সমকালীন প্রসঙ্গ
স্বাস্থ্য সুরক্ষার সংগ্রাম ও রাজনীতি
ফয়জুল হাকিম
প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ১৫ জুন ২০২০ | ১৪:৪৬
করোনাভাইরাস সংক্রমণ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জনস্বাস্থ্য, চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রকৃত চেহারা, জনগণের দুরবস্থার চিত্র সেইসব দেশের জনগণের সামনে, এমনকি বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচন করে দিয়েছে। উন্নত পুঁজিবাদী দেশ বলে পরিচিত, গ্লোবাল পাওয়ার হিসেবে খ্যাত এসব দেশের সাধারণ জনগণ এই বৈশ্বিক মহামারি কভিড-১৯ এর সংক্রমণে উপলব্ধি করছেন যে, পুঁজিবাদী রাষ্ট্র ও সমাজে বৈষম্য যে কতটা ব্যাপক ও গভীর, কতটা অনিশ্চয়তা জীবনের। বাংলাদেশেও কভিড-১৯ স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বেহাল অবস্থা তুলে ধরেছে। সরকারি মহল থেকে গত একদশক ধরে 'প্রবৃদ্ধি' আর 'উন্নয়নের' যে হিসাব তুলে ধরা হচ্ছিল, তা অসার প্রমাণ হয়েছে।
২০১৯-এর ডিসেম্বরে চীন দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ ধরা পড়লে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গত ১১ জানুয়ারি বৈশ্বিক স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে। সে হিসেবে কভিড-১৯-এর সংক্রমণ প্রতিরোধে বাংলাদেশ সরকার সময় পেয়েছিল তিন মাস। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীরা প্রস্তুতি নেওয়ার বদলে বাগাড়ম্বরে সময় নষ্ট করেছেন। জনগণকে অন্ধকারে রেখেছে।
বাংলাদেশে স্বাস্থ্য বলতে অনেকেই চিকিৎসাসেবাকেই বুঝে থাকেন। প্রকৃতপক্ষে একটি দেশে নাগরিকদের দৈনন্দিন খাদ্য ও পুষ্টি গ্রহণের পরিমাণ, তাদের বার্ষিক বা মাসিক আয়, দৈনিক কর্মদিবসের সময় ও অবসর, স্বাস্থ্যসম্মত বাসস্থান ও নিরাপদ পানির নিশ্চয়তা, মানসিক অবস্থা ও বিনোদন প্রভৃতি অঙ্গাঙ্গিভাবে স্বাস্থ্যের সঙ্গে যুক্ত। অথচ সেসব বিষয় বাদ দিয়েই এখানে স্বাস্থ্য সম্পর্কিত আলোচনা হয়ে থাকে শুধু চিকিৎসাসেবা নিয়ে।
বাংলাদেশে চিকিৎসাসেবা বলতে সরকারি মেডিকেল সার্ভিস বা চিকিৎসাসেবাকেই বোঝানো হয়ে থাকে। প্রতি বছর জাতীয় সংসদে যে বার্ষিক বাজেট পেশ করা হয় তাতে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের নামে মূলত বরাদ্দ হয় চিকিৎসাসেবা খাতে। আবার এই চিকিৎসাসেবা খাতে বরাদ্দকৃত অর্থের বড় অংশই ব্যয় হয় প্রশাসনিক খাতে। চিকিৎসা বিজ্ঞান গবেষণা, শিক্ষা, হাসপাতাল, বিশেষজ্ঞ হাসপাতাল, ক্লিনিক ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর পেছনে ব্যয় হয় প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। মহামারি ও রোগ নিয়ন্ত্রণ খাত উপেক্ষিতই বলা চলে। বৈশ্বিক মহামারি কভিড-১৯ স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশের প্রস্তুতি ছিল তাই খুব দুর্বল। মনে রাখা দরকার, ২০১৯ সালে ডেঙ্গুর প্রকোপ সামলাতে রাজধানী ঢাকার হাসপাতালগুলো বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। এবারে কভিড-১৯ সংক্রমণ ব্যাপক আর এই ভাইরাস প্রাণঘাতী।
কভিড-১৯ সংক্রমণ প্রতিরোধে যারা একে শুধু স্বাস্থ্যগত সংকট বা সমস্যা হিসেবে দেখছেন বা দেখাতে চাইছেন তারা মূলত স্বাস্থ্যের সঙ্গে রাষ্ট্র বা রাজনীতির যে সম্পর্ক রয়েছে তা আড়াল করে জনগণের রাজনৈতিক চেতনাকে ভোঁতা করে দিতে তৎপর।
কভিড-১৯ প্রতিরোধে সরকারের গৃহীত নীতি এ ক্ষেত্রে পর্যালোচনায় আনা দরকার। সরকার প্রথমত এই বৈশ্বিক মহামারি সৃষ্ট ভয়াবহ জাতীয় দুর্যোগ পরিস্থিতির ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়নি। চীন দেশে এই সংক্রমণের ভয়াবহতা যেভাবে মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছে, কিংবা ইউরোপের, বিশেষত ইতালিতে যা ঘটেছে তা তো না জানার কথা নয়। বাস্তবে সরকার কভিড-১৯ মোকাবিলায় আমলা প্রশাসনের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হওয়ায় এমন বিপত্তি।

করোনাভাইরাস সৃষ্ট পরিস্থিতি প্রতিরোধে ভয়াবহ জাতীয় দুর্যোগ পরিস্থিতি ঘোষণা করে সব গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল ও জোটকে সঙ্গে নিয়ে সর্বদলীয় কমিটি গঠন করে এই প্রতিরোধের কাজ শুরু করা জরুরি কর্তব্য ছিল। কিন্তু সরকার শ্রেণিগত ও চরিত্রের কারণেই তা অস্বীকার করেছে। অন্যদিকে ভয়াবহ জাতীয় দুর্যোগ পরিস্থিতিতে জনগণকে রক্ষার জন্য বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণে সরকারকে বাধ্য করতে গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল দল ও জোট একমঞ্চে এসে দাবি ও দিকনির্দেশনা তুলে ধরলে সরকারকে বাধ্য করা সহজ হতো। ভুল পদক্ষেপ থেকে অনেকাংশে সরকারকে সরিয়ে আনা যেত, জনগণকে ব্যাপকভাবে সম্পৃক্ত করা যেত। জনগণকে রক্ষা করা যেত। কভিড-১৯-কে কেন্দ্র করে এক গণতান্ত্রিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব ছিল। বামপন্থি দল ও জোটগুলো এ ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিতে পারত। কিন্তু কমিউনিস্ট নামে পরিচিত কোনো কোনো দল সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিরোধ গড়ে ওঠার বিরুদ্ধে সক্রিয়। এরা শাসক শ্রেণির ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক সংগ্রামে সর্বহারা শ্রেণির উদ্যোগ ও নেতৃত্ব বিকাশে সচেতনভাবেই বিরোধী। বামপন্থি ঐক্যের নামে এরা মূলত আওয়ামী লীগের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলার নীতির অনুসারী। এদের শ্রেণি চরিত্র কী, এই প্রশ্ন তাদের করা দরকার।
করোনা পরিস্থিতি প্রতিরোধে সরকারের গাছাড়া ভাব জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি-মার্চ পর্যন্ত চলে এসেছে। ২৬ মার্চ গণছুটি ঘোষণা করে সরকার এই প্রাণঘাতী ভাইরাস মোকাবিলার গুরুত্বকে হাল্ক্কা করে দেখেছে। বিদেশ থেকে আসা ব্যক্তিদের যথাযথ স্ট্ক্রিনিং না করা, প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে না রেখে হোম কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো হতে শুরু করে, মাত্র একটি কেন্দ্র থেকে করোনা টেস্ট করার তুঘলকি ব্যবস্থা করা, ডাক্তার-নার্স-চিকিৎসা কর্মীদের মানসম্পন্ন পিপিই-মাস্ক পর্যাপ্ত সরবরাহ না করা, কভিড-১৯ চিকিৎসায় হাসপাতালগুলোকে যথাযথ প্রস্তুত না করা, কভিড-১৯ ভিন্ন অপরাপর রোগীদের চিকিৎসাসেবার কৌশল নির্ধারণ না করা প্রভৃতি অব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনাহীনতার দৃষ্টান্ত।
করোনাভাইরাস মোকাবিলায় ভারতের কেরালা, ভিয়েতনাম, নেপাল প্রভৃতি রাষ্ট্র যেসব পদক্ষেপ বা কৌশল গ্রহণ করেছে আমাদের কর্তাব্যক্তিরা তা থেকে মুখ ফিরিয়ে রেখে নিজস্ব মনগড়া কৌশল নিয়ে চলেছেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে প্রধান করে যে ৫শ' সদস্যবিশিষ্ট কমিটি কভিড-১৯ প্রতিরোধে গঠন করা হয়েছিল তার কোনো কথা এখন আর তাই শোনা যায় না। কিছুদিন আগেও সরকার মনোনীত ডাক্তার, রোগতত্ত্ববিদ প্রভৃতি বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিকে নিয়ে গঠিত কারিগরি কমিটির প্রধান সংবাদপত্রে বিবৃতি দিয়ে বলেছেন, কারিগরি কমিটির প্রস্তাব যদি না শোনা হয় তাহলে সরকারের উচিত এই কমিটি ভেঙে দেওয়া।
জাতীয় ক্ষেত্রে সংঘটিত কভিড-১৯ সৃষ্ট মহাদুর্যোগ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রধান কর্তব্য ছিল প্রকৃত লকডাউন দেওয়া এবং এ সময়ে দৈনিক এক লাখ সংখ্যক টেস্ট করার ব্যবস্থা করা। গণস্বাস্থ্যের র্যাপিড টেস্ট কিট দ্রুত অনুমোদন দেওয়া। কিন্তু গণস্বাস্থ্যের র্যাপিড কিট নিয়ে সরকারি মহলের আচরণ জনগণকে ক্ষুব্ধ করেছে। অন্যদিকে গণছুটিতে লোকজনকে ঘরে ধরে রাখতে সরকার থেকে ছয় মাস কর্মহীন পরিবারকে খাদ্যসামগ্রী ও নগদ অর্থ সহায়তা দেওয়া কর্তব্য ছিল। কর্তব্য ছিল জরুরিভিত্তিতে ফিল্ড হাসপাতাল গঠন করে ডাক্তার-নার্সদের প্রশিক্ষণ দিয়ে চিকিৎসাসেবা সম্প্র্রসারিত করার, প্রাইভেট হাসপাতালগুলো সরকার কর্তৃক অধিগ্রহণ করে কভিড-১৯ চিকিৎসাসেবা বিস্তৃত করার। প্রাণঘাতী কভিড-১৯ সংক্রমণে প্রতিদিন আক্রান্তের সংখ্যা যেভাবে বেড়ে চলেছে তাতে এখনও গণছুটি নয়, সরকারকে পরিকল্পিতভাবে কার্যকর লকডাউন করতে হবে।
প্রাণঘাতী কভিড-১৯ প্রতিরোধে জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষার সংগ্রামকে শুধু চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতির সংগ্রাম হিসেবে, ডাক্তারদের সংগ্রাম হিসেবে না দেখে একে দেশের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত করে দেখতে হবে। যেসব ডাক্তার বা চিকিৎসাকর্মী কিংবা রাজনৈতিক দলের কর্মী একে শুধু স্বাস্থ্য আন্দোলন হিসেবে বিচ্ছিন্নভাবে লড়ার কথা বলবেন, তারা মূলত বিদ্যমান শোষণ বৈষম্যমূলক আর্থসামাজিক লুণ্ঠনের ব্যবস্থার পক্ষেই কৌশলে ওকালতি করে চলবেন।
বাংলাদেশে আশির দশকে বিশ্বব্যাংক আইএমএফের কাঠামোগত সংস্কার কর্মসূচি কার্যকর করতে রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা সেবাখাতকে সংকুচিত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। সামরিক সরকার হতে সংসদীয় সরকারগুলো গত চল্লিশ বছর ধরে এ কাজ করে এসেছে। চিকিৎসাসেবাকে পণ্য বানিয়ে একে ব্যবসায়ীদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এসব অজানা বিষয় নয়।
কভিড-১৯ প্রতিরোধে আমরা তাই স্বাস্থ্য আন্দোলন গড়ে তুলতে বলি এমনভাবে যেন জনগণের ঘাড়ের ওপর চেপে থাকা শাসক শ্রেণির মর্মমূলে আঘাত লাগে। শ্রমিক কৃষক মেহনতি মানুষসহ সমগ্র জনগণকে পুঁজির শোষণ ও শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামে যুক্ত করে তাদের শ্রেণিগত সাহস ও ঔদ্ধত্যের প্রকাশ ঘটানো যায়।
চিকিৎসক; আহ্বায়ক জনস্বাস্থ্য সংগ্রাম পরিষদ
- বিষয় :
- সমকালীন প্রসঙ্গ
- ফয়জুল হাকিম