ভিন্নমত
জানি, এমন বাজেট হবে না
রুমিন ফারহানা
প্রকাশ: ২২ মে ২০২১ | ১২:০০ | আপডেট: ২২ মে ২০২১ | ১৪:৪৬
আগামী ৩ জুন ঘোষিত হবে ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট। কেমন বাজেট প্রত্যাশা করছে মানুষ তা নিয়ে বিভিন্ন মতামত প্রায় প্রতিদিনই দিচ্ছেন স্বনামধন্য অর্থনীতিবিদ, গবেষণা প্রতিষ্ঠানসহ এর সঙ্গে যুক্ত নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। আমি অর্থনীতির ছাত্র নই, সুতরাং জিডিপির প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয়, ব্যালান্স অব পেমেন্টসহ অর্থনীতির চুলচেরা বিশ্নেষণ, অলিগলির ব্যাখ্যা আমার কাছে নেই। আমি শুধু বুঝি বাজেট হওয়া উচিত গণমানুষের, মানুষের কল্যাণের, দেশের একেবারে প্রান্তিক মানুষটির কথাও যেন বাজেট তৈরির সময় চিন্তা করা হয়। গত দেড় বছর ধরে যে করোনাজ্বর আগে থেকে পশ্চিম ঘিরে রেখেছে, সেখানে বাজেটের একটাই লক্ষ্য হওয়া উচিত ছিল, আর তা হলো মানুষকে বাঁচানো। এখন প্রবৃদ্ধি হিসাবের সময় নয়।
কয়েক বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি মূলত স্বজনতোষী পুঁজিবাদে পরিণত হয়েছে। কারও কারও মতে ডেমোক্র্যাসি, মেরিটোক্র্যাসি সব শেষ হয়ে গিয়ে বাংলাদেশে এখন চলছে ক্লিপ্টোক্র্যাসি। না হলে করোনার আগে চার কোটি আর করোনার পরে আট কোটি দরিদ্র মানুষের দেশে কী করে অতি ধনী (২৫০ কোটি টাকার বেশি সম্পদের মালিক) বৃদ্ধির হারে বাংলাদেশ পৃথিবীতে প্রথম আর ধনী (সাড়ে ৮ কোটি থেকে ২৫০ কোটি টাকার সম্পদের মালিক) বৃদ্ধিতে তৃতীয় হয়, আর দরিদ্রের সংখ্যায় হয় বিশ্বে পঞ্চম?
করোনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, বুঝিয়ে দিয়েছে যতই জিডিপির প্রবৃদ্ধি আর মাথপিছু আয় বাড়ুক না কেন, যতই আমরা মেট্রোরেল, ফ্লাইওভার, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বানাই না কেন, দিনের শেষে মানুষের নূ্যনতম মৌলিক চাহিদার দিকে যতক্ষণ পর্যন্ত রাষ্ট্র নজর না দেবে, ততক্ষণ পর্যন্ত উন্নয়নের বুলি ফাঁপাই হয়ে থাকবে। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ধনী-অতি ধনীরা প্রাণ বাঁচাতে পৃথিবীর উন্নত কোনো দেশে আশ্রয় নিতে পারেননি, তাদের প্রথমবারের মতো নির্ভর করতে হয়েছিল দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর। এবারই সম্ভবত অনেকেই প্রত্যক্ষ করেছেন স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ বরাদ্দ, ১০ হাজার মানুষের জন্য পাঁচজন চিকিৎসক, দু'জন নার্স, অদক্ষ ব্যবস্থাপনা নিয়ে আর যাই হোক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা যায় না। করোনাকালে বাজেট হওয়া উচিত বারোয়ারি বাজেটের চাইতে আলাদা। তবে আর সব সেক্টরের বরাদ্দ যেমন হবে তার চাইতে একেবারে ভিন্নভাবে দেখতে হবে স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা বাজেটকে।
গত বছরের বাজেটও একেবারে করোনার মধ্যে ছিল। তাতে স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ১ শতাংশেরও কম বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। করোনার ভয়াবহ দুঃসময়েও বরাবরের মতোই জিডিপির তুলনায় স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল দক্ষিণ এশিয়ায় তো বটেই এমনকি পৃথিবীতেও অন্যতম সর্বনিম্ন। স্বাস্থ্য খাতে মাথাপিছু রাষ্ট্রীয় ব্যয়ে এই মুহূর্তে বাংলাদেশে দক্ষিণ এশিয়াতে সর্বনিম্ন অবস্থানে আছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী পাকিস্তান, নেপাল, আফগানিস্তান, ভারত, ভুটান, শ্রীলঙ্কা এবং মালদ্বীপে স্বাস্থ্য খাতে মাথাপিছু রাষ্ট্রীয় ব্যয় যথাক্রমে মাথাপিছু ১২৯, ১৩৭, ১৬৭, ২৬৭, ২৮১, ৩৬৯, ১৯৯৬ ডলার। বাংলাদেশে এই পরিমাণ মাত্র ৮৮ ডলার, যা পাকিস্তানের দুই-তৃতীয়াংশ এবং আফগানিস্তানের অর্ধেক। এই কারণেই এই দেশের জনগণকে এখনও তাদের চিকিৎসা খরচের ৭২ শতাংশ নিজের পকেট থেকে খরচ করতে হয়। আর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণা মতে এই ব্যয় মেটাতে গিয়ে প্রতি বছর ৬৫ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যায়।
প্যানডেমিকের মধ্যেও ২০২০-২১ অর্থবছরে যে বাজেট দেওয়া হয়েছিল, তাতেও সম্পূর্ণ উপেক্ষিত ছিল স্বাস্থ্য খাত। প্যানডেমিক দেশের স্বাস্থ্য খাতের একেবারে নাজুক অবস্থা প্রকাশিত করে দেওয়ার পরও তার নূ্যনতম প্রতিফলন দেখা যায়নি বাজেট বরাদ্দে। এমনকি স্বাস্থ্যমন্ত্রী পর্যন্ত কিছুদিন আগে স্বীকার করেছেন স্বাস্থ্যে জিডিপির শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ বরাদ্দ অতি অপ্রতুল। আমাদের যে কোনো পরিবর্তন আসেনি তার একটা চমৎকার উদাহরণ হতে পারে আইসিইউর পরিসংখ্যান। ২০২০-এর এপ্রিলে ঘোষণার পর জুনের মন্ত্রিসভার বৈঠকে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছিলেন প্রতি জেলায় আইসিইউ স্থাপনের। তিনি যখন এই ঘোষণা দেন, তখন সরকারি পর্যায়ে আইসিইউ না থাকা জেলার সংখ্যা ছিল ৪৭, আর এক বছরে মাত্র পাঁচটি জেলায় আইসিইউ স্থাপনের পর সেই সংখ্যা এখন ৪২।
করোনা যদি আমাদের নূ্যনতম শিক্ষা দিয়ে থাকত, তাহলে গত বছর থেকেই আমাদের উচিত ছিল স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিত জিডিপির কমপক্ষে ৫ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার পদক্ষেপ নেওয়া। এই বাজেটে উচিত হবে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ জিডিপির অন্তত আড়াই শতাংশ নিয়ে যাওয়া, যাতে আগামী ২-৩ বছরের মধ্যে নূ্যনতম ৫ শতাংশ বরাদ্দের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা যায়।
স্বাস্থ্যের মতোই বাজেটে সব সময়ই উপেক্ষিত থাকে সামাজিক সুরক্ষা খাত। গবেষণা সংস্থা সানেম ২০২০ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বরে করা এক গবেষণায় জানা যায় বাংলাদেশের দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪২ শতাংশে, অথচ তখন করোনার প্রকোপ কমে এসেছিল, এমনকি ছিল না কোনো লকডাউন। করোনার আগে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে করা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক জরিপ বলছে শহরের ৮ শতাংশ দরিদ্র পরিবার না খেয়ে ঘুমাতে যায়, ১২ শতাংশের ঘরে খাবার নেই, সারাদিনে একবারও খেতে পায়নি প্রায় ৩ শতাংশ পরিবার। করোনার আগেই যদি পরিস্থিতি এই থাকে তাহলে করোনা পুরো বিষয়টিকে কোথায় নিয়ে গেছে তা সহজেই অনুমেয়।
করোনাকে মাথায় রেখে সামাজিক নিরাপত্তার প্রকল্পগুলোর উপকারভোগীর সংখ্যা এবং মাথাপিছু বরাদ্দের পরিমাণ কমপক্ষে দ্বিগুণ করতে হবে। নতুন দরিদ্র হওয়া মানুষের জন্য দীর্ঘমেয়াদি নতুন প্রকল্প শুরু করতে হবে। করোনার সময় ছাড়াই দেশের প্রায় অর্ধেক মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থান করছিল, তাই তাদের হাতে এই মুহূর্তেই নগদ টাকা পৌঁছে দেওয়া জরুরি। এর জন্য একটা থোক বরাদ্দ অত্যাবশ্যক।
মানুষের হাতে টাকা পৌঁছে দেওয়ার জন্য যদি প্রয়োজন হয় সরকারের যোগাযোগ এবং অন্যান্য খাতের কিছু মেগা প্রকল্পের গতি তাতে কিছুটা ধীর করে রাখাই যায়। কোন খাতগুলোতে মনোযোগ দিতে হবে এবং সেখানে কী করতে হবে সেই ধরনের পরামর্শ গত বছর দেওয়া হয়েছিল, দেওয়া হচ্ছে এ বছরও। কিন্তু সরকার গতবারের মতো এ বছরও বিভিন্ন খাতে বাজেটের আকার অনুযায়ী হয়তো কিছু আনুপাতিক বরাদ্দ বাড়াবে মাত্র। সরকারি বরাদ্দ সেসব প্রকল্পের দিকেই যাবে যেগুলো থেকে লুটপাট করা সহজ হয়। সেজন্যই বাজেটের আগে দেশের অর্থনীতিবিদরা এবং গবেষণা সংস্থাগুলো যা যা করে সেটা স্রেফ আনুষ্ঠানিকতার বেশি কিছু না। আমার আশঙ্কা এ বছরও তেমন বাজেট হবে না, যে বাজেট করোনার অভিঘাত মোকাবিলায় সমর্থ হবে।
সংসদ সদস্য; আইনজীবী, কলাম লেখক
- বিষয় :
- ভিন্নমত
- রুমিন ফারহানা
- বাজেট
