ঢাকা শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬

উন্নয়ন প্রকল্প

সাশ্রয়ের নিশ্চয়তা সুশাসনে

সাশ্রয়ের নিশ্চয়তা সুশাসনে
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ১৫ জুলাই ২০২০ | ১৪:২২

উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় সাশ্রয়ের যে পরামর্শ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় দিয়েছেন, তাতে জনমতই প্রতিফলিত হয়েছে। তার নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের টানা তিন মেয়াদে উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির প্রশ্নে কারও দ্বিমত নেই। বিশেষত অবকাঠামোগত উন্নয়নের কারণেই বাংলাদেশ এশিয়ার উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে রয়েছে প্রথম সারিতে। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর মতো মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা এক দশক আগে যেখানে কেউ চিন্তাও করত না, এখন তা নিরেট বাস্তবতা। কিন্তু একই সঙ্গে প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ব। খোদ পদ্মা সেতু প্রকল্পের ব্যয় আমরা দফায় দফায় বাড়তে দেখেছি। একই কথা বলা চলে বিভিন্ন উড়াল সেতু, সড়ক ও রেল প্রকল্পের ব্যাপারেও। অস্বীকারের অবকাশ নেই যে, প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে রয়েছে বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতাসহ যৌক্তিক বিভিন্ন কারণ। বস্তুত বিশ্বের অন্যান্য দেশেও প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় বেড়ে গেলে সেই অনুপাতে ব্যয়ও বাড়ে। কিন্তু আমাদের দেশে প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে বাতাসে ঘুরে বেড়ায় নানা আলোচনা। এর কোনো কোনোটি কতটা সত্য, রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎ প্রকল্পের আবাসিক ভবন সজ্জিতকরণ ব্যয়ের মধ্য দিয়ে তা নিদারুণ স্পষ্ট হয়ে আছে। সাধারণ আসবাবপত্র ও তা বাইরে থেকে ঘরে ঢোকানোর অসাধারণ ব্যয় আমাদের সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে 'বালিশকাণ্ড' হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল। বালিশের পথ ধরেই হাসপাতালের পর্দাকাণ্ড এসেছিল। তারপর এসেছিল স্বাস্থ্য খাতে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র। অনেকে ধারণা করেছিল, করোনা পরিস্থিতিতে দুর্নীতিবাজরা 'শুধরে' যাবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, করোনায় মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করেও নিজের পকেট ভারী করতে দ্বিধা করেনি তারা। বিশেষত করোনা পরীক্ষা ও চিকিৎসা নিয়ে দুর্নীতির খেসারত এখন বাংলাদেশ ছেড়ে বিদেশের মাটিতেও দিতে হচ্ছে আমাদের। স্বাস্থ্য খাতে এখন বেরিয়ে আসছে আরও দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা। সেই সঙ্গে সাশ্রয় দূরে থাক; অহেতুক, অমূলক এমনকি ভিত্তিহীন খরচের যেন প্রতিযোগিতায় মেতেছে কোনো কোনো ব্যক্তি ও গোষ্ঠী। অতি সম্প্রতি দেখা গেছে সামান্য ইন্টারনেট খরচ করে ঘরে বসে অনলাইন কর্মশালায় অংশ নিয়ে লাখ লাখ টাকা বিল করছে সরকারের বাস্তবায়ন, পরীবিক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। অথচ এ ধরনের কর্মসূচি বাস্তবায়নে এখনই ছিল সাশ্রয়ের শ্রেষ্ঠ সময়। পরিকল্পনামন্ত্রী ইতোমধ্যে এর ব্যাখ্যা চেয়েছেন বলে সংবাদমাধ্যমে খবর এসেছে। আমরা মনে করি, সরকারের অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও বিভাগেও এ ধরনের ব্যয়ের ব্যাপারে খতিয়ে দেখা যেতে পারে। মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রীর এই আহ্বানের পর সব মন্ত্রণালয়েরই উচিত হবে বিলম্বে হলেও ব্যয় সাশ্রয়ে মনোযোগী হওয়া। কিন্তু যারা সামান্য কাজেও বিপুল ব্যয় 'দেখিয়ে' অভ্যস্ত, তারা কি প্রধানমন্ত্রীর কথা শুনবে? কোনোকালেই চোরে ধর্মের কাহিনী শুনেছে বলে নজির নেই। আমাদের মনে আছে, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের জরিপে বাংলাদেশ পরপর কয়েক বছর দুর্নীতিতে বৈশ্বিক 'চ্যাম্পিয়ন' ঘোষিত হয়েছিল। সেই দুর্নীতির বিরুদ্ধেই সুশাসনের অঙ্গীকার ব্যক্ত করে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় ফিরেছিল আওয়ামী লীগ। ওই নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ যেসব অঙ্গীকার করেছিল, তার বেশিরভাগই পূরণ করেছে স্বীকার করতেই হবে। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার, যুদ্ধাপরাধের বিচার ছাড়াও জঙ্গিবাদ দমনে সাফল্যের পরিচয় দিয়েছে বর্তমান সরকার। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয়, কর্মসংস্থান বেড়েছে। কিন্তু দুর্নীতির বিরুদ্ধে কি কাঙ্ক্ষিত সাফল্য এসেছে? আমরা মনে করি, অনিয়ম, দুর্নীতি ও ব্যয়বাহুল্যে লাগাম টেনে ধরা গেলে অনেক উন্নয়ন প্রকল্পই আরও কম অর্থে আরও আগেই বাস্তবায়ন সম্ভব হতো। অর্থনৈতিক উন্নয়ন হতো আরও ত্বরান্বিত। বর্তমানে আমরা যে আয় ও সম্পদ বৈষম্য দেখি, তার পেছনেও দুর্নীতি ও অনিয়ম একটি বড় কারণ। ফলে ব্যয় সাশ্রয় করতে হলে সর্বস্তরে সুশাসনের বিকল্প নেই। দুর্নীতি ও অনিয়মকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা ছাড়া সুশাসন থেকে যাবে সুদূর পরাহত।

আরও পড়ুন

×