সাক্ষাৎকার: ড. রুহুল আবিদ
রোগ প্রতিরোধের বার্তা পৌঁছানো জরুরি
সাক্ষাৎকার গ্রহণ: গৌতম মণ্ডল
প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ২৩:২৬
বাংলাদেশি-আমেরিকান চিকিৎসক ড. রুহুল আবিদ যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের আলপার্ট মেডিকেল স্কুলের অধ্যাপক। তিনি ও তার প্রতিষ্ঠিত অলাভজনক সংস্থা হেলথ অ্যান্ড এডুকেশন ফর অল (হায়েফা) এ বছর নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন তালিকায় স্থান পেয়েছে। ড. আবিদ ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস সম্পন্ন করেন। তিনি ১৯৮৪-৮৬ মেয়াদে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছাত্র সংসদের নির্বাচিত ভিপি ছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি জাপানের নাগোয়া ইউনিভার্সিটিতে জেনেটিক্স অ্যান্ড মলিকিউলার বায়োলজিতে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন
সমকাল: আমরা জানি, আপনি ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ছিলেন ছাত্র সংসদের নির্বাচিত ভিপি।
রুহুল আবিদ: হ্যাঁ, ঢাকা মেডিকেল কলেজে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ করতাম। স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত ছিলাম। এরশাদ সরকার আমাকে জেলেও পাঠায়। তবে ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলনের মুখে সাত দিনের মাথায় ছেড়ে দেওয়া হয়। তখন ৯টি মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের যে জোট ছিল তারও নেতৃত্বে ছিলাম আমি। যেহেতু এরশাদ তখনও ক্ষমতায়, তাই এমবিবিএস পাস করার পর আমি সরকারি চাকরি না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।
সমকাল: সরকারি চাকরি না করে তাহলে কী করার সিদ্ধান্ত নিলেন?
রুহুল আবিদ: হঠাৎ করেই একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম ওই সময়। ব্রিটিশ কোম্পানি ডানকান ব্রাদার্সের চাকরি নিয়ে গেলাম হবিগঞ্জে তাদের চা বাগানে। সেখানে গিয়ে দেখলাম চা শ্রমিকদের অবস্থা বেশ খারাপ। ঠিক করলাম, তাদের অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে হবে। তখন সেখানে চা শ্রমিকদের অনেক শিশু মারা যেত। কোনো টিকা কার্যক্রম সেখানে ছিল না। শিশুদের প্রথমে হাম হতো এবং ৬/৭ দিন পর নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যেত। চা শ্রমিকরা বিশ্বাস করত 'খারাপ বাতাস' লাগায় শিশুরা অসুস্থ হয়ে মারা যায়। বুঝে নিয়েছিলাম, একটা কুসংস্কারে বিশ্বাস করে চা শ্রমিকরা।
সমকাল: চা শ্রমিকদের মধ্যে সেই কুসংস্কার দূর হয়েছিল?
রুহুল আবিদ: হ্যাঁ, অনেক কষ্টে কাজটি করতে পেরেছিলাম। কারণ শুরুতে চা শ্রমিকরা টিকা নিতে চায়নি। যারা টিকা দিতে গিয়েছিল তাদের বিশ্বাস করেনি। ফিরিয়ে দিয়েছিল। এরপর কৌশল পাল্টে কয়েকজন শ্রমিককে টিকা প্রদানের প্রশিক্ষণ দিলাম এবং তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকা দেওয়া শুরু করে। ডানকানের তখন ১০টি চা বাগান, সবক'টিতেই এ কার্যক্রম শুরু করলাম। কিন্তু সমস্যা হলো, পুরুষদের কাছে অনেক নারী টিকা নিতে অস্বীকার করে বসল। আবার কৌশল পাল্টে বিবাহিত কিছু নারীকে ডেকে নিয়ে তখন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলাম। কীভাবে টিকার কথা বলতে হবে, প্রেশার মাপতে হবে, টিকার উপকারিতা কী কী এবং গর্ভবতী মা হলে কেন হাসপাতালে যেতে হবে ইত্যাদি বিষয় শেখানো হয় তাদের। পাশাপাশি ছয় মাস অন্তর কৃমির ওষুধ ও বছরে একবার ভিটামিন-এ ক্যাপসুল খাওয়ানো শুরু করি।
সমকাল: এটা কত সালের দিকে?
রুহুল আবিদ: ১৯৯০-৯১ সালে। দেশে তখন টিকা গ্রহীতার হার ৬৩ শতাংশ হলেও চা বাগানে ওই হার ছিল শূন্য থেকে ৫ শতাংশ মাত্র। তবে সাড়ে তিন বছরে ওই এলাকার চা শ্রমিকদের মধ্যে টিকা গ্রহীতার হার দাঁড়িয়েছিল ৯৭ শতাংশ। চা শ্রমিকদের জন্য একটি হেলথ কার্ডও তৈরি করা হয়েছিল। তাদের স্বাস্থ্যসেবায় আমার নেওয়া প্রতিটি প্রজেক্টই ছিল সফল।
সমকাল: দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে কাজ করার আগ্রহও কি সেখান থেকেই?
রুহুল আবিদ: ওই আগ্রহ আমার আগে থেকেই ছিল। বলা যায়, চা শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করার সময় সেটি বেড়েছে। তবে ১৯৯৩ সালে আমি ডানকান ছেড়ে দিই এবং ঢাকায় ফিরে স্কলারশিপ নিয়ে জাপানের নাগোয়া ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি করতে যাই। ১৯৯৭ সালে জাপান থেকে দেশে ফিরে কিছুদিন পর আমেরিকা চলে আসি।
সমকাল: হায়েফার কার্যক্রম শুরু হলো কীভাবে?
রুহুল আবিদ: আমেরিকায় প্রথমে যোগ দিই লুজিয়ান স্টেট ইউনিভার্সিটি মেডিকেল স্কুলে। বছর দুয়েক পর চলে যাই হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলে। সেখানে দুই বছর মলিকুলার মেডিসিন ফেলোশিপ ট্রেনিং করার পর ২০০২ সালে ফ্যাকাল্টি হিসেবে যোগ দেই। গবেষণা করতাম, পড়াতাম। ২০১১ সালে ব্রাউন ইউনিভার্সিটি মেডিকেল স্কুলে যোগ দেই সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে। মাঝখানে হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলে থাকার সময় পরিচয় হয় সেখানকার সহযোগী অধ্যাপক রোজমেরি ডুডার সঙ্গে। তিনি ছিলেন স্তন ক্যান্সার ও জনস্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞ। প্রায়ই আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে যেতেন। একদিন তাকে প্রশ্ন করলাম- আফ্রিকা গিয়ে কী করো? রোজমেরি বললেন- ক্যাম্প করে মানুষকে চিকিৎসা দেই। তখনই আমার মধ্যে ভাবনা আসে- কাজটি আমি বাংলাদেশে শুরু করি না কেন?
সমকাল: বাংলাদেশে শুরু করলেন কীভাবে?
রুহুল আবিদ: ২০০৮ সালে ঢাকায় এসে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন, পিজি হাসপাতালসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে আমার কাজ উপস্থাপন করলাম। ২০১১ সালে আরও অনেকের সঙ্গে কথা বলি। এরপর ২০১২ সালে রোজমেরি ডুডাকে নিয়ে গড়ে তুলি হায়েফা। প্রথমে এর নিবন্ধন ছিল যুক্তরাষ্ট্রে।
সমকাল: বাংলাদেশে হায়েফার কাজ শুরু তো ২০১৩ সালে রানা প্লাজা ধসের পর...
রুহুল আবিদ: ঠিকই বলেছেন, রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় আমার খুব খারাপ লাগে। তখন রোজমেরি ডুডাকে বলি, চলো বাংলাদেশে যাই, গরিব মানুষের চিকিৎসা করি, গার্মেন্ট কারখানাগুলোর অবস্থা দেখি। আমার প্রস্তাবে তিনি রাজি হয়ে যান। ২০১৩ সালের এপ্রিলে আমার মেয়ে, রোজমেরি ও আরও কয়েকজনকে নিয়ে ঢাকায় আসি। প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজে গিয়ে সেখানকার সুপারিন্টেনডেন্টের কাছে কয়েকজন তরুণ ডাক্তার ও মেডিকেল শিক্ষার্থী চাই পোশাককর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা কার্যক্রম চালানোর জন্য। সেটাই বাংলাদেশে হায়েফার প্রথম কাজ।
সমকাল: কেমন ছিল শুরুর দিনগুলো?
রুহুল আবিদ: শুরুতে আমরা গাজীপুরের দুটি ও তেজগাঁওয়ের একটি পোশাক কারখানায় শ্রমিকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করি। মেশিন কেনা থেকে শুরু করে প্লেনের টিকিট- সবকিছুই তখন পকেটের টাকা খরচ করে করেছি। প্রথমে আমরা পোশাককর্মীদের রোগ চিহ্নিত করার চেষ্টা করলাম। তারপর চিকিৎসার কথা ভেবেছি। শাহবাগ থেকে দুটি ছোট বাসে প্রতিদিন ভোরে আমরা ২২ জন যেতাম গাজীপুর, ভালুকা, মাওনা, শ্রীপুর। সেখানে পোশাককর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতাম।
সমকাল: ওইসব পরীক্ষায় কী ধরনের তথ্য পেয়েছিলেন?
রুহুল আবিদ: অবাক হওয়ার বিষয় হলো, তখন আমরা সাত থেকে আট শতাংশ শ্রমিকের হাইপারটেনশন পেয়েছি, যদিও তাদের গড় বয়স ছিল ২৬-২৭ বছর। ডায়াবেটিসে আক্রান্তের হার ছিল ৩ শতাংশ এবং যক্ষ্ণায় আক্রান্ত ছিল ১ শতাংশ। পরে আমরা দেখেছি, এটা শুধু পোশাক কারখানার চিত্র নয়; গোটা দেশেরই চিত্র। মূলত এর পরই বাংলাদেশে হায়েফার কার্যক্রম সম্প্রসারিত করি। ২০১৬ সালে আমরা একটি 'ইলেক্ট্রনিক মেডিকেল রেকর্ড' তৈরি করি, যার নাম 'নিরোগ'। বাংলাদেশে এ পর্যন্ত হেলথ স্ক্রিনিং বা স্বাস্থ্য পরীক্ষার এই সেবা আমরা দিয়েছি ৩০ হাজার পোশাক শ্রমিককে।
সমকাল: হায়েফা তো কুড়িগ্রামেও নারীর জরায়ুমুখের ক্যান্সার নির্ণয়ের কার্যক্রম শুরু করেছে।
রুহুল আবিদ: গত বছরের অক্টোবরে আমরা এই কর্মসূচি শুরু করি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে। আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে ডিএফআইডি। ইউএনএফপিএ যুক্ত রয়েছে। উলিপুর, নাগেশ্বরী ও চিলমারীতে মোবাইল ওডিটি নামে একটি আধুনিক যন্ত্র দিয়ে নারীদের জরায়ুমুখের ক্যান্সার চিহ্নিত করার কাজ চলছে। চিকিৎসাও দেওয়া হচ্ছে। প্রকল্প শুরুর প্রথম ছয় মাসে প্রায় ১০ হাজার রোগী স্ক্রিনিং করা হয়ে গেছে, যাদের বয়স ৩০ থেকে ৬০ বছর। ভোলা, পিরোজপুর ও ঝালকাঠিতে প্রকল্পটির কার্যক্রম সম্প্রসারণের চেষ্টা চলছে। তবে হায়েফা পোশাককর্মীদের জরায়ুমুখের ক্যান্সার স্ক্রিনিংয়ের কাজ শুরু করে ২০১৮ সালে। এই কার্যক্রমের জন্য 'গ্র্যান্ড চ্যালেঞ্জেস কানাডা' তখন হায়েফাকে 'স্টার্স ইন গ্লোবাল হেলথ' অ্যাওয়ার্ড প্রদান করে। ওই অ্যাওয়ার্ডের অর্থ দিয়ে আবার ১০ হাজার পোশাককর্মীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসা প্রদান করা হয়। একশ' পোশাক কারখানায় কার্যক্রমটি সম্প্রসারণে এখন বিজিএমইএর সঙ্গে আলোচনা চলছে।
সমকাল: কভিড-১৯ মোকাবিলায়ও তো হায়েফা সরকারের সঙ্গে কাজ করেছে...
রুহুল আবিদ: কভিড-১৯ মোকাবিলায় আমরা বাংলাদেশের ৩৫টি প্রতিষ্ঠানের ১২শ' স্বাস্থ্যকর্মীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছি। তাদের মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল, আইইডিসিআর, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, আইসিডিডিআর,বি, সেভ দ্য চিলড্রেন ও ডব্লিউএইচওর স্বাস্থ্যকর্মীরা ছিলেন। ব্রাউন ইউনিভার্সিটির হায়েফা 'প্রজেক্ট হোপ' থেকে তাদের ওই প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
সমকাল: হৃদরোগ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ হিসেবে বাংলাদেশে কভিড-১৯ মোকাবিলার পদ্ধতি ও ব্যবস্থাপনা কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
রুহুল আবিদ: দেখুন, কভিড-১৯ মোকাবিলায় জনস্বাস্থ্যের বার্তাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এ নিয়ে কাজ করছে। তবে স্বাস্থ্যের প্রধান যে বার্তা, যে কোনো কারণেই হোক, সেগুলো ক্লিনিক্যাল ওরিয়েন্টেড। অসুখ হলে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে; হার্ট অ্যাটাক হলে, ক্যান্সার হলে সার্জারি করা হচ্ছে; কিন্তু রোগ প্রতিরোধের বার্তা জনগণের কাছে পৌঁছানো খুব জরুরি। আমি মনে করি, বাংলাদেশে এটি জোরদার করতে হবে। একটি দেশ যদি কভিড-১৯ এর মতো মহামারি ঠেকাতে চায় তবে প্রথমেই জনস্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করতে হবে। মানুষকে সচেতন ও সক্রিয় করতে হবে। একজন করোনা আক্রান্তকে এলাকা থেকে তাড়িয়ে দিলেই যে করোনা চলে যাবে না- জনস্বাস্থ্যের এই বার্তা আরও কার্যকরভাবে মানুষের কাছে পৌঁছানো দরকার ছিল।
সমকাল: এত ব্যস্ততার মধ্যেও অনলাইনে সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।
রুহুল আবিদ: সমকালের জন্য শুভকামনা।
- বিষয় :
- সাক্ষাৎকার
- ড. রুহুল আবিদ
- গৌতম মণ্ডল
