খুলনা ওয়াসা
পয়সা দিয়ে নোনাপানি!
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ২৩ মে ২০২১ | ১২:০০
খুলনার মানুষের পানির কষ্ট লাঘবের দায়িত্ব খুলনা পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিস্কাশন কর্তৃপক্ষ তথা খুলনা ওয়াসা গ্রহণ করলেও সংস্থাটি সেখানে কেবল ব্যর্থই হয়নি; উপরন্তু অপরিণামদর্শী প্রকল্প গ্রহণ করে আড়াই হাজার কোটি টাকা জলে ফেলার কাজও সম্পন্ন করেছে। 'খুলনা ওয়াসার অদ্ভুত প্রকল্প' শিরোনামে সমকালের গত তিন দিনের ধারাবাহিক প্রতিবেদনে আমরা দেখেছি, 'নিরাপদ পানি সরবরাহ এবং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমানো'র ঘোষণা দিয়ে হাতে নেওয়া এক দশক আগের বিশাল প্রকল্পটি বাস্তবে কোনো ফল দেয়নি। পানি লবণাক্ত হওয়ায় তা খাবারের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। সমকালের প্রতিবেদন সূত্রে দেখা যাচ্ছে, খুলনা ওয়াসা বছর দেড়েক আগে ওই প্রকল্প চালু করে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে নগরীর এলাকায় পানি পৌঁছায়। এরপরই পানিতে লবণের বিষয়টি ধরা পড়লেও লবণের উৎস খুঁজতে ব্যর্থ হয়ে ওয়াসা প্রথম দিকে গভীর নলকূপের পানিতে নোনা বেশি পাওয়ায় কয়েকটি নলকূপ বন্ধ করে দেয়। এরপর পানি শোধন কেন্দ্র ও বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা পানি পরীক্ষা করে দেখা যায়, মধুমতী থেকে এনে পরিশোধন করা পানিতে লবণ রয়েছে।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, মধুমতী নদী থেকে পানি এনে পরিশোধন করে খুলনাবাসীকে দেওয়ার বিশাল এ প্রকল্পটি গ্রহণের আগে লবণাক্ততার বিষয়টি বিবেচনায়ই আনা হয়নি। এত ব্যয়বহুল ও গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রকল্প হাতে নেওয়ার আগে মৃত্তিকা সম্পদ দপ্তরের কাছ থেকে এই অতি প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের প্রয়োজনই মনে করেনি। এমনকি প্রকল্পের সম্ভাব্যতা জরিপকারী সংস্থা জাপানের এনজেএস কনসালট্যান্ট সে সময় মধুমতীর পানির লবণাক্ততা বিষয়ে প্রায় একই রকম তথ্য পেয়েছিল। কিন্তু ওয়াসা সেটিও আমলে নেয়নি। সরকারি সংস্থাগুলোর তথ্য ও পরিবেশবাদীদের আপত্তি আমলে না নিয়েই প্রকল্পটি কীভাবে গ্রহণ করা হলো? বর্ষার আশীর্বাদে খুলনা ওয়াসা ও নগরবাসী উভয়ই রক্ষা পেলেও তিন-চার মাসের শুস্ক মৌসুমে সেখানে পানি যেন কেবলই হাহাকার। বর্ষায় মধুমতী থেকে বেশি আর নলকূপ থেকে কম পানি তুলে দুটি মিশিয়ে সরবরাহ করে রক্ষা পায় ওয়াসা। কিন্তু শুকনো মৌসুমে মধুমতীর মাত্রাতিরিক্ত নোনাপানি কমিয়ে আর নলকূপের পানি বাড়িয়ে ওয়াসা 'ভেজাল' করে পার পেতে চাইলেও পানিতে নোনা কমছে না।
স্থানীয়রা অভিযোগ করছেন, পরিকল্পিতভাবে দুর্নীতি-অনিয়মের মাধ্যমে প্রকল্পের অর্থ নয়ছয় করতে এ প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। আমাদেরও প্রশ্ন, 'নইলে আড়াই হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পরও পানির নোনা যাবে না কেন?' আমরা দেখছি লবণাক্ততার প্রভাব পড়ছে খুলনা ওয়াসার সার্বিক পানি সরবরাহের ওপর। শুস্ক মৌসুমে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় পরিশোধিত ও নলকূপের পানি যৌথভাবে সরবরাহের চেষ্টা করায় গ্রাহক ঠিকমতো পানি পাচ্ছেন না। জলাধার থেকে দেওয়া পানির বেশি গতি ও নলকূপের পানির গতি কম থাকায় দিনের বেশিরভাগ সময় নলকূপ চালালেও সেই পানি গ্রাহকের বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছায় না বলে দিনের যেটুকু সময় জলাধারের পানি আসে, মানুষ ওই সময়টুকুর জন্যই অপেক্ষা করে থাকে। ভূগর্ভের পানি সুরক্ষার কথা থাকলেও খুলনা ওয়াসা প্রতিদিন ভূগর্ভ থেকে পানি তুলে যে সর্বনাশ করছে, দীর্ঘমেয়াদে তার প্রভাব খারাপ হতে বাধ্য।
এমনকি ওয়াসার বাইরেও খুলনার অধিকাংশ নগরবাসী যেভাবে ভূগর্ভের পানির ওপর নির্ভরশীল; সেখানে ওয়াসার হিসাবেই সংস্থাটির চার কোটি লিটারের মধ্যে আড়াই কোটি লিটার ভূগর্ভ থেকে তোলা পানি আর নগরবাসীর হিসাব ধরলে প্রতিদিন যেভাবে ভূগর্ভ থেকে ২২ কোটি লিটার পানি উঠছে, তা চরম আত্মঘাতী। আমরা মনে করি, সেখানে ভূগর্ভ থেকে পানি তোলা কমিয়ে অন্য কোনো পানির উৎসের দ্রুত সন্ধান করতে হবে। তার আগে খুলনা ওয়াসা মধুমতী প্রকল্পের নামে যে অর্থ অপচয় করেছে, তার তদন্ত হওয়া জরুরি। খুলনা ওয়াসার এ আত্মঘাতী ও নীতিবিরুদ্ধ প্রকল্পে জড়িতদের বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা দরকার। দীর্ঘমেয়াদে খুলনা নগরীর পানি সংকট যেভাবে দুর্যোগে রূপ নিচ্ছে, তা নিয়েও এখনই ভাবতে হবে।
- বিষয় :
- খুলনা ওয়াসা
- সম্পাদকীয়
