ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

পরিশুদ্ধ জীবনের জন্য তওবা

পরিশুদ্ধ জীবনের জন্য তওবা
×

ড. মোহাম্মদ বাহাউদ্দিন

প্রকাশ: ২৯ জুলাই ২০২১ | ১২:০০

সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ হিসেবে মানুষের উচিত ইতিবাচক ও মানবিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে নিয়োজিত রাখা এবং সব ধরনের পাপাচার থেকে স্বীয় রুহ-বদনকে মুক্ত রাখা। কিন্তু মানুষের পক্ষে শতভাগ নিস্কলুষ জীবনযাপন করা দুরূহ ব্যাপার। অবশ্য আমাদের সমাজ-কাঠামো, পারিপার্শ্বিকতা ও সামগ্রিক পরিমণ্ডল অনেক ক্ষেত্রে নির্ভেজাল জীবন অতিবাহিতকরণে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়। অশ্নীলতা ও পাপাচারের প্রতি নাফসে আম্মারা তথা কুপ্রবৃত্তির যেমন চাহিদা জড়িত, তেমনি সমাজ-বাস্তবতাও মানুষকে অনেক সময় কুকর্মের দিকে ধাবিত হতে প্ররোচিত করে। ইচ্ছা-অনিচ্ছায় যেভাবেই হোক না কেন, মানুষ যখনই অপরাধমূলক কার্যক্রমে নিজেকে জড়িয়ে ফেলবে বা পাপকর্মে নিজের অংশগ্রহণ দেখতে পাবে- এর পরিপ্রেক্ষিতে শরিয়ত-নির্দেশিত যে পন্থার মাধ্যমে তা থেকে পরিত্রাণের পথ খুঁজে পাবে, সেটিই হলো তওবা। এই তওবার ফলে অনুতপ্ত মানুষেরা পুনরায় মহান স্র্রষ্টার প্রিয়পাত্রে পরিণত হওয়ার অপার সুযোগ লাভ করে থাকে।
আমরা এখানে বুখারি ও মুসলিম শরিফে বিবৃত এক বিশুদ্ধ হাদিসের ঘটনার সারসংক্ষেপ উল্লেখ করতে পারি- যেখানে জঘন্য অপরাধীর তওবা-জ্ঞান, ক্ষমাপ্রাপ্তি ও মহান আল্লাহর মহানুভবতার প্রকৃষ্ট নজির রয়েছে। রাসুল (সা.)-এর ভাষ্যমতে, এক ব্যক্তি ৯৯ জন মানুষকে হত্যা করার পর তার সংবিৎ ফিরে এলো, সে তাওবা করবে। সেজন্য সবচেয়ে বড় আলেমের শরণাপন্ন হয়ে তার অপরাধের বিবরণ দিয়ে তওবার ইচ্ছা পোষণ করল। কিন্তু আলেম বললেন, তার তওবার কোনো সুযোগ নেই। তখন সে ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে ওই আলেমকেও হত্যা করল এবং এর মধ্য দিয়ে তার মানুষ হত্যার সেঞ্চুরি পূর্ণ হলো। অতঃপর সে আবারও তওবার জন্য সর্বোচ্চ আলেমের সন্ধান করতে লাগল। সে বিজ্ঞ আলেমের সান্নিধ্যে পৌঁছে আবারও নিজের পাপের বিবরণ দিয়ে তওবার পথ খোলা আছে কিনা জানতে চাইল। আলেম বললেন, অবশ্যই তুমি তওবার সুযোগ পাবে, তবে তোমাকে অমুক দেশে চলে যেতে হবে; সেখানে কিছু লোক রয়েছে, যারা মহান আল্লাহর উপাসনায় নিয়োজিত। লোকটি তাওবার উদ্দেশ্যে সেই অঞ্চলের দিকে অগ্রসর হতে লাগল, পথিমধ্যে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলো এবং সে মৃত্যুমুখে পতিত হলো। জীবনের এই সন্ধিক্ষণে তার কাছে আজাব এবং রহমত- উভয়ের ফেরেশতা চলে এলো। কে তার জান কবজ করবে- এ নিয়ে বাদানুবাদ শেষে সিদ্ধান্ত এলো যে, সে যে দেশে রওনা হয়েছিল, তা যদি যেখান থেকে চলে এসেছে, তা হতে অধিকতর সন্নিকটবর্তী হয়ে থাকে, তবে রহমতের ফেরেশতারা তার জান কবজ করবে এবং সে নাজাত পাবে। রাস্তা পরিমাপ করে দেখা গেল মাত্র এক বিঘতের ব্যবধান। অর্থাৎ আলেম যেই অঞ্চলে যেতে বলেছিলেন তা তার জন্মভূমির চেয়ে অধিকতর নিকটবর্তী। ফলে তাকে সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত করে ক্ষমা প্রদান করা হলো।
মানবতার পরম বন্ধু মহানবী (সা.) বলেছেন- 'আত্‌ তায়িবু মিনায্‌ যাম্বে কামাল্লা যান্বা লাহু' অর্থাৎ গুনাহ থেকে তওবাকারী ব্যক্তি এমন হয়ে যায় যে, সে আর কোনো গুনাহই করেনি। রাসুলে পাকের এ বাণীতে তওবার কার্যকারিতা সুস্পষ্ট প্রতীয়মান হয়। মহান আল্লাহ তার বান্দার প্রতি ভালোবাসার আহ্বান জানিয়ে ঘোষণা করেছেন- 'ইয়া ইবাদিয়াল্লাজিনা আসরাফু আলা আনফুসিহিম লা তাকনাতু র্মি‌ রাহমাতিল্লাহ ইন্নাল্লাহা য়াগফিরুয্‌ যুনুবা জামিআ ইন্নাহু হুয়াল গাফুরুর রাহিম' অর্থাৎ হে বান্দারা, যারা অপরাধের মধ্য দিয়ে নিজেদের ওপর সীমা অতিক্রম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হইও না। নিশ্চিতভাবে মহান আল্লাহ তোমাদের সব গুনাহ মাফ করে দেবেন। তিনি ক্ষমাশীল ও দয়ালু।
তওবার সুনির্দিষ্ট রীতি-পদ্ধতি রয়েছে। ইসলামের নির্দেশনা মেনে কোনো ব্যক্তি তওবা করলে তার জন্য মুক্তি, ক্ষমা ও রহমতের নিশ্চয়তা রয়েছে। তিনটি শর্তের সমন্বয়ে তওবাকার্য বাস্তবায়ন করতে হবে, তবেই সেটি বিধান অনুযায়ী প্রকৃত তওবার মর্যাদা পাবে। প্রথমত, কৃত অপরাধ ও পাপাচারের জন্য গভীর অনুতপ্ত হতে হবে। দ্বিতীয়ত, বর্তমান পর্যন্ত কৃত সব অপরাধ ও পাপকার্যের জন্য মহান আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে। তৃতীয়ত, ভবিষ্যতে আর কখনও এমন সব অপরাধে নিজেকে জড়াবে না- এ অঙ্গীকার ব্যক্ত করতে হবে। উল্লিখিত তিন শর্তে তওবা করলে বান্দা সম্পূর্ণ নিষ্পাপ ও নিস্কলুষ হয়ে এর কার্যকারিতা উপভোগ করবে এবং তওবার মাধ্যমে সে এক পরিশুদ্ধ জীবন লাভ করবে।
চেয়ারম্যান ও অধ্যাপক, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×