ঢাকা রোববার, ২১ জুন ২০২৬

প্রণোদনা

শিক্ষার উন্নয়নে শিক্ষকদের বোনাস দিন

শিক্ষার উন্নয়নে শিক্ষকদের বোনাস দিন
×

এম আর খায়রুল উমাম

প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ২৫ জুলাই ২০২০ | ১৫:২১

গত ৩০ বছরে শিক্ষার উন্নয়ন শুধু এগিয়ে চলার ইতিহাস। ১৯৯০ সালে এসএসসি পরীক্ষায় গড় পাসের হার ছিল ৩১ দশমিক ৭৩ আর সদ্য প্রকাশিত ২০২০ সালে গড় পাসের হার গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৮২ দশমিক ৮৭। শিক্ষার ক্রম-উন্নয়নে ২০০১ সালে এসএসসি পরীক্ষার গড় পাসের হার সর্বনিম্ন ৩৫ দশমিক ২২ এবং ২০১৪ সালে গড় পাসের হার সর্বোচ্চ ৯২ দশমিক ৬৭ হয়েছিল। এমন পাসের হারে আমাদের জনবান্ধব সরকার খুশি বলে মনে হয় না। সরকারের পক্ষ থেকে একটির পর একটা শিক্ষার উন্নয়নে পদক্ষেপ গ্রহণ করার পরও শিক্ষক, শিক্ষার্থী আর অভিভাবকদের অমনোযোগিতার কারণে আজ পর্যন্ত শতভাগ পাসের লক্ষ্য অর্জন করতে ব্যর্থ হচ্ছে। সরকারি প্রচেষ্টায় সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করে, অচিরেই এই অল্পকিছু শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবক সরকারের অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে সহযোগিতার হাত প্রসারিত করবে এবং শতভাগ পাসের মাইলস্টোন স্পর্শ করতে আমরা সক্ষম হবো। সরকার নিরলসভাবে কাজ করে প্রায় শতভাগ শিশুকে স্কুলমুখী করতে সক্ষম হয়েছে, তাই জনগণ সে আশা করতেই পারে।

পরীক্ষা হচ্ছে শিক্ষা পরিমাপ করার একটি গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি। এই পদ্ধতির মধ্য দিয়ে যারা সফল হয়, তারা নিশ্চয় একটি মান অর্জনে সক্ষম হয়। এই বিবেচনায় আমাদের শিক্ষাকে মানহীন বলার কোনো সুযোগ আছে বলে মনে হয় না। অথচ শিক্ষামন্ত্রী থেকে অনেকেই শিক্ষার মানোন্নয়নের কথা প্রায়শই বলে থাকেন। এখানে অনেকে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর দায় চাপিয়ে থাকেন। সরকারের পরীক্ষা পদ্ধতির মধ্য দিয়ে ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থীকে তার সফলতার বিষয়ে গাইড করছে শিক্ষক সমাজ। তাই শিক্ষার মান নিয়ে যদি কারও দায় থাকে, তবে পরীক্ষা পদ্ধতির মধ্যেই আছে। শিক্ষার মানের প্রশ্নে শিক্ষা কর্তৃপক্ষ এখানে কাজ করতে পারে। বরং শিক্ষক সমাজ একত্রিত হয়ে গত ১০ বছর পরীক্ষায় গড় পাসের হার যে ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ রাখতে সফল হয়েছে, তার জন্য সরকারের কাছে বিশেষ বোনাস বা প্রণোদনা দাবি করতে পারে। যদি রপ্তানি করে প্রণোদনা পাওয়া যায়, যদি বিদেশ থেকে টাকা পাঠিয়ে প্রণোদনা পাওয়া যায়, কলকারখানায় উৎপাদন করে প্রণোদনা পাওয়া যায় তবে জনশক্তি উৎপাদনের সহায়করা কেন প্রণোদনা পাবেন না?

শিক্ষকরা সমাজের অংশ, বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। সমাজের সর্বত্র ঘুষ, দুর্নীতি, লোভ, পরেরটা কেড়ে খাওয়ার প্রবণতা শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে সংক্রমিত হবে- এটাই স্বাভাবিক। নিজেরা যা করি তা দেখো না, যা বলি তাই করতে হবে- এটা মানানো কঠিন। তাই শিক্ষা ব্যবস্থাকে সমাজ ব্যবস্থা থেকে আইন করে বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব নয়। দেশের অনাহারী নিরক্ষর মানুষের ঘামের অর্থে শুধু শিক্ষক সমাজ তৈরি হয়নি যে দায় তাদের বহন করতে হবে। অন্য সব পেশার মানুষ যদি ভুলে গিয়ে থাকতে পারে, তবে শিক্ষকরা পারবেন না কেন? সমাজ থেকে শিক্ষা নিয়ে শিক্ষকরা দেশপ্রেম-মানবপ্রেমে বিকশিত হতে ভুলে গেছেন, নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন হতে ভুলে গেছেন; চরিত্রবান হতে, নির্লোভ হতে, পরোপকারী হতে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সক্রিয় হতে ভুলে গেছেন। যেসব জিনিস সমাজে খুঁজে পেতে 'হারিকেন' কিনতে হয়, তা শিক্ষার্থীদের কোথা থেকে এনে দেবে শিক্ষক সমাজ। তবে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যেই আছে একজন শিক্ষার্থী- এক একটা শিক্ষার স্তর অতিক্রম করলেই সে বেশকিছু প্রান্তিক যোগ্যতা অর্জন করতে থাকে। যেমন একজন শিক্ষার্থীকে সফলভাবে প্রাথমিক শিক্ষার স্তর অতিক্রম করতে ২৯টি প্রান্তিক যোগ্যতা অর্জন করতে হয়। এই ২৯টি প্রান্তিক যোগ্যতার মধ্যে কী নেই তা গবেষণার ব্যাপার। তার পরও বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করে প্রাথমিক স্কুল পরীক্ষায় সফল ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থীর সিংহভাগ তা অর্জন করে। আমাদের শিক্ষকরা সমাজ থেকে যে শিক্ষাই গ্রহণ করুক না কেন, শিক্ষার্থীদের প্রান্তিক যোগ্যতা অর্জনে সহায়ক ভূমিকা রাখতে সফল হয়েছেন।


রাষ্ট্রযন্ত্র যেমন শতভাগ পাসের ফলাফল পেতে মরিয়া হয়ে ছুটে চলেছে নিজেদের মর্যাদাবান করতে, ঠিক তেমনি অভিভাবক সমাজ নিজেদের মর্যাদাবান দেখতে গোল্ডেন এ প্লাস বলে একটি নতুন শ্রেণি সৃষ্টি করে নিয়েছে। আমাদের সংবিধানে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে স্বীকৃত হলেও মর্যাদাবান সমাজে একটি শ্রেণি নিজেদের কর্মকর্তা হিসেবে জাহির করে। গোল্ডেন এ প্লাস এমনই একটি মর্যাদাবান হওয়ার প্রতিযোগিতা। এই মর্যাদাবান দেখার প্রতিযোগিতায় একশ্রেণির শিক্ষক এখানে ঢেউ গোনার ব্যবস্থা করে নিয়েছেন। ওই ঢেউ গোনার সংস্কৃতি আমাদের প্রায় সব পেশাজীবীর মধ্যে বিরাজমান। নীতি-নৈতিকতার প্রশ্ন যখন কারও জন্য প্রযোজ্য হয় না, তখন শিক্ষক সমাজও তা নিয়ে ভাবতে নারাজ। রাষ্টযন্ত্র দেশের সর্বত্র ঢেউ গোনাকে মৌখিক স্বীকৃতি দিলেও শিক্ষা ব্যবস্থায় তা আইন করে দিয়েছে। পেশাজীবীদের সবাই রাজনীতি সম্পৃক্ত হওয়ার ফলে আইনের প্রয়োগ কোথায় কতটা হবে তা সাধারণ মানুষের বিবেচনার ঊর্ধ্বে। তাই শিক্ষা ক্ষেত্রের ব্যাপক সফলতার স্বীকৃতিস্বরূপ শিক্ষকদের বোনাস প্রাপ্তি নিশ্চিত করা জরুরি।

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় এখন আর কেউ শিক্ষার্থী নেই, সবাই পরীক্ষার্থী হয়ে গেছে। প্রাথমিক, জুনিয়র, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক সনদ প্রাপ্তির জন্য পরীক্ষা আর পরীক্ষা। শিক্ষক-শিক্ষার্থী-অভিভাবক সবাই পরীক্ষার সিরিজে ব্যস্ত। পরীক্ষা মানেই সবার ব্যবসা- পরীক্ষার আয়োজক সংস্থা থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পর্যন্ত। আয়োজকদের আর্থিক স্বাস্থ্য দেখলেই ব্যবসার পরিমাণ বোঝা যায়। এখানে শিক্ষকরা নীরব থাকেন কীভাবে? অভিভাবকরা শিক্ষকদের নীরব থাকতে দেন না। বাধ্য করেন নিজেকে মর্যাদাবান করতে। এখন আর শিক্ষকরা দুয়ারে দুয়ারে ঘোরেন না, তারা এক জায়গায় বসে থাকেন আর অভিভাবকরা সন্তানদের জন্য পণ্য ক্রয় করেন। তাই নীতি-নৈতিকতার দায় অভিভাবক ও কর্তৃপক্ষের বেশি। শিক্ষকদের ওপর দায় চাপিয়ে নয়, পরীক্ষার সাফল্য বিবেচনায় বোনাস প্রাপ্তির নিশ্চয়তা জরুরি।

শিক্ষক সমাজের ওপর দায় চাপানোর আগে বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক সময় বিবেচনা করা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কতটা সময় শিক্ষকদের সঙ্গে কাটানোর সুযোগ পায়? পত্রিকায় প্রকাশিত এক সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের হিসাবটা এমন- তিনটি বোর্ড পরীক্ষার জন্য ৯৩ দিন, ঐচ্ছিক ও সরকারি ছুটি ৮৫ দিন এবং সাপ্তাহিক ছুটি ৫২ দিন সব মিলিয়ে ৩৬৫ দিনের মধ্যে ২৩০ দিন বন্ধ থাকে। বাকি ১৩৫ দিনের মধ্যে বিদ্যালয়ের অর্ধবার্ষিক ও বার্ষিক পরীক্ষা, বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বনভোজন, বিজ্ঞান মেলা বিভিন্ন দিবস, সরকারি প্রোগ্রামের র‌্যালি ইত্যাদিতে ক্লাস বন্ধ রাখতে হয়। ক্লাস বন্ধের গভীরে না গিয়ে বলা যায় সর্বাধিক ১০০ দিন শিক্ষার্থীরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকের সংস্পর্শে থাকার সুযোগ পায় এবং সেটি মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য। দিনের বেশির ভাগ সময়ই শিক্ষার্থীর তার পরিবার ও সমাজ থেকে বেশি শিক্ষা গ্রহণ করার কথা। বর্তমান সময়কালে দুর্নীতি, সন্ত্রাসসহ মূল্যবোধের সব অবক্ষয় এখান থেকে শিখছে। তার পরও শিক্ষক সমাজ ঢেউ গোনার সুযোগে কিছু সময় শিক্ষার্থীদের সংস্পর্শে থাকতে পারে, সে সুফলই পরীক্ষার ফলাফলে প্রকাশিত হচ্ছে। তাই শিক্ষক সমাজের বোনাস প্রাপ্তির ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই।

জাতীয় বাজেটে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে তিন লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা। রাজস্ব বোর্ড নির্ধারিত রাজস্ব আদায় করতে পারলে এবং তার বিপরীতে তাদের বোনাস বা প্রণোদনার সুযোগ দেওয়া হলে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণের একটি পরিবেশ হতে পারে। সাধারণ জনগণ দেখেছে স্বনির্ধারিত লক্ষ্য নির্ধারণ করে দেশের অনেক ক্ষেত্রে এমন বোনাস নেওয়ার প্রচলন আছে। কিন্তু আমাদের সর্বত্র সমালোচিত শিক্ষক সমাজ এত প্রতিবন্ধকতার মাঝেও মানবসম্পদ উন্নয়নে বিশাল ভূমিকা রেখেছে। উন্নয়ন ও উৎপাদনে যদি বোনাস প্রদানের সুযোগ থাকে তবে এর কারিগর তৈরি যারা করে থাকেন, তারা কেন বোনাসবঞ্চিত থাকবেন। তাই মানবসম্পদ উন্নয়নের প্রধান কারিগর শিক্ষক সমাজ পরীক্ষার ফলাফলে যে বিশাল অবদান রাখছে, তার স্বীকৃতিস্বরূপ বোনাস প্রদানের ঘোষণা অবিলম্বে কামনা করছি। এটা না হলে শিক্ষক সমাজ যদি শিক্ষার সফলতাকে ৩০ বছর পেছনে ফেলে দেয়, তবে শতভাগ পাসের লক্ষ্যের কী হবে?

  সাবেক সভাপতি, ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইডিইবি)

আরও পড়ুন

×