ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬

প্রকাশনা শিল্প

প্রকাশকদের পাশে দাঁড়াতে হবে

প্রকাশকদের পাশে দাঁড়াতে হবে
×

উমর ফারুক

প্রকাশ: ০৯ এপ্রিল ২০২১ | ১২:০০

মন ভালো নেই প্রকাশক সাকিল মাসুদের। করোনা সংকট জেঁকে বসেছে তার ব্যবসায়ের ঘাড়ে। আজ অমর একুশ বইমেলার তিন সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত বিক্রির একেবারে তলানিতে। বইমেলায় এক ভৌতিক পরিবেশ বিরাজ করছে। আইডিয়া প্রকাশনের স্বত্বাধিকারী সাকিল মাসুদ কয়েক বছর ধরে বইমেলায় স্টল বরাদ্দ নিচ্ছেন। স্টল বরাদ্দ, সাজসজ্জা, কর্মীর বেতন, বই পরিবহন, যাতায়াত সব মিলিয়ে একটি বইমেলায় খরচ কমপক্ষে দুই লাখ টাকা। এখনও কোনো বইমেলায় লাভের মুখ দেখেনি তার প্রকাশনা। কোনো বছর ক্ষতির পরিমাণটা বাড়ে। কোনো বছর কমে। পার্থক্যটা শুধু এটুকুই। তবুও পেশাটা ছাড়তে পারছেন না তিনি। গত বছর বইমেলায় বিকিকিনি মোটামুটি ভালো ছিল। খরচের টাকাটা অন্তত উঠেছিল। কিন্তু এ বছর কী হবে! গল্পটা আইডিয়া প্রকাশনের একার নয়। একই পথের যাত্রী দেশের প্রায় সব প্রকাশনীর।
এ কথা সত্য, অসময়ে বইমেলা আয়োজন সব সময় ঝুঁকির পরিমাণ বাড়ায়। এবারও এর ব্যতিক্রম হলো না। তারপর আবার কালবৈশাখী বাড়িয়েছে ক্ষতির পরিমাণ। বর্তমানে চলছে গৃহবন্দিত্বের প্রহর। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বেরোনো নিষেধ। গণপরিবহন বন্ধ। দোকান খুলে বসে আছেন প্রকাশকরা। বিকিকিনি তো দূরের কথা, এমন অনেক স্টল আছে, যেখানে সারাদিন কোনো দর্শকও প্রবেশ করেনি। খুব নাম করা কিছু প্রকাশনী বাদে সবার অবস্থা এরকমই। দেশের প্রকাশনা শিল্পের অবস্থা ভয়াবহ। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে প্রকাশকদের। নতুন বই প্রকাশ করে আর ঝুঁকি বাড়াতে চাইছেন না তারা, যার প্রভাব পড়ছে লেখকের ওপর, পাঠকের ওপর। কোনো কোনো লেখক পকেটের টাকায় বই প্রকাশ করছেন। মাঝারি মানের লেখকরাও লেখার সম্মানী থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ফলে লেখক, প্রকাশক ও পাঠক সবাই এখন সংকটাপন্ন অবস্থায় আছেন।
বই মনের খোরাক জোগায়। বই আমাদের সৃজনশীল করে, সৃষ্টিশীল করে। একটি সৃজনশীল প্রজন্ম বিনির্মাণের জন্য প্রকাশনা শিল্পের ধারাবাহিকতা ও গতিশীল উন্নয়ন অত্যন্ত আবশ্যক। দেশের প্রকাশনা শিল্পকে বাঁচাতে হবে। আমাদের জানামতে, সরকার প্রতি বছর মফস্বল প্রকাশনাগুলো থেকে ২৫ হাজার টাকার বই ক্রয় করে, কিন্তু একটি প্রকাশনী সংস্থাকে প্রতিবছর লাখ লাখ টাকার বই প্রকাশ করতে হয়- সে ক্ষেত্রে এই অংশগ্রহণ অতি নগণ্য। মনে রাখা দরকার, আমাদের শিক্ষা, আমাদের সমাজকে সঠিক পথ দেখাতে বইয়ের কোনো বিকল্প নেই। এ জন্য প্রকাশককে বাঁচাতে হবে। মোবাইল ফোন ও কম্পিউটার থেকে যৌক্তিক সময় দূরে রাখতে মানসম্পন্ন বইয়ের কোনো বিকল্প নেই। প্রশ্ন হলো, কী করতে পারি আমরা প্রকাশকদের জন্য? মূলত প্রকাশকদের বাঁচানোর জন্য এবারের বইমেলায় অংশগ্রহণকারী প্রতিটি প্রকাশককে স্টল ফি বাবদ গৃহীত অর্থ ফেরত দেওয়া জরুরি। প্রয়োজনে বইমেলায় অংশগ্রহণকারী প্রতিটি প্রকাশনীকে ক্ষতিপূরণের আওতায় আনাও জরুরি। সৃজনশীল বই প্রকাশের জন্য হ্রাসকৃত মূল্যে তাদের জন্য কাগজ সরবরাহ করা যেতে পারে। আরও অধিকসংখ্যক বই সরকারিভাবে ক্রয় করে প্রকাশকের পাশে দাঁড়ানো যেতে পারে। একই সঙ্গে দেশ করোনামুক্ত হলে প্রতিবছর জেলা, উপজেলা ও সম্ভব হলে ইউনিয়ন পর্যায়ে সরকারি উদ্যোগে বিনামূল্যে বইমেলার আয়োজন করতে হবে। তা হলে প্রকাশকরা হয়তো আবার উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতে পারবেন। পাঠকের হাতে বই পৌঁছে দেওয়ার জন্য, লেখকের লেখা প্রকাশের জন্য প্রকাশককে বাঁচাতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। সরকারের উচিত প্রণোদনা প্যাকেজ নিয়ে তাদের পাশে দাঁড়ানো। একই সঙ্গে এই সংকটকালে প্রকাশকের পাশে দাঁড়াতে পারেন পাঠকও। অনলাইনে বই সংগ্রহ করে এই খাতকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব পাঠকেরও। পদ্ধতি যা-ই হোক, প্রকাশনা খাতকে বাঁচাতে হবে, অন্যথায় ঝুঁকিপূর্ণ হবে আমাদের পথচলা।
শিক্ষক, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর ও উদ্যোক্তা, গুনগুন-রণন বইমেলা
[email protected]

আরও পড়ুন

×