জীববৈচিত্র্য
পৃথিবী শুধু মানুষের জন্য নয়
সালাহ্উদ্দিন নাগরী
প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ১৫ জুন ২০২০ | ১৪:৪৬
করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা ও এলাকা নিয়ত বিস্তৃত হচ্ছে। চীনা বিজ্ঞানীরা দাবি করছেন বাদুড় থেকে বনরুই এবং সেখান থেকে মানুষের মধ্যে ছড়িয়েছে এ করোনাভাইরাস। চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরের বন্যপ্রাণী বিক্রির এক বাজার থেকে এ ভাইরাস ছড়িয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এখানে ব্যাঙ, সাপ, বাদুড়, সজারু, বুনো খরগোশসহ বিভিন্ন পোকমাকড় বিক্রি করা হয়ে থাকে। ওই শহর থেকে এ রোগের সূচনা গেল বছরের ৩১ ডিসেম্বর, আর ১২ দিনের মাথায় প্রথম আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যু হয়।
যুগে যুগে বিভিন্ন প্রাণী, বিশেষত বন্যপ্রাণীর দেহ থেকে অনেক প্রাণঘাতী রোগের ভাইরাস মানুষের দেহে প্রবেশ করেছে, আক্রান্ত হয়েছে এবং যথাযথ চিকিৎসা ও ভ্যাকসিনের অভাবে মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছে। প্রায় ৪০ বছর আগে বানর জাতীয় প্রাণী থেকে শুরু হয়েছিল এইচআইভি বা এইডস রোগে, যার প্রকোপে এখনও পৃথিবীতে অসংখ্য মানুষ মৃত্যুবরণ করছে। ২০০৯ সালের দিকে শূকরের দেহ থেকে সোয়াইন ফ্লু ভাইরাস ছড়িয়েছিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইবোলা, নিপাহ ও সার্স ভাইরাস ছাড়ানোর ব্যাপারে বাদুড়ের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা আছে।
এ রোগ ছড়ানোর সঙ্গে বাদুড়ের সংশ্নিষ্টতা পাওয়ার পর এবং এর আগে নিপা ভাইরাস ছড়ানোর কারণে বাদুড় সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তো এখন রীতিমতো আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। এর আগে থেকেই বিভিন্ন দেশ জাতি-গোষ্ঠীর কাছে বাদুড় ছিল এক অশুভ শক্তির প্রতীক।
এ প্রেক্ষাপটে অনেকের নিশানায় পরিণত হয়েছে বাদুড়। মার্চে ইন্দোনেশিয়ার বাজারে বাদুড় মেরে ফেলতে বলা হয়, রুয়ান্ডাতেও ফরুট ব্যাট ফায়ার হোস হিসেবে বাদুড় মেরে ফেলার গুঞ্জন শোনা যায়। পেরুতে রেবিজ প্রতিরোধে ভাম্পায়ার বাদুড় ও উগান্ডাতে মিসরীয় ফরুট ব্যাট ধ্বংস করা হয়। অস্ট্রেলিয়ায় হেন্দ্রা ভাইরাসের ঝুঁকি কমাতে বাদুড় মারা হয়। মনে হচ্ছে, 'যত দোষ নন্দ ঘোষ' এই বাদুড়ের। বাদুড় মেরে নিশ্চিহ্ন করে দিলে হয়তো পৃথিবীর বুক থেকে এ রোগগুলো চিরবিদায় নেবে। এটা ঠিক বাদুড় দ্বারা অনেক রোগ ছড়ায় এবং এই প্রাণঘাতী করোনা, বাদুড়ের মাধ্যমে মানুষের মাঝে সংক্রমিত হয়েছে। সে জন্য কি বাদুড় মেরে ফেলতে হবে? এটা কি কোনো সমাধান হতে পারে?
অবিমিশ্র উপকারী কোনো জীব বা জড় কি পৃথিবীতে আছে? আমরা জানি ঝড়, ঘূর্ণিঝড়ে সবার আগে গাছপালা ভেঙে পড়ে। কিন্তু আমরা কি এটা জানি এ গাছপালা ঝড়ের তীব্রতা রোধ ও জানমালের ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনার ব্যাপারে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে। ঝড়ে গাছপালা ভেঙে জানমালের ক্ষতি করে বলে আমরা যদি গাছপালা সাফ করে ফেলি, তাহলে কিন্তু গোটা প্রকৃতিই লণ্ডভণ্ড হয়ে যাবে। সাপের কামড়ে পৃথিবীতে প্রতি বছর দেড় লাখেরও বেশি লোকের মৃত্যু হয়, চিরতরে পঙ্গু হয়ে যায় ৫-৭ লাখ মানুষ। তাই বলে কিন্তু সাপ মেরে ফেলা হয় না। একইভাবে যেসব প্রাণী মানুষের মধ্যে রোগজীবাণু ছড়ায়, সেসব প্রাণী মেরে ফেলে কোনো ফয়সালা পাওয়া যাবে না।
পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বাদুড়ের একটি বড় ভূমিকা আছে। বাদুড় ফুল, ফল, বিভিন্ন বনজ ও ঔষধি গাছের পরাগায়নে অবদান রাখে। এ প্রক্রিয়া দুর্গম অঞ্চলে গাছপালা বৃদ্ধি করে থাকে। বিভিন্ন ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ খেয়ে ফসল রক্ষায় বাদুড় ব্যাপক অবদান রাখে। এদের মলমূত্র জমিতে জৈব সারের ঘাটতি পূরণ করে। প্রতি বছর পোকামাকড় খেয়ে প্রাকৃতিক উপায়ে কীটপতঙ্গ দমন করে। বাদুড় হয়তো আম-জাম-লিচু খেয়ে ক্ষতির কারণ হচ্ছে, কিন্তু এসবের বীজ চারদিকে দিকে ছড়িয়ে দেওয়ায় গাছগাছালির সংখ্যা বাড়ছে। প্রকৃতিকে সুরক্ষা দিচ্ছে, সৃষ্টিকে সুন্দর ও বিস্তৃত করছে।
অনেক ধরনের নিশাচর প্রাণী আছে, যারা দিনের আলোতে দেখতে পায় না, রাতের অন্ধকারেই তারা চলাফেরা করে, খাদ্য সংগ্রহ করে। বনাঞ্চল, ঝোপঝাড় কমে যাওয়া ও রাতের বেলায় লাইটের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় লক্ষ্মী পেঁচা, হুতুম পেঁচা, বনবিড়ালের মতো প্রাণীর বাসা তৈরি ও খাদ্য সংগ্রহ দুটোতেই প্রভাব পড়ছে প্রকান্তরে এসব প্রাণী বিলুপ্ত হতে চলেছে।
পিঁপড়া, গিরগিটি, বাদুড়সহ অনেক প্রাণীই মানুষের বহু আগে থেকেই এ পৃথিবীতে বসবাস করছে। আর আমরা তাদের পরে এসে তাদের তাড়িয়ে বেড়াচ্ছি, তাদের জীবনযাপনকেই অস্বীকার করে চলেছি। আজকে তাদের টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়েছে। জীববৈচিত্র্য ও প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করে দিচ্ছি। আজকে প্রাণী থেকে যেসব ভাইরাস ও রোগব্যাধি আসছে তা কি মানুষের কারণে? না ওই সব পশুপাখির কারণে? ওরা আমাদের কাছে আসছে না, আমরাই বরং ওদের আমাদের মধ্যে টেনে আনছি, বিষয়গুলো গভীরভাবে ভাবতে হবে।
বনভূমি ধ্বংস ও গাছপালা কেটে ফেলা হচ্ছে, আমাজনের দাবানল রোধে কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি। বন্যপ্রাণীকে হত্যা করা হচ্ছে, উট বেশি পানি খায় বলে অনাবৃষ্টির সময় হেলিকপ্টার থেকে গুলি করে তাদের মেরে ফেলা হচ্ছে। মনে হচ্ছে, সবাই প্রকৃতি ও সভ্যতার উল্টোপথে বৈঠা টেনে চলেছে। তাই প্রকৃতি হয়তো তার প্রতিশোধ নিতে শুরু করেছে।
এ পৃথিবী তো শুধু মানুষের নয়। মানুষের অনেক আগেই তো এসব জীবজন্তু এ পৃথিবীতে এসেছে। তাদের আবাসস্থল সংকুচিত করে, হত্যা করে প্রকৃতির শৃঙ্খলা এলোমেলো করে দেওয়া হচ্ছে। মানুষ এবং একমাত্র মানবজাতিই এ শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে অভিযুক্ত। এ পৃথিবীতে অন্যান্য জীবজন্তু, পশুপাখি, কীটপতঙ্গ না থাকলে মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের কোনো মূল্য নেই। প্রকৃতি পৃথিবীকে যেভাবে সাজিয়েছে, সেভাবেই ধরে রাখতে হবে। ব্যত্যয় ঘটালেই সর্বনাশ। এর আলামত ইতোমধ্যেই দৃশ্যমান।
উপপরিচালক, জাতীয় বিজ্ঞান জাদুঘর
[email protected]
- বিষয় :
- জীববৈচিত্র্য
- সালাহ্উদ্দিন নাগরী