিব্রেট করি।

উৎপলার দিকে এবার ফিরে তাকিয়ে বললেন, ছাড় না বেলুন (উৎপলার ডাকনাম), ছাত্ররাই তো করেছে। ওরা কোথায় অত টাকা পাবে বল তো? এই ছিলেন মানুষ হেমন্তদা।

মহালয়ার সকালে রেডিওতে 'মহিষাসুরমর্দিনী', যা আম বাঙালি এক ডাকে 'মহালয়া' বলে, তাতে প্রথম দিকে বেশ কয়েক বছর অংশ নিয়েছিলেন। তখন লাইভ ব্রডকাস্টিং হতো অনুষ্ঠানটির। এখন যে রেকর্ডটি বাজানো হয় জীবন সায়হ্নে এসে বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্র বর্তমান কলমচিকে বলেছিলেন, সেটি পাঁচের দশকের গোড়ার রেকর্ডিং। হেমন্তদার বড় বৌদির বাপের বাড়িতে শ্রীরামকৃষ্ণের একটি জন্মজয়ন্তীর অনুষ্ঠানে বীরেনদার কাছে শোনা ঘটনা, মহালয়ার অনুষ্ঠানের সময় সবাইকে সেই ভোরে স্নান করে আসতে হতো। যে ঘরে অনুষ্ঠানটি হতো সেই ঘরে বীরেনদা নিজের হাতে ধূপ জ্বেলে দিতেন। হেমন্তদা মহালয়ার অনুষ্ঠান নিয়ে নিজের গানের কথা না বলে বলতেন পঙ্কজ কুমার মল্লিকের কথা। বলতেন, পঙ্কজদা যখন অর্গলাস্ত্রোত্রের জয়ন্তী মঙ্গলা কালী ভদ্র কালী কৃপালিনী, দুর্গা শিবা ক্ষমা ধাত্রী স্বহাঃ স্বধা নমস্তুতে ধরতেন পরিবেশটা কেমন যেন অন্যরকম হয়ে যেত। গান শেষের পরেও অনেকটা সময় লাগত পঙ্কজ বাবুর স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে। যেন একটা ঈশ্বরীয় আবেশ হতো তার ভেতরে- এসব অকপটে বলতেন হেমন্তদা।

কারও ভেতরে এতটুকু সম্ভাবনা দেখলে স্পষ্ট ভাষায় বলতেন তিনি। স্পষ্ট অথচ কটুত্বহীন কথা ছিল তার চরিত্রের সব থেকে বড় বৈশিষ্ট্য। একটা সময়ে সংগীত জীবনের শুরুতে পঙ্কজ মলিল্গককে কিছুটা অনুসরণ করতেন। ওকে তখন বলা হতো 'ছোট পঙ্কজ'। তুলসী দাস ফিল্মে ওর গাওয়া 'আমি তনু চন্দন বাটি রাম নাম পাষাণে' শুনলে এটা বোঝা যায়। এটিকে তিনি খুব অল্প সময়ের ভেতরেই কাটিয়ে স্বকীয় হয়ে উঠেছিলেন।

সংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন পুরস্কার-সম্মাননার পাশাপাশি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পেয়েছেন সম্মানসূচক ডি.লিট। ১৯৮৯ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর এই মহান শিল্পী মৃত্যুবরণ করেন। কালজয়ী এই সংগীতব্যক্তিত্ব সংগীতশিল্পী ও সংগীতানুরাগীদের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে চিরভাস্বর হয়ে আছেন।

আরও পড়ুন

×