প্রতিবেশ
পরিবেশ, পানি ও পেশাজীবী
এম আর খায়রুল উমাম
প্রকাশ: ২৪ জানুয়ারি ২০২১ | ১২:০০ | আপডেট: ২৪ জানুয়ারি ২০২১ | ১৫:১৭
ইতিহাসখ্যাত হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো আজ মৃত নগরী। দীর্ঘ ৬০০ বছরের প্রাণবন্ত এ নগর দুটির অস্তিত্ব খ্রিষ্টপূর্বাব্দের ১৭৫০ সাল পর্যন্ত পাওয়া যায়। ভারতীয় উপমহাদেশের সিন্ধু সভ্যতার অন্যতম নিদর্শন এ শহর ১৯২০-এর দশকে ব্রিটিশ ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশে প্রত্নতাত্ত্বিক খননের ফলে বর্তমান সময়ের মানুষের সামনে আসে। বিশাল এলাকাজুড়ে নগরের ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, পানি ব্যবস্থাপনা, পয়ঃপ্রণালি ব্যবস্থাসহ নানাবিধ স্থাপনা নিয়ে মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। সবাই সভ্যতা ধ্বংসের কারণ অনুসন্ধানে রত। অন্ধের হাতি দেখার মতো যে যার অবস্থান থেকে এক-একটা বিষয় গুরুত্ব দিয়ে যুক্তি-প্রমাণ উপস্থাপন করে চলেছেন। পানি, মাটি, বায়ু, সূর্য ও আগুন- এগুলোর মধ্যে কোনটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তার মীমাংসা এখনও না হওয়ায় বিতর্ক চলমান রয়েছে। দিন দিন মানুষ আকাশের নক্ষত্র থেকে মাটির দুর্বার শক্তি সম্পর্কে জানতে সক্ষম হচ্ছে এবং সিদ্ধান্তে আসতে চেষ্টা করছে।
আদি যুগ থেকে মানুষ পানিপ্রাপ্তির নিশ্চয়তাকে ভিত্তি করে বসত গড়ে তুলেছে। তাই প্রতিটি জনপদের পাশে নদীর অস্তিত্ব দেখা যায়। আজকে বিশ্বে ছোট-বড় নগরগুলো বহমান নদীর পাশে গড়ে উঠেছে। অতীতের পাহাড়পুর, ময়নামতি, উয়ারী-বটেশ্বর জনপদগুলো যেমন নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল, ঠিক তেমনি গড়ে উঠেছে ঢাকা, দিল্লি, কায়রো, লন্ডন কিংবা প্যারিস। তাই অনেক পরিবেশ-সচেতন মানুষ মনে করে থাকেন, নদীকে কেন্দ্র করে যেহেতু বসতি গড়ে উঠেছে, তাই নদী তার অস্তিত্ব হারালে নগরও তার অস্তিত্ব রক্ষা করতে পারবে না। এ ভাবনা থেকেই বিশ্বব্যাপী নদী রক্ষায় আন্দোলন-সংগ্রাম চলমান। নদীমাতৃক বাংলাদেশের মানুষও অস্তিত্ব রক্ষায় নিজ নিজ এলাকার নদী রক্ষার সংগ্রামে নিবেদিত।
সৃষ্টির আদি থেকে দু'হাত ভরে প্রকৃতি মানুষের চাহিদার জোগান দিয়ে চলেছে। কিন্তু দিন দিন মানুষ তার অতিরিক্ত চাহিদা প্রকৃতি থেকে সংগ্রহে ব্যর্থ হয়ে প্রকৃতির ভারসাম্য বিনষ্ট করেছে। প্রকৃতি তাই আজ বিরূপ। অতীতে মানুষ একটা নির্দিষ্ট অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার ফলে পরিবেশের বিরূপ প্রভাবও ওই নির্দিষ্ট সীমার মধ্যেই থাকত। বিজ্ঞানের নব নব আবিস্কারে মানুষ যত আয়েশি জীবনের দিকে এগিয়েছে, প্রকৃতির বিরূপ প্রভাব তত বেশি ভর করেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাড়ছে, মহামারির কবলে জীবন বিপন্ন হচ্ছে, জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়ছে। এসব দেখার পরও মুক্তির পথে হাঁটার কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি পেলেও শাসকশ্রেণি উদাসীনই রয়ে গেছে। আর শাসকশ্রেণির পৃষ্ঠপোষকতায় একশ্রেণির মানুষ নিজেদের অভিজাত জীবন ধরে রাখার প্রতিযোগিতায় শুধু তাদের জীবনই বিপন্ন করছে না, বিশ্বের আপামর মানুষের জীবনকেও বিপন্ন করে তুলছে। তাদের আগ্রাসনে পানি, মাটি, আকাশ-পাতাল, বায়ু সবকিছু অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।
বিশ্বব্যাপী পরিবেশ-সচেতন অনেক মানুষ পরিবেশ রক্ষায় প্রধান নিয়ামক হিসেবে পানিকে গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। তাই জলাশয় রক্ষার আন্দোলন-সংগ্রাম দিন দিন তীব্র আকার ধারণ করছে। বিশেষ করে মিঠাপানির আকর নদী থেকে শুরু করে সবচেয়ে ছোট ইউনিট পুকুর পর্যন্ত আন্দোলনের অংশ হয়ে পড়েছে। পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনে বনায়ন, শব্দদূষণ, বায়ুদূষণ, পানি, গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন, কীটনাশক ব্যবহার, প্লাস্টিক প্রক্রিয়াজাতকরণ, ওজোনস্তর রক্ষা, উষ্ণায়ন প্রভৃতি অনেক বিষয় দিন দিন সম্পৃক্ত হচ্ছে। বিষয়ের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সম্পৃক্ততাও মনে আশার আলো ছড়ায়। যদিও এতে পরিবেশের বিরূপ প্রভাব থেকে মুক্তি ত্বরান্বিত হয়েছে এমন দাবি করার সময় এখনও আসেনি। প্রাথমিক পর্যায়ে পরিবেশের বিরূপ প্রভাব একটা ধারণা ছিল, আজ তা আর ধারণার মধ্যে আটকে নেই। বিশ্বব্যাপী সুনামি, আইলা, জলোচ্ছ্বাস, হারিকেনের সঙ্গে তাপপ্রবাহ বয়ে যাওয়া, মরুকরণ, রোগ-মহামারির প্রকোপ পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে- তা অনেকটাই প্রমাণিত।
বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পানি আগ্রাসনের শিকার- এ ব্যাপারে কোনো দ্বিমত নেই। আন্তর্জাতিক প্রতিটি নদী একতরফা পানি প্রত্যাহারে ধুঁকছে। শুস্ক মৌসুমে পানির জন্য হাহাকার আর বর্ষা মৌসুমে বন্যায় ভেসে যাওয়া। অস্বাভাবিক প্রবাহ পানির যাত্রাপথে বাধা সৃষ্টি করায় প্রতিনিয়ত ড্রেজিং করেও নদীগুলোর নাব্য রক্ষা করা যাচ্ছে না। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে যে ২৫ হাজার ৪০০ কিলোমিটার নৌপথ ছিল, তা এখন সাত হাজার ৬০০ কিলোমিটারে এসে ঠেকেছে। ছোট ছোট বহু নদী আজ পানি আগ্রাসনের ফলে মৃতপ্রায় বা মৃত। নদী রক্ষায় পরিকল্পিত কোনো পরিকল্পনা আমাদের আছে এমন দাবি করা যাবে না। শাসকশ্রেণি নদী রক্ষায় ব্রতী হয়েছে পরিকল্পনাহীনভাবে। এলাকাভিত্তিক মানুষ সোচ্চার হলে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প প্রণয়ন হয়েছে, প্রকল্পের বাস্তবায়ন হয়েছে, বিশাল কর্মযজ্ঞে মানুষ আশার আলো দেখার চেষ্টা করেছে। কিন্তু কোনো লাভের লাভ স্থায়ী হয়নি। সম্মিলিত পরিকল্পনা তৈরি করা হয়নি। মুক্তির পথ পাওয়ার উদ্যোগ দেখা যায়নি। আমরা চেষ্টা করে চলেছি, তা বলতে বলতে ৫০ বছর পার হয়ে গেল।
দেশের মানুষকে রক্ষার নামে পরিকল্পনাহীন পানি ব্যবস্থাপনা নদী রক্ষা কার্যক্রমকে আরও কঠিন করে তুলেছে। দূরদৃষ্টি হারিয়ে শুধু সামনে যা আছে, তা দেখার ফলে পরিণতি আরও ভয়াবহ হয়েছে। দূরদৃষ্টির অভাবে বড়াল নদের মুখে দুই হাজার ৫০০ কিউসেক স্লুইসগেট নির্মাণ করা হয়েছে, যা ধারণক্ষমতার এক-তৃতীয়াংশ। তাও আবার যথাযথভাবে খোলা বা বন্ধ করা হয় না। যমুনা নদীর পাড়ে বাঁধ দিয়ে আটটি নদীর মুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পানির ব্যবস্থা না করে গড়াই খনন করা হয়েছে। প্রতি ইঞ্চি জমি আবাদের নামে চলনবিল ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে। অধিক ফসলের লোভে ভবদহ-বিল ডাকাতিয়া সৃষ্টি হয়েছে। এমন হাজার একটা উদাহরণের কোনটাকে জনকল্যাণের বলে শেষ বিচারে পাওয়া যাবে? বিশাল আয়োজনের মেগা প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজ অন্য সব বিবেচনা বাদ দিয়ে ভারতীয় সীমানা থেকে চার কিলোমিটার অভ্যন্তরে ডালিয়ায় করা হচ্ছে। নির্মিত ব্যারাজে যদি ১০ ফুট পানির উচ্চতা বাড়ে তবে তা করে কি খুব বেশি উপকারে আসবে?
দেশ বিবেচনায় প্রকৌশল ও কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা নেহাত কম নয়। প্রকৌশল কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত পেশাজীবীদের সংখ্যাও উন্নত বিশ্বের মতো। তার পরও আমাদের গর্বের শিক্ষার্থীদের পেশার প্রতি অবহেলা সাধারণ মানুষকে ভাবায়। সবাই রাজনৈতিক মতাদর্শে বিভক্ত হয়ে রাজনীতির বাতাসে ভাসছে। পেশার উন্নয়ন নেই, মাটি ও মানুষের কল্যাণ-ভাবনা নেই। শাসকশ্রেণি সাময়িক প্রাপ্তির প্রত্যাশায় আনন্দমুখর। উন্নয়ন ও উৎপাদনের জীবনকাল কোনো সমস্যাই নয়। উত্তরণের পথ খোঁজার চেষ্টা বা প্রয়োজনীয়তা নেই। দেশের ছোট-বড় কোনো প্রকল্প নিয়ে আজ পর্যন্ত সম্মিলিত বিতর্কের উদ্যোগ দেখা গেল না। মাটি আর মানুষের কল্যাণ বিবেচনায় শ্রেষ্ঠ বিবেচনার সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব হলো না। বঙ্গবন্ধু সেতুকে বহুমুখী করার ক্ষীণ চিৎকার একসময় শাসকশ্রেণির সিদ্ধান্তকে নড়াতে ব্যর্থ হয়েছিল; কিন্তু আজ সেতুর পাশে নতুন রেলসেতু নির্মাণের উদ্যোগ নিতে হচ্ছে। বিশেষজ্ঞ পেশাজীবীদের উন্মুক্ত বিতর্কের ব্যবস্থা করতে পারলে আজ বিশাল ব্যয়ে নতুন রেলসেতু নির্মাণের কথা শুনতে হতো না। সেতু যে নদীর ক্ষতি করে, সে বিবেচনা না-ই বা করা হলো। অবস্থা অনুধাবন করতে লালন সেতুর দিকে একবার নজর দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
সরকারের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় পরিকল্পনার অভাব থাকলেও প্রকল্পের কোনো অভাব নেই। এসব প্রকল্প জনকল্যাণে কতটা ভূমিকা রাখতে পারছে বা পারবে, তা চিরকালই বিবেচনার বাইরে থেকে গেছে। যশোর অঞ্চলের ভৈরব নদের সংস্কারের কাজ চলমান। এলাকার মানুষ ৩০-৪০ বছর ধরে বহতা নদী দেখার আন্দোলন করেছে, যার ফলে সংস্কারকাজ শুরু। জনপ্রতিনিধিদের কেউ সৌন্দর্যপ্রাপ্তির আনন্দে, কেউ নৌপথের চেয়ে হাঁটাপথ পাওয়ার আনন্দে, কেউ বিনোদনের স্থানপ্রাপ্তির আনন্দে সোচ্চার। চলমান প্রকল্প পরিস্কার করে দিয়েছে, জনগণের চাহিদা পূরণ হচ্ছে না। কারণ, উৎসে পানির নিশ্চয়তা না করে নদী সংস্কার করা হলে এমনই হওয়ার কথা। ২৭৮ কোটি টাকায় জনগণ কী পেতে চলেছে, তার হিসাব কেউ রাখছে বলে মনে হয় না। নদী ড্রেনেজ সিস্টেম ও বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য সংস্কার করা হলে তা কত দিন সেবা দেবে? বহতা নদী পরিবেশের যে সুফল আনতে সক্ষম, তা কি এই নদী সংস্কার দিতে পারবে?
পরিবেশ রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান পানির প্রতি অবহেলায় সামগ্রিকভাবে বিপন্ন হয়ে পড়বে চলমান বাংলাদেশের গতিধারা। সুদূরপ্রসারী প্রভাবে জনজীবন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এরই মধ্যে রাজধানী ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানিতে লবণাক্ততা পাওয়া গেছে। অথচ ভয়াবহ পরিস্থিতি বিবেচনায় করণীয় নির্ধারণের ভাবনা পর্যন্ত নেই। আমরা লুপ্ত নগরী হরপ্পার পরিণতির দিকে ছুটে চলেছি কিনা, তা আগামীই বলতে পারবে। আশা, দেশের মেধাবী পেশাজীবীরা মাটি ও মানুষের কল্যাণে সম্মিলিত উদ্যোগে মহাপরিকল্পনা করে তা বাস্তবায়নে ব্রতী হবেন। জনগণ বহতা নদী পাবে, যা পরিবেশ রক্ষায় সহায়ক হবে।
প্রাবন্ধিক; সাবেক সভাপতি, ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইডিইবি)
[email protected]
- বিষয় :
- প্রতিবেশ
- এম আর খায়রুল উমাম
