সমাজ ও রাষ্ট্রের মুক্তিই তার স্বপ্ন
×
আহমদ কবির
প্রকাশ: ২২ জুন ২০২০ | ১২:০০
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বাংলা গদ্যের এক উৎকৃষ্ট শিল্পী। গদ্য রচয়িতা হিসেবে তার সুনাম ছড়িয়ে পড়েছিল পঞ্চাশের দশকে। সেই থেকে তিনি অনবরত লিখে চলেছেন। এতটা সময় তার কলম সক্রিয় থেকেছে এবং থাকবেও আরও বহুদিন। দেশ-বিদেশের সাহিত্যের অনুপম ব্যাখ্যাদাতা ও বাংলাদেশের সমাজ-সংস্কৃতি রাজনীতির উঁচু মানের বিশ্নেষক হিসেবে তিনি উল্লেখযোগ্য হিসেবে দাবিদার হয়েছেন বহুদিন আগে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের উত্তম ছাত্র (এমএ পাস ১৯৫৬) সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ছাত্রত্ব ঘোচানোর পরপরই বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক হন এবং দীর্ঘ চল্লিশ বছর নিরবচ্ছিন্ন ও নিয়মিত শিক্ষকতা শেষে অবসর গ্রহণ করেন (১৯৯৬)। কিন্তু এর পরপরই ইংরেজি বিভাগের সংখ্যাতিরিক্ত শিক্ষক হিসেবে এবং ২০০৭ সালে ইমেরিটাস প্রফেসর হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।
এখন পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা ও শিক্ষাজীবনের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা পুরো ষাট বছরের। এই ছয় দশকে তার শিক্ষকতা, গবেষণা, লেখালেখি, সম্পাদনা ও বিদ্যাচর্চার নানা আয়োজনের এত সাফল্য অল্প কথায় বলে শেষ করা যাবে না। স্কুল জীবন থেকেই তিনি লেখায় অনুরাগী হন। দেয়ালপত্র লেখার মধ্য দিয়ে বড় লেখার সূচনা হয় তার লেখক জীবনের শুরুতে। গল্প, রম্য রচনা, আলোচনা ইত্যাদি লিখতে লিখতে তিনি বড় প্রাবন্ধিক ও চিন্তাবিদ হিসেবে এবং উত্তম গদ্য লিখিয়েরূপে বিকশিত হন। বাংলাদেশের চিন্তার জগতে তিনি এক দাপুটে ও প্রভাবশালী লেখক এবং এ মুহূর্তে তার চেয়ে বড় গদ্য লেখক কেউ নেই।
পত্রিকা সম্পাদনার কাজ তার অনুরাগের প্রকাশ। ছাত্রজীবনেই শুরু করেছিলেন সে কাজ। তার সম্পাদিত পত্রিকার তালিকা হবে দীর্ঘ। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো লেখক সংঘের 'পরিক্রম', মুক্তধারার 'সাহিত্যপত্র', নিজের প্রকাশনা থেকে নতুন দিগন্ত এবং 'ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পত্রিকা'। দীর্ঘ ষোলো বছর তিনি অতি সুনামের সঙ্গে এই গবেষণা পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আগে ইংরেজি জার্নাল 'ঢাকা ইউনিভার্সিটি স্টাডিজ' বের করা হতো। ইংরেজির সঙ্গে বাংলা পত্রিকা তারই উদ্ভাবন। একসময় ইংরেজি-বাংলা উভয় গবেষণা পত্রিকা তিনিই সম্পাদনা করেছেন।
পত্রিকা সম্পাদনার পাশাপাশি তিনি এক সুদক্ষ লিখিয়ে হিসেবে বিকশিত হন। কলাম তাকে শিল্পময় গদ্য রচনার স্থান করে দেয়। যৌবনে লিখেছেন 'পুশনী' পত্রিকায় ঢাকায় থাকি নামের সুরম্য কলাম। 'পরিক্রম' পত্রিকায়ও তিনি কলাম লিখেছেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে লেখেন সাপ্তাহিক বিচিত্রায় 'উপর কাঠামোর ভেতরেই'। সবচেয়ে বেশি খ্যাতি পান দৈনিক সংবাদ পত্রিকার 'সময় বহিয়া যায়' কলামের জন্য। সব কলামেই দেশের সাহিত্য, সংস্কৃতি, সম্পদ, রাজনীতি, অর্থনীতি, নাগরিক জীবন জনদুর্ভোগ, দারিদ্র্য, দুর্ভিক্ষ, বিশেষ করে সামাজিক শ্রেণি বৈষম্য নিয়ে লিখেছেন। আলোচনা করেছেন। শেষেরটিই বেশি করে এসেছে তার কলাম লিখনে। তার সব কলামের লেখা সাহিত্যগুণ ও সমাজ চিত্রবীক্ষণের জন্য জনপ্রিয় হয়েছে এবং পরে গ্রন্থভুক্ত হয়েছে।
তবে কলামের জন্য তিনি দেশে সুপরিচিত ও সুখ্যাত হয়েছেন তা নয়, তিনি প্রণয়ন করেছেন অজস্র গ্রন্থ- বেশির ভাগই প্রবন্ধের সংকলন। নানা বিষয়ের প্রবন্ধ, যেগুলো গুণে-মানে আকর্ষণীয় ও চিন্তা উদ্রেককারী। তার গদ্য ভঙ্গিও অনুপম। চিন্তাকে শিল্পমণ্ডিত করে স্বাদ গদ্যের নির্মাণে তিনি নিপুণ লেখক। এ প্রসঙ্গে তার গদ্যরীতির কথা বলতে হয়। ইংরেজি পড়ার সুবাদে তিনি বাংলা গদ্যকে অধিক রীতিবৈশিষ্ট্যপূর্ণ করার ক্ষমতা অর্জন করেন।
তার ইংরেজি সাহিত্য পড়ারও প্রণোদনা বাংলা চর্চা করার জন্য। এতে যে তার দীর্ঘ সাধনা সফল হয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কেবল ছোট প্রবন্ধে নয়, দেশকাল মিলিয়ে বিশাল পরিসরের সমাজ-প্রেক্ষাপট আলোচনায়ও তার নৈপুণ্য সুবিদিত। এককথায় তিনি দেশের বড় লেখক, বড় চিন্তাবিদ। সমাজ বৈষম্যের ঘোর বিরোধী তিনি। তিনি চান ব্যবস্থা এমন হোক, যাতে দেশের মানুষের উঁচু-নীচু ভেদাভেদ ঘুচে যাবে। এতেই সমাজ ও রাষ্ট্রের মানুষ আর্থিক সংকট থেকে মুক্ত হবে; অর্থাৎ মানবিক মর্যাদায় সবাই সমশ্রেণিভুক্ত হবে। এ কথাটি গুরুত্ব দিয়ে তিনি তার সব বইতে বলেছেন। 'অন্বেষণ' থেকে শুরু করে এ যাবতকাল তিনি যে কয়েক ডজন বই লিখেছেন সেগুলো তাকে দেশ ও মানুষের মঙ্গলকামী মানুষরূপে চিরজীবী রাখবে।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর জন্মস্থান শ্রীনগর উপজেলার বাড়ৈইখালী গ্রামে। তার বাবার নাম হাফিজ উদ্দিন চৌধুরী ও মা আসিয়া খাতুন। বাবার সরকারি চাকরিসূত্রে তার শৈশব কেটেছে রাজশাহী ও কলকাতায়। পড়াশোনা করেছেন ঢাকার সেন্ট গ্রেগরিজ স্কুল, নটর ডেম কলেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ইংরেজি সাহিত্যে উচ্চতর গবেষণা করেছেন যুক্তরাজ্যের লিডস এবং লিস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট কর্তৃক দু'বার উপাচার্য হওয়ার জন্য মনোনীত হয়েছিলেন। কিন্তু তিনি উৎসাহ দেখাননি। শিক্ষায় অবদানের জন্য তিনি ১৯৯৬ সালে একুশে পদকে ভূষিত হন।
৮৪ বছরের পূর্ণ জীবনে তার প্রতি অভিবাদন।
অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
এখন পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা ও শিক্ষাজীবনের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা পুরো ষাট বছরের। এই ছয় দশকে তার শিক্ষকতা, গবেষণা, লেখালেখি, সম্পাদনা ও বিদ্যাচর্চার নানা আয়োজনের এত সাফল্য অল্প কথায় বলে শেষ করা যাবে না। স্কুল জীবন থেকেই তিনি লেখায় অনুরাগী হন। দেয়ালপত্র লেখার মধ্য দিয়ে বড় লেখার সূচনা হয় তার লেখক জীবনের শুরুতে। গল্প, রম্য রচনা, আলোচনা ইত্যাদি লিখতে লিখতে তিনি বড় প্রাবন্ধিক ও চিন্তাবিদ হিসেবে এবং উত্তম গদ্য লিখিয়েরূপে বিকশিত হন। বাংলাদেশের চিন্তার জগতে তিনি এক দাপুটে ও প্রভাবশালী লেখক এবং এ মুহূর্তে তার চেয়ে বড় গদ্য লেখক কেউ নেই।
পত্রিকা সম্পাদনার কাজ তার অনুরাগের প্রকাশ। ছাত্রজীবনেই শুরু করেছিলেন সে কাজ। তার সম্পাদিত পত্রিকার তালিকা হবে দীর্ঘ। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো লেখক সংঘের 'পরিক্রম', মুক্তধারার 'সাহিত্যপত্র', নিজের প্রকাশনা থেকে নতুন দিগন্ত এবং 'ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পত্রিকা'। দীর্ঘ ষোলো বছর তিনি অতি সুনামের সঙ্গে এই গবেষণা পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আগে ইংরেজি জার্নাল 'ঢাকা ইউনিভার্সিটি স্টাডিজ' বের করা হতো। ইংরেজির সঙ্গে বাংলা পত্রিকা তারই উদ্ভাবন। একসময় ইংরেজি-বাংলা উভয় গবেষণা পত্রিকা তিনিই সম্পাদনা করেছেন।
পত্রিকা সম্পাদনার পাশাপাশি তিনি এক সুদক্ষ লিখিয়ে হিসেবে বিকশিত হন। কলাম তাকে শিল্পময় গদ্য রচনার স্থান করে দেয়। যৌবনে লিখেছেন 'পুশনী' পত্রিকায় ঢাকায় থাকি নামের সুরম্য কলাম। 'পরিক্রম' পত্রিকায়ও তিনি কলাম লিখেছেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে লেখেন সাপ্তাহিক বিচিত্রায় 'উপর কাঠামোর ভেতরেই'। সবচেয়ে বেশি খ্যাতি পান দৈনিক সংবাদ পত্রিকার 'সময় বহিয়া যায়' কলামের জন্য। সব কলামেই দেশের সাহিত্য, সংস্কৃতি, সম্পদ, রাজনীতি, অর্থনীতি, নাগরিক জীবন জনদুর্ভোগ, দারিদ্র্য, দুর্ভিক্ষ, বিশেষ করে সামাজিক শ্রেণি বৈষম্য নিয়ে লিখেছেন। আলোচনা করেছেন। শেষেরটিই বেশি করে এসেছে তার কলাম লিখনে। তার সব কলামের লেখা সাহিত্যগুণ ও সমাজ চিত্রবীক্ষণের জন্য জনপ্রিয় হয়েছে এবং পরে গ্রন্থভুক্ত হয়েছে।
তবে কলামের জন্য তিনি দেশে সুপরিচিত ও সুখ্যাত হয়েছেন তা নয়, তিনি প্রণয়ন করেছেন অজস্র গ্রন্থ- বেশির ভাগই প্রবন্ধের সংকলন। নানা বিষয়ের প্রবন্ধ, যেগুলো গুণে-মানে আকর্ষণীয় ও চিন্তা উদ্রেককারী। তার গদ্য ভঙ্গিও অনুপম। চিন্তাকে শিল্পমণ্ডিত করে স্বাদ গদ্যের নির্মাণে তিনি নিপুণ লেখক। এ প্রসঙ্গে তার গদ্যরীতির কথা বলতে হয়। ইংরেজি পড়ার সুবাদে তিনি বাংলা গদ্যকে অধিক রীতিবৈশিষ্ট্যপূর্ণ করার ক্ষমতা অর্জন করেন।
তার ইংরেজি সাহিত্য পড়ারও প্রণোদনা বাংলা চর্চা করার জন্য। এতে যে তার দীর্ঘ সাধনা সফল হয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কেবল ছোট প্রবন্ধে নয়, দেশকাল মিলিয়ে বিশাল পরিসরের সমাজ-প্রেক্ষাপট আলোচনায়ও তার নৈপুণ্য সুবিদিত। এককথায় তিনি দেশের বড় লেখক, বড় চিন্তাবিদ। সমাজ বৈষম্যের ঘোর বিরোধী তিনি। তিনি চান ব্যবস্থা এমন হোক, যাতে দেশের মানুষের উঁচু-নীচু ভেদাভেদ ঘুচে যাবে। এতেই সমাজ ও রাষ্ট্রের মানুষ আর্থিক সংকট থেকে মুক্ত হবে; অর্থাৎ মানবিক মর্যাদায় সবাই সমশ্রেণিভুক্ত হবে। এ কথাটি গুরুত্ব দিয়ে তিনি তার সব বইতে বলেছেন। 'অন্বেষণ' থেকে শুরু করে এ যাবতকাল তিনি যে কয়েক ডজন বই লিখেছেন সেগুলো তাকে দেশ ও মানুষের মঙ্গলকামী মানুষরূপে চিরজীবী রাখবে।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর জন্মস্থান শ্রীনগর উপজেলার বাড়ৈইখালী গ্রামে। তার বাবার নাম হাফিজ উদ্দিন চৌধুরী ও মা আসিয়া খাতুন। বাবার সরকারি চাকরিসূত্রে তার শৈশব কেটেছে রাজশাহী ও কলকাতায়। পড়াশোনা করেছেন ঢাকার সেন্ট গ্রেগরিজ স্কুল, নটর ডেম কলেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ইংরেজি সাহিত্যে উচ্চতর গবেষণা করেছেন যুক্তরাজ্যের লিডস এবং লিস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট কর্তৃক দু'বার উপাচার্য হওয়ার জন্য মনোনীত হয়েছিলেন। কিন্তু তিনি উৎসাহ দেখাননি। শিক্ষায় অবদানের জন্য তিনি ১৯৯৬ সালে একুশে পদকে ভূষিত হন।
৮৪ বছরের পূর্ণ জীবনে তার প্রতি অভিবাদন।
অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
- বিষয় :
- মুক্তিই তার স্বপ্ন