ঢাকা রোববার, ২১ জুন ২০২৬

সমাজ

মুক্তবুদ্ধির চর্চা হোক অবারিত

মুক্তবুদ্ধির চর্চা হোক অবারিত
×

এম আর খায়রুল উমাম

প্রকাশ: ১৩ ডিসেম্বর ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ১৩ ডিসেম্বর ২০২০ | ১৫:১৪

স্বাধীন বাংলাদেশ। মুক্ত মানুষ। মুক্ত সমাজ। যেখানে মুক্তির স্বপ্ন নিয়ে সংগঠিত হয়ে ওঠে মানুষ। তাকে নিজ ও সমাজের জন্য পরিবেশ, প্রতিবেশ ও জায়গা তৈরি করতে হয়। সম্প্রসারণ করতে হয়। এ বিনির্মাণে প্রয়োজন হয় মতের ভিন্নতা। বিতর্ক গড়ে তুলতে হয়। গতিশীল সমাজের বৈশিষ্ট্য রক্ষায় মানুষকে বিতর্কের আকাশ খোলা রাখতে হয়। মতপ্রকাশে কুণ্ঠা থাকলে, মতপ্রকাশের পরিবেশ সৃষ্টি করা না গেলে, প্রতিষ্ঠিত মতকে প্রাধান্য দিয়ে চিন্তার রাজ্য বন্ধ করে রাখলে বিতর্কের পরিবেশ সৃষ্টি হয় না। সবার সামনে স্বাধীনতার অবাধ সুযোগ অবারিত থাকে না। বিতর্কের মাধ্যমে বের হয়ে আসবে সত্য ও সুন্দর। যে সত্য ও সুন্দরের পথ ধরে মানুষ নিজেকে বিকাশে নিয়োজিত থাকবে। সৃজনশীলতার দ্বার খুলে যাবে। মানুষ নিজের মধ্যে থাকা অসীম ক্ষমতার সন্ধান পাবে। স্বীয় ক্ষমতায় মানুষ নির্মাণ করবে তার বাসযোগ্য পৃথিবী। মুক্তচিন্তা ও সৃজনশীলতার অচলায়তন কেটে যাবে। অন্ধকারের ভয় থাকবে না। নতুন সৃষ্টির আনন্দ-চিন্তাতে নানা শ্রমনিষ্ঠ উদ্যোগে সামাজিক অগ্রগতি ও মানবিক আলোকিত ধারার নবজাগরণ ঘটবে।

বাংলাদেশে চিন্তার স্বাধীনতা, মুক্তবুদ্ধির চর্চাকে প্রতি পদক্ষেপে বাধাগ্রস্ত করার মতো পরিবেশ সৃষ্টি হয়। সমাজে চিন্তার স্বাধীনতা এবং ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়লে সমাজ স্থবির হয়ে পড়ে। জড় পদার্থে পরিণত হয়ে পড়ে। সাংস্কৃতিক অগ্রগতি, সাংস্কৃতিক বিকাশের পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। সুস্থ চিন্তাচেতনা, ইতিবাচক মুক্তবুদ্ধির চর্চা, মনের ভালোবাসা নিয়ন্ত্রিত হলে গভীরতর সামাজিক ব্যাধির প্রকাশ ঘটবে- এটাই সত্য। দেশে সংস্কৃতি ও সংস্কৃতিবান মানুষের ওপর প্রথম আঘাত নেমে আসে যশোরে উদীচীর সম্মেলনে বোমা হামলার মধ্য দিয়ে। তারপর একের পর এক রমনা বটমূলের পহেলা বৈশাখ, ঢাকার সিপিবির জনসভা, ঢাকায় আহমদিয়া মসজিদের জামাত, সাতক্ষীরায় গুড়পুকুরের মেলা, সিলেটে মাজারের ওরস, বানিয়াচরের গির্জার প্রার্থনা, ময়মনসিংহে সিনেমা হলে হামলা- এই তালিকার লম্বা লাইন। হুমায়ুন আজাদ থেকে অভিজিৎরা চাপাতির তলায় জীবন দিয়েছেন। যুক্তির আলো, বিতর্কের সৌন্দর্য, প্রশ্নের শক্তি সহ্য করা সম্ভব না হওয়ায় একটার পর একটা হীন পরিকল্পনার বাস্তবায়ন চলছে। লক্ষ্য অনেক, লক্ষ্যবস্তুও অনেক। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রতিটি ক্ষেত্রে তৈরি হয় প্রতিবন্ধকতা-প্রতিকূলতার প্রাচীর।

শিক্ষা মানুষের সংস্কৃতিবোধকে জাগ্রত করে। স্বদেশ প্রেমকে সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। বহুদিন আগেই আমরা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বর্ণ পরিচয়কে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বাদ দিয়ে দিয়েছি। এই বিয়োজনের ফলে আমরা জীবনের খাতা থেকে নৈতিকতা ও মূল্যবোধকে হারিয়ে ফেলেছি। এখন 'বইয়ের পাতায় প্রদীপ জ্বলে/বইয়ের পাতা স্বপ্ন বলে/যে বই জুড়ে সূর্য ওঠে/পাতায় পাতায় গোলাপ ফোটে/সে বই তুমি পড়বে'- এসব পড়া বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ক্রমান্বয়ে দেশের সাধারণ শিক্ষাকে বিচিত্র এক সংস্কৃতিচর্চার দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। বিজ্ঞানমনস্ক, দেশপ্রেমমূলক, বাঙালি জাতীয়তাবোধ সম্পন্ন শিক্ষার্থীর কথা প্রচার করে ধর্মমনস্ক শিক্ষার্থী তৈরি করতে মহল বিশেষ তৎপর। ক্ষমতার বাইরে থাকা মানুষ সংগ্রাম করে, আন্দোলন করে, বাতিলের অঙ্গীকার করে, মানবাধিকার রক্ষায় সোচ্চার হয় কিন্তু মসনদে বসলে সব ভুল আইনের প্রয়োগ করতে থাকে। দেশের সিংহভাগ মানুষ '৭২-এর সংবিধানে ফেরত যেতে চায়। আইন প্রণেতাদের সুযোগ থাকার পরও '৭২-এর সংবিধানে ফেরত যাওয়া হয় না। একই গল্প একইভাবে সবাই বলে চলে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই কখনও আইন বাতিল করার জন্য আন্দোলন, কখনও বা তা রক্ষা করার জন্য প্রক্রিয়া চলমান থাকে। শুধু পীড়নের ক্ষেত্রে পার্থক্য কিছু থাকে না। এই এক জায়গায় উভয় পক্ষের প্রচণ্ড মিল। যারা আইন করে পীড়নের পথ ধরে, তারাই ক্ষমতার বাইরে গেলে বাতিলের জন্য আন্দোলন-সংগ্রামও করে।

এখন তো আর এনালগের যুগ নয়, এ হলো ডিজিটাল যুগ। তাই একবার মুখ থেকে কোনো কথা বের হয়ে গেলে তা ইথারের কোনো না কোনো জায়গায় থেকেই যায়। এ কথাটিও অনেকেই মনে রাখতে চান না। ক্ষমতার জোরে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে চান। একবার বলে প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানি করলে জীবন দিয়ে দেব আবার বলে মাটির নিচে প্রাকৃতিক গ্যাস জমা করে রেখে লাভ কী? কোনটা যে তাদের মনের কথা বোঝা দায়। একবার বলে সিন্ডিকেট ভেঙে ফেলার কথা, আবার বলে বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করলে বাজার থেকে পেঁয়াজই উধাও হয়ে যাবে। ডিজিটাল এ যুগে সাধারণ জনগণকে বোকা ভাবার সমীচীন নয়। দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য মুক্তবুদ্ধিচর্চার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করলে এর নেতিবাচক প্রভাবের ক্ষেত্র বিস্তৃত হবে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে রাজধানী- সর্বত্র 'আমি'র যেন রাজত্ব। যেন 'আমি'র মধ্যে দেশপ্রেম, 'আমি'র মধ্যেই মানবপ্রেম। বিশেষ কোনো পরিবেশে আমরা সামনে এসে পড়লে তার মধ্যেও 'আমি'র গুরুত্ব অনেক বেশিই থাকে।

মধ্যযুগের একটা গান আছে- 'আপন আপন করে তুই হারালি তোর যা ছিল আপন।' চিন্তার স্বাধীনতাহীনতা মুক্তবুদ্ধিচর্চার প্রধান অন্তরায় হয়ে কখনও কখনও এমনভাবে দাঁড়ায়, যা আমাদের পেছনে ঠেলে দেয়। আপন লোকের ভিড়েই দুর্নীতির আকর সৃষ্টি হচ্ছে। ব্যক্তিস্বার্থে ক্ষমতাকে ব্যবহার করে 'আমি'র জয়গান চলছেই। দুর্নীতি সহনীয় পর্যায়ে রাখা যাচ্ছে না। বিদেশে অর্থ পাচার বন্ধ করা যাচ্ছে না। অনিয়ম বন্ধ করা যাচ্ছে না। সত্য ও ন্যায়ের ভিত্তিতে কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ সৃষ্টির জন্য মুক্তবুদ্ধিচর্চা অবারিত হওয়া প্রয়োজন। সব জড়তা দূর করে আধুনিক ধ্যান-ধারণায় প্রয়াসী হওয়াও জরুরি। দেশের সহজ-সরল- মুক্তমনা জনগোষ্ঠীকে গণ্ডিবদ্ধ না করে, স্বার্থপর ক্ষুদ্র গোষ্ঠীভিত্তিক চিন্তুা-চেতনা পরিহার করে নতুন প্রাণের প্রেরণা সৃষ্টিতে উদ্যোগী হওয়ার বিকল্প নেই।

সাবেক সভাপতি, ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ

আরও পড়ুন

×