ভিন্নমত
নির্বাচন কমিশন গঠনে আইন হোক
রুমিন ফারহানা
প্রকাশ: ০২ জুলাই ২০২১ | ১২:০০ | আপডেট: ০২ জুলাই ২০২১ | ১৬:৪৭
বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে। আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে নতুন আরেকটি নির্বাচন কমিশন গঠন করতে হবে, যার অধীনেই হবে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন। বর্তমান নির্বাচন কমিশন গঠনের আগে সরকার একটি সার্চ কমিটি গঠন করেছিল। তাদের বক্তব্য ছিল, তাতে নাকি সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি কমিশন গঠন করা যাবে। সেই কমিটির প্রস্তাবিত নির্বাচন কমিশন কেমন হয়েছে, কেমন জাতীয় নির্বাচন তারা করেছেন, আমরা তা দেখেছি। কিন্তু তারও আগে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তখনই উঠেছিল, কিসের ভিত্তিতে সরকার এই সার্চ কমিটি তৈরি করেছিল। এমনকি সেই সার্চ কমিটির ভিত্তিতে যদি এমন অসাধারণ একটা নির্বাচন কমিশন হতো, যে কমিশন দেশকে একটা অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দিতে পেরেছে, তবুও কি সেই সার্চ কমিটি বা নির্বাচন কমিশনকে একটা উত্তম উদাহরণ মনে করতাম আমরা?
একটা আধুনিক রাষ্ট্র মানেই রাষ্ট্রটি পরিচালিত হবে আইন এবং বিধি দ্বারা। আর সবার ওপরে থাকবে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন সংবিধান। প্রতিটি আইন এবং বিধি তৈরি হবে সংবিধানের নির্দেশনার আলোকে এবং কোনো আইন বা বিধি সংবিধানের কোনো অনুচ্ছেদ কিংবা চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারবে না। ধরে নেওয়া যাক কোনো রাষ্ট্রে আইনবহির্ভূতভাবে আপাতদৃষ্টিতে কোনো ভালো কাজ সংঘটিত হচ্ছে। বহু ক্ষেত্রেই নাগরিকরা সেগুলো সমর্থনও করেন। অনেক সময় অনেক বড় চিহ্নিত অপরাধীকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করার মতো বেআইনি কর্মকাণ্ডও অনেক নাগরিক সমর্থন করেছেন। কিন্তু রাষ্ট্রের নাগরিকদের এটা জানতে হবে কোনো রাষ্ট্রে খুব ক্ষুদ্র একটা পদক্ষেপও যদি আইনবহির্ভূতভাবে হয়, তাহলে তা আপাতদৃষ্টিতে যত ভালো কাজই হোক না কেন, এমন কাজ আদতে রাষ্ট্রকে দুর্বল করে দেয়।
কথাগুলোর প্রেক্ষাপট বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন গঠন। দেখা যাক সংবিধানে নির্বাচন কমিশন প্রতিষ্ঠার পদ্ধতি নিয়ে কী বলা হয়েছে। সংবিধানে বলা হয়েছে, 'প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অনধিক চারজন নির্বাচন কমিশনারকে লইয়া বাংলাদেশের একটি নির্বাচন কমিশন থাকিবে এবং উক্ত বিষয়ে প্রণীত কোনো আইনের বিধানাবলি-সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারকে নিয়োগদান করিবেন।' খুব সহজভাবেই আমরা এটা বুঝতে পারি, নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য একটি আইন থাকতেই হবে এবং সেই আইনের ভিত্তিতেই একমাত্র নির্বাচন কমিশন গঠন করা সম্ভব। সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের একটা প্রধান পার্থক্য রয়েছে। নির্বাচন কমিশন গঠনের ক্ষেত্রে আইনই একমাত্র পথ। আইন ছাড়া অন্য কোনোভাবে নির্বাচন কমিশন গঠন করার অপশন সংবিধানে নেই। রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের উচিত ছিল প্রথম নির্বাচনটির আগেই কমিশন গঠন করার জন্য একটা আইন তৈরি করা। কিন্তু স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করা বাংলাদেশের সংসদে গত ৫০ বছরে অসংখ্য আইন পাস হয়েছে, কিন্তু এই অতি জরুরি আইনটি পাস করা হয়নি। সংবিধান আমরা যতটুকু বুঝি তার আলোকে এটা বলতেই পারি, আইন ছাড়া নির্বাচন কমিশন গঠন করার অর্থ হচ্ছে, সেই নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিকভাবে অবৈধ। তাই প্রশ্ন আসতেই পারে, বাংলাদেশের ৫০ বছরের ইতিহাসে অনুষ্ঠিত হওয়া একটি নির্বাচনও কি আদতে বৈধ?
একজন সংসদ সদস্য হিসেবে প্রতিটি অধিবেশনে দেখি একের পর এক আইন তৈরি হচ্ছে, সংশোধিত হচ্ছে। কোনো আইনই ছোট করে দেখতে চাই না, কিন্তু এটা তো সত্য, সব আইনের গুরুত্ব রাষ্ট্রের এবং নাগরিকদের দৃষ্টিকোণ থেকে সমান নয়। এই সংসদে বহু আইন প্রণীত হয়, আগেও হয়েছে যেগুলোর চাইতে নির্বাচন কমিশন গঠন করার আইন বহুগুণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নিশ্চয়ই একটা অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন মানেই গণতন্ত্র না। আবার এটাও ধ্রুব সত্য, সে রকম একটি নির্বাচন ছাড়া গণতন্ত্রের প্রাথমিক ভিত্তিই স্থাপিত হতে পারে না। তাই সবকিছুর আগে নির্বাচন কমিশন গঠনের একটা আইন করা সরকারের জন্য সবচেয়ে জরুরি কাজ। প্রশ্ন হচ্ছে, আগামী নির্বাচন কমিশন গঠনের আগে হলেও কি সরকার এই কাজটি করবে?
খুব ভালোভাবেই জানি, একটা আইন তৈরি হওয়া মানেই সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে যাওয়া না। ক্ষমতাসীনরা সেই আইনকে শ্রদ্ধা করবেন কিনা, সেই আইন মেনে চলবেন কিনা সেগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে অনেক উদাহরণ দিয়ে দেখানো যায় বহু ক্ষেত্রেই সরকার আইন, এমনকি সংবিধানবহির্ভূত আচরণ করে।
সবকিছুর পরও আইনগুলো তৈরি হওয়া উচিত। সরকার আইন তৈরি করা মানেই সেটা মেনে চলবে বা সেটার ফাঁকফোকর বের করে তার স্বার্থসিদ্ধি করবে না তা তো না। তাহলে কেন কাগজে-কলমে অন্তত একটা আইন সরকার তৈরি করছে না? নির্বাচন কমিশনের মতো একটা প্রতিষ্ঠান, যে প্রতিষ্ঠান ক্ষমতায় যাওয়া কিংবা ক্ষমতা ধরে রাখার মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নির্ধারক ভূমিকা রাখতে পারে, এর ক্ষেত্রে নূ্যনতম আইন মানার ইল্যুশনও সরকার তৈরি করতে চায় না। সরকার চায় একেবারেই তাদের ইচ্ছামতো একটা কমিশন গঠিত হবে। এমনকি কোনো রকম লোক দেখানো আনুষ্ঠানিকতা করার জন্যও সরকার প্রস্তুত নয়। এই লেখায়ই প্রশ্ন রেখেছি পরবর্তী নির্বাচন কমিশন গঠনে একটি আইন প্রণীত হবে কি? বিদ্যমান বাস্তবতায় স্পষ্টভাবেই বলতে পারি, তেমন কিছু ঘটতে যাচ্ছে না। আগামী সংসদ নির্বাচন হতে যাচ্ছে সাংবিধানিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ একটি নির্বাচন কমিশনের অধীনে। তবুও আমরা এ দাবি করব। প্রত্যাশা রাখব, নির্বাচন কমিশন গঠন আইন দেশ-জাতির বৃহৎ স্বার্থে করা হোক।
সংসদ সদস্য; আইনজীবী, কলাম লেখক
- বিষয় :
- ভিন্নমত
- রুমিন ফারহানা
