পণ্যমূল্য
বাজার অনিয়মের গণ্ডিমুক্ত হোক
এম হাফিজ উদ্দিন খান
প্রকাশ: ০৯ এপ্রিল ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ০৯ এপ্রিল ২০২২ | ১৩:৫০
বাজারের বিদ্যমান পরিস্থিতিতে এ প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক- বাজারে কি অনিয়মই নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাজারের অস্থিরতা যেন স্থায়ী রূপ পেতে যাচ্ছে। এমনিতেই সুযোগসন্ধানী ব্যবসায়ীদের ছলচাতুরীর অভাব নেই। তার ওপর যে কোনো উপলক্ষে এই চাতুরী কিংবা অপকৌশলের জাল আরও ছড়িয়ে যায়। আমাদের অভিজ্ঞতায় আছে, প্রায় প্রতি রমজানেই নিত্যপণ্য নিয়ে অসাধুদের নাটাই ঘোরানো আরও গতি পায়। এবারও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। সম্প্রতি এ নিয়ে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল জাতীয় সংসদও। ৬ এপ্রিল সমকালের শীর্ষ প্রতিবেদনের শিরোনাম করা হয়েছে 'নিয়ন্ত্রণের বাইরে বাজার, তোপে বাণিজ্যমন্ত্রী'। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিত্যপণ্যসহ সব জিনিসের দামে ঊর্ধ্বগতির প্রেক্ষাপটে জাতীয় সংসদে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশিকে একহাত নিলেন বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা। সরকারের শরিক দল জাতীয় পার্টির সদস্যরাও ছিলেন কঠোর সমালোচনামুখর। তারা প্রায় সবাই বলেছেন, সরকারের সহযোগিতা ছাড়া সিন্ডিকেট দাম বাড়াতে পারে না।
'সিন্ডিকেট' শব্দটি আমাদের বাজারের ক্ষেত্রে বহুল প্রচলিত ও ব্যবহূত। এই চক্রের কারসাজির নানা চিত্র এরই মধ্যে সংবাদমাধ্যমে উঠে এলেও এর প্রতিকার চিত্র বিবর্ণ। 'সিন্ডিকেট'-এর হোতারা ক্রমাগত ভোক্তার পকেট কেটে নিজেদের পকেট স্ম্ফীত করলেও তাদের কেশাগ্র স্পর্শ না করতে পারার কারণে সামাজে নানারকম চটুল কথা শোনা যায়। সরকারের মন্ত্রীরাও এরই মধ্যে বহুবার এই 'সিন্ডিকেট'-এর কথা স্বীকার করেছেন এবং তাদের কারসাজির জন্য অতীতে কেউ কেউ অসহায়ত্বও প্রকাশ করেছেন! 'সিন্ডিকেট'-এর হোতাদের হাত কি তাহলে আইনের হাতের চেয়েও লম্বা? কিংবা 'সিন্ডিকেট'-এর হোতাদের মাথা কি ক্ষমতাসংশ্নিষ্ট কারও কারও হাত স্পর্শিত? যে কোনো সমাজে দুস্কর্মকারীরা যখন দুস্কর্ম ক্রমাগত চালিয়েই যেতে থাকে, তখন খুব সহজেই প্রতীয়মান- এর পেছনে নিশ্চয়ই এমন শক্তি আছে, যে শক্তির সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে সম্পর্ক রয়েছে। একটি কল্যাণ রাষ্ট্র কিংবা সভ্য-মানবিক সমাজের চিত্র তো এমন হতে পারে না। নিত্যপণ্যের দাম নিয়ে যে চিত্র প্রায়ই নিত্য সংবাদমাধ্যমে উঠে আসছে, তাতে এ প্রশ্নও জাগে- বাজার কি নিয়ন্ত্রণহীনই হয়ে গেল। মুক্তবাজার অর্থনীতির মানে কী এই, যে রকম খুশি স্বেচ্ছাচারিতা চালিয়ে ফায়দা লুটে নিলেও সরকার ও সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীল পক্ষগুলোর কিছুই করার থাকবে না? জাতীয় সংসদে কঠোর সমালোচনার মুখে বাণিজ্যমন্ত্রী উল্টো প্রশ্ন রেখেছেন- 'ব্যবসা করি ৪০ বছর, রাজনীতি ৫৬ বছর। আমি ব্যবসায়ী বলে আমার অপরাধ' (৬ এপ্রিল, ২০২২, সমকাল)।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে বিদেশি ব্যবসায়ীদের নিয়ে দেশে যৌথ বাণিজ্য সংগঠন তৈরি ও বাণিজ্যিক সংগঠনে প্রশাসক বসানোর সুযোগ রেখে 'বাণিজ্য সংগঠন বিল-২০২২' পাস হওয়ার প্রেক্ষাপটেও অনেক প্রশ্ন সামনে এসেছে। এই বিল জনস্বার্থ কিংবা জনকল্যাণে কী ভূমিকা রাখবে, তাও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। সম্প্রতি রাশিয়া-ইউক্রেনের মধ্যকার যুদ্ধের কারণে বাজারে জ্বালানিসহ নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে- সরকারের কেউ কেউ এই যুক্তি দাঁড় করিয়েছেন। যেসব পণ্য আমদানি করতে হয় না এবং সরকারের সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীলদের ভাষ্যমতেই এসব যথেষ্ট মজুত আছে; একই সঙ্গে সরবরাহ চেইনও নির্বিঘ্ন; প্রশ্ন হচ্ছে- সেসব পণ্যের দাম বাড়ল কেন? করোনা দুর্যোগ-উত্তর দেশের বড় একটি অংশের মানুষ এখনও ঘুরে দাঁড়াতে পারেননি। অনেকে চাকরি হারিয়েছেন; পেশা বদলাতে বাধ্য হয়েছেন। স্বভাবতই এমন পরিস্থিতিতে তাদের স্বাভাবিক জীবনযাপনে বিরূপ প্রভাব পড়েছে। অনেকেই বাধ্য হয়ে ব্যয় সংকোচন শুধু নয়, চাহিদার তুলনায় অনেক কম নিত্যপণ্য কিনছেন; পুষ্টিকর খাদ্যপণ্য কেনা তো পরের কথা। হঠাৎ একদিন মন্ত্রী একটি বাজারে গিয়ে হাজির হলেন, তদারকি করলেন; তাতেই চলমান সংকট কেটে যাবে- এমনটি মনে করার সংগত কোনো কারণ আছে কি?
সম্প্রতি সমকালের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাত্র ছয় প্রতিষ্ঠানের কাছে রয়েছে ভোজ্যতেলের পুরো বাজারের নিয়ন্ত্রণ। অতীতে তো বটেই, সম্প্রতি ভোজ্যতেল নিয়ে তেলেসমাতি কম হয়নি। চাল নিয়ে চালবাজিও পুরোনো বিষয়। 'ভোজ্যতেলের দাম বাড়ার নেপথ্যে পাঁচ কারণ' শিরোনামে সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে যে চিত্র উঠে এসেছে, তাতেও প্রশ্ন জাগে- বাজারে নৈরাজ্যের শেষ কোথায়। এটা খুব স্বাভাবিক বিষয়, যে কোনো পণ্য যত বেশি হাতবদল হবে, তত দাম বাড়বে। সবজির অগ্নিমূল্যের পেছনেও রয়েছে নানা কারণ, যা নীতিনির্ধারক কিংবা বাজার নিয়ন্ত্রণের দায়-দায়িত্ব যাদের, তাদের না জানার কথা নয়। উৎপাদক অর্থাৎ কৃষক বঞ্চিত হচ্ছেন তার প্রাপ্য ন্যায্যমূল্য থেকে। অন্যদিকে ভোক্তা নাকাল হচ্ছেন সবজির বাজারে গিয়ে। মধ্যস্বত্বভোগীদের পোয়াবারো। তারা একদিকে উৎপাদকের মাথায় লাঠি মারছে, অন্যদিকে ভোক্তার পকেট কাটছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেছেন, 'সরকার কোথাও ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে না; ব্যবসায়ীদের সহায়তা করে।' প্রশ্ন হচ্ছে- নিয়ন্ত্রণ আর তদারকি কি এক কথা। নিয়ন্ত্রণ করে না কিন্তু নজরদারি-তদারকির পাটও যদি চুকে যায়, তাহলে অসাধুরা তো ফায়দা লুটবেই এবং হচ্ছে তা-ই। আর সরকার যে ব্যবসায়ীদের সহায়তা করছে; ভোক্তারা কি এর সুফল পাচ্ছেন? ভোক্তারা যদি কোনো সুফল না পান তাহলে কোন স্বার্থে ব্যবসায়ীদের সরকার সহায়তা করছে- এ প্রশ্নের জবাব দেওয়ার দায় যেমন সরকারের, তেমনি সরকারের কাছে এ জন্য ব্যবসায়ীদেরও জবাবদিহির দায় আছে। সরকারি বিপণন সংস্থা টিসিবির পরিসর, জনবল বাড়ানোসহ চাহিদার নিরিখে ভোক্তার কাছে ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রির পথ সুগম করার দাবিও পুরোনো। কিন্তু টিসিবি সংকটের মধ্যেও যেভাবে কার্যক্রম চালাচ্ছে, তা যেন সিন্ধুর মাঝে বিন্দু। বাজারে বিশৃঙ্খলার নানা চিত্র দৃশ্যমান, অথচ নেই দৃষ্টান্তযোগ্য প্রতিকার! পণ্যদরের তালিকা টাঙানো নিয়েও কত রকম বিস্ময়কর চিত্র সংবাদমাধ্যমে উঠে আসছে! এক কথায়, বাজার পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষ দিশেহারা। তারা রীতিমতো জিম্মি অসাধু চক্রের হাতে। ব্যবসার নামে যে নৈরাজ্য চলছে তাতে প্রতীয়মান- সুশাসনের অভাব কতটা অকল্যাণকর হতে পারে।

বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সরকারের উচিত সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে মজুত যতই থাক, সেদিকে দৃষ্টি আটকে না রেখে মজুত আরও বাড়িয়ে নিত্যপণ্যের বিক্রি বাড়ানো। রোজায় সংগত কারণেই মানুষের চাহিদা বেড়ে যায়। নিম্ন আয়ের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কিংবা তাদের ব্যাপারে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিসর বাড়ানোর পাশাপাশি সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীলদের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও জরুরি। ৭ এপ্রিল সমকালের একটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, গরিবের ভাতার টাকায় সংশ্নিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কী বিস্ময়কর লালসার দৃষ্টি! বাজার থেকে শুরু করে সমাজের নানা স্তরে এমন অনিয়ম-দুর্নীতি বলে দিচ্ছে, ক্ষত কতটা গভীরে। কোনো টোটকা-দাওয়াইয়ে এসব ব্যাধি সারবে না। শুধু বাজার কেন, সর্বত্রই ব্যবস্থা সুচারু করা দরকার। যে কোনো বৈরী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে দরকার দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার। বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের তরফে দৃশ্যত নানা পদক্ষেপ ইতোমধ্যে নেওয়া হলেও কার্যত সুফল মিলছে না কেন- এর উত্তর সন্ধান জরুরি।
বাজার নামক স্পর্শকাতর ক্ষেত্রে স্থিতিশীলতা কেন খুব জরুরি- এর বিশদ ব্যাখ্যা-বিশ্নেষণ নিষ্প্রয়োজন। সরকার বরাবরের মতোই অঙ্গীকার করেছিল, রোজায় নিত্যপণ্যের দাম সহনীয় পর্যায়ে থাকবে। কিন্তু যেখানে অসাধুদের দাপট এত বেশি এবং তাদের অনৈতিকতা এত প্রকট, সেখানে এসব যে কথার কথা মাত্র, এর নজিরও তো আমাদের সামনে আছে। দুর্মুখেরা বলেন, সরকার চাইলেই এমন তুঘলকি কাণ্ড বন্ধ করতে পারে। কিন্তু সরকারের সদিচ্ছা এ ব্যাপারে কতটা রয়েছে- এ প্রশ্নের জবাব সরকারের দায়িত্বশীলরাই ভালো দিতে পারবেন। আমরা প্রত্যাশা করি, বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠনের নেতারা সহযোগিতায় কার্যকরভাবে এগিয়ে আসবেন। ঘাটে ঘাটে চাঁদাবাজিসহ সব রকম নেতিবাচকতা বন্ধে সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীলদের কঠোর হতে হবে। অনিয়মকে নিয়মে পরিণত করার অপচেষ্টার পথ রুদ্ধ করতেই হবে।
এম হাফিজ উদ্দিন খান: সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা; সভাপতি, সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন
- বিষয় :
- পণ্যমূল্য
- এম হাফিজ উদ্দিন খান
