সমকালীন প্রসঙ্গ
সুশাসন প্রতিষ্ঠায় রাজনৈতিক সদিচ্ছা আছে কি?
এম হাফিজ উদ্দিন খান
প্রকাশ: ১১ মার্চ ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ১১ মার্চ ২০২২ | ১৪:৩০
দেশে দুর্নীতির ক্ষেত্র ও উৎসের পাশাপাশি এর প্রতিকার-প্রতিবিধান নিয়েও আমরা কথা বলে আসছি। রাষ্ট্র পরিচালনায় তো বটেই, রাষ্ট্রের প্রতিটি সংস্থা কিংবা প্রতিষ্ঠানে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও সুনীতি চর্চার কোনো বিকল্প নেই। 'সুশাসনে জোর, দুর্নীতিতে লাগাম চায় আইএমএফ' শিরোনামে ৯ মার্চ সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে যে তথ্য উঠে এসেছে; আমরাও এ রকম কথা বলে ও দাবি জানিয়ে আসছি। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বলেছে, শাসনব্যবস্থা শক্তিশালী করে, দুর্নীতির ঝুঁকি কমিয়ে কাঠামোগত উন্নয়ন করলে তা বিনিয়োগ আকর্ষণে সহায়তা করবে। সরকারি খাত ডিজিটাইজেশন হলে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং দুর্নীতি কমবে- এই অভিমত ব্যক্ত করেছে সংস্থাটি। আমরা অন্যের চেয়ে আমাদের বাস্তবতা যেমন ভালো বুঝি, তেমনি এর নিরিখেই সচেতন নাগরিক হিসেবে পরামর্শও দিয়ে আসছি। দুঃখের বিষয় হলো, এসব খুব কমই আমলে নেওয়া হয়।
দুর্নীতি আমাদের কী ভয়াবহ ব্যাধি হয়ে আছে, তা জানতে আন্তর্জাতিক কোনো সংস্থার দ্বারস্থ হওয়ার দরকার নেই। দেশের এমন কোনো খাত নেই যেখানে অনিয়ম-দুর্নীতি বাসা বাঁধেনি; সুশাসন নির্বাসনে যায়নি। দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদকের দক্ষতা বৃদ্ধি, সরকারি কর্মকর্তাসহ মন্ত্রী-এমপিদের সম্পদের হিসাব দাখিল, জনস্বার্থ-সংশ্নিষ্ট যে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে জনমত যাচাই ইত্যাদি বিষয়ে আমরা বারবার তাগিদ দিয়ে আসছি। সুশাসন নিশ্চিত না হলে অনিয়ম-দুর্নীতির লাগাম টানা যাবে না। দুর্নীতি প্রতিরোধে সরকারের 'শূন্য সহিষুষ্ণতা'র অঙ্গীকার সত্ত্বেও অনিয়ম-দুর্নীতি কমা দূরের কথা, তা যেন বেড়েই চলেছে! কেন? এই 'কেন'র উত্তর সন্ধান জরুরি। অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা আর নির্মোহ অবস্থান নিয়ে প্রতিকার নিশ্চিত করা এক বিষয় নয়। এ বছরের প্রথমদিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআই) দুর্নীতির ধারণা সূচকে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৩তম হিসেবে চিহ্নিত হয়।
সরকারের নীতিনির্ধারকরা সুশাসনের ব্যাপারে দ্বিমত প্রকাশ না করলেও এ বিষয়ে তাদের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সুশাসন সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক বিভিন্ন নির্দেশক এবং আইএমএফের প্রাক্কলন অনুযায়ী বাংলাদেশের যে স্কোর নির্ণয় করা হয়েছে তাতে দেখা যায়, সুশাসনের বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল। সব সূচকে দক্ষিণ এশিয়ার গড় স্কোরের চেয়েও পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। আমরা দেখছি করোনা দুর্যোগে সরকারের নান ারকম সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে অনিয়মকারী দুর্নীতিবাজদের স্বেচ্ছাচারিতার থাবা। অর্থ পাচারের মতো গুরুতর ব্যাধির চিত্র তো সংবাদমাধ্যমে প্রায়ই উঠে আসছে। ব্যাংক খাতের নানা অস্বচ্ছতা নিয়ে সমালোচনা অব্যাহত থাকলেও এর প্রতিকারের তেমন কিছুই দেখা যায় না কিংবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেওয়া হলেও এর গতি অত্যন্ত মন্থর। সেবা খাতগুলোর চিত্র আরও বিবর্ণ। যে কোনো সেবা নিতে গিয়ে মানুষকে কী ভোগান্তির শিকার হতে হয়, তা ভুক্তভোগীমাত্রই জানা। সরকারের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোয় দায়িত্বশীলদের দক্ষতায় যেমন ঘাটতি রয়েছে, তেমনি তাদের নিয়ন্ত্রণমূলক কার্যক্রমেও অনেক ক্ষেত্রে রয়েছে অস্বচ্ছতার অভিযোগ। যতই উন্নয়ন-অগ্রগতির কথা তারস্বরে বলা হোক; এর কোনোকিছুই টেকসই হবে না যদি সুশাসন নিশ্চিত ও দুর্নীতি নির্মূল করা না যায়। দেশে সব ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবশ্যই শতভাগ জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। মন্ত্রণালয়, সংসদীয় কমিটি, সরকারি কেনাকাটায় তদারকি সংস্থা, সরকারের বিভিন্ন দপ্তর, আর্থিক বিভাগ, এনবিআর, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সব সেবা খাতকেই জবাবদিহি করার কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে- এ প্রশ্নের উত্তর অস্পষ্ট নয়। দুর্নীতির মতো ব্যাধি নির্মূল তো পরের কথা, সহনীয় মাত্রায়ই নিয়ে আসা যাচ্ছে না। এ জন্য সরকারের নীতিনির্ধারকদের আত্মজিজ্ঞাসা খুব জরুরি। সুশাসন নিশ্চিত ও দুর্নীতি নির্মূলে সরকারের অঙ্গীকার সত্ত্বেও কেন এখনও বিষয়গুলো দেশে-বিদেশে নানা মহলে প্রশ্নের বিষয় হয়ে আছে, এর সদুত্তর তাদের দিতে হবে। আর্থিক ও সেবা খাতের সংস্কারে বারবার তাগিদ সত্ত্বেও এসব ক্ষেত্রে সরকারের মনোযোগ নিবিড় হচ্ছে- বিদ্যমান পরিস্থিতি এই সাক্ষ্যও বহন করে না। প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও সরকারের বিভাগ-দপ্তরগুলোয় একজন করে প্রধান রয়েছেন। নিজ নিজ মন্ত্রণালয় কিংবা প্রতিষ্ঠানে এই বিভাগের প্রধানকে সবার আগে আসতে হবে জবাবদিহির আওতায়। প্রধান ব্যক্তি যদি জবাবদিহি করতে বাধ্য হন, তাহলে তার অধীনরা এমনিতেই স্বচ্ছতা-দায়বদ্ধতা-জবাবদিহির পরীক্ষার মুখোমুখি হতে বাধ্য হতেন। বাজারে যে তুঘলকি কাণ্ড চলছে, এও সুশাসনের অভাবেই।
দুদক কতটা স্বাধীন ও শক্তিশালী- এর প্রমাণ তাদেরই দিতে হবে কাজের মধ্য দিয়ে। তাদের অনুসন্ধান ও তদন্ত কার্যক্রম জানার অধিকার আমাদের রয়েছে। দুদককে যেমন আরও সক্রিয় হতে হবে, তেমনি প্রশাসনিক দুর্নীতি বন্ধে জড়িতদের দৃষ্টান্তযোগ্য দণ্ডের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি বিভাগীয়ভাবেই। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যক্রমে আরও গতি দরকার। এই প্রতিষ্ঠান ব্যাংক খাতের অস্বচ্ছতা দূর করতে কেন পারছে না- তা স্পষ্ট করুক। অভিযোগ আছে, অনেক প্রতিবেদন পড়ে আছে, অথচ ব্যবস্থা নেই। দুর্নীতির মামলাগুলোর বিচার প্রক্রিয়ায় শুধু গতি আনলেই চলবে না; ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার শর্তগুলোও পূরণ করতে হবে সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীল সব মহলকে নির্মোহ অবস্থান নিয়ে। দুর্নীতি বন্ধ করতে হলে বেশকিছু পদ্ধতির সংস্কার প্রয়োজন। প্রয়োজন কাঠামোগত পরিবর্তনও। রুই-কাতলাদের জালবন্দি করতে হবে এবং তারা যাতে কোনো অনুকম্পা না পায়, তা সরকারকেই নিশ্চিত করতে হবে।
এও মনে রাখা জরুরি, সুশাসন প্রতিষ্ঠায় অবাধ তথ্যপ্রবাহের গুরুত্ব অপরিসীম। প্রযুক্তির বিকাশ অনেক কিছুই সহজ করে দিয়েছে। চাই শুধু সরকারের সদিচ্ছা। বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী ক্ষমতার মালিক জনগণ। দেশে কয়েকশ আইন বলবৎ রয়েছে। বেশিরভাগ আইন চালু রয়েছে জনগণের ওপর প্রয়োগ করার জন্য। কিন্তু তথ্য অধিকার আইনবলে জনগণ কর্তৃপক্ষকে প্রশ্ন করার অধিকার রাখে- এই শ্রুতিমধুর কথার প্রায়োগিক ব্যবস্থা সরকার কতটা নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে? সামাজিক, রাজনৈতিক ও সব প্রতিষ্ঠানে তথ্যপ্রবাহ অবাধ করা, অধিকার চর্চা গতিশীল করা এবং প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে তথ্য কমিশন যাতে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে তা নিশ্চিত করার দায় সরকারের। সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতি নির্মূলের শর্তগুলো শতভাগ পূরণ না করে শুধু অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করলেই সুফল মিলবে না। দুর্নীতি হ্রাস ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় করণীয় সবকিছুই করতে হবে নির্মোহ অবস্থান নিয়ে।

সংবিধানে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, জনগণের মৌলিক অধিকার ইত্যাদি স্বীকৃত হওয়া সত্ত্বেও কেন সুশাসন নিয়ে প্রশ্ন ওঠে? সরকারের সামনে এ এক বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জে জয়ী হতে না পারলে যত অর্জনের কথাই বলা হোক না কেন, এর সুফলভোগী দেশের মানুষ হতে পারবে না। মনে রাখা দরকার, সমতাভিত্তিক টেকসই উন্নয়নে সুশাসন অপরিহার্য। এও মনে রাখতে হবে, অর্জনের কোনো ফলই নিচের স্তরে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছে না। নিঃসন্দেহে এটি অত্যন্ত দুর্বল দিক। আমরা শুধু প্রবৃদ্ধি নিয়ে তৃপ্তির কথা বলছি; সুষম বণ্টনের দিকটি কি সেভাবে দেখছি? আগে রাজনৈতিক ব্যবস্থা স্বচ্ছ করতে হবে। রাজনৈতিক ব্যবস্থা যদি স্বচ্ছ করা না যায়, তাহলে অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান, বাজার, স্থানীয় প্রতিষ্ঠান- কোনো ক্ষেত্রেই আশার আলো দেখা যাবে না।
সরকারের মনোযোগ বাড়ানো উচিত গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ, সুশাসন প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা, গতিশীলতা এনে সম্পদের সুষম বণ্টনে। সুশাসন নিশ্চিত হলে, দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে পারলে বৈষম্যের ছায়া সরানোর পথটাও প্রশস্ত হবে। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অস্বচ্ছতার ছায়া গাঢ় হয়েছে বলেই নেতিবাচক অনেক কিছু দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। সুশাসন নিশ্চিত করা কিংবা দুর্নীতির পথ রুদ্ধ করা তো জনগণের কাজ নয়। এই কাজ ও দায়িত্ব সরকারের। দায়িত্বশীল কারও এমন ধারণা পোষণ করা উচিত নয়- দায়িত্ব পালনে আমরা নির্ভুল ও মানোত্তীর্ণ। এমন আত্মতৃপ্তি আত্মশুদ্ধির পথ সংকুচিত করে।
এম হাফিজ উদ্দিন খান: সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও সভাপতি, সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন
- বিষয় :
- সমকালীন প্রসঙ্গ
- এম হাফিজ উদ্দিন খান
