অর্থনীতি
করোনাকালে 'কল্পনার বাজেট' প্রসঙ্গে
খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ
প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ১৫ জুন ২০২০ | ১৪:৪৬
এবারের বাজেটের সঙ্গে আলোচকবৃন্দ অনেক বিশেষণ যোগ করেছেন। বাস্তবতাবর্জিত, বাস্তবায়ন অযোগ্য, কল্পনাবিলাসী, আরও কত কী! কোনটা বাস্তব, কোনটা অবাস্তব; কোনটা সত্য, কোনটা অসত্য- এ নিয়ে বোঝা বা না বোঝার বিষয় তেমন ছিল না। গোল বাঁধালেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রামের জন্মের এক হাজার বছর আগে 'রামায়ণ' রচনা করেছিলেন মহর্ষি কবি বাল্মীকি। এ প্রসঙ্গে কবিগুরু লিখেছেন, 'যাহা ঘটে, তাহা সত্য নয়। কবির মনোভূমি রামের জন্মভূমি অযোধ্যার চেয়ে সত্য জেনো।' অর্থাৎ কিনা, হাজার বছর পর জন্ম নিয়ে রাম কী করবেন, কী বলবেন, তার চেয়ে অনেক বেশি সত্য বাল্মীকির কবি মনে জন্ম নেওয়া রাম, তার বচন, তার কর্ম। তাই কবি কল্পনার চোখে যা দর্শন করেন, তাই সত্য, যা ঘটে, তা নয়।
এবারকার বাজেট নিয়ে তেমনটাই মনে হয়। আগামী বছর কী ঘটবে তা নিয়ে ভাবনার অবকাশ নেই। কাল্পনিক হিসাববিদ অর্থমন্ত্রীর মানসপটে যা উদিত হয়েছে, তাই সত্য। বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, 'আয় হোক বা না হোক, আমি ব্যয় করেই যাবো।' এর আগে কোনো অর্থমন্ত্রী এমন কথা বলার সাহস দেখাননি। তাদের সাদামাটা কথা ছিল, যতটুকু আয়, ততটুকু ব্যয়; এরপর প্রকল্প বাস্তবায়ন থেমে যাবে। এখানেই বর্তমান অর্থমন্ত্রীর কথার বাহাদুরি। আয় না হলেও তিনি ব্যয় করেই যাবেন। কথাটা তো উড়িয়েই দিতাম! চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট বলে কথা! তিনি নিশ্চয়ই হিসাব করে কথা বলেছেন। তাহলে কথাটার অর্থ কী? পিতার অগাধ অর্থ ও সম্পত্তি ছিল। পিতার মৃত্যুর পর ছেলে সব খরচা করে ধারকর্জ করে ঠাটবাট বজায় রাখছিল। তারপর একদিন শোনা গেল, আদালত ছেলেকে দেউলিয়া ঘোষণা করেছেন। সমীকরণ করলে প্রশ্ন দাঁড়ায়, অর্থমন্ত্রী আয় ছাড়া ব্যয় করতে করতে দেশটাকে কি দেউলিয়া বানিয়ে ছাড়বেন। তারপর? তারপর আর কী। দেউলিয়া তো হবে দেশ, দেশের ষোলো কোটি মানুষ। মাথাব্যথাটা তাই দেশের মানুষের।
প্রথমেই ধরা যাক বাজেটে প্রাক্কলিত জাতীয় আয়ের প্রবৃদ্ধির অঙ্ক। জিডিপির প্রবৃদ্ধি দেখানো হয়েছে ৮.২ শতাংশ। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবিসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বাংলাদেশে প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন করেছে ২ শতাংশ থেকে সাড়ে ৩ শতাংশ। দেশের স্বীকৃত গবেষণা সংস্থা সিপিডির প্রাক্কলন ছিল ২.৫ শতাংশ। অর্থমন্ত্রী এক কথার মানুষ। করোনা আক্রমণের আগে থেকেই তিনি ৮ শতাংশ অতিক্রম করার কথা বলে আসছেন। করোনার আক্রমণে গার্মেন্টসহ শিল্প খাত, বাণিজ্য খাত, বৈদেশিক রেমিট্যান্স খাত- এসবই পর্যুদস্ত। কিন্তু অর্থমন্ত্রী মানতে নারাজ। তিনি করোনার আগে ৮ শতাংশ, করোনার মধ্যে ও ৮.২ শতাংশ। দেখা যাক, করোনার পর কী দাঁড়ায়!
এত দুর্যোগের মধ্যেও অর্থমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন, টাকার কোনো অভাব হবে না। বিশেষ করে স্বাস্থ্য খাতে যত টাকা প্রয়োজন, তত টাকাই দেওয়া হবে। মনে পড়ে গেল, জিয়াউর রহমান সাহেবের উদ্ৃব্দত উক্তি, 'মানি ইজ নো প্রবলেম' অর্থাৎ টাকা কোনো সমস্যাই না।
বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী একটা মূল্যবান কথা বলেছেন। তিনি বলেন, 'সমাজে সমতা আনতে কর আরোপ করা হয়। ধনী আরও ধনী হয়ে গেল। গরিব না খেয়ে থাকল। এটা সরকার চায় না।' কিন্তু এই সদিচ্ছাটি কীভাবে বাস্তবায়িত হবে এবং বাজেটে তা কীভাবে প্রতিফলিত হয়েছে, তেমন ব্যাখ্যা তিনি দেননি।

ব্যাংক খাত নিয়ে অর্থমন্ত্রীর কথা রহস্যে ভরা। তিনি বলেছেন আগে খেলাপি ঋণ বেশি থাকায় ব্যাংক ঋণ দিতে পারত না। এখনও খেলাপি হ্রাস পেয়েছে। ব্যাংকগুলো ঋণ দিতে পারছে। কিন্তু খেলাপি ঋণ কীভাবে কমল, সেই ধাঁধার উত্তর তিনি দেননি। প্রকৃতপক্ষে খেলাপি আদায় হয়নি। মার্কামারা বৃহৎ খেলাপিদের বাঁচানোর জন্য এক রকম আদায় ছাড়াই দীর্ঘদিনের মন্দঋণ শ্রেণিমুক্ত করা হয়েছে। এসব খেলাপিপ্রীতি ছিল সরকারের বদান্যতা, যার কুফল ভবিষ্যতে প্রতিফলিত হবে। তখন ব্যাংক খাত আবার খেলাপির ভারে ন্যুব্জ হবে। অর্থমন্ত্রী এটিকে ব্যবসাবান্ধব নীতি বলেছেন। প্রকৃতপক্ষে এটা ছিল খেলাপিবান্ধব নীতি। এতে কিছুটা সময়ক্ষেপণ হবে। ভারমুক্ত হওয়া যাবে না।
মাননীয় মন্ত্রীর একটি আপ্তবাক্য যা তিনি আগেও বলেছেন। এবার বাজেট প্রসঙ্গেও বলেছেন, 'সুদহার ৯ শতাংশের বেশি হলে খেলাপি ঋণ বাড়ে, বিনিয়োগ হয় না। বিদেশে বিনিয়োগ চলে যায়।' এই দাবির পেছনে কি কোনো গবেষণা আছে? নাকি ধনীজনের স্বার্থসিদ্ধির জন্য তার এই আপ্রাণ প্রয়াস? ঋণ প্রবৃদ্ধির হার ১৬-১৭ এমন কি ১৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল যখন ঋণের সুদহার ছিল ১২ থেকে ১৬ শতাংশ। অনেক সমীক্ষায় প্রকাশিত হয়েছে যে, ঋণের আদায় সুদহার নির্ভর নয়, বরং ঋণ ব্যবস্থাপনানির্ভর।
দীর্ঘ পাঁচ বছর পর, এবারের বাজেটে একটি জনদাবি স্বীকৃত হয়েছে। ব্যক্তি শ্রেণির করমুক্ত আয়ের সীমা ২.৫০ লাখ থেকে ৩ লাখ টাকায় উন্নীত হয়েছে। ৫ বছরে ৫ শতাংশ করে হলেও আয়ের অবমূল্যায়ন হয়েছে ২৫ শতাংশ। এই পরিপ্রেক্ষিতে শতকরা মাত্র অর্ধভাগ আয়সীমা বৃদ্ধি বাস্তবসম্মত না হলেও মন্দের ভালো। উল্লেখ্য, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে করমুক্ত আয়সীমা ৫ লাখ রুপি (অর্থাৎ ৬ লাখ টাকা)। সমতাভিত্তিক সমাজ গঠনে ভারতের এই করনীতি বাস্তবসম্মত। বাংলাদেশের মাত্র ৩ লাখ টাকা একটি 'হাফ- হার্টেড' প্রচেষ্টা। আগামী ৫ বছরে করমুক্ত আয়সীমা ভারতের সমান হওয়া উচিত। সেই লক্ষ্যে এখন থেকে পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত। কিন্তু মন্ত্রীর বক্তব্য আমাদের উদ্বিগ্ন করেছে। তিনি বলেছেন, '৩ লাখ টাকা যার আছে, সে এখন গরিব না। ধনীদের নিচের দিকে।' তাই কি? বার্ষিক ৩ লাখ টাকা আয় অর্থ মাসিক আয় ২৫,০০০। অনেক পুরোনো পিওন-দারোয়ানের বেতন ২৫,০০০ টাকার বেশি। তারাও ধনী? সংবাদে শুনেছি, করোনার সাধারণ ছুটিতে এই শ্রেণির এমন কী উচ্চতর শ্রেণির অনেক মানুষ ফোন করে সাহায্য চেয়েছেন। সরকারের নীতিনির্ধারকদের চিন্তা- চেতনা বাস্তবসম্মত হওয়া উচিত।
তবে করোনার এই দুঃসময়ে দুঃসাহসী বাজেট পেশ করার জন্য অর্থমন্ত্রী ধন্যবাদ পেতে পারেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর
- বিষয় :
- অর্থনীতি
- খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ