অনলাইন ক্লাস
কল্পনা থেকে পরিকল্পনায়
মাশরুর শাহিদ হোসেন
প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ১৫ জুন ২০২০ | ১৪:৪৬
কেউ বলে করো, কেউ বলে ক'রোনা। মাঝখানে সুঁই হয়ে ঢুকে ফাল হচ্ছে করোনা। বলছি বাংলাদেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইন ক্লাসের কথা। গত তিন মাস ধরে চলছে তর্ক-বিতর্ক-কুতর্ক। তর্ক-বিতর্ক ভালো, তবে তখনই যখন তা কোনো নির্ণয়ে পৌঁছুতে চায়, গড়িমসির বাহানা হিসেবে নয়। কিছু বিদ্বজ্জনকে শুনে মনে হয়েছে কেবল আলাপে থাকার জন্য সংলাপ; করোনা আর কদ্দিন, তারপর তো আগের মতোই ক্লাস, এমন একটা ভাব। কিন্তু এতদিনে আমরা জেনে গেছি, করোনা থাকছে আমাদের সাথে। তা সে থাকুক আর না থাকুক, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সচল রাখা জরুরি। আমরা পোশাকশিল্প বুঝি, বিশ্ববিদ্যালয় বুঝি না- কেন, রপ্তানিযোগ্য শিল্প নয় বলে?
করোনাকালে সরকারি (স্বায়ত্তশাসিতসহ) বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সচল রাখার অনেক উপায় আছে। তার একটি হলো:অনলাইন ক্লাস। যদিও দেরি হয়েছে, তবুও হ্যাঁ-না সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে শিক্ষকদের ওপর জরিপ হওয়া জরুরি; কিছু হচ্ছে, আরও হোক। হোক শিক্ষার্থীদের ওপর জরিপও, অনলাইনে। তবে কার্যকর জরিপের জন্য অংশগ্রহণকারীকে জানতে হবে তারা কী বিষয়ে মন্তব্য করছেন এবং যে অবস্থান নিচ্ছেন তা বুঝে নিচ্ছেন কিনা। অংশগ্রহণকারীকে জানানোর দায়িত্ব প্রশাসনের। প্রশাসনকে তাই বুঝে নিতে হবে অনলাইন ক্লাসের কী-কেন-কীভাবে। জনমুখী নীতি তৈরির সময় অনুভূতি ও বিবেচনা যেমন জরুরি, তেমন জরুরি যুক্তি ও দূরদর্শিতা। তাই জরিপের আগে ও পরে, কল্পনাকে পরিকল্পনায় রূপান্তরিত করার কালে, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রশাসনকে যে বিষয়গুলো আমলে আনতে হবে তা নিয়ে এ আলাপ।
এক. 'অনলাইন ক্লাস'-এর সংজ্ঞা তৈরি। সংজ্ঞাটি এমন হতে পারে :অনলাইন ক্লাস বলতে বোঝায় ইন্টারনেটে ভিডিও কমিউনিকেশন্স সার্ভিস (জুম, গুগল মিট, মাইক্রোসফট টিম ইত্যাদি) ব্যবহার করে 'লাইভ' ও 'ইন্টারেকটিভ' আনুষ্ঠানিক ক্লাস। যেহেতু অনলাইন ক্লাস 'লাইভ (সরাসরি) ও 'ইন্টারেকটিভ' (মিথষ্ফ্ক্রিয়া ও অংশগ্রহণমূলক), তাই তা ক্লাসরুম ক্লাসের আপদকালীন বিকল্প হতে পারে। এই সংজ্ঞা গোচরে নিলে, লেখাপড়ার যা-কিছু 'লাইভ' ও 'ইন্টারেকটিভ' নয় কিন্তু অনলাইনে সম্পন্ন হচ্ছে (যেমন, রেকর্ড-করা লেকচার, ফেসবুক আলোচনা, গুগল ক্লাসরুমে অ্যাসাইনমেন্ট) সেগুলোকে 'অনলাইন কার্যক্রম' নাম দিতে পারি।
দুই. 'অনলাইন ক্লাস'-এর প্রকৃতি নির্ধারণ করতে হবে। যেমন, এই ক্লাস কি 'আনুষ্ঠানিক'? সেক্ষেত্রে একটি ক্লাস-কে 'সম্পূর্ণ' হিসেবে গণ্য করতে হবে; ওই ক্লাসে যা পাঠদান করা হলো তা 'সম্পন্ন' হিসেবে গণ্য করতে হবে; এবং বিশ্ববিদ্যালয় খোলার পর ওই বিষয়ে ক্লাসরুমে ক্লাস দিতে ও নিতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী বাধ্য থাকবেন না। অন্যদিকে অনলাইন ক্লাসকে যদি 'আপদকালীন আধা-আনুষ্ঠানিক' হিসেবে গণ্য করা হয়, তাহলে ওই ক্লাসের কাজ হলো পড়াশোনা ও পরীক্ষার কাজ এগিয়ে-গুছিয়ে রাখা, সম্পন্ন করা নয়। সেক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় খোলার পর ওই বিষয়ে ক্লাসরুমে পুনরায় ক্লাস হবে, তবে স্বল্পতর সময়ে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, দুটোর সংমিশ্রণ শ্রেয়তর।
তিন. বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ডিন্যান্সে অনলাইন ক্লাসের বিধান নেই, তাই বিধান প্রণয়ন জরুরি। যেমন, অনলাইন ক্লাস কখন প্রযোজ্য এবং কখন নয়, তা পরিস্কার করা দরকার। নইলে এমন হলে আশ্চর্য হবো না, যদি ক্লাস খোলার পরও কোনো শিক্ষক ক্লাসরুমে ক্লাস না নিয়ে অনলাইন ক্লাসেই সব কাজ শেষ করেন।
চার. অনলাইন ক্লাস হবে কোন কোন প্ল্যাটফর্মে (জুম, মিট, টিম, ফেসবুক) তা নির্ধারণ করা জরুরি। যেহেতু একেক প্ল্যাটফর্মের নিজস্ব নিয়ম আছে, যেমন কতজন একসঙ্গে ক্লাস করতে পারবে, ক্লাসটি কতক্ষণ করা যাবে- সেহেতু এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত প্রশাসন নিক।
পাঁচ. যদি কোনো কোর্স অনলাইনেই 'সম্পন্ন' হয়ে গেল, তাহলে? বিশ্ববিদ্যালয় খোলার পরে কি শিক্ষককে আবার ক্লাস নিতে হবে? বিষয়টি পরিস্কার করা জরুরি।
ছয়. ব্যবহারিক ক্লাস ও প্রজেক্ট কি অনলাইনে সম্ভব? সংশ্নিষ্ট শিক্ষকদের সঙ্গে আলাপ হোক। থাকুক নির্দেশনা ও পরামর্শর অনলাইন ম্যানুয়ল।
সাত. শিক্ষকদের চটজলদি প্রশিক্ষণ অত্যাবশ্যক।
আট. অনলাইন ক্লাসে শিক্ষার্থীর 'উপস্থিতি' কি বাধ্যতামূলক নাকি ঐচ্ছিক। উপস্থিতির জন্য কি অ্যাটেনডেন্স নম্বর থাকবে? থাকলে তা কীভাবে ক্লাসরুমের অ্যাটেনডেন্স নম্বর-এর সঙ্গে সমন্বয় করা হবে।
নয়. অনলাইন ক্লাসে পরীক্ষা নেওয়া যাবে কি। কী ধরনের পরীক্ষা নেওয়া যাবে। 'অ্যাসাইনমেন্ট' কি গ্রহণযোগ্য হবে। যদি কোনো শিক্ষার্থী অনলাইন পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে না পারেন, তাহলে কী ব্যবস্থা থাকবে?
দশ. অনলাইন ক্লাস কতদিন চলবে? কেউ জানে না, ঠিক, কিন্তু এ ব্যাপারে পরিকল্পনা থাকা জরুরি যে কোন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে অনলাইন ক্লাস বন্ধ হয়ে যাবে। শুরুর আগে জানা চাই শেষের সূত্র।
এগারো. ফাইনাল পরীক্ষা কীভাবে এবং কবে হবে, তা নির্ধারণ করে রাখা চাই। মার্চ মাসে যেসব ইয়ারে ফাইনাল পরীক্ষা চলছিল কিংবা ক্লাস শেষে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তাদের কি অনলাইন ক্লাস হবে না? তারা কি লিখিত ফাইনালের জন্য অপেক্ষা করতেই থাকবেন?
বারো. অনলাইন ক্লাস যদি 'সীমিত' আকারেও চালু হয়, একই প্রক্রিয়া কি ইভনিং বা উইকেন্ড কোর্সগুলোর জন্য প্রযোজ্য হবে?
তেরো. আইটি হেল্প ডেস্ক খোলা উচিত, যার কাজ হবে অনলাইন ক্লাস বিষয়ে সহায়তা দেওয়া।
চোদ্দ. অনলাইন ক্লাস চলাকালীন বিদ্যুৎ-বিভ্রাট কিংবা ইন্টারনেট সংযোগে সমস্যা হলে কী করতে হবে, বিশেষ করে ক্লাসের 'হোস্ট' শিক্ষক কী করবেন, সে বিষয়ে দিকনির্দেশনা থাকা জরুরি।
পনেরো. অনলাইন ক্লাসের জন্য শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর দুটি জিনিস দরকার :ইন্টারনেট সংযোগ এবং স্মার্টফোন বা ল্যাপটপ বা ওয়েবক্যামসহ কম্পিউটার। সকল শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর কি এই সক্ষমতা আছে? ব্যাপারটি সহজ করার জন্য যা যা করা যায় তার একটি হলো :আর্থিক সহায়তা বা বৃত্তির ব্যবস্থা। আরেকটি হলো :মোবাইল সেট বিক্রয়কারী এবং মোবাইল অপারেটরদের সঙ্গে চুক্তিতে আসা, যার ভিত্তিতে অনলাইন ক্লাসের জন্য মূল্যছাড় বা বিশেষ প্যাকেজ থাকবে। সরকার ও সংশ্নিষ্ট প্রশাসনকে এই আয়োজনে যুক্ত করা যাক।
ষোলো. যে কোনো অনলাইন কাজের নিরাপত্তা ঝুঁকি আছে; আছে নেট-শিষ্টাচার; আছে গোপনীয়তার বিষয়-আশয়। প্রশাসনের উচিত হবে এসব ব্যাপারে বিধান রাখা এবং শুরু থেকেই সকলকে সুরক্ষা নীতি বিষয়ে অবহিত করা।
সতেরো. অনলাইন-নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হয়তো প্রশাসনিক পর্যবেক্ষণ জরুরি, তবে পর্যবেক্ষণের ছুতোয় অহেতুক নজরদারি শুরু হলে তা শিক্ষক-শিক্ষার্থীর কাছে অগ্রহণযোগ্য হতে পারে। তাই প্রশাসনকে পষ্ট করতে হবে কীভাবে সাইবার নিরাপত্তা ও পর্যবেক্ষণ পরিচালিত হবে। যেমন, আবশ্যিকভাবে ক্যামরো ব্যবহার করতেই হবে কিনা সে ব্যাপারে নির্দেশনা থাকা উচিত, নচেত পরবর্তী সময় বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। আর, ক্যাম অফ করে রেখে কিন্তু দিব্যি অনলাইন ক্লাস করা যায়; খরচও বাঁচে।
যা খুবই জরুরি তা হলো :অনলাইন ক্লাস হোক কি না হোক, এখনই, এক্ষুনিই, সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের, বিশেষত হলগুলোর বাসযোগ্যতা ও ক্লাসরুমগুলোর ব্যবহারযোগ্যতা সুনিশ্চিত করতে বিবেচক উদ্যোগ নিতে শুরু করা। সুরক্ষার অজুহাতে যেমন আমরণ হলগুলো বন্ধ করে রাখা যায় না, তেমনই যথাযথ সুরক্ষা নিশ্চিত না করে শিক্ষার্থী-হল খোলা যায় না।
অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, সাভার, ঢাকা
- বিষয় :
- অনলাইন ক্লাস
- মাশরুর শাহিদ হোসেন