ঢাকা সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬

চিকিৎসা প্রযুক্তিবিদ নিয়োগ

এখনও গেল না দুষ্টচক্র

এখনও গেল না দুষ্টচক্র
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ১৫ জুন ২০২০ | ১৪:৪৮

বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালের জন্য চিকিৎসা প্রযুক্তিবিদ নিয়োগে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে প্রণীত চূড়ান্ত তালিকা সম্পর্কে সোমবার সমকালে যে শীর্ষ প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে, তা আমাদের যতখানি না বিক্ষুব্ধ তার চেয়ে বেশি বিস্মিত করেছে। এতকিছুর পরও স্বাস্থ্য খাতে সিন্ডিকেট বহাল তবিয়তে! স্বাস্থ্য খাতে নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি, ক্রয় প্রভৃতি বিষয়ে দুর্নীতির কারণেই দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার যে এই হাল, এ সম্পর্কে কম আলোচনা-সমালোচনা হয়নি। আমরা দেখেছি, চিকিৎসা সংশ্নিষ্ট মহলগুলো ছাড়াও সাধারণ নাগরিকদের মধ্যেও বিষয়টি আলোচিত। বস্তুত সমালোচনার মুখেই সম্প্রতি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে সচিব, কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের পরিচালকসহ স্বাস্থ্য প্রশাসনের উচ্চতর স্তরে রদবদল হয়েছে। আমরা প্রত্যাশা করেছিলাম, এর পরিপ্রেক্ষিতে সিন্ডিকেটবাজি কমবে। কিন্তু আমাদের আশা যে নিছক দুরাশা ছিল, চিকিৎসা প্রযুক্তিবিদ নিয়োগ প্রক্রিয়া তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। অবশ্য অতীতেও আমরা দেখেছি, কোনো প্রশাসনে বদলিই হলেই সুশাসন আসে না। প্রশাসক বদল হয়, রয়ে যায় সিন্ডিকেট। কিন্তু আমরা ভেবেছিলাম, করোনাভাইরাস এসে অন্তত সংশ্নিষ্টদের সংবিৎ ফিরিয়েছে। বিলম্বে হলেও তারা বুঝতে পেরেছে যে, স্বাস্থ্য খাতে ফাঁক রাখলে তা গোটা জাতির জন্য কীভাবে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে পারে। বিশেষত চিকিৎসা প্রযুক্তিবিদের মতো অপেক্ষাকৃত প্রান্তিক কিন্তু স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ স্তরে ফাঁকি দেওয়ার ফল যখন হতে পারে ভয়াবহ।

আমাদের বিক্ষোভের চেয়ে আক্ষেপ বেশি আরেকটি কারণে। এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেই মে মাসের গোড়ার দিকে আমরা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা প্রযুক্তিবিদ নিয়োগের জোর তাগিদ দিয়েছিলাম। কারণ তখন সমকালে প্রকাশিত অন্য একটি প্রতিবেদনে দেখা গিয়েছিল- হাসপাতালে হাসপাতালে চিকিৎসা প্রযুক্তিবিদ সংকটে করোনাভাইরাস আক্রান্তদের নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষাই সংকটের মুখে পড়েছে। তখন দেখা গিয়েছিল, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার ছয়টি শাখা মিলিয়ে সারাদেশে চিকিৎসা প্রযুক্তিবিদের পদ রয়েছে প্রায় আট হাজার। এর মধ্যে কমবেশি তিন হাজার পদ খালি ছিল। অনেক হাসপাতালেই দেখা গিয়েছিল মাত্র একজন চিকিৎসা প্রযুক্তিবিদ রয়েছে। করোনা পরিস্থিতি চলাকালেই চিকিৎসা প্রযুক্তিবিদ নিয়োগের তাগিদ দিয়ে আমরা বলেছিলাম- ডাক্তাররা যদি চিকিৎসা ব্যবস্থার মস্তিস্ক হন, তাহলে সেবিকারা হচ্ছেন চোখ-কান। আর চিকিৎসা প্রযুক্তিবিদও হচ্ছেন চিকিৎসা ব্যবস্থার হাত-পা। একটি সুষম ও সুসংহত চিকিৎসা ব্যবস্থায় তিন পদেই প্রয়োজনীয় লোকবল থাকতে হবে। শুধু চিকিৎসক ও সেবিকা থাকলেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা প্রযুক্তিবিদ ছাড়া বর্তমান সময়ের একটি চিকিৎসা ব্যবস্থা চলচ্ছক্তিহীন বিবেচিত হতে বাধ্য। আমরা দেখেছি, করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নিয়োগ দেওয়া হয়েছে সেবিকাও। তারপর গত মাসে যখন কমবেশি ১২শ' চিকিৎসা প্রযুক্তিবিদ নিয়োগ প্রক্রিয়া সূচিত হয়, আমরা আশাবাদী হয়েছিলাম। এখন তো দেখা যাচ্ছে আমাদের এত আলোচনা, এত আশাবাদ- সকলই গরল ভেল! সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে যে তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে, সেখানে স্থান পায়নি এতদিন বিভিন্ন স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে দৈনিক মজুরিতে কাজ করে আসা চিকিৎসা প্রযুক্তিবিদরা। বরং করোনা পরিস্থিতিতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যারা নতুন যুক্ত হয়েছে, বা যাদের অভিজ্ঞতা এক-দুই মাসের বেশি নয়, তারাই স্থান পেয়েছে তালিকায়। অভিযোগ রয়েছে, এর নেপথ্যে রয়েছে পুরোনো সিন্ডিকেট। আমরা মনে করি, গুরুত্বপূর্ণ একটি নিয়োগের ক্ষেত্রে এমন সিন্ডিকেটবাজি আর চলতে পারে না। এই দুষ্টচক্র ভাঙতেই হবে। সমকালের কাছে কেউ কেউ যে এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার নেপথ্যে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ তুলেছেন, তাও খতিয়ে দেখতে হবে গুরুত্বের সঙ্গে। স্বাস্থ্য ব্যবস্থার এত বড় চ্যালেঞ্জের মুখেও যারা অনিয়ম করতে চাইছে, তার আসলে নাগরিকদের প্রাণ নিয়েই খেলতে চায়। এদের প্রশাসনিক পরিচয় বা রাজনৈতিক রং যাই হোক না কেন, অভিযোগ প্রমাণ হলে ছাড় দেওয়ার অবকাশ নেই। যে কোনো মূল্যে আনতে হবে আইনের আওতায়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষে বিভিন্ন স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে চিঠি দিয়ে তালিকা চাওয়ার যে কথা বলা হচ্ছে, তা নেহাত খোঁড়া যুক্তি। চিঠিতে সাড়া না পেলে ওই প্রতিষ্ঠানের নিয়োগযোগ্যরা বঞ্চিত হবেন- রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে এমন খামখেয়ালিপনার অবকাশ নেই। এ ছাড়া ওই চিঠির ভাষা ও আনুষঙ্গিক নিয়ম নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তাও আমলে নিতে হবে বৈকি। মন্দের ভালো যে, এই তালিকায় তিনশ'রও কম চিকিৎসা প্রযুক্তিবিদকে চূড়ান্ত করা হয়েছে। আমরা দেখতে চাইব, অবিলম্বে তালিকাটি ত্রুটিমুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে বাকি নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম ও কারচুপি দেখতে চাই না। ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর পকেট ভারী করতে স্বাস্থ্য খাতে অনেক আবর্জনা জমেছে, এর পুনরাবৃত্তি আর নয়।

আরও পড়ুন

×