ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

পবিত্র কাবার গুরুত্ব

পবিত্র কাবার গুরুত্ব
×

ড. মোহাম্মদ বাহাউদ্দিন

প্রকাশ: ২৪ জুন ২০২১ | ১২:০০

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কর্তৃক প্রেরিত নবুওতি কাফেলার এক অত্যুজ্জ্বল জ্যোতিস্ক হজরত ইব্রাহিম (আ.)। আল কোরআনে বর্ণিত নবীগণের মধ্যে তিনি ষষ্ঠতম এবং ২৫টি সুরায় ৬৯টি স্থানে মহান আল্লাহ এ বিখ্যাত পয়গম্বরের নামোল্লেখ করেছেন। বর্তমান ইরাকের প্রাচীন বাবেল শহরখ্যাত 'উর' নামক স্থানে প্রায় চার হাজার বছর পূর্বে মুসলিম মিল্লাতের মহান নেতা ইব্রাহিম (আ.)-এর জন্ম হয়। তার ১৭৫ বছরের জীবনকাল ছিল অবিরাম সংগ্রাম, ত্যাগ-তিতিক্ষা, ধৈর্য আর সীমাহীন কষ্ট-দুর্ভোগের। জন্মের পর থেকেই তাকে মুখোমুখি হতে হয়েছিল নানান অগ্নিপরীক্ষায়; কিন্তু অপরিসীম ত্যাগী ও দৃঢ়চেতা ইব্রাহিম (আ.) সব পরীক্ষায় সাফল্যের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়েছেন।
দুনিয়া বিখ্যাত পয়গম্বর হজরত ইব্রাহিম (আ.)-কে এই মর্মে স্বয়ং আল্লাহতায়ালাই সনদ দিচ্ছেন- 'ইব্রাহিমকে তার পালনকর্তা কয়েকটি বিষয়ে পরীক্ষা করলেন আর প্রতিটি পরীক্ষাতেই তিনি পূর্ণতাপ্রাপ্ত হলেন।' আর জীবনযুদ্ধে ইব্রাহিম (আ.)-এর এই সর্বাঙ্গীণ পূর্ণতার পুরস্কারস্বরূপ মহান আল্লাহ ঘোষণা করেন- 'ইন্নি জাইলুকা লিন্নাসি ইমামা', অর্থাৎ নিশ্চয়ই আমি ইব্রাহিমকে মানবজাতির নেতৃত্বের আসনে সমাসীন করব। আল্লাহপাক এ মহান নবীর জ্ঞান-প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা, বৈশিষ্ট্য ও নেতৃত্বগুণের প্রশংসায় বলেন- 'আর আমি ইতোপূর্বে ইব্রাহিমকে তার সৎপন্থা দান করেছিলাম এবং আমি তার সম্পর্কে সম্যক পরিজ্ঞাতও ছিলাম। যখন তিনি তার পিতা ও তার সম্প্রদায়কে বললেন- এই মূর্তিগুলো কী, যাদের তোমরা পূজারি হয়ে বসে আছ? তারা বলল, আমরা আমাদের বাপ-দাদাকে এদের পূজা করতে দেখেছি। তিনি বললেন, তোমরা প্রকাশ্য গোমরাহিতে আছ এবং তোমাদের বাপ-দাদারাও তাই ছিল। তারা বলল, তুমি কি আমাদের কাছে সত্যসহ আগমন করেছ, না তুমি কৌতুক করছ? তিনি বললেন, না, তিনিই তোমাদের পালনকর্তা যিনি নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের পালনকর্তা, যিনি এগুলো সৃষ্টি করেছেন; আমি এই বিষয়েরই সাক্ষ্যদাতা।' হজরত ইব্রাহিম (আ.) পরম স্রষ্টার একত্ববাদের ঝাণ্ডাকে সমুন্নত রাখার মানসে অবিশ্বাসীদের তৈরি মূর্তিগুলো ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিলেন; শুধু বড় মূর্তিটি তার ভাঙার কবল থেকে রেহাই পায়। এর প্রতিবাদে ইব্রাহিমবিরোধীরা প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয় এবং প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে তাকে জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করে ভস্মীভূত করার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু রাখে আল্লাহ মারে কে, স্বয়ং আল্লাহ হলেন ইব্রাহিমের হেফাজতকারী। তিনি নির্দেশ দিলেন- 'হে অগ্নি, তুমি ইব্রাহিমের ওপর শীতল ও নিরাপদ হয়ে যাও।' নমরুদের প্রজ্বলিত আগুন মহান প্রভুর নির্দেশে ইব্রাহিমের (আ.) জন্য আরামদায়ক এক শান্তিনিবাসে পরিণত হলো। শুধু তাই নয়, ইব্রাহিম (আ.)-কে যারা নিঃশেষ করতে চেয়েছিল, ইতিহাসের পাতা থেকে মহান আল্লাহ তাদেরই একেবারে মূলোৎপাটিত করে দিলেন। আল্লাহপাক বলেন- 'তারা ইব্রাহিমের বিরুদ্ধে ফন্দি আঁটতে চাইল, অতঃপর আমি তাদেরই সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত করে দিলাম।' তাই মুসলিম মিল্লাতের পিতা ও মানবজাতির অবিসংবাদিত নেতা ইব্রাহিম (আ.)-এর জীবনের নানা ঘটনাপ্রবাহেও এটি সুস্পষ্টরূপে প্রতিভাত হয় যে, স্বয়ং আল্লাহই হচ্ছেন তার মাখলুকের সুরক্ষাদাতা, হেফাজতকারী।
ইসলামের ইতিহাসে মহান আল্লাহ কর্তৃক হেফাজতের এক অত্যুজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলো পবিত্র কাবা শরিফ। মানবেতিহাসের প্রথম গৃহ ও পৃথিবীর অধিবাসীদের জন্য হেদায়াতের কেন্দ্রবিন্দু পবিত্র কাবাগৃহটি মক্কা শরিফে বিদ্যমান। এটি বায়তুল্লাহ বা আল্লাহর ঘর হিসেবে দুনিয়াবাসীর কাছে এর গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম। কৌশলগত অবস্থানের দিক হতেও পবিত্র কাবাগৃহের মর্যাদা ও গুরুত্ব লক্ষণীয়। এটি গোটা পৃথিবীর মধ্যমণি হয়ে পবিত্র মক্কা ভূমিতে স্বমহিমায় অবস্থান করছে। কাবা শরিফের ভিত্তি স্থাপনের পর হতে অনেক মহামনীষী কর্তৃক এ পবিত্র গৃহের পরিচর্যা ও প্রয়োজনীয় সংস্কার সাধিত হয়। আরবে আইয়ামে জাহেলিয়া তথা অন্ধকার যুগে যখন ইথিওপিয়ার খ্রিষ্টান শাসক আবরাহা আল আশরাম (মৃ. ৫৭৫ খ্রি.) এই পবিত্র গৃহের ধ্বংস সাধনে প্রবৃত্ত হন। আবরাহার আক্রমণ থেকে আল্লাহই তার প্রিয় গৃহকে সুরক্ষা প্রদানের প্রকৃত স্বত্বাধিকারী। মহানবী (সা.)-এর জন্মের মাত্র ৫০ দিন পূর্বের এ ঐতিহাসিক ঘটনা মহান আল্লাহ কর্তৃক তাঁর প্রিয় বস্তুর স্বতঃস্ম্ফূর্ত সংরক্ষণ সংক্রান্ত এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আল্লাহপাক পরবর্তী সময়ে রাসুল (সা.)-কে তার কুদরতের অপূর্ব নিদর্শন হিসেবে কাবা শরিফকে নিরাপদ রাখার ঐতিহাসিক ঘটনা এভাবে বিবৃত করেছেন- 'আপনি কি দেখেননি যে, আপনার প্রতিপালক হস্তিবাহিনী ও এর ধারকদের সঙ্গে কী আচরণ করেছেন? তিনি কি তাদের চক্রান্তকে ব্যর্থতায় পর্যবসিত করে দেননি?'
  চেয়ারম্যান ও অধ্যাপক, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×